https://www.prothomalony.com/
18088
north-america
আরেকটি ১১ সেপ্টেম্বর। সেই সঙ্গে পূর্ণ হচ্ছে পঁচিশ বছর—একটি প্রজন্মের সমান সময়। ২০০১ সালের সেই সকালে নিউইয়র্কের আকাশ যেভাবে কালো ধোঁয়ায় ঢেকে গিয়েছিল, সেই ছবি এখনো পৃথিবীর সম্মিলিত স্মৃতির সবচেয়ে গাঢ় দাগগুলোর একটি হয়ে আছে। ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের যমজ চূড়া দুটি ধসে পড়তে সময় নিয়েছিল মিনিট কয়েক। কিন্তু তার অভিঘাত পৃথিবী এখনো বহন করে চলেছে। বিমানবন্দরের নিরাপত্তা তল্লাশি থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র পুনর্বিন্যাস, প্রতিটি ক্ষেত্রেই সেই সকালের ছায়া দীর্ঘ। ইতিহাসে এমন কম দিনই আছে, যাকে ঘিরে গোটা বিশ্ব-ব্যবস্থার একটি স্পষ্ট আগে ও পরে চিহ্নিত করা যায়। ১১ সেপ্টেম্বর তেমনই একটি দিন।
চারটি সমন্বিত হামলায় সেদিন প্রাণ হারিয়েছিলেন প্রায় তিন হাজার মানুষ। যাঁদের মধ্যে ছিলেন উনিশজন হামলাকারীও। শুধু ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারেই মৃত্যু হয়েছিল আড়াই হাজারের বেশি মানুষের। উদ্ধারকাজে গিয়ে প্রাণ দিয়েছিলেন কয়েক শ দমকলকর্মী ও পুলিশ সদস্য। মৃতের তালিকায় ছিল আশির অধিক দেশের নাগরিক।এই সংখ্যাটিই বলে দেয়, নিউইয়র্ক আসলে কতটা বিশ্বনগরী। সেই সকালের ক্ষতি কোনো একটি জাতির একার শোক হয়ে থাকেনি।
এই বিশ্বজনীন শোকের তালিকায় বাংলাদেশও নীরবে যুক্ত হয়ে গিয়েছিল। লোয়ার ম্যানহাটনের সেই টাওয়ার দুটিতে সেদিন কাজ করছিলেন প্রবাসী বাংলাদেশিরাও—কেউ রেস্তোরাঁয়, কেউ অফিসে, কেউবা নিছক জীবিকার তাগিদে। অন্তত ছয়জন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আমেরিকান সেদিন প্রাণ হারান বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। যাঁদের মধ্যে ছিলেন শাকিলা ইয়াসমিন ও তাঁর স্বামী নুরুল হক মিয়া—এক দম্পতি, যাঁদের গল্প পঁচিশ বছর পরও ঢাকা কিংবা নিউইয়র্কের বাঙালি মহল্লায় মাঝেমধ্যে ঘুরেফিরে আসে। কারো কারো হিসাবে সংখ্যাটি আরও বেশি, কেননা নথিপত্রহীন অভিবাসীদের অনেকের নামই শেষ পর্যন্ত কোনো সরকারি তালিকায় ওঠেনি।এই না-ওঠাটুকুই বোধ হয় প্রবাসজীবনের সবচেয়ে করুণ এক সত্য। যে মানুষ জীবদ্দশায় প্রায়ই অদৃশ্য থেকে যান কাগজে-কলমে, মৃত্যুতেও তাঁর নাম রয়ে যায় হিসাবের বাইরে।
পঁচিশ বছর একটা লম্বা সময়। এই সময়ে আফগানিস্তান ও ইরাকে দুটি দীর্ঘ যুদ্ধ হয়ে গেছে। বিমানবন্দরে জুতা খুলে তল্লাশি দেওয়া একরকম বিশ্ব-সংস্কৃতি হয়ে উঠেছে। আর মুসলিম পরিচয়ের মানুষজনকে বহু দেশে সন্দেহের চোখে দেখার একটি নতুন স্বাভাবিকতা তৈরি হয়েছে। যা আজও পুরোপুরি কাটেনি। যে নিরাপত্তা-স্থাপত্যের ভেতর দিয়ে আজকের বিশ্ব চলাফেরা করে—নজরদারি, ড্রোন হামলা, সীমান্ত-নিয়ন্ত্রণ—তার ভিত গাঁথা হয়েছিল সেই একটি সকালে। এতকিছুর পরও একটি প্রশ্নের নিষ্পত্তি হয়নি: এই ক্ষত আদৌ সারবে কবে? ঘটনাস্থলে আজ দাঁড়িয়ে আছে নতুন এক ওয়ান ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার। ঝকঝকে কাচের দেয়ালে সূর্য প্রতিফলিত হয়। কিন্তু স্থাপত্য দিয়ে স্মৃতি মোছা যায় না, বড়জোর ঢেকে রাখা যায়।
প্রতিবছর সেপ্টেম্বর এলে নিউইয়র্ক-নিউজার্সির বাঙালি অধ্যুষিত এলাকাগুলোতেও একধরনের নীরব আচার পালিত হয়।কেউ স্মরণসভায় যান, কেউ শুধু খবরের কাগজ উল্টে পুরোনো ছবিগুলো আরেকবার দেখেন। এই শহরেই বাস করেন সেই স্বজনহারা পরিবারগুলো, যাঁদের কাছে ১১ সেপ্টেম্বর কোনো ঐতিহাসিক তারিখ নয়। একটি নাম, একটি মুখ, একটি ফিরে না আসা মানুষের স্মৃতি। ইতিহাসের বইয়ে যা একটি অধ্যায়, বাস্তব জীবনে তা কারো কারো কাছে এখনো প্রতিদিনের এক অসমাপ্ত শোক।
সভ্যতা এগিয়েছে, প্রযুক্তি বদলেছে, ভূরাজনীতির মানচিত্র বহুবার আঁকা হয়েছে নতুন করে। কিন্তু একটি সকালে নিরপরাধ কয়েক হাজার মানুষকে এভাবে মুছে ফেলার যে কলঙ্ক, তার কোনো সংশোধনী সংস্করণ এখনো তৈরি হয়নি। পঁচিশ বছর পর দাঁড়িয়ে তাই এটুকুই বলা যায়—ক্ষত পুরোনো হয়েছে, কিন্তু শুকায়নি।
উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন