https://www.prothomalony.com/
18032
opinion
একজন ছেলে ও একজন মেয়ের বয়স ঠিককত বছর হলে তাদেরকে প্রাপ্ত বয়স্ক বলা যাবে কোরআন থেকে তার কোনো ধারনা পাওয়া যায় না।কোনো বয়সে বিয়ে করা উচিৎ আর কোনো বয়সে উচিৎ নয় এ সিদ্ধান্ত মানুষ তার সমসাময়িক পারিপার্শ্বিক পরিবেশ থেকে গ্রহণ করে থাকে। জাতি সংঘের সংজ্ঞায় ১৮ বছরকে প্রাপ্ত বয়স্কের মাপকাঠি ধরা হলেও স্থান কাল ভেদে এটি পরিবর্তিত হয়।
ছেলেমেয়েদের বিয়ের একটি যৌক্তিক বয়স সম্পর্কে কোরআনে একটি নির্দেশনা পাওয়া যায়।
"ইয়াতীমদেরকে যাচাই করতে থাকবে যে পর্যাপ্ত না তারা বিয়ের যোগ্য হয় এবং তাদের মধ্যে ভাল-মন্দ বিচারের জ্ঞান দেখলে তাদের সম্পদ তাদেরকে বুঝিয়ে দাও ।(৪:৬)
উপরোক্ত আয়াত থেকে বুঝা যায় যে, বিয়ের যোগ্য বয়স হওয়া আর ছেলেমেয়েদের ভালমন্দ বিচার করার বিবেকবুদ্ধি সম্পন্ন হওয়ার বিষয়টি যাচাই করে দেখার দায়িত্বটি আল্লাহ্ মানুষের ওপর ছেড়ে দিয়েছেন যা দেশ কাল ভেদে ভিন্ন হতে পারে।
আমেরিকার এক এক অঙ্গ রাজ্যের আইনে প্রাপ্ত বয়স্ক ও বিয়ের বৈধ বয়স একেক রকম ,সর্বত্র ১৮ বছর নয়। রাষ্ট্রের আইনে বিয়ের বৈধ বয়সের কথা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকলেও আইনের তোয়াক্কা না করে সেখানে প্রতিবছর লাখ লাখ বাল্য বিয়ে সংঘটিত হয়। অনেক অঙ্গ রাজ্যের আইনে বাবামায়ের সম্মতিতে অপ্রাপ্ত বয়স্কদের বিয়ে করার অনুমতি দেওয়া হয়।
বাংলা ভাষার অনেক জনপ্রিয় কবি ও সাহিত্যিক ইসলামের নবী মুহাম্মদ সাঃ এর সাথে আয়েশা রা: বিয়ে নিয়ে ব্যাঙ্গাত্মক কবিতা ও সাহিত্য রচনা করেছেন।এক শ্রেনীর ধর্ম বিদ্বেষী মানুষ ভাষণ বক্তৃতায় রেফারেন্স হিসেবে সময়ে সময়ে এইসব লেখকদের লেখার উদৃতি দিয়ে থাকেন। মুহাম্মদ সাঃ এর বাল্য বিবাহের এই অপবাদ যে সত্য নির্ভর নয় তাদের অনেকেই সে বিষয়টি জানেন। তারপরও অপপ্রচার থেমে নেই।
বাল্য বিয়ের সেকাল ও একালের পরিস্থিতি জানতে ইতিহাসের দলিল ঘাঁটাঘাঁটি করে সত্য উদঘাটনের প্রয়োজন পড়ে না।নবীজীর সমালোচনাকারী প্রবীণ লেখকদের অনেকেরই বাবা মায়ের বিয়ে হয়েছে অপ্রাপ্ত বয়সে যা সে সময়কার বিয়ের জন্য সমাজের দৃষ্টিতে স্বীকৃত বিষয় হিসেবেই বিবেচিত হয়েছে। আমরা জানি সাহিত্য চলমান সময়ের প্রতিচ্ছবি যা মানুষের রুচি অভ্যাস ও অন্যান্য রীতিনীতি ধারণ করে। আসুন পল্লী কবি জসিম উদ্দিনের কবর কবিতার খানিকটা অংশ পড়ি।
"এই খানে তোর দাদির কবর ডালিম-গাছের তলে,
তিরিশ বছর ভিজায়ে রেখেছি দুই নয়নের জলে।"
এতটুকু তারে ঘরে এনেছিনু সোনার মতন মুখ,
পুতুলের বিয়ে ভেঙে গেল বলে কেঁদে ভাসাইত বুক।"
পুতুল নিয়ে খেলা করা একটি মেয়ের বয়স কত হতে পারে এই সব লেখকরা কি অনুধাবন করতে পারেন না? অবশ্যই পারেন। আজ থেকে কয়েক দশক আগেও বাল্য বিয়ে বলে কোন বিয়েকে দোষনীয় কাজ বলে চিহ্নিত করা হতো না।
মেয়েদের অল্প বয়সে বিয়ে হওয়া নিয়ে এই যে আমরা আলোচনা করছি মেয়েরা নিজেরা আসলে অল্প বয়সে বিয়ে হওয়ার বিষয়টি কিভাবে দেখেন? জীবনে অনেক সুশিক্ষিতা উচ্চ শিক্ষিতা মহিলাকে গর্বভরে এমন কথা উচ্চারণ করতে শুনেছি যে,খুব ছোট বয়সে তাদের বিয়ে হয়েছে। কোন পরিসংখ্যান না থাকলেও আজও দেখি মেয়ে সন্তানরা অল্প বয়স থেকেই শিশুর পুতুল কোলে নিয়ে কল্পনার রাজত্বে তাকে লালন পালন করে আর একটি ছেলের চেয়ে একটি মেয়ে অনেক আগে থেকেই বিয়ে আর সংসার এসব নিয়ে ভাবতে শুরু করে।
মার্কিন যুক্তরাস্ট্রের প্রতিষ্ঠান 'ফ্রন্টলাইন' এর ২০০০-২০১৫ এক জরিপে দেখা যায় যে, উল্লেখিত সময়ে দেশটিতে অন্তত ২ লাখ ৭ হাজার ৪৬৮টি বাল্যবিবাহের ঘটনা ঘটেছে। আর অপ্রাপ্ত বয়স্ক ছেলেমেয়েদের মধ্যে শারীরিক সম্পর্কের ঘটনা এর চেয়ে অনেক বেশি। উইকিপিডিয়ার তথ্যে দেখা যায় যে, সারা বিশ্বে প্রতিবছর ১ কোটি ২০ লাখের বেশি বিয়ে সংঘটিত হয় যেখানে মেয়ের বয়স ১৮ বছরের কম।
ইমাম বোখারী তার ১২শ' বছর আগের গ্রন্থে লিখেছেন আয়েশার রা:বিয়ে হয়েছে ৬ বছর বয়সে। আর তাদের মধ্যে শারীরিক সম্পর্ক হয়েছে ১১বছর বয়সে। যদিও এসব তথ্যে দ্বিমত ও বিতর্ক রয়েছে অনেক। মাইকেল হার্টজের বিবেচনায় ইতিহাসের ১ নম্বর সফল রাষ্ট্র নায়কের মর্যাদা প্রাপ্ত নবী মুহাম্মদের (সা:) সাথে অপ্রাপ্ত বয়স্কা আয়েশার বিয়ের বিষয়টি দুনিয়ার সর্বত্রই কিছু মানুষের মুখে মুখে আলোচিত ও সমালোচিত হতে দেখা যায়।
উপমহাদেশের কবি সাহিত্যিকদের অনেক লেখায় নবীজী ও আয়েশার এ বিবাহকে নিয়ে ব্যঙ্গ বিদ্রূপ করা হয়েছে। এসব লেখালেখির মাধ্যমে নবীজীকে ইতিহাসের নিন্দিত রাষ্ট্র নায়ক হিসেবে দেখানোর অপচেষ্টার পাশাপাশি ইসলামকে একটি ভ্রান্ত জীবন দর্শন প্রমাণের চেষ্টা করা হয়েছে।
নবীজির জামানায় কার সাথে বিয়ে বৈধ আর কার সাথে বিয়ে বৈধ নয় এমন কোন নিয়ম নীতি ছিলোনা তখনকার আরব সমাজে।আর রাসূল ছিলেন সে সমাজেরই একজন মানুষ। ঠিক একই কারণে অন্যান্য আরব পুরুষদের মতই রাসূলের স্ত্রীর সংখ্যা ছিল ৯ যা সেসময়কার জন্য দোষনীয় কোন বিষয় ছিলোনা।
আজকের এ সময়ে আপনাদের যাদের বয়স ৫০/৬০/৭০ বছর একটু খোজ নিয়ে দেখেন আপনাদের বাবামায়ের বিয়ে হয়েছিল কত বছর বয়সে? আপনাদের দাদা দাদীর সময়ের কথা না হয় বাদই দিলাম। খোঁজ নিয়ে দেখুন আপনার মায়ের প্রথন সন্তানের জন্ম হয়েছিল তার কত বছর বয়সে? আপনার বাবা মা কি তাদের বয়সের জন্য সে সমাজে ঘৃণিত হয়েছিলেন? মোটেই না।
নবীজি ও আয়েশা রা: র বিয়ের বিষয়টি আজ থেকে দেড় হাজার বছর আগের ঘটনা।অথচ আজ থেকে পন্ধাশ বছর আগেও সমাজে বাল্যা বিয়েকে একটি স্বাভাবিক বিয়ে হিসেবে গণ্য করা হতো।
আমাদের এই উপমহাদেশে সুশীল মানুষ হিসেবে পরিচিত এমন অনেক মানুষ কিন্তু অপ্রাপ্ত বয়সে দাম্পত্য জীবন শুরু করেছিলেন যা ইসলাম বিদ্বেষীরা ভুলেও উচ্চারণ করেন না।
১৪ বছর বয়সে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বিয়ে করেছিলেন ৮ বছর বয়সের এক মেয়েকে।কবি গুরু খেতাবপ্রাপ্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিয়ে করেছিলেন ২২ বছর বয়সে। আর তখন তাঁর স্ত্রীর বয়স ছিল ১১ বছর।
সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র বিয়ে করেন ১১ বছর বয়সে যখন তাঁর স্ত্রীর বয়স ছিল মাত্র ৫ বছর ৷
দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর বিয়ে করেছিলেন ১৪ বছর বয়সে তখন তাঁর স্ত্রী সারদা দেবীর বয়স ছিল মাত্র ৬ বছর।
রাজনারায়ণ বসু বিয়ে করেছিলেন ১৭ বছর বয়সে তখন তাঁর স্ত্রীর বয়স ছিল ১১ বছর।জ্যোতিন্দ্রনাথ ঠাকুর বিয়ে করেছিলেন ১৯ বছর বয়সে যখম তার স্ত্রীর বয়স ছিল মাত্র ৮ বছর।সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত বিয়ে করেছিলেন ১৭ বছর বয়সে। তখন তার স্ত্রীর বৈস ছিল মাত্র ৭ বছর।
আর বাংলাদেশে শেখ মুজিবের বয়স যখন ১৩ এবং বেগম ফজিলাতুন্নেসা রেণুর বয়স যখন মাত্র ৩ বছর তখন পরিবারের সম্মতিতে তাদের বিয়ে ঠিক হয়। ১৯৩৮ সালে আনুষ্ঠানিক বিয়ের সময় রেনুর বয়স ছিল ৮ বছর ও শেখ মুজিবের ১৮ বছর।
ইতিহাসের পাতায় এমন হাজারো বিয়ের ঘটনা খোঁজে পাওয়া যাবে।
লেখক: মানবিক সংগঠক ও ধর্মতত্ত্বের লেখক।
অভিমত থেকে আরো পড়ুন