https://www.prothomalony.com/

18089

new-york

নিউইয়র্ক

নাইন-ইলেভেনের পঁচিশ বছর: নিউইয়র্ক যে ক্ষত বয়ে চলছে

প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৪:৪৩

ক্যালেন্ডারের পাতায় ২৫ বছর খুব দীর্ঘ সময়। কিন্তু নিউইয়র্কের কাছে ১১ সেপ্টেম্বর ২০০১—নাইন-ইলেভেন—এখনো যেন গতকালের ঘটনা।

পঁচিশ বছর আগে এই শহরের আকাশ হঠাৎ বদলে গিয়েছিল। ম্যানহাটনের আকাশে উঠে আসা কালো ধোঁয়া, সাইরেনের শব্দ, রাস্তায় ছুটে চলা মানুষ, ধুলোয় ঢাকা মুখ।এসব দৃশ্য শুধু নিউইয়র্কের ইতিহাসে নয়, আধুনিক বিশ্বের স্মৃতিতেও স্থায়ী হয়ে আছে।

সেদিন ২,৯৭৭ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন। তাঁরা ছিলেন বিভিন্ন দেশ, জাতি, ধর্ম ও পরিচয়ের মানুষ। তাঁদের মধ্যে ছিলেন অফিসকর্মী, অগ্নিনির্বাপক, পুলিশ কর্মকর্তা, বিমানের যাত্রী, রেস্তোরাঁকর্মী—ছিলেন অসংখ্য অভিবাসীও। একটি সন্ত্রাসী হামলা মুহূর্তের মধ্যে হাজার হাজার পরিবারকে শোকের মধ্যে ঠেলে দিয়েছিল।

নাইন-ইলেভেন শুধু একটি সন্ত্রাসী হামলা ছিল না। এটি ছিল একটি যুগের সমাপ্তি এবং আরেকটি যুগের সূচনা।

টুইন টাওয়ারের পতনের সঙ্গে সঙ্গে শুধু দুটি ভবন ধসে পড়েনি; ধসে পড়েছিল আমেরিকার নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিনের আত্মবিশ্বাসও।

এরপর শুরু হলো ‘War on Terror’। আফগানিস্তানে যুদ্ধ, ইরাকে আগ্রাসন, গুয়ানতানামো বে, কঠোর বিমানবন্দর নিরাপত্তা, ব্যাপক নজরদারি এবং সন্ত্রাসবিরোধী আইনের বিস্তার—আমেরিকার রাষ্ট্রব্যবস্থা ও বৈদেশিক নীতিতে নাইন-ইলেভেনের ছাপ গভীর হয়ে বসে গেল।

২৫ বছর পর দাঁড়িয়ে একটি কঠিন প্রশ্ন করতেই হয়—সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কি পৃথিবীকে সত্যিই নিরাপদ করেছে?

আল-কায়েদার নেতা ওসামা বিন লাদেন নিহত হয়েছেন। সংগঠনটির আগের সক্ষমতা ভেঙে পড়েছে। কিন্তু সন্ত্রাসবাদ পৃথিবী থেকে বিদায় নেয়নি। বরং এর চরিত্র বদলেছে, নতুন সংগঠন ও নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে নতুন নতুন রূপ নিয়েছে।

আফগানিস্তান ও ইরাকের দীর্ঘ যুদ্ধ যে বিপুল মানবিক ও রাজনৈতিক মূল্য তৈরি করেছে, তার হিসাবও এখনো শেষ হয়নি।

নাইন-ইলেভেনের পর আমেরিকার মুসলিম জনগোষ্ঠীর জীবনেও বড় পরিবর্তন আসে।

একটি সন্ত্রাসী সংগঠন ইসলামকে নিজের নামে ব্যবহার করেছিল। কিন্তু সেই অপরাধের ছায়া পড়েছিল পৃথিবীর কোটি কোটি নিরপরাধ মুসলমানের ওপর।

আমেরিকার মসজিদ, মুসলিম কমিউনিটি, আরব-আমেরিকান ও দক্ষিণ এশীয় অভিবাসী—অনেকেই সন্দেহ, বৈষম্য ও সামাজিক চাপের মুখোমুখি হয়েছেন। এমনকি সাধারণ মুসলিম নাম, পোশাক কিংবা দাড়িও কখনো কখনো অযাচিত সন্দেহের কারণ হয়ে উঠেছিল।

এখানেই নাইন-ইলেভেনের একটি মৌলিক শিক্ষা রয়েছে: একজন অপরাধীর পরিচয় দিয়ে কোটি মানুষের পরিচয় নির্ধারণ করা যায় না।

সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে। কিন্তু কোনো ধর্মের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জয়ী হওয়া যায় না।

নিউইয়র্কের বাংলাদেশি কমিউনিটিও নাইন-ইলেভেনের পরের পরিবর্তনের বাইরে ছিল না।

এই শহরের জ্যাকসন হাইটস, জ্যামাইকা, ব্রঙ্কস, ব্রুকলিন কিংবা কুইন্সের নানা এলাকায় যে বাংলাদেশি অভিবাসী সমাজ গড়ে উঠেছে, তার অনেকেই নাইন-ইলেভেনের আগে আমেরিকাকে দেখেছেন একভাবে, পরে দেখেছেন অন্যভাবে।

আমাদের প্রজন্মের বহু মানুষ তখন নতুন অভিবাসী। কেউ সদ্য ব্যবসা শুরু করেছেন, কেউ ট্যাক্সি চালাচ্ছেন, কেউ রেস্টুরেন্টে কাজ করছেন, কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন, কেউ সাংবাদিকতা করছেন। হঠাৎ করেই ‘Muslim’ পরিচয়টি অনেকের সামাজিক জীবনে নতুন এক অর্থ নিয়ে হাজির হয়।

কিন্তু এই কমিউনিটিই আবার প্রমাণ করেছে—আমেরিকার মূলধারায় যুক্ত হওয়া এবং নিজের সাংস্কৃতিক পরিচয় ধরে রাখা পরস্পরবিরোধী নয়।

আজ নিউইয়র্কের বাংলাদেশিরা ব্যবসা করেন, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিক্ষক, সাংবাদিক, আইনজীবী, সরকারি কর্মকর্তা ও নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন। এই শহরের অর্থনীতি ও সামাজিক জীবনে তাঁদের অবদান রয়েছে।

নাইন-ইলেভেনের ২৫ বছর পর এই গল্পটিও বলা দরকার। কারণ ইতিহাস শুধু ধ্বংসের গল্প নয়; ইতিহাস পুনর্গঠনের গল্পও।

আজ যেখানে টুইন টাওয়ার দাঁড়িয়ে থাকার কথা ছিল, সেখানে রয়েছে 9/11 Memorial। বিশাল দুটি জলাধারের চারপাশে খোদাই করা হাজার হাজার নাম।
সেখানে দাঁড়ালে রাজনীতি খুব ছোট মনে হয়।

কোনো নামের পাশে লেখা নেই তিনি রিপাবলিকান ছিলেন না ডেমোক্র্যাট। লেখা নেই তিনি মুসলিম ছিলেন, খ্রিষ্টান ছিলেন, ইহুদি ছিলেন কিংবা কোনো ধর্মে বিশ্বাস করতেন না। লেখা নেই তিনি অভিবাসী ছিলেন নাকি বহু প্রজন্মের আমেরিকান।
আছে শুধু নাম।

মৃত্যু মানুষকে শেষ পর্যন্ত পরিচয়ের সমস্ত বিভাজনের বাইরে নিয়ে যায়। এই কারণেই গ্রাউন্ড জিরো শুধু একটি স্মৃতিসৌধ নয়। এটি মানবসভ্যতার জন্য একটি নৈতিক প্রশ্নও।

নাইন-ইলেভেনের পর আমেরিকা নিরাপত্তাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছে। বিমানবন্দরের দীর্ঘ নিরাপত্তা পরীক্ষা থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় নজরদারি—নাগরিকজীবনের বহু ক্ষেত্রেই পরিবর্তন এসেছে।

কিন্তু গণতন্ত্রের জন্য প্রশ্নটি এখনো একই: নিরাপত্তার নামে আমরা কতটা স্বাধীনতা বিসর্জন দিতে প্রস্তুত?

একটি রাষ্ট্র তার নাগরিককে নিরাপদ রাখবে—এটি তার দায়িত্ব। কিন্তু সেই নিরাপত্তার নামে যদি নাগরিকের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কিংবা নির্দিষ্ট কোনো জনগোষ্ঠীর সমান অধিকার সংকুচিত হয়, তাহলে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে গণতন্ত্র নিজেই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

নাইন-ইলেভেনের ২৫ বছর পর এই ভারসাম্যের প্রশ্নটি আগের চেয়ে আরও গুরুত্বপূর্ণ।

নাইন-ইলেভেন আমাদের শিখিয়েছে, কোনো রাষ্ট্রই সম্পূর্ণ নিরাপদ নয়।এটি শিখিয়েছে গোয়েন্দা তথ্যের মধ্যে সমন্বয়ের গুরুত্ব। শিখিয়েছে প্রযুক্তি যেমন নিরাপত্তা বাড়াতে পারে, তেমনি সন্ত্রাসীদের হাতেও নতুন অস্ত্র তুলে দিতে পারে। শিখিয়েছে ঘৃণা কখনো সীমান্ত মানে না। সবচেয়ে বড় কথা—এটি শিখিয়েছে, ভয়কে ঘৃণায় পরিণত করা কত সহজ।

কিন্তু নিউইয়র্ক আরেকটি শিক্ষা দিয়েছে।ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকেও একটি শহর উঠে দাঁড়াতে পারে।সেদিন যারা মানুষকে বাঁচাতে ছুটে গিয়েছিলেন, তাঁরা ধর্ম বা জাতি জিজ্ঞেস করেননি। অগ্নিনির্বাপকরা জানতেন না তাঁরা কাকে উদ্ধার করছেন। পুলিশ কর্মকর্তারা জানতেন না সামনে কী বিপদ। Flight 93-এর যাত্রীরা জানতেন না তাঁদের প্রতিরোধ ইতিহাসে কী অর্থ বহন করবে।মানুষ তখন মানুষের জন্যই দাঁড়িয়েছিল।

নাইন-ইলেভেনের ২৫ বছর পূর্তি কোনো উৎসব নয়। এটি স্মরণের দিন, আত্মজিজ্ঞাসার দিন।আমরা নিহতদের স্মরণ করব। তাঁদের পরিবারের বেদনার প্রতি শ্রদ্ধা জানাব। প্রথম প্রতিক্রিয়াকারীদের আত্মত্যাগ স্মরণ করব।

কিন্তু একই সঙ্গে আমাদের প্রশ্ন করতে হবে—গত ২৫ বছরে আমরা কি পৃথিবীকে আরও নিরাপদ করেছি, নাকি শুধু আরও ভীত করেছি?

আমরা কি সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে কোনো নিরপরাধ জনগোষ্ঠীকে সন্দেহের চোখে দেখেছি?

আমরা কি নিরাপত্তার নামে স্বাধীনতার সীমা অতিক্রম করেছি? সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—আমরা কি ইতিহাস থেকে ঘৃণার বদলে মানবিকতার শিক্ষা নিয়েছি?

নিউইয়র্কের আকাশে এখন আর টুইন টাওয়ার নেই। কিন্তু তাদের স্মৃতি আছে। সেই স্মৃতি আমাদের প্রতিদিন মনে করিয়ে দেয়—মানুষের তৈরি সবচেয়ে উঁচু ভবনও একদিন ধসে পড়তে পারে। রাষ্ট্রের শক্তিও সীমাহীন নয়। প্রযুক্তিও আমাদের রক্ষা করার পাশাপাশি বিপদের কারণ হতে পারে।

কিন্তু মানুষের সহমর্মিতা, সাহস এবং একসঙ্গে দাঁড়ানোর ক্ষমতা—সেটিই শেষ পর্যন্ত একটি শহরকে বাঁচিয়ে রাখে।

নাইন-ইলেভেনের ২৫ বছর পর তাই আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত খুব সহজ।
সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আপসহীন থাকব, কিন্তু ঘৃণার কাছে আত্মসমর্পণ করব না।

কারণ নাইন-ইলেভেনের ধ্বংসস্তূপ থেকে নিউইয়র্ক যে শিক্ষা নিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে, সেটি শুধু আমেরিকার জন্য নয়—সমগ্র বিশ্বের জন্য।

মানুষের নাম মনে রাখুন। মানুষের পরিচয়কে সম্মান করুন। সত্যকে ভুলে যাবেন না।
ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিপর্যয়গুলো শেষ পর্যন্ত আমাদের কাছে ফিরে আসে একটি প্রশ্ন নিয়ে— আমরা কি সত্যিই কিছু শিখেছি?

নিউইয়র্ক থেকে আরো পড়ুন