https://www.prothomalony.com/
18067
opinion
উচ্চ রক্তচাপ একটি নীরব ঘাতক হলেও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে এটিকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব বলে জানান ডা. সাবরিনা হক।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) প্রথম আলো উত্তর আমেরিকা আয়োজিত সাপ্তাহিক সম্প্রচার ‘টক অব দ্য উইক’ অনুষ্ঠানে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সচেতনতা ও সঠিক দিকনির্দেশনা নিয়ে কথা বলেন তিনি। অনুষ্ঠানটির উপস্থাপনায় ছিলেন সোহানা নাজনীন এবং পরিচালনায় এইচ বি রিতা।
তিনি বলেন, “অনেকের ধারণা অনুযায়ী রক্তচাপ অস্বাভাবিক হলে আমাদের খারাপ লাগা অনুভূত হয়। কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই এই খারাপ লাগাটা থাকে না। যারা বছরে একবার ডাক্তারের কাছে যান রক্তচাপ পরিমাপের জন্য, তাদের বাসায় মেশিন থাকাটা জরুরি। বাঙালি কমিউনিটিতে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, কোলেস্টেরল ধরা পড়লেও আমরা কেন জানি না এই রোগগুলোকে সামাল দিতে পারছি না। নিজেদের ছাড়া আমরা অন্যদের বদলাতে পারব না। তাই নিজেদের যত্ন নিজেদেরকেই নিতে হবে। নিজেদের মানসিক শান্তি বজায় রাখা, সময়ের কাজ সময়ে করা, দুশ্চিন্তা এড়িয়ে চলা আমাদের সবার দায়িত্ব।”
উচ্চ রক্তচাপ এবং এর চিকিৎসা সম্পর্কে ডা. সাবরিনা বলেন, “আমাদের রক্তনালিতে যখন রক্ত অস্বাভাবিক গতিতে প্রবাহিত হয়, তখন তা শরীরের অনেক ক্ষতি করে। রক্তচাপের একটি উচ্চসীমা এবং নিম্নসীমা থাকে। আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের মতে এই উচ্চসীমা ১২০-এর নিচে এবং নিম্নসীমা ৮০-এর নিচে থাকা বাঞ্ছনীয়। যারা এই মাত্রা বজায় রাখতে পারবেন, তারা হার্ট অ্যাটাক এবং স্ট্রোকের মতো ঝুঁকি এড়িয়ে সুস্থ থাকবেন। যত আগে আমরা রোগ নির্ণয়ের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারব, ততই আমাদের জন্য মঙ্গল।”
ঘরে বসে রক্তচাপ পরিমাপের সঠিক নিয়ম ও যন্ত্রের ব্যবহার সম্পর্কে ডা. সাবরিনা বলেন, “অতীতে পারদযুক্ত (মার্কারি) রক্তচাপ মাপার যন্ত্র ছিল। তবে আধুনিক সময়ে অ্যানালগ এবং ডিজিটাল ডিভাইস সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য। এটি কেবল হাতে কাফ লাগিয়ে বোতাম চাপলেই নির্ভুলভাবে রক্তচাপ পরিমাপ করে। আমার মতে সব বাসাতেই একটি রক্তচাপ মাপার যন্ত্র থাকা উচিত। www.validatebp.org ওয়েবসাইটে গিয়ে এ বিষয়ে যাচাই করে নিতে পারেন। তবে সবারই মেশিন কেনার আগে কাফের মাপ (সাইজ) জেনে নেওয়া উচিত। কেবলমাত্র খারাপ বোধ হলেই রক্তচাপ মাপতে হবে, বিষয়টি এমন নয়। ভালো থাকা কিংবা কোনো ব্যথা না থাকা অবস্থাতেও রক্তচাপ মাপা উচিত। শরীর শিথিল (রিল্যাক্সড) থাকা অবস্থায় কিংবা যারা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে ওষুধ খান, তাদের পরবর্তী ওষুধ খাওয়ার আগে রক্তচাপ মাপা উচিত। তবে তার আগে খেয়াল রাখতে হবে যেন প্রস্রাবের বেগ না থাকে, ঢিলেঢালা পোশাক পরে হেলানযুক্ত চেয়ারে বসে হাত দুটিকে কোনো সমতলে রাখতে হবে এবং অন্তত পাঁচ মিনিট বিশ্রামের পর রক্তচাপ মাপতে হবে। অবশ্যই মেশিনটি বুক বা হৃৎপিণ্ডের সমান্তরালে রাখতে হবে। কেউ চাইলে সপ্তাহে দুইবার রক্তচাপ মেপে লিখে রাখতে পারেন।”
‘হোয়াইট কোট হাইপারটেনশন’ এবং ‘মাস্কড হাইপারটেনশন’ সম্পর্কে সোহানা নাজনীনের প্রশ্নে তিনি বলেন, “ডাক্তারের চেম্বারে গেলে অনেক সময় উত্তেজনার কারণে মানসিক চাপ (স্ট্রেস) বেড়ে রক্তচাপও বেড়ে যায়। অথচ দেখা যাবে বাস্তবে রক্তচাপ বেশি নয়; বাসায় শান্ত পরিবেশে পরিমাপ করলে রিডিং স্বাভাবিক আসবে। হাসপাতালে ডাক্তারের সাদা অ্যাপ্রন বা পোশাক দেখে রক্তচাপ সাময়িক বেড়ে যাওয়াকে ‘হোয়াইট কোট হাইপারটেনশন’ বলে। এ ধরনের সমস্যা সাধারণত বয়স্ক নারীদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। তবে ‘মাস্কড হাইপারটেনশন’ আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। এক্ষেত্রে ডাক্তারের চেম্বারে রক্তচাপ স্বাভাবিক দেখায়, কিন্তু বাসায় ফেরার পর রক্তচাপ বেড়ে যায়। এটি তুলনামূলক কম বয়সী তরুণদের ক্ষেত্রে বেশি দেখা যায়। বাঙালি হিসেবে আমাদের জিনগতভাবেই ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স ও উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি একটু বেশি। কম বয়সে ধূমপান করলে সেই ঝুঁকি আরও বাড়ে।”
রক্তচাপের ওষুধ সম্পর্কে তিনি জানান, “আমেরিকায় বর্তমানে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত ওষুধ বেশ সুলভ মূল্যে পাওয়া যায়। স্বল্প সময় কার্যকর ওষুধগুলো দিনে দুইবার সেবন করতে হয়। তবে আমাদের জেনে নেওয়া দরকার কোন ওষুধ চব্বিশ ঘণ্টা কার্যকর থাকে। সাধারণত কম ও মাঝারি মাত্রার ডোজ বেশি কার্যকর; উচ্চ মাত্রার ওষুধে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি বাড়ে। আজকাল একাধিক ওষুধের সমন্বয়ে কম্বিনেশন ট্যাবলেট তৈরি হচ্ছে, যা উচ্চ রক্তচাপ আরও ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণ করে। তবে প্রতিবেলা ওষুধ সেবনের আগে রক্তচাপ মেপে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।”
ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া প্রসঙ্গে ডা. সাবরিনা হক বলেন, “ডায়াবেটিস, কোলেস্টেরল, উচ্চ রক্তচাপ, অতিরিক্ত ওজন—সবকিছুই পরস্পরের সাথে যুক্ত। রোগের তীব্রতা, খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রার ওপর সুস্থতা নির্ভর করে। সব ক্ষেত্রেই ওজন নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত জরুরি। উচ্চ রক্তচাপের ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে শুকনো কাশি, অ্যালার্জি, পা ফুলে যাওয়া কিংবা ঘন ঘন প্রস্রাবের প্রবণতা। সাধারণত ওষুধ শুরুর প্রাথমিক পর্যায়েই এমন উপসর্গ দেখা দিতে পারে।”
তিনি আরও জানান, উচ্চ রক্তচাপের সাথে হরমোনজনিত সমস্যার সম্পর্ক থাকতে পারে। “অনেক সময় দেখা যায় দীর্ঘকাল ওষুধ সেবন বা ওষুধ পরিবর্তন করার পরেও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে আসছে না। তখন ভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার (ডায়াগনসিস) মাধ্যমে দেখা যায় হরমোনের অস্বাভাবিকতা এর পেছনে ভূমিকা রাখছে। এছাড়া কারও কিডনির জটিলতা রয়েছে কি না, তাও পরীক্ষা করে দেখা হয়।”
উচ্চ রক্তচাপের নানাদিক, সঠিক পরিমাপের কৌশল এবং ওষুধ সেবনের নিয়মাবলি নিয়ে প্রাণবন্ত আলোচনার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানটি শেষ হয়। প্রথম আলো উত্তর আমেরিকার “টক অব দ্য উইক” প্রতি বৃহস্পতিবার নিউইয়র্ক সময় রাত ৯টায় ফেসবুক পেজে সরাসরি সম্প্রচারিত হয়।
অভিমত থেকে আরো পড়ুন