ডেঙ্গুর ভয়াবহতা বেড়েই চলেছে। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে এবং অনেকে মারা যাচ্ছে। ডেঙ্গুর এই ভয়াবহ অবস্থার মধ্যে স্কুল কলেজ বন্ধ রাখাটাই ভাল ছিল। এদিকে বিদ্যালয়ে গ্রীষ্মের ছুটিও বাতিল করা হয়েছে। অনেক শিক্ষার্থী ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছে। এডিস মশা নিয়মিত তান্ডব চালিয়ে যাচ্ছে।অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছে এডিস মশার বিস্তার। মশার সাথে আমাদের যুদ্ধের ইতিহাসটা বেশ পুরোনো।প্রতিবারই আমরা এই যুদ্ধে পরাজিত হয়েছি। তবে তাতে লজ্জার কিছু নেই। জয় পরাজয় থাকবেই।কিন্তু এই যুদ্ধে আমাদের সক্ষমতা নিয়ে কিছু প্রশ্ন জনমনে তৈরি হয়েছে। ধারাবাহিক পরাজয়ের নিশ্চয়ই কোন কারণ আছে। কিন্তু আমরা এত শক্তিশালী হয়েও তাদের সাথে যুদ্ধ করে কি একবারও জিততে পারবো না?
আমাদের দুর্বলতা তাহলে কোথায়? বাঘ, ভাল্লুক, সিংহ সহ সকল হিংস্র প্রাণিকে আমরা ঘায়েল করে ফেলেছি, অথচ সামান্য এই কীটের কাছে আমরা কেন এত অসহায়? সবুজ ঘাসের উপর বসে আড্ডা দেয়ার অভ্যাস আমার বেশ পুরোনো। গরমের দিনে সন্ধ্যায় ঘাসে বসে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেয়ার মজাই আলাদা। কিন্তু বেরসিক মশা তা সহ্য করতে নারাজ। মশা মারার জন্য কামানের প্রয়োজন হয় না, তবে কামানের চেয়ে ঢের শক্তিশালী পরিকল্পনা এবং সেই অনুযায়ী উদ্যোগের প্রয়োজন হয়। আর আমাদের ঠিক এখানেই দুর্বলতা। গরম আসতে না আসতেই মশার উপদ্রব শুরু হয়েছে। বরাবরই মশা নিধনের অনেক কেচ্ছা কাহিনী আমরা শুনেছি। যারা শুনিয়েছে তারা তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী হয়তো চেষ্টা করেছেন। আমাদেরও গাফিলতি রয়েছে অনেক। খাল কেটে কুমির আনতে আমাদের জুরি মেলা ভার।
মশার বাধাহীন বংশ বিস্তারের জন্য যা যা করোনীয় আমরা তা করছি। পুরো পরিবেশকে মশার জন্য আমরা প্রস্তুত করে দিচ্ছি। সেই মশাই যখন আমাদের সাথে মিতালী করতে আসে তখন আমরা অস্থির হয়ে উঠি। সব দায় অন্যের ঘাড়ে দিতে পারলেই যেন বাঁচা। বংশ বিস্তারের অধিকার সবারই আছে। মশারও আছে। বংশ বিস্তারের জন্য প্রতিটি জীব নিজ চেষ্টায় অনুকুল পরিবেশ তৈরি করে নেয়। কিন্তু এক্ষেত্রে মশা চরম ভাগ্যবান। কষ্ট করে তাদের পরিবেশ তৈরি করতে হয় না। আমরাই তাদের পরিবেশ তৈরি করে দিচ্ছি। প্রবাদে আছে যেমন কর্ম তেমন ফল। আমরা মশার বংশ বৃদ্ধিতে প্রতিনিয়ত সহায়তা করে যাচ্ছি। আবার একই সাধে তাদের নিধনে বুক চাপরাচ্ছি। এ ধরনের স্ববিরোধী বা প্যারাডকসিক্যাল কর্মই প্রধান অন্তরায়। তবে মশক নিধনে যাদের হাতে কিছু বিস্ফোরক রয়েছে তাদের ভুমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সিটি করপোরেশনের অনেক বেশি দায়িত্ব রয়েছে মশক নিধনে।
ডেঙ্গুর প্রকোপ দাবানলের মত ছড়িয়ে পড়ছে। গত ছয় মাসে প্রায় ২০০ মানুষ ডেঙ্গুতে মারা গেছেন। হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন কয়েক হাজার। গত বছর ২৮১ জন ডেঙ্গুতে মারা গিয়েছিলো। প্রায় ৬৩০০০ মানুষ ডেঙ্গু জ্বর নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলো। ১৯৬৫ সালে দেশে ডেঙ্গু প্রথম সনাক্ত হয়। কিন্তু ২০০০ সালের পর থেকে সেটা বৃদ্ধি পেতে থাকে। ডেঙ্গুর বিস্তার রোধে আমাদের উল্লেখযোগ্য কোন পদক্ষেপ ছিল না। যার ফলে ডেঙ্গুর বিস্তার আজ দানবীয় রূপ নিয়েছে। এখন ডেঙ্গুকে যদি আমরা নিয়ন্ত্রনে আনতে না পারি তবে এটা মহামারি আকার ধারণ করবে। গত তিনটি বছর করোনার ছোবলে আমরা দিশেহারা ছিলাম। এখন শুরু হয়েছে ডেঙ্গুর যন্ত্রনা। এডিস মশা নিয়ে আমাদের সচেতনতারও যথেষ্ট অভাব আছে। প্রতিটি মানুষ নিজ থেকে সচেতন না হলে ডেঙ্গুর ভয়াবহতা থেকে আমাদের মুক্তি নেই। যেসব কারণে ডেঙ্গুর বিস্তার ঘটে সেই সব কারন দূরীকরণে যথেষ্ট ঘাটতি দৃশ্যমান। প্রায় তিন কোটি লোকের বাস ঢাকা শহরে। ছোট্ট এই জায়গায় কোটি জনতার চাপে পরিবেশ একেবারেই নাজুক রূপ ধারণ করেছে। আমরা সবাই একে অন্যের উপরে দায় চাপিয়ে দায়িত্ব শেষ করতে চাই। কিন্তু এটা কোন সমাধান হতে পারে না। রাষ্ট্রকে মশক নিধনে বাজেট বাড়াতে হবে। বিদেশ থেকে ভাল মানের ঔষধ এনে ছিটাতে হবে। মশক নিধনের সাথে যারা জড়িত তাদের নিয়েও নানা অভিযোগ শোনা যায়। মশা নিধনের ঔষধের স্বল্পতার কথা প্রায়ই সোনা যায়? কিন্তু কেন? আমরা যদি পদ্মা সেতুর মত কাজ করতে পারি তাহলে মশা কেন নিধন করতে পারবো না? রাষ্ট্রকে অনেক বড় দায়িত্ব নিতে হবে। মশক নিধনে জনবল বাড়াতে হবে। ভাল ঔষধ ছিটাতে হবে। পরিবেশ পরিস্কার রাখার জন্য প্রশাসনকে কঠোর অবস্থানে যেতে হবে। এভাবেতো আর চলতে পারে না।
পৃথিবীতে যত ধরনের কীট আছে সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর হচ্ছে মশা। এটি ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া সবই বহন করে এবং এর কামড়ের মাধ্যমে এগুলি ছড়ায়। এখন পর্যন্ত বিশ্বে প্রায় সাড়ে তিন হাজার প্রজাতির মশার সন্ধান পাওয়া গেছে। মশা ১৫ টি ভয়ংকর রোগ ছড়ায়। এদের মধ্যে ম্যালেরিয়া, ফাইলেরিয়া, কালাজ্বর, ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, জিকা ও ইয়েলো ফিভার অন্যতম। মশার প্রকোপ এতটাই বেশি যে প্রতি বছর ২০ আগস্ট পালিত হয় মশা দিবস। আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী বছরে বিশ্ব প্রায় ৭০ কোটি মানুষ মশা বাহিত রোগে আক্রান্ত হয় এবং মারা যায় প্রায় ১০ লক্ষ মানুষ। গত ৩০ বছরে ডেঙ্গুর হার বেড়েছে প্রায় ৩০ গুণ।
মশার কামড়ে অতিষ্ঠ থাকে না এমন মানুষ এদেশে খুঁজে পাওয়া দূরুহ। শীতের আগমন ঘটছে। ইদানিং মশার উৎপাত কিছুটা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। মশার বিস্তার রোধে বহুমুখী পদক্ষেপ এখনই নেয়া জরুরী।
একটি স্ত্রী মশা খুব অল্প সময়ের মধ্যে দ্রুত বংশ বিস্তার করতে পারে। সাধারণত ২৫ থেকে ৩০ ডিগ্রি তাপমাত্রায় মশার প্রজনন বেশি হয়। মশায় আক্রান্ত একটি ভাইরাস থেকে চার ঘন্টায় ১০০ থেকে প্রায় এক হাজার ভাইরাস জন্ম নেয়। একটি স্ত্রী মশা সাধারণত ৫ থেকে ৭ সপ্তাহ পর্যন্ত বাঁচে। এই সময়ের মধ্যে একটি স্ত্রী মশা তিন থেকে চার বার প্রজনন করে থাকে।। মশা তার জীবনচক্রের প্রথম ২ সপ্তাহ সাধারণত পানিতে কাটায়। এরা যখন প্রাপ্ত বয়স্ক হয় তখন এদের নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। মশার জীবনচক্র চারটি পর্যায়ে হয়ঃ ডিম, শূক, মূককীট, আর পূর্ণাঙ্গ মশা। পূর্ণাঙ্গ নারী মশা বদ্ধ পানিতে ডিম পাড়ে। আমরা সবাই মশা নিধনের জন্য মরিয়া হয়ে উঠি। কিন্তু একটি বিষয় আমরা নজর কম দেই। আর তা হল মশার লার্ভা। এই লার্ভা ধ্বংস না করতে পারলে কোনমতেই মশার নিধন সম্ভব নয়। লার্ভা নিধন সবচেয়ে জরুরী। আর এর জন্য দরকার সমন্বিত উদ্যোগ। আমরা নানা উপায়ে মশার কামড় থেকে বাঁচার চেষ্টা করি। কয়েল ও স্প্রে ব্যবহার করে মশা তাড়াই। কিন্তু এ দুটিই স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের জন্য। মশারি টাঙিয়ে ঘুমানোটা নিরাপদ। মশা নিধন করতে হলে মশার উৎপত্তি, বিকাশ ও প্রজনন সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা থাকতে হবে। মশার বিস্তারের পিছনে বড় কারণগুলির মধ্যে রয়েছে পরিবেশ দূষণ, ঘনবসতি, জনসংখ্যার আধিক্য, অসচেতনতা, আবর্জনা, অপরিকল্পিত নগরায়ন ও শিল্পায়ন, জলাবদ্ধতা, অপরিকল্পিত পয়ঃনিষ্কাশন, জলবায়ুর পরিবর্তন, অতিরিক্ত কীটনাশকের ব্যবহার, অনিয়মিত মশক নিধন প্রক্রিয়া। যে কারণগুলি উল্লেখ করলাম এগুলির সবকটিই এদেশে প্রবল। কাজেই মশা খুব দ্রুত বিস্তার করে। মশার কামড়ে যে শুধু অসস্তি লাগে তাই নয়, বরঞ্চ এর কামড়ে নানা প্রকাশ রোগ বিস্তার লাভ করে। এডিস মশার কামড়ে ডেঙ্গু জ্বর সহ নানা জটিলতা দেখা দেয় শরীরে। মশা নিধনের কাজটি মুখে যত সহজে বলা যায় বাস্তবে তা সম্ভব নয়। মশা নিধন করতে হলে কতকগুলি সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিতে হবেঃ ১. নমুনা সংগ্রহ করা ২. লার্ভা সনাক্ত করা ৩. প্রজনন বন্ধ করা ৪. কার্যকরী ঔষধ ছিটানো ৫. পরিবেশ পরিষ্কার রাখা ৬. জলাবদ্ধতা দূরীকরণ ৭. অতিরিক্ত কীট নাশকের ব্যবহার সম্পর্কে সচেতন হওয়া ৮. পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা নিরাপদ করা।
আমরা সাধারণত দেখি যে মশার প্রকোপ বৃদ্ধি পেলে কিছু ঔষধ ছিটিয়েই যেন দায়িত্ব শেষ। শুধু ঔষধ ছিটিয়ে মশা নিধন আদৌ সম্ভব নয়। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে প্রতিকূল পরিবেশেও মশার টিকে থাকার সক্ষমতা বেড়েছে। অর্থাৎ আগে যে সাধারণ ঔষধে কাজ হতো, এখন আর তা হচ্ছে না। ডেঙ্গু নিধনে বর্তমানে উবাকিয়া পদ্ধতি ব্যবহার হয়ে থাকে। বদ্ধ বা জমা পানিতে কেরোসিন বা মবিল ঢেলেও মশক নিধন করা যায়। তবে পদ্ধতিটি স্বাস্থ্য সম্মত নয়। তাহলে মশা কিভাবে নিধন করা সম্ভব। এক্ষেত্রে মশার ডিমকে যদি ধ্বংস করে দেয়া যায় তাহলে খুব সহজেই মশা নিধন করা সম্ভব। সরকারের একার পক্ষে মশক নিধন কখনোই সম্ভব নয়। পরিবেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখার দায়িত্ব সবার। সবাই সচেতন না হয়ে শুধু কারও উপর দায় চাপিয়ে দিলেই কাজ হবে না। তাই রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপের পাশাপাশি নিজেদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে। প্রবাদে আছে মশা মারতে কামান দাগা। কথাটির মাঝে কঠিন সত্য লুকিয়ে আছে। মশা মারতে হয়তো কামান দরকার হয় না, কিন্ত কামানের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী পরিকল্পনা দরকার হয়। একমাত্র সঠিক পরিকল্পনা তার সেটার সঠিক বাস্তবায়নই পারে মশার বিস্তার রোধ করতে।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রনে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবক গঠনগুলিকে কাজে লাগানো যেতে পারে। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও এক্ষেত্রে এগিয়ে আসতে পারে। রাষ্ট্রে অনেক বেকার যুবক আছে। এসব বেকার যুবকদের কিছু আর্থিক সহায়তা দিয়ে রাষ্ট্র তাদের কাজে লাগাতে পারে। এছাড়াও বি এন সি সি সহ নানা থরণের প্রশিক্ষিত শ্রেণিকেও রাষ্ট্র কাজে লাগাতে পারে। ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে শিক্ষাঙ্গনে তেমন প্রচারনা দৃশ্যমান নয়। কিন্তু শিক্ষার্থীদের সচেতন করতে হবে। প্রতিটি বিদ্যালয়ে শিক্ষকদের সহায়তা নিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্তনে কাজ করা যেতে পারে। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এখন কিছুটা উত্তপ্ত। সবার নজর হয়তো সেদিকে। কিন্তু রাজনীতি নিয়ে মাথা ঘামাতে ঘামাতে ডেঙ্গুর প্রকোপে ভয়াবহ সর্বনাশ হয়ে যেতে পারে। তাই এখন সমন্বিত উদ্যোগই একমাত্র ভরসা।
অভিমত থেকে আরো পড়ুন