https://www.prothomalony.com/
18087
literature
প্রকাণ্ড মেহগনি গাছটি তার সমস্ত শাখাপ্রশাখা দিয়ে পুরো বাড়িটিকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। এই বাড়িতে বহুকাল ধরে কেউ পা মাড়ায় না। গ্রামের মেঠোপথ দিয়ে যাওয়ার সময় আজও মানুষ ভয়ে দোয়া-দরুদ পড়ে বুকে ফুঁ দিয়ে বাড়ির পাশ দিয়ে যায়। মাঝে মাঝে কুয়াশাচ্ছন্ন সকালে কিংবা অমাবস্যার রাতে দূর থেকে আবছা দেখা যায়, এক বিবর্ণ নারী গাছটাকে জড়িয়ে ধরে কোনো এক অচেনা ভাষায় গান গাইছে। সেই সুরের ভেতর যেন লুকিয়ে আছে হাজার বছরের জমাট বাঁধা কান্না।
সেদিন ছিল ভ্যাপসা গরমের এক অমাবস্যার রাত। শাশুড়ি জমিলা বিবির কঠোর শাসনে পরীবানুর সারা দিন কেটেছে চরম আতঙ্কে। রাতে স্বামী চেরাগ আলীর চরম অবহেলা সহ্য করতে না পেরে পরীবানু দৌড়ে পালিয়ে আসে বাড়ির পেছনের উঠানে। মেহগনি গাছের গোড়ায় বসে সে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলে, "হে গাছ, আমার বাইচ্চা থাকতে আর মন চায় না। আমার কথা যদি বুঝতে পারো, তাইলে তোমার বুকে আমারে একটু জায়গা দাও। ভালোবাসা ছাড়া তো আর কিছু চাই না। হে গাছ, আমার কথা কি শুনতে পাও?"
পরীবানুর জীবনটা ছিল ঘরের এক কোণে পড়ে থাকা অব্যবহৃত, ধুলোমাখা এক টুকরো কাগজের মতো। জন্মের পর থেকেই তার কোনো কদর ছিল না। বাবা-মায়ের কাছে সে ছিল এক অপ্রয়োজনীয় বোঝা, আর ভাইবোনদের ভিড়ে এক অদৃশ্য ছায়া। সবাই চেয়েছিল দ্রুত তার বিয়ে দিয়ে দায়মুক্ত হতে। পরীবানু ভেবেছিল, বিয়ের পর হয়তো তার একটা স্থায়ী ঠিকানা মিলবে। নিজের একটা ঘর হবে, সংসার হবে, স্বামীর ভালোবাসা পাবে।
কিন্তু বিয়ের পর পরীবানু যে ঘর পেল, সেখানে একমাত্র রাজত্ব ছিল তার শাশুড়ি জমিলা বিবির। চেরাগ আলীর সাহস ছিল না মায়ের কথার বাইরে যাওয়ার। সে ছিল মায়ের আঁচলে বাঁধা এক পরজীবী মানুষ। আর শাশুড়ি জমিলা বিবি ছিলেন সাক্ষাৎ এক যমদূত। পরীবানুর সকাল শুরু হতো শাশুড়ির কটু কথা আর গঞ্জনা দিয়ে, আর রাত শেষ হতো চোখের জলে বালিশ ভিজিয়ে। রান্নায় একটু এদিক-সেদিক হলেই শুনতে হতো—অভাবের সংসারে পরীবানু কত বড় বোঝা! মায়ের কথা শুনে চেরাগ আলী স্ত্রীর গায়ে হাত না তুললেও যে ধরনের কথা শোনাত, তাতে প্রতিদিন একটু একটু করে পরীবানুর আত্মসম্মান চূর্ণ হয়ে যেত।
সারা দিনের এই অপমান আর দমবন্ধ করা পরিবেশ থেকে মুক্তি পেতে পরীবানুর একমাত্র আশ্রয় ছিল বাড়ির পেছনের অবহেলিত উঠানটা। যেখানে একা দাঁড়িয়ে ছিল বহু পুরোনো, ঝরা পাতার এক মেহগনি গাছ। কেউ তার যত্ন নেয় না, তবু সে টিকে আছে—ঠিক পরীবানুর মতোই।
পরীবানুর জীবনে যখন দুঃখের বাঁধ ভেঙে যেত, তখন লুকিয়ে সে এই মেহগনি গাছের কাছে ছুটে আসত। গাছের খসখসে বাকলে হাত বুলিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলত নিজের কষ্টের কথা। স্বামী আর শাশুড়ি মিলে কীভাবে তাকে যন্ত্রণা দেয়, যা সে নিজের বাপের বাড়ির কাউকে বলতে পারে না। তার আশপাশে এমন কোনো মানুষ ছিল না যে বলবে, "আমি তোমার কষ্ট বুঝি।" গাছটা নীরব শ্রোতার মতো সব শুনত। পরীবানু যেন এই মৌনতার মাঝেই এক পরম শান্তি খুঁজে পেয়েছিল।
হঠাৎ একদিন এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। পরীবানুর কান্নার রেশ যখন মিলিয়ে আসছে, তখন রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে বাতাসে এক অদ্ভুত মর্মর ধ্বনি শোনা গেল। কেবল পাতার শনশন শব্দ নয়, স্পষ্ট মানুষের গলার মতো ভারী ও গম্ভীর এক পুরুষালি কণ্ঠ ভেসে এল বাতাসে—
"তুমি একা নও গো পরী। আমি তোমার পাশে আছি, সব সময় পাশে থাকব। কথা দাও, তুমিও আমৃত্যু আমার সাথে থাকবে?"
পরীবানু ভয়ে বড় বড় চোখে এদিক-ওদিক তাকাল। উঠানে কেউ নেই। সে ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বলল, "কে? কে কথা বলছ?"
"আমি গো, আমি। তোমার এই গাছ। তোমার দীর্ঘশ্বাস, তোমার জমিয়ে রাখা অভিমান আর চোখের জলে আমার শেকড়গুলো আজ জীবন্ত হয়ে উঠেছে। তুমি আমায় ডেকেছ, তাই আমি জেগে উঠেছি। কথা বলছি তোমার সাথে।"
কত কাল পর কেউ এত সুন্দর করে, মোলায়েম সুরে তার সাথে কথা বলল! গাছের বাকলে হাত রেখে পরী কথা দেয়, আমৃত্যু তারা একসাথেই থাকবে। পরী অনুভব করে, গাছের খসখসে ছাল থেকে যেন মৃদু এক উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ছে তার আঙুলের ডগায়। ভয়ের মেঘ কেটে গিয়ে পরীর মনে তখন এক অদ্ভুত রোমাঞ্চ ভর করে। এই পৃথিবীতে কেউ কখনো তার এত আপন হয়ে কথা বলেনি।
পরের দিন থেকে পরীর জীবন যেন বদলে গেল। সংসারে যতই অত্যাচার হোক না কেন, পরীর মুখ আর ম্লান হতো না। কারণ সে জানত, রাতের বেলা তার জন্য কেউ একজন অপেক্ষায় থাকবে।
সন্ধ্যা নামলেই পরী সব কাজ দ্রুত সেরে পেছনের উঠানে ছুটে যেত। গাছটির সাথে এখন আর সে একা কথা বলে না; গাছটিও তার সাথে কথা বলে। পরীবানুকে সান্ত্বনা দেয়, ভালোবাসার কথা শোনায়, কবিতা পড়ে, গান গায়। গাছটি বলে, "তুমি কোনো সাধারণ নারী নও গো পরী, তুমি অনেক ক্ষমতাধর এক নারী; তুমি আমাকে জাগিয়ে তুলেছ। এই বেকুব সমাজ তোমায় চিনতে পারেনি, তাতে কী? আমি তোমাকে ঠিকই চিনেছি।"
গাছের এমন প্রশংসায় পরী মুগ্ধ হয়ে যায়। সে গভীরভাবে গাছের প্রেমে পড়ে। পরম যত্নে গাছের ডালে রঙিন ফিতে বাঁধে, গোড়ায় জল ঢালে, কাণ্ড ছুঁয়ে দেয়। এখন শাশুড়ি কিংবা স্বামীর কোনো কটুকথাই তার গায়ে লাগে না। কারণ তার পাশে এখন এমন একজন আছে, যে তাকে বোঝে এবং ভালোবাসে।
এভাবে বেশ কিছুদিন চলতে থাকল। কিন্তু এই গোপনীয়তা বেশি দিন আড়ালে রাখা গেল না।
শাশুড়ি জমিলা বিবির তীক্ষ্ণ চোখ পরীবানুর এই পরিবর্তন ধরে ফেলল। তিনি খেয়াল করলেন, যা-ই বলা হোক না কেন, সারা দিন পরীবানুর মুখে এক মায়াবী হাসি লেগেই থাকে। আর রাত বাড়লেই সে পেছনের উঠানে গিয়ে কার সাথে যেন ফিসফিস করে কথা বলে।
একদিন গভীর রাতে পরী যখন মেহগনি গাছের সাথে কথা বলায় মগ্ন হয়ে বিড়বিড় করে বলছিল, "তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচব না, তুমিই আমার একমাত্র ভালোবাসা হে গাছ..."
ঠিক তখনই পেছন থেকে টর্চ জ্বেলে হাজির হলেন জমিলা বিবি আর তাঁর ছেলে চেরাগ আলী।
"নষ্টা মেয়ে, শেষ পর্যন্ত গাছের সাথে পিরিতি শুরু করেছিস! ডাইনি, রাক্ষসী কোথাকার!"—পরীবানুর চুলের মুঠি ধরে চিৎকার করে উঠলেন জমিলা বিবি।
চেরাগ আলী রাগে কাঁপতে কাঁপতে এগিয়ে এসে পরীর চুল খামচে ধরে বলল, "পাগল হয়ে গেছিস হারামজাদি? শেষ পর্যন্ত একটা গাছের সঙ্গে? আমাদের মানসম্মান তুই ধুলোয় মিশিয়ে দিলি!"
পরীবানু আর্তনাদ করে ওঠে, "ছাড়ি দাও আমারে! তোমরা বুঝবা না, ও আমারে ভালোবাসে, আমার সাথে কথা কয়, আমার সব কথা শোনে। আমিও ওরে ভালোবাসি।"
"তোরে আজ আর ছাড়ুম না!"—বলে চেরাগ আলী সজোরে এক ধাক্কা মেরে পরীকে মাটিতে ফেলে দেয়। তারপর ঘর থেকে কুঠার এনে গর্জে ওঠে, "আজকে এই ভুতুড়ে গাছটারে আমি কেটে ফেলব। দেখি তোর প্রেম কোথায় থাকে হারামজাদি।"
"না না, এমন কোরো না, খোদার দোহাই লাগে!"—পরীবানু চেরাগ আলীর পা জড়িয়ে ধরে কেঁদে বলে, "গাছ কাটলে আমি মরে যাব। এই গাছই আমার প্রেম, এই গাছই আমার পরান।"
চেরাগ আলী তাকে সজোরে লাথি মেরে সরিয়ে দিয়ে মেহগনি গাছের গায়ে কুঠারের কোপ বসিয়ে দেয়। কোপটা লাগার সাথে সাথেই বিকট এক শব্দে কেঁপে ওঠে পুরো উঠান। গাছের ক্ষতস্থান থেকে তাজা রক্তের মতো লাল রস ফোয়ারার মতো ছিটকে বের হতে থাকে। একই সাথে গাছের ভেতর থেকে ভেসে আসে এক তীব্র যন্ত্রণার আর্তনাদ—যেটা ছিল এক পুরুষের তীব্র যন্ত্রণার চিৎকার ।
ভয়ে পিছিয়ে যান জমিলা বিবি। চেরাগ আলী কুঠার হাতে থমকে দাঁড়িয়ে থাকে।
পরীবানুর চোখের সামনে তখন পৃথিবী ঘুরছে। সে আর সহ্য করতে না পেরে দৌড়ে গিয়ে চেরাগ আলীর হাত থেকে কুঠারটা ছিনিয়ে দূরে ছুড়ে ফেলে দেয় এবং রক্তাক্ত গাছটিকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে বলে, "আমারেও তোমার সাথে নিয়ে চলো হে গাছ!"
মুহূর্তেই বাতাস তীব্র ঝড়ের বেগে বইতে শুরু করে। আর সেই ঝড়ের মাঝেই গাছের কাণ্ড থেকে এক অদ্ভুত স্নিগ্ধ আলো ছড়িয়ে পড়ে চারপাশে। পরীর কানে শেষবারের মতো ভেসে আসে সেই কণ্ঠস্বর—
"চলে আসো পরী। এই নরক থেকে চিরতরে মুক্তি নাও..."
পরের মুহূর্তেই প্রকাণ্ড মেহগনি গাছটি মড়মড় শব্দে ভেঙে পড়ে পরীর ওপর।
সকালে প্রতিবেশীরা এসে দেখতে পান, ভেঙে পড়া মেহগনি গাছের নিচে চাপা পড়ে আছে পরীর নিথর দেহ। মুখে কোনো কষ্টের ছাপ নেই, বরং ফুটে রয়েছে এক অপার্থিব তৃপ্তির হাসি।
সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন