https://www.prothomalony.com/

18058

opinion

অভিমত

উত্তরের স্বাস্থ‍্য-সচাতনতা 

প্রকাশ: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২৩:১৪

উত্তরের স্বাস্থ‍্য-সচাতনতা 
(১)

নারীর ইস্ট ইনফেকশন ও প্রতিকার

আমাদের বাঙালি সমাজে নারীদের প্রজনন স্বাস্থ্য বা যোনিপথের নানা সমস্যা নিয়ে কথা বলা এখনও একরকম সামাজিক লজ্জা বা সংকোচের বিষয়; বিশেষ করে যোনিপথে চুলকানি, জ্বালাপোড়া বা স্রাবের পরিবর্তনের মতো সংবেদনশীল সমস্যাগুলো। অথচ চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এটি সম্পূর্ণ একটি সাধারণ, নিরাময়যোগ্য এবং প্রচলিত স্বাস্থ্যগত জটিলতা, যার নাম 'ইস্ট ইনফেকশন'। 

যোনিপথে ইস্ট ইনফেকশনের আরেকটি নাম হলো 'ভ্যাজাইনাল ক্যান্ডিডিয়াসিস'। প্রতি ৪ জন নারীর মধ্যে প্রায় ৩ জন তাঁদের জীবদ্দশায় অন্তত একবার এই সংক্রমণের শিকার হন। আর প্রায় অর্ধেক নারী দু'বার বা ততোধিক বার এতে আক্রান্ত হন। বয়ঃসন্ধিকালের পরে এবং মেনোপজের (রজঃনিবৃত্তি) আগের সময়টাতে এটি সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। 

ইস্ট ইনফেকশনের লক্ষণ ও কারণ সমূহ: 

ইস্ট ইনফেকশনের সাধারণ লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে: যোনিপথে বা তার চারপাশে চুলকানি অথবা জ্বালাপোড়া, ছানার মতো দেখতে ঘন ও সাদা রঙের স্রাব, যোনিপথ ও যোনিদ্বারের চারপাশে লাল হয়ে যাওয়া এবং ফুলে যাওয়া, যোনিদ্বারের ত্বকে ছোট ছোট ক্ষত বা সূক্ষ্ম ফাটল দেখা দেওয়া, প্রস্রাবের সময় জ্বালাপোড়া করা এবং যৌন মিলনের সময় ব্যথা হওয়া।

ক্লিভল‍েন্ড ক্লিনিক এর তথ‍্য অনুযায়ী, ক্যান্ডিডা নামক ছত্রাকের অতিরিক্ত বৃদ্ধির কারণে যোনিপথে ইস্ট ইনফেকশন হয়ে থাকে। সাধারণত এই ছত্রাক কোনো সমস্যা ছাড়াই মানবদেহে বাস করে। শরীরের অন্যান্য উপকারী ব্যাকটেরিয়া এর বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। কিন্তু কিছু নির্দিষ্ট কারণে এই ভারসাম্য নষ্ট হলে ক্যান্ডিডা অনিয়ন্ত্রিতভাবে বেড়ে যায় এবং ইস্ট ইনফেকশনের সৃষ্টি করে। 

কিছু সুনির্দিষ্ট কারণের মধ‍্যে রয়েছে: অ্যান্টিবায়োটিক সেবন, গর্ভাবস্থা ও হরমোনের পরিবর্তন, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমেযাওয়া, অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস। 

আমাদের শরীরের অন্যান্য সংক্রমণের চিকিৎসায় ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিক যোনিপথের উপকারী ব্যাকটেরিয়াগুলোকে মেরে ফেলে। উপকারী ব্যাকটেরিয়ার অনুপস্থিতিতে ভারসাম্য নষ্ট হয়ে ইস্ট ইনফেকশন দেখা দেয়। যেকোনো কারণে হরমোনের তারতম্য ঘটলে যোনিপথে ক্যান্ডিডার ভারসাম্য বিঘ্নিত হতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে গর্ভাবস্থা, জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি ব্যবহার এবং মাসিক চক্রের স্বাভাবিক হরমোন পরিবর্তন।

এছাড়া, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করে দেয় এমন কোনো রোগ থাকলে ইস্ট ইনফেকশনে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। প্রস্রাবে শর্করার অতিরিক্ত উপস্থিতিও ইস্টের বংশবৃদ্ধিতে সহায়তা করে। এছাড়া অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও দুর্বল করে দেয়।

ঝুঁকি বাড়ায় এমন অন্যান্য বিষয়গুলোর মধ‍্যে রয়েছে: ভেজা পোশাক বা সাঁতারের পোশাকে দীর্ঘক্ষণ থাকা, 

 আঁটসাঁট ও বাতাস চলাচলে বাধা দেয় এমন পোশাক পরা, 

 সুগন্ধযুক্ত ট্যাম্পন, স্প্রে, সাবান বা ডিওডোরেন্ট ব্যবহার করা।

তবে এটি কোনো যৌনবাহিত রোগ নয়। ইস্ট ইনফেকশন সাধারণত ছোঁয়াচে হিসেবে বিবেচিত হয় না; তবে বিরল ক্ষেত্রে এটি নারী সঙ্গীর দেহে ছড়াতে পারে। পুরুষ সঙ্গীর দেহে এটি ছড়ানোর ঘটনা অত্যন্ত বিরল।

ইস্ট ইনফেকশনের লক্ষণগুলো যোনিপথের অন্যান্য সমস্যার লক্ষণের মতোই হতে পারে। তাই এই ধরনের কোনো উপসর্গ দেখা দিলে কিংবা উপরোক্ত লক্ষণগুলোর বাইরেও যদি আপনার শরীরে অন্য কোনো নতুন বা অস্বাভাবিক উপসর্গ দেখা দেয়, তাহলে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর সাথে যোগাযোগ করে পরীক্ষা করানো উচিত।  

প্রতিরোধে আপনি যা করতে পারেন: 

জীবনযাত্রায় কিছু পরিবর্তন এনে আপনি সহজেই ইস্ট ইনফেকশন প্রতিরোধ করতে পারেন। যেমন:

১.ডাউচিং (যোনিপথ ভেতর থেকে পানি বা রাসায়নিক দিয়ে ধোয়া) না করা (ডাউচিং ছত্রাক নিয়ন্ত্রণকারী উপকারী ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করে ফেলে)।

২.ভ্যাজাইনাল স্প্রে বা ডিওডোরেন্ট এড়িয়ে চলা।

৩.সুগন্ধযুক্ত ট্যাম্পন বা প্যাড ব্যবহার না করা।

৪.ভেজা কাপড় (সাঁতারের পোশাক বা ব্যায়ামের পোশাক) যত দ্রুত সম্ভব বদলে ফেলা।

৫.সুতি কাপড়ের অন্তর্বাস এবং ঢিলেঢালা পোশাক পরা।৬.যৌন মিলনের ক্ষেত্রে ওয়াটার-বেসড (পানিভিত্তিক) লুব্রিকেন্ট ব্যবহার করা।

৬.ডায়াবেটিস থাকলে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা।

ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক বার্তা দেয় যে, ইস্ট ইনফেকশন খুব সাধারণ একটি ছত্রাকজনিত সংক্রমণ, যা অধিকাংশ নারীই জীবনে কখনো না কখনো ভোগেন। ওষুধের মাধ্যমে এটি পুরোপুরি নিরাময়যোগ্য এবং কিছু ওষুধ স্থানীয় ফার্মেসিতে চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র (প্রেসক্রিপশন) ছাড়াই কিনতে পাওয়া যায়। তবে আপনি লক্ষণগুলো চিনতে পারলেও স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর পরামর্শ নেওয়া জরুরি। সংক্রমণের ধরন ও তীব্রতা অনুযায়ী তাঁরাই সবচেয়ে কার্যকর চিকিৎসার পরামর্শ দিতে পারেন।

(২)

সন্তানের ব্যক্তিত্ব গঠনে ভারসাম্যপূর্ণ প্যারেন্টিংয়ের গুরুত্ব

সন্তান প্রতিপালন বা প্যারেন্টিং কোনো অপরিবর্তনী নিয়ম নয়, বরং এটি স্নেহ ও শৃঙ্খলার এক সূক্ষ্ম ভারসাম্য। মাটির পাত্র গড়তে যেমন এক হাত দিয়ে ভেতর থেকে আলতো সমর্থন দিতে হয় এবং অন্য হাত দিয়ে বাইরে থেকে চাপ দিয়ে আকার দিতে হয়, সন্তানের চরিত্র গঠনেও ঠিক তেমনি ভালোবাসা ও নিয়মানুবর্তিতার যুগপৎ প্রয়োজন। অভিভাবকত্বে এই ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যখন তা 'অতি আদর' কিংবা 'অতি শাসন'-এর চরম সীমায় পৌঁছায়, তখন শিশুর মানসিক ও সামাজিক বিকাশ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।

অতি আদরের ক্ষতিকর প্রভাব:  সন্তানের প্রতিটি অযৌক্তিক আবদার মেনে নেওয়া,  ভুলত্রুটি দেখেও অন্ধ থাকা এবং তাকে বাস্তব জীবনের কোনো প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে না দেওয়াকে 'অতি আদর' বা পার্মেসিভ প্যারেন্টিং বলা হয়। এতে শিশুর সহনশীলতা ও বাস্তবতাবোধ নষ্ট হয়ে যায়। শৈশবে সবকিছু সহজে পাওয়ার কারণে এরা 'না' শোনার মানসিক শক্তি হারিয়ে ফেলে। ফলে পরিণত জীবনে সামান্য ব্যর্থতা বা প্রত্যাখ্যানে এরা চরম হতাশা ও বিষণ্ণতায় ভেঙে পড়ে।

অতি আদরে বড় হওয়া শিশুরা নিজেদেরকে জগতের কেন্দ্রবিন্দু মনে করতে শুরু করে, যাকে মনস্তত্ত্বের ভাষায় 'এনটাইটেলমেন্ট কমপ্লেক্স' বলা হয়। তারা অন্যের অনুভূতির প্রতি উদাসীন হয়ে পড়ে এবং চরম আত্মকেন্দ্রিক আচরণ করে। এছাড়া সবকিছু অভিভাবক গুছিয়ে দেওয়ায় এরা নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার বা সমস্যা সমাধানের মৌলিক দক্ষতা অর্জন করতে পারে না, যা এদের আজীবন পরনির্ভরশীল করে রাখে।

অতি শাসনের মানসিক আঘাত: শাসন মানে যদি হয় শারীরিক বা মানসিক শাস্তি, সার্বক্ষণিক নজরদারি এবং শিশুর নিজস্ব ব্যক্তিসত্তার সম্পূর্ণ অবমূল্যায়ন, তবে তা শৃঙ্খলা শেখায় না; বরং শিশুর আত্মবিশ্বাস গুঁড়িয়ে দেয়। কর্তৃত্বপরায়ণ বা অথরিটেরিয়ান প্যারেন্টিংয়ের এই অতিরিক্ত কঠোরতা শিশুকে সত্যবাদী করে না, বরং শাস্তি এড়াতে নিখুঁত মিথ্যা বলতে ও তথ্য গোপন করতে বাধ্য করে। প্রতিনিয়ত সমালোচনা ও কড়া শাসনের শিকার শিশুরা নিজেদের অযোগ্য ভাবতে শুরু করে। তাদের মধ্যে তীব্র হীনম্মন্যতা ও অপরাধবোধ তৈরি হয়, যা পরবর্তী জীবনে গুরুতর সামাজিক উদ্বেগে রূপ নেয়। অধিকন্তু, এই ভয় ও অবদমনের চাপ যখন অসহনীয় হয়ে ওঠে, তখন তারা পিতা মাতার প্রতি অশ্রদ্ধাশীল হতে পারে এবং বয়ঃসন্ধিকালে এসে অনেক সন্তান চরম উগ্র ও বিদ্রোহী হয়ে ওঠে এবং বাবা-মায়ের সাথে আত্মিক বন্ধন চিরতরে ছিন্ন করে।

অভিভাবকত্বের মূল ভিত্তি: ভালোবাসা ও যৌক্তিক শাসন:  শিশুর সুস্থ, সুন্দর ও স্বাভাবিক মানসিক বিকাশের জন্য অথরিটেরিয়ান, নেগলেক্টেড, পার্মিসিভ প‍্যারেন্টিং-কোনটাকেই বিশেষজ্ঞরা সমর্থন করেন না। এর পরিবর্তে অথরিটেটিভ প‍্যারেন্টিং চর্চাকে শিশুর সার্বিক বিকাশে উপযুক্ত বলে সমর্থন করা হয়-যেখানে স্নেহ ও শৃঙ্খলার সমন্বয়ে গড়ে ওঠে ইতিবাচক পরিবেশ। এই অভিভাবকত্বের মূল ভিত্তি মূলত দুটি স্তম্ভের ওপর প্রতিষ্ঠিত:

স্পষ্ট সীমারেখা ও স্নেহের বাস্তবায়ন: আচরণের সীমানা নির্ধারণ করতে হবে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে, তবে তা কার্যকর করতে হবে গভীর ভালোবাসা ও সহমর্মিতার সাথে।

ইতিবাচক বোঝাপড়া: সন্তান কোনো ভুল করলে তাকে শারীরিক বা মানসিকভাবে আঘাত না করে, শান্ত কণ্ঠে ভুলের পরিণতি বুঝিয়ে বলতে হবে। একইভাবে, অযৌক্তিক কোনো আবদারে সায় না দিয়ে সরাসরি প্রত্যাখ্যানের বদলে 'না' বলার পেছনের যৌক্তিক কারণটি ব্যাখ্যা করতে হবে।

সন্তানের মনস্তত্ত্ব একটি নরম কাদামাটির মতো; অতিরিক্ত আদরে সে যেমন কোনো সুনির্দিষ্ট আকার পায় না, তেমনি অতি শাসনে শুকিয়ে ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। একটি আত্মবিশ্বাসী, দায়িত্বশীল ও মানবিক গুণসম্পন্ন ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ে তোলার একমাত্র চাবিকাঠি হলো অপরিসীম ভালোবাসা এবং গঠনমূলক শৃঙ্খলার ভারসাম্যপূর্ণ মেলবন্ধন।

(৩)

কৈশোরের প্রজনন স্বাস্থ্য: সংকট এবং মা-বাবার ভূমিকা

কৈশোর বা বয়ঃসন্ধিকালে দেহে ও মনে ঘটে যুগান্তকারী পরিবর্তন। কৈশোর হলো শৈশব থেকে যৌবনে উত্তরণের সন্ধিক্ষণ। এই সময়ে শরীরে যেমন দ্রুত পরিবর্তন আসে, তেমনি মনে আসে নানা জিজ্ঞাসা ও দ্বন্দ্ব। যৌনতা এই বয়সের বিকাশের একটি স্বাভাবিক অংশ, কিন্তু সঠিক জ্ঞানের অভাবে এটিই অনেক সময় সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

কৈশোরের যৌন জটিলতা কী ও কেন হয়? 

কৈশোরে যৌন সংক্রান্ত জটিলতা কোনো রোগ বা বিকৃতি নয়; বরং এটি মূলত হরমোনের তীব্র পরিবর্তন সম্পর্কে বিভ্রান্তি, অতিরিক্ত কৌতূহল এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে  না পারা জনিত জটিলতাকে বোঝায়; যা স্বাভাবিক। 

মূলত, ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সের মধ্যে ছেলেদের শরীরে টেস্টোস্টেরনের ক্ষরণ হঠাৎ বহুগুণ বেড়ে যায়। এর ফলে কণ্ঠস্বর ভারী হওয়া, দ্রুত দৈহিক বিকাশ, বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকর্ষণ এবং স্বপ্নদোষের মতো গৌণ বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পায়। হরমোনের এই আকস্মিক উত্থানের কারণে শরীরে এমন কিছু নতুন অনুভূতি ও জৈবিক তাড়না তৈরি হয়, যা সম্পর্কে তাদের পূর্ব কোনো ধারণা থাকে না। পরিবার বা পাঠ্যসূচিতে সঠিক প্রজনন স্বাস্থ্য শিক্ষার সুযোগ না থাকায় এই স্বাভাবিক শারীরিক পরিবর্তনগুলো তাদের কাছে ভয়, বিভ্রান্তি ও লজ্জার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

এ সময় বন্ধুবান্ধবের আড্ডায় যৌনতা নিয়ে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে বলা গল্প বা মিথ অনেক সময় কিশোরদের মধ্যে ভুল প্রতিযোগিতা তৈরি করে। নিজেকে তখন অন্যদের চেয়ে কম পুরুষালি বা অনভিজ্ঞ মনে করে তারা হীনম্মন্যতায় ভোগে। ফলে বন্ধুদের কাছে নিজেকে বড় বা সাহসী প্রমাণ করার জন্য অনেকে ঝুঁকিপূর্ণ আচরণে জড়িয়ে পড়ে।

এ সময়ে কিশোররা সাধারণত কী করে?

পারিবারিক সমর্থনের অভাবে কিশোররা সাধারণত কিছু অস্বাস্থ্যকর প্রক্রিয়ায় নিজেদের মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। 

গোপনীয়তার আশ্রয় ও আত্ম-অন্বেষণ: নিজেদের অনুভূতি বা শারীরিক রূপান্তর নিয়ে তারা চরমভাবে গুটিয়ে যায় এবং সবকিছু পরিবারের কাছে লুকিয়ে রাখে। নিজের শরীর নিয়ে কৌতূহল জাগে। আয়নায় বারবার নিজেকে দেখে। 

হস্তমৈথুন: এটি এই বয়সে একটি অতি সাধারণ ও 

স্বাভাবিক আচরণ। এটি শারীরিকভাবে ক্ষতিকর নয়, যদি না এটি অতিরিক্ত আসক্তিতে পরিণত হয়ে পড়াশোনা বা দৈনন্দিন জীবনকে ব্যাহত করে।

পর্নোগ্রাফিতে অতিরিক্ত নিমগ্নতা: কৌতূহল ও মানসিক চাপ মেটাতে অনেকে ডিজিটাল মাধ্যমের ক্ষতিকর জগতে ডুব দেয়। পর্নোগ্রাফির অবাস্তব অভিনয়কে তারা বাস্তবের আদর্শ রূপ ভেবে নেয়, যার ফলে বাস্তব জীবন নিয়ে অবাস্তব প্রত্যাশা তৈরি হয় এবং বিপরীত লিঙ্গের প্রতি বিকৃত ও অসম্মানজনক দৃষ্টিভঙ্গি জন্ম নেয়।

স্বভাব ও আচরণের পরিবর্তন: পড়াশোনায় মনোযোগ হারানো, অকারণ মেজাজ খিটখিটে হওয়া, একা একা থাকা এবং মা-বাবার সাথে দূরত্ব বজায় রাখা শুরু করে।

ঝুঁকিপূর্ণ পরীক্ষা-নিরীক্ষা: সঠিক ধারণার অভাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপরিচিত মানুষের সাথে অন্তরঙ্গ আলাপে বা ভুল সম্পর্কের ফাঁদে জড়িয়ে পড়ে। এছাড়া পরিচিত কারো সান্নিধ্য বা স্পর্শ পাওয়ার অবচেতন তাড়না অনুভব করা এ বয়সে স্বাভাবিক হলেও, ব্যক্তিগত সীমানা ও সম্মতির বোধ না থাকায় তারা অনেক সময় অপ্রীতিকর পরিস্থিতির মুখে পড়ে চরম পাপবোধে ভোগে।

মনে রাখা দরকার, পর্নোগ্রাফিকে যৌন শিক্ষার উৎস মনে করা সবচেয়ে মারাত্মক ভুল, যা যৌনতা সম্পর্কে বিকৃত ধারণা তৈরি করে। সম্মতি কী, তা না বোঝা আরও একটি সমস‍্যা। ভালোবাসার নামে শারীরিক সম্পর্কের জন্য চাপ দেওয়া বা চাপে পড়ে রাজি হওয়া দুটোই ক্ষতিকর। অল্প বয়সে শারীরিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ার ফলে যৌনবাহিত রোগ, অপরিকল্পিতভাবে কাউকে প্রেগনেন্ট করানোর মতো শারীরিক ও মানসিক ট্রমার ঝুঁকি থাকে। সামাজিক ট্যাবু বা কুসংস্কারের কারণে স্বপ্নদোষ বা হস্তমৈথুন নিয়ে অমূলক পাপবোধে ভোগা-আত্মবিশ্বাসকে ধূলিসাৎ করে এবং অবসাদের জন্ম দেয়। 

এ সময় অভিভাবকের যা করণীয়: 

এ সময়ে শাসন নয়, প্রয়োজন বন্ধুত্বপূর্ণ সহযোগিতা। মনে রাখবেন, সন্তান নরম কাদামাটির মতো।

১. লজ্জা নয়, বন্ধু হোন: "তোমার বয়স হয়নি" বলে এড়িয়ে যাবেন না। এ সনয় বয়স উপযোগী ভাষায় শরীরের পরিবর্তন নিয়ে কথা বলুন। আপনিই হোন তার নির্ভরযোগ্য তথ্যের প্রথম উৎস। তাকে বলুন, "কাউকে ভালো লাগা বা ছুঁয়ে দেখার ইচ্ছে জাগতেই পারে - এটা বয়ঃসন্ধির হরমোনের কারণে হয়, এটা পাপ নয়, বিকৃতিও নয়। কিন্তু মনে ইচ্ছে জাগা এক জিনিস, আর সেটা করে ফেলা আরেক জিনিস। যেমন রাগ হওয়া স্বাভাবিক, কিন্তু রাগ হলেই কাউকে মেরে ফেলা যায় না।"

২. স্পষ্ট সীমা ও যুক্তি: ইন্টারনেট ব্যবহারের স্পষ্ট নিয়ম তৈরি করুন, তবে স্নেহের সাথে। শুধু 'না' বলবেন না, 'কেন না' তার যৌক্তিক কারণ ব্যাখ্যা করুন। 

৩. শাস্তি নয়, পরিণতি বোঝান: ভুল করলে আক্রমণ বা অপদস্থ করবেন না। শান্তভাবে বোঝান যে তার আচরণের পরিণতি কী হতে পারে। তাকে প্রশ্ন করার নিরাপদ জায়গা দিন।

৪. সম্মতি ও সম্মানের শিক্ষা দিন: তাকে সুস্পষ্টভাবে শেখাতে হবে যে কারও ব্যক্তিগত সীমানাকে সম্মান জানানো জরুরি। অনুমতি বা সম্মতি ছাড়া কাউকে স্পর্শ করা অন্যায় এবং সামাজিক ও আইনিভাবে অগ্রহণযোগ্য।

'না' বলার অধিকার সবার আছে, এবং 'না' মানেই 'না'।

৫. পর্যবেক্ষণ, নজরদারি নয়: ফোন চেক করে আতঙ্কিত না হয়ে, তার মানসিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করুন। সে কি হঠাৎ গুটিয়ে যাচ্ছে, রেগে যাচ্ছে, পড়াশোনায় অমনোযোগী হচ্ছে? তাহলে খোলামনে কথা বলুন। প্রয়োজনে স্কুল কাউন্সেলর বা কিশোর-বান্ধব চিকিৎসকের সাহায্য নিন।

৬.আবেগ নিয়ন্ত্রণের সুস্থ মাধ্যম: এই বাড়তি মানসিক ও শারীরিক শক্তিকে খেলাধুলা, সৃজনশীল কাজ, পড়াশোনা বা শরীরচর্চার মতো গঠনমূলক কাজে পরিচালিত করার উৎসাহ দিন। 

কৈশোর কোনো সমস্যা নয়, এটি জীবনের এক সুন্দর পরিবর্তনের যাত্রা। আমাদের সমাজের অনেক অভিভাবক নিজেরাও এই বিষয়গুলো নিয়ে কথা না বলার সংস্কৃতিতে বড় হয়েছেন; ফলে সন্তানের সাথে আলোচনা করতে গিয়ে দ্বিধা বা লজ্জায় ভোগেন। কিন্তু মনে রাখবেন, আপনি সংকোচে নীরব থাকলে সন্তান তথ্য খোঁজা থামাবে না, বরং বাইরে থেকে ভুল ও বিকৃত তথ্য গ্রহণ করবে।

প্রজনন স্বাস্থ্য স্বাভাবিক শরীরবৃত্তীয় বিজ্ঞানের অংশ। সরাসরি বলতে অস্বস্তি হলে শিক্ষামূলক বই বা চিকিৎসকের লেখার সাহায্য নিয়ে সহজভাবে কথা শুরু করুন। এই সন্ধিক্ষণে পর্যাপ্ত ভালোবাসা, যৌক্তিক শৃঙ্খলা ও মা-বাবার সংকোচহীন দিকনির্দেশনাই তাকে একজন আত্মবিশ্বাসী ও দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবে।

অভিমত থেকে আরো পড়ুন