https://www.prothomalony.com/
18033
opinion
ভ্রমণ মানে কত দেশ দেখলাম সেটা না, ভ্রমণ মানে প্রকৃতির কত কাছে গেলাম:
প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬ ০৫:১৯
ফরিদা ইয়াসমীন:
দেখিতে গিয়াছি পর্বতমালা,
দেখিতে গিয়াছে সিন্ধু,
দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া
ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া
একটি ধানের শিসের উপরে
একটি শিশির বিন্দু
ভ্রমণ পিয়াসি পাপিয়া শারমিন এই কাব্য কথার মর্মার্থে মোহিত কিনা জানিনা।তবে সারা বিশ্ব ঘুরে দেখার এক অদম্য নেশা পেয়ে বসে তাকে।
শুরুটা হয়েছিল এভাবে। ২০১৬ সালে আমেরিকা আসেন তিনি। আসার পরে উনি নিউইয়র্কের আশেপাশে বিভিন্ন শহর ঘুরে ঘুরে দেখছিলেন। এই ঘুরতে গিয়ে ওনার ভেতরে ভ্রমণের একটা নেশা জেগে ওঠে। একসময় উনি কানাডা ভ্রমন করতে চাইলেন।
কিন্তু পাসপোর্ট জটিলতায় কানাডা ভ্রমণ করতে পারেননি। তখন উনার মনের মধ্যে জেগে ওঠে আমেরিকা ভ্রমণের ইচ্ছা।ভাবেন, আমেরিকা বিশাল বড় দেশ। আমেরিকার বিভিন্ন স্টেট ঘুরে দেখবেন আগে। যেই কথা সেই কাজ। একে একে ৫০টি স্টেট ভ্রমণ শেষ করলেন। তত দিনে ভিসা জটিলতা শেষ হয়েছে। গ্রীন কার্ড থেকে সিটিজেন হয়েছেন। তখনই ভ্রমণ পিয়াসী পাপিয়ার মন নাড়া দেয় বিশ্ব ভ্রমণের।এর পর একে একে জয় করেন সাতটি মহাদেশ।
প্রিয় পাঠক এতক্ষণ যার কথা বললাম উনি আমাদের বাঙালি ঘরের মেয়ে পাপিয়া শারমিন। যাদের পায়ে থাকে সমাজের অদৃশ্য বেড়ি। পান থেকে চুন খসলে যাদের নামের পাশে নানা রকমের তকমা জুড়ে দেয়া হয়। সেই বাঙালি মেয়ে অদম্য ইচ্ছা শক্তির জোড়ে নিজের মনের ইচ্ছা পূরণ করেছেন।
পাপিয়া শারমিন একাধারে একজন পর্যটক, কনটেন্ট ক্রিয়েটর, সোশ্যাল এক্টিভিস্ট, বর্তমানে তিনি নিউইয়র্ক পুলিশ বিভাগের ট্রাফিক সুপারভাইজার হিসেবে কর্মরত আছেন। পাশাপাশি তিনি পড়াশোনা করছেন সাইবার সিকিউরিটি বিষয়ে।
বৃহস্পতিবার ২০শে আগস্ট তিনি এসেছিলেন প্রথম আলো উত্তর আমেরিকার জনপ্রিয় সাপ্তাহিক সম্প্রচার টক অফ দা উইক অনুষ্ঠানে । দর্শক শ্রোতাদের তিনি শোনান তার জীবনের এই চমকপ্রদ কাহিনী।
উপস্থাপিকা পাপিয়া শারমিনের কাছে জানতে চান লেখাপড়া চাকরি এবং ভ্রমণ এই তিনটার ভিতর সমন্বয় কিভাবে করেন?
উত্তরে পাপিয়া শারমিন চমৎকার করে বলেন যে, নিজের স্বপ্ন এবং ইচ্ছা গুলোকে পূরণ করার প্রচন্ড একটা ইচ্ছা থাকতে হবে। সুযোগ কখনো পথে এসে ডাকবে না। ইচ্ছা শক্তির কাছে সব সমস্যা পরাজিত হয়। তিনি চমৎকারভাবে বলেন যে, আমরা বাঙালি মহিলারা সব সময় অন্যের স্বপ্নে বাঁচি। কখনো স্বামীর স্বপ্ন পূরণের চেষ্টা করি কখনো সন্তানের স্বপ্ন পূরণ ,কখনো বাবা-মায়ের স্বপ্ন পূরণের চেষ্টায় ব্যস্ত থাকি। নিজের স্বপ্নগুলো কখন মরে যায় আমরা বুঝতেও পারি না।
তবে এই যাত্রাপথে উনার মা এবং পরিবারের অন্যান্যরা ওনাকে সাহায্য করেন বলে জানান।
সাতটি মহাদেশ ভ্রমণের মধ্যে পাপিয়ার কাছে সবচেয়ে ভালো লেগেছে আফরিকা মহাদেশ। উনি জানান যে, আফ্রিকার মানুষের ব্যবহার, আতিথেয়তা সবকিছু অতুলনীয়। অথচ আমাদের কাছে তাদের সম্পর্কে একটু ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে যে ,তারা মানুষের সাথে খারাপ ব্যবহার করে কিন্তু বাস্তবে তারা খুবই ভদ্র ,অমায়িক এবং অতিথিবৎসল।
আফ্রিকার যে বিষয়টি পাপিয়াকে মুগ্ধ করেছে এবং চমৎকৃত করেছে সেটা হল বন্যপ্রাণীদের সাথে তাদের সহাবস্থান। ওখানের সাফারি পার্ক গুলোতে কোন বেরিকেট নাই। মানুষ এবং বনপ্রাণী পাশাপাশি চলছে, কোন হানাহানি নাই।
বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করতে গিয়ে কি কখনো মনে হয়েছে জায়গাটা খুব দুর্গম কিংবা কখন কি মনে হয়েছে ভ্রমণটা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ?
সঞ্চালিকা এ প্রশ্নের উত্তরে পাপিয়া জানান, ২০২৬ সালে নেটওয়ার্কের বাইরে থাকাটাই ঝুঁকিপূর্ণ বলে উনার কাছে মনে হয়। আলাস্কা ভ্রমণ বেশ দুর্গম বলে উল্লেখ করেন। কারণ সেখানে যোগাযোগের মাধ্যম বেশিরভাগ অঞ্চলে শুধুমাত্র হেলিকপ্টার। আবার কিছু অঞ্চলে একশ মাইলের মধ্যে কোন গ্যাস স্টেশন নেই।
গ্রিনল্যান্ড ভ্রমণটাও বেশ ঝুঁকিপূর্ণ বলে উনি উল্লেখ করেন। কারণ ওখানে কোন রাস্তা নেই। ভ্রমণের একমাত্র উপায় বোট এবং হেলিকপ্টার। শীতের সময় আবার বরফে ঢাকা।
একজন নারী হয়ে একা ভ্রমণের ক্ষেত্রে কি ধরনের বাধার সম্মুখীন হন পরিবার এবং সমাজ থেকে ?জানতে চাওয়া হলেও উনি বলেন , শুরুর দিকে পরিবার থেকে একটু সমস্যা ছিল কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সবাই মেনে নিয়েছে এবং তারা এখন বেশ প্রাউড ফিল করে তাকে নিয়ে।
দেশে এবং প্রবাসী নারীদের উদ্যোগী করে তোলার জন্য উনার কোন পরিকল্পনা আছে কিনা জানতে চাওয়া হলে পাপিয়া জানান ,ব্যাপক অর্থে সেরকম পরিকল্পনা নেই তবে ওনার একটা পেইজ আছে সেই পেজে উনি উনার কাহিনী গুলো লেখেন এবং সেটা দেখে অনেকে অনুপ্রাণিত হয়।
নারীদের ক্ষেত্রে এক একটি ভ্রমণের সময় কি ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিতে হয়? সঞ্চালিকার এ প্রশ্নের উত্তর জানেন যে, যে কোন ভ্রমণের আগে সেই এলাকা সম্পর্কে প্রচুর পড়াশোনা করতে হয়। সঠিক পরিবেশ পরিস্থিতি সবকিছু জানার পরে ভ্রমণের উদ্দেশ্য বের হতে হয় এছাড়াও উনি প্রয়োজনীয় সবকিছু কাগজ ফটোকপি করে ব্যাগে রাখেন এবং জরুরি টেলিফোন নাম্বার কাগজে লিখে রাখেন। শুধুমাত্র সেলফোনের উপর নির্ভরশীলতা বিপদ দিকে আনতে পারে। হোটেলের ঠিকানা এবং টেলিফোন নাম্বার গুলো উনি কাগজে লিখে ব্যাগে রাখেন ।
পরিশেষে তিনি সবার উদ্দেশ্যে বলেন বিশেষ করে নারীদের বলেন, একজন স্বনির্ভর নারী তার শখ এবং স্বপ্ন মেটানোর জন্য উদ্যোগী হতে পারেন খুব সহজেই। তাছাড়া একজন কর্মজীবী নারীর ভিতরে আত্মনির্ভরশীলতা ,আত্মবিশ্বাস এবং দৃঢ়তা খুব সহজেই পরিলক্ষিত হয়।
অবশেষে সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে অনুষ্ঠানটি শেষ করা হয়।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনায় ছিলেন ফরিদা যাসনি এবং কারিগরি সহযোগিতায় ছিলেন এইচ বি রীতা।
অভিমত থেকে আরো পড়ুন