https://www.prothomalony.com/

18049

opinion

অভিমত

সিজদার গুরুত্ব ও তাৎপর্য

খতীব, নূরে মদীনা জামে মসজিদ, সীতাকুণ্ড, চট্টগ্রাম।

প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৬ ০৪:৪২

সিজদা এক অনন্য ও অদ্বিতীয় সম্মাননা, যা একমাত্র আল্লাহরই প্রাপ্য। মহান আল্লাহ বলেন, তোমরা আল্লাহকে সিজদা করো (সূরা ফুসসিলাত: ৩৭)। সিজদার মাধ্যমেই মানবজাতির পিতা আদম আলাইহিস সালামকে প্রথম অভ্যর্থনা জানানো হয়েছিল, আর এর দ্বারাই মানুষকে শ্রেষ্ঠত্ব দানের বিষয়টি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়। এই নিবন্ধে সিজদার গুরুত্ব ও তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা করা হলো।

আল্লাহ তায়ালা আদম আলাইহিস সালামকে সৃষ্টি করার পর ফেরেশতাদের তাঁকে সিজদা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন (সূরা হা-মীম সিজদাহ: ১১)। ইবলিস ব্যতীত সকল ফেরেশতাই তাঁকে সিজদা করেছিল; ইবলিস অহংকারবশত এই আদেশ অমান্য করে পথভ্রষ্ট হয়ে যায়। আল্লাহ তাকে জিজ্ঞেস করলে সে যুক্তি দেখায় যে, আদম মাটির তৈরি আর সে আগুনের তৈরি, তাই মাটির তৈরি মানুষকে সে সিজদা করতে পারে না এভাবে সে অহংকার প্রদর্শন করে। ফলে আল্লাহ তার প্রতি চরম অসন্তুষ্ট হয়ে তাকে চিরতরে অভিশপ্ত ঘোষণা করেন।

মূলত আল্লাহ তায়ালা তাঁর ইবাদতের জন্যই মানবজাতিকে সৃষ্টি করেছেন। মানব জাতির প্রতি অসামান্য ভালোবাসার প্রতীক হিসেবেই সিজদার মতো গুরুত্বপূর্ণ সম্মান দিয়ে আদম আলাইহিস সালামকে বন্ধুরূপে বরণ করে নেওয়া হয়। এরপর ইবলিসের শয়তানি চিন্তা-চেতনা সম্পর্কে আদম আলাইহিস সালামকে সতর্ক করে তাঁকে তার থেকে দূরে থাকতে বলা হয় এবং জান্নাতের একটি নির্দিষ্ট বৃক্ষের ফল খেতে নিষেধ করা হয়। কিন্তু শয়তান মিথ্যা ও লোভনীয় প্রতিশ্রুতি দিয়ে আদম ও হাওয়া আলাইহিমাস সালামকে সেই নিষিদ্ধ ফল খাওয়াতে সক্ষম হয়। এরপর আল্লাহ তাঁদের প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে কিছুকালের জন্য পৃথিবীতে নির্বাসন দেন এবং শয়তানকেও অভিশপ্তরূপে পৃথিবীতে প্রেরণ করেন।

মূলত সিজদা কখনোই আদম আলাইহিস সালামের জন্য ইবাদত ছিল না, বরং তা ছিল মানব জাতির প্রতি অন্যদের সম্মান প্রদর্শনের একটি মাধ্যম। প্রকৃতপক্ষে সিজদা একমাত্র আল্লাহর প্রাপ্য এবং তাঁর প্রতি যাবতীয় ইবাদতের শ্রেষ্ঠাংশ। আল্লাহ মানবজাতির জন্য সালাতের মতো একটি ইবাদতের বিধান দিয়েছেন এবং সমগ্র বিশ্বের মানুষের সিজদার দিকনির্দেশনা হিসেবে বায়তুল্লাহ বা কাবা শরিফকে নির্ধারণ করেছেন। উল্লেখ্য, ইবলিস জান্নাত থেকে বহিষ্কৃত হলেও আল্লাহ তাকে মানুষকে ধোঁকা দেওয়া ও বিভ্রান্ত করার সীমিত ক্ষমতা দিয়েছেন, যা মূলত মানুষকে পরীক্ষা করার জন্যই। যে ব্যক্তি শয়তানের প্রবঞ্চনাকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করতে পারবে, সে তার শ্রেষ্ঠত্ব বহাল রেখে আল্লাহর প্রিয়পাত্র হয়ে জান্নাত লাভ করবে; আর যে শয়তানের পথ অনুসরণ করবে তাকে জাহান্নামে যেতে হবে।

সমগ্র সৃষ্টিজগৎই আল্লাহর প্রতি সিজদাবনত। আল্লাহ বলেন, নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলে যা কিছু আছে, তারা ও তাদের ছায়াসমূহ সকাল-সন্ধ্যা ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় আল্লাহকেই সিজদা করে (সূরা রা'দ: ১৫)। অন্যত্র বলা হয়েছে, নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলে যা কিছু আছে, সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্ররাজি, পর্বতরাজি, বৃক্ষলতা, জীবজন্তু ও বহু মানুষ আল্লাহকে সিজদা করে, আর বহু মানুষ যারা সিজদা করতে অস্বীকার করে তাদের উপর শাস্তি অবধারিত হয়ে গেছে (সূরা হজ্জ: ১৮)। আরেক আয়াতে বলা হয়েছে, আসমান ও যমীনের সকল প্রাণী এবং ফেরেশতাগণ বিনীতভাবে আল্লাহকে সিজদা করে, তারা অহংকার করে না, বরং তারা তাদের প্রতিপালককে ভয় করে এবং যা আদিষ্ট হয় তাই পালন করে (সূরা নাহল: ৪৮-৪৯)।

যারা বিনয় ও আনুগত্যের সাথে আল্লাহকে সিজদা করে তারা বিশেষভাবে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করে। আল্লাহ বলেন, কেবল তারাই আমার নিদর্শনসমূহে বিশ্বাস করে, যাদের তা স্মরণ করিয়ে দিলে তারা সিজদায় লুটিয়ে পড়ে এবং প্রতিপালকের পবিত্র মহিমা কীর্তন করে, তারা অহংকার করে না (সূরা সাজদা: ১৫)। আরেক আয়াতে বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি রাত্রিকালে সিজদায় বা দাঁড়িয়ে আনুগত্য প্রকাশ করে, আখিরাতকে ভয় করে এবং প্রতিপালকের রহমতের আশা রাখে, সে কি তার সমান যে এমন করে না (সূরা যুমার: ৯)। এমনকি জড় বস্তুও আল্লাহর প্রতি সিজদাবনত—আল্লাহ বলেন, তারকা ও বৃক্ষলতা সিজদারত আছে (সূরা আর-রহমান: ৬)।

কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, মানুষের মধ্যে অনেকে আল্লাহকে সিজদা করে, আবার অনেকে করে না। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন, এক দলকে আল্লাহ হেদায়েত দান করেছেন, আর আরেক দলের উপর ভ্রষ্টতা নির্ধারিত হয়ে গেছে, কারণ তারা আল্লাহকে ছেড়ে শয়তানকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করেছে অথচ মনে করে তারা সুপথপ্রাপ্ত (সূরা আ'রাফ: ৩০)। এই পৃথিবী মানুষের জন্য এক কঠিন পরীক্ষাকেন্দ্র। আল্লাহ বলেন, তিনিই মৃত্যু ও জীবন সৃষ্টি করেছেন এটা পরীক্ষা করার জন্য যে, তোমাদের মধ্যে কে উত্তম কর্মশীল (সূরা মুলক: ১-২)। অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, মানুষ কি মনে করে যে শুধু ঈমান আনার দাবি করলেই তাদের পরীক্ষা ছাড়াই ছেড়ে দেওয়া হবে? আল্লাহ পূর্ববর্তীদেরও পরীক্ষা করেছিলেন, যাতে সত্যবাদী ও মিথ্যাবাদী চিহ্নিত হয় (সূরা আনকাবুত: ২-৪)।

মানুষ ও জিন ব্যতীত অন্য কোনো সৃষ্টির হিসাব বা পরীক্ষা হবে না, কারণ তাদের মানুষের মতো জ্ঞান-বুদ্ধি বা শত্রু নেই। যারা জ্ঞান দ্বারা শয়তানের মোকাবিলা করে আল্লাহর নিদর্শন থেকে হেদায়েত লাভ করে, তারা পরকালেও আল্লাহর সিজদার মাধ্যমে সফলকাম হবে। পক্ষান্তরে যারা আল্লাহকে অস্বীকার করে, তাদের সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, তাদের কী হলো যে তারা বিশ্বাস স্থাপন করে না এবং কুরআন পাঠ করা হলেও সিজদা করে না (সূরা ইনশিকাক: ২০-২১)। অন্যত্র বলা হয়েছে, তাদের রহমানকে সিজদা করতে বললে তারা প্রশ্ন করে রহমান আবার কে, আর তাতে তাদের বিমুখতাই বৃদ্ধি পায় (সূরা ফুরকান: ৬০)।

এই অস্বীকারকারীরা পরকালেও সিজদা করতে সক্ষম হবে না এবং জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে। আল্লাহ বলেন, যেদিন পায়ের গোছা উন্মোচিত করা হবে এবং তাদের সিজদার আহবান জানানো হবে, কিন্তু তারা তা করতে সক্ষম হবে না; তাদের দৃষ্টি অবনত থাকবে ও তারা লাঞ্ছনাগ্রস্ত হবে, অথচ সুস্থ অবস্থায় তাদের সিজদার আহবান জানানো হয়েছিল (সূরা কলম: ৪২-৪৪)। হাদিসে এসেছে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ যখন নিজের পরিচয় দেবেন এবং সাক বা পায়ের নলা উন্মোচিত হবে, তখন সকল প্রকৃত ঈমানদার সিজদায় লুটিয়ে পড়বে, কিন্তু যারা দুনিয়াতে লোক-দেখানোর জন্য সিজদা করত তাদের মেরুদণ্ড তক্তার মতো শক্ত হয়ে যাবে, ফলে তারা সিজদা করতে পারবে না (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)।

সালাতের মধ্যে সিজদা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহ বলেন, তোমরা তো উদাসীন, বরং আল্লাহকে সিজদা করো ও তাঁর উপাসনা করো (সূরা নাজম: ৬১-৬২)। সিজদার সময় বান্দা আল্লাহর সবচেয়ে নিকটবর্তী হয়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, বান্দা তার প্রতিপালকের সবচেয়ে নিকটবর্তী হয় যখন সে সিজদারত থাকে, অতএব তোমরা তখন বেশি বেশি দোয়া করো (সহিহ মুসলিম: ৪৮২)। আল্লাহ তাঁর প্রিয় নবীকে নির্দেশ দিয়ে বলেন, তুমি তোমার প্রতিপালকের প্রশংসা বর্ণনা করো এবং সিজদাকারীদের অন্তর্ভুক্ত হও, আর তোমার প্রতিপালকের ইবাদত করো যতক্ষণ না মৃত্যু তোমার কাছে আসে (সূরা হিজর: ৯৮-৯৯)।

নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সিজদার ফজিলত সম্পর্কে একাধিক হাদিসে বলেছেন। ছাওবান রাযিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আল্লাহর উদ্দেশ্যে বেশি বেশি সিজদা করো, কেননা তুমি যখনই আল্লাহর উদ্দেশ্যে একটি সিজদা করবে, আল্লাহ তোমার মর্যাদা এক ধাপ বাড়িয়ে দেবেন এবং একটি গুনাহ মোচন করে দেবেন (সহিহ মুসলিম: ৪৮৮)। রাবিয়া ইবনে কাব রাযিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, তিনি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে জান্নাতে তাঁর সঙ্গ চাইলে নবীজি বলেন, তাহলে বেশি বেশি সিজদার মাধ্যমে এই ব্যাপারে আমাকে সাহায্য করো (সহিহ মুসলিম: ৪৮৯)। অন্য হাদিসে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, কিয়ামতের দিন তাঁর উম্মতকে সিজদার চিহ্নের কারণে চেহারা উজ্জ্বল থাকা অবস্থায় চেনা যাবে (সহিহ বুখারি: ৩৪৭)।

আদম সন্তান পাপের কারণে জাহান্নামে যাবে বটে, কিন্তু জাহান্নামের আগুন তার সিজদার স্থান স্পর্শ করবে না। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আল্লাহ যখন জাহান্নামীদের কাউকে দয়া করতে চাইবেন, তখন ফেরেশতাদের নির্দেশ দেবেন যারা আল্লাহর ইবাদত করত তাদের বের করার জন্য, আর তাঁরা সিজদার চিহ্ন দেখে তাদের চিনে নেবেন, কেননা আল্লাহ আগুনের উপর সিজদার চিহ্ন ভক্ষণ করা হারাম করে দিয়েছেন (সহিহ বুখারি: ৮০৬)। ঈমানদারের জন্য সিজদার গুরুত্ব অপরিসীম। কুরআনে দাউদ আলাইহিস সালামের ঘটনায় বলা হয়েছে, তিনি পরীক্ষায় পতিত হয়েছেন বুঝতে পেরে প্রতিপালকের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে সিজদায় লুটিয়ে পড়েন এবং তাঁর দিকে মুখ ফিরিয়ে নেন (সূরা ছোয়াদ: ২৪)। অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, যাদের পূর্বে জ্ঞান দেওয়া হয়েছিল তাদের কাছে কুরআন পাঠ করা হলে তারা কাঁদতে কাঁদতে সিজদায় লুটিয়ে পড়ে এবং তাদের বিনয় আরও বৃদ্ধি পায় (সূরা বনী ইসরাইল: ১০৭-১০৯)।

স্বয়ং ইবলিসও সিজদার মহিমা সম্পর্কে অবগত ছিল। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আদম সন্তান যখন সিজদার আয়াত পাঠ করে সিজদা করে, তখন শয়তান কাঁদতে কাঁদতে সরে গিয়ে বলে, হায়! আদম সন্তানকে সিজদার আদেশ করা হয়েছিল আর সে সিজদা করেছে, ফলে তার জন্য জান্নাত নির্ধারিত হয়েছে, আর আমাকেও সিজদার আদেশ করা হয়েছিল কিন্তু আমি অবাধ্য হয়েছি, তাই আমার জন্য জাহান্নাম নির্ধারিত হয়েছে (সহিহ মুসলিম: ৮১)।

যারা প্রকৃত অর্থে আল্লাহকে সিজদাকারী, তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে; আর যারা নামমাত্র সিজদাকারী, যাদের সিজদায় আল্লাহ সন্তুষ্ট নন, তারা প্রথমে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হলেও পরবর্তীতে আল্লাহর দয়া ও রহমতে ধীরে ধীরে জান্নাতে স্থান পাবে। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলকে সকল প্রকার ভ্রান্তির ঊর্ধ্বে উঠে তাঁর সন্তুষ্টির পথে চলার তাওফিক দান করুন। আমীন।

মুমিন কিভাবে রাত অতিবাহিত করবে

শায়েখ ওসামা বিন আমীন

প্রিন্সিপাল, আন্- নাজম একাডেমি, কক্সবাজার।

মুমিনের সকাল-সন্ধ্যা আল্লাহর জন্যই নিবেদিত হবে। তার প্রতিটি মুহূর্ত অতিবাহিত হবে আল্লাহর স্মরণে এবং তাঁর বিধান পালনের মধ্য দিয়ে, আর তার সকল কর্ম সম্পাদিত হবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অনুসরণের মাধ্যমে। দিনের মতোই রাত্রি অতিবাহিত করার আদব ইসলাম বিশেষভাবে শিক্ষা দিয়েছে, যা কুরআন ও হাদিসে সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে, যাতে মুমিন প্রতিটি রাত আল্লাহর সন্তুষ্টিতে অতিবাহিত করে সফলকাম হতে পারে।

রাত আল্লাহর সৃষ্টির এক বড় নিদর্শন (সূরা ইসরা: ১২), যা মানুষের আরাম ও প্রশান্তির উপায় হিসেবে সৃষ্ট (সূরা আনআম: ৯৬; সূরা নাহল: ৮৬) এবং মানুষের জন্য আবরণস্বরূপ (সূরা ফুরকান: ৫৭)। আল্লাহ চাইলে সর্বদা দিন বা সর্বদা রাত কায়েম রাখতে সক্ষম (সূরা কাসাস: ৭১-৭২)। রাত্রিতেই কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ইসরা ও মিরাজ সংঘটিত হয়েছে (সূরা ইসরা: ১), আর রাতের শেষ তৃতীয়াংশে আল্লাহ দুনিয়ার আসমানে অবতরণ করেন। তাই নীরবে-নিভৃতে আল্লাহকে ডাকার জন্য রাত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়।

রাত্রে পবিত্র অবস্থায় শয়ন করা সুন্নাত। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি অজু করে শয্যা গ্রহণ করে, তার পোশাকের মাঝে একজন ফেরেশতা রাত যাপন করেন এবং তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকেন (সহিহ ইবনে হিব্বান)। ঘুম থেকে জেগে হাত-মুখ ধৌত করা, জুনুবি অবস্থায় অজু বা তায়াম্মুম করে শয়ন করা এবং রাতে জাগ্রত হয়ে মেসওয়াক করাও নবীজির সুন্নাত ছিল (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)।

রাত্রিকালে বিভিন্ন আজান প্রচারিত হয়। সূর্যাস্তের সাথে সাথেই মাগরিবের আজান দেওয়া সুন্নাত (সহিহ বুখারি)। পশ্চিম আকাশের লাল আভা মিলিয়ে যাওয়ার পর এশার সময় শুরু হয়, যা অর্ধরাত বা রাতের এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত থাকে। রমজানে সাহরির সময় বেলাল রাযিয়াল্লাহু আনহু ও আব্দুল্লাহ বিন উম্মে মাকতুম রাযিয়াল্লাহু আনহুর পৃথক আজানের ঘটনা সহিহ বুখারিতে বর্ণিত হয়েছে। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, মুয়াজ্জিনের কণ্ঠের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত তাকে ক্ষমা করা হবে এবং প্রতিটি সজীব-নির্জীব বস্তু তার পক্ষে সাক্ষ্য দেবে (সুনানে আবু দাউদ)।

আল্লাহ তায়ালা নিদ্রাকে ক্লান্তি দূরকারী এবং রাত্রিকে আবরণ বানিয়েছেন (সূরা নাবা: ৯-১০; সূরা ফুরকান: ৪৭)। শয়নের কয়েকটি সুন্নাতি আদব রয়েছে। প্রথমত, ডান কাতে শয়ন করা। দ্বিতীয়ত, শয়নের আগে দোয়া পাঠ করা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর নাম না নিয়ে শয়ন করে তার জন্য বঞ্চনা নেমে আসে (সহিহ মুসলিম)। তৃতীয়ত, সূরা ইখলাস, নাস ও ফালাক তেলাওয়াত করে দুই হাতে ফুঁক দিয়ে সারা শরীরে বুলানো, যা আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা বর্ণনা করেছেন (সহিহ বুখারি: ৫০১৭)। চতুর্থত, আয়াতুল কুরসি পাঠ করা, যাতে সকাল পর্যন্ত শয়তান নিকটে আসতে না পারে (সহিহ বুখারি)। পঞ্চমত, সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত পাঠ করা, যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ভাষায় সেই রাতের জন্য যথেষ্ট (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)। ষষ্ঠত, সূরা মুলক তেলাওয়াত করে ঘুমানো, যা জাবির রাযিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন (তিরমিযি)। সপ্তমত, শয়নকালে তেত্রিশবার আল্লাহু আকবার, তেত্রিশবার আলহামদুলিল্লাহ ও তেত্রিশবার সুবহানাল্লাহ পাঠ করা, যা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ফাতিমা রাযিয়াল্লাহু আনহা ও আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুকে শিখিয়েছিলেন (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)।

রাত্রে দুই ধরনের সালাত আদায় করা হয়—ফরজ ও নফল। মাগরিবের সালাত তিন রাকাত ফরজ, আর এশার সালাত চার রাকাত ফরজ। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এশার সালাত বিলম্বে আদায় করতে পছন্দ করতেন এবং কষ্টকর না হলে রাতের এক-তৃতীয়াংশ অতিক্রান্ত হওয়ার পর আদায় করা উত্তম মনে করতেন। জামাতে এশা আদায় করলে অর্ধরাত্রি সালাতের সওয়াব পাওয়া যায়। সফরে মুয়াজ বিন জাবাল রাযিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন, তাবুক যুদ্ধে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাগরিব ও এশা একসাথে জমা করে আদায় করতেন (সহিহ মুসলিম)। মহিলাদের জন্য ঘরে সালাত আদায় করা উত্তম হলেও রাতেও মসজিদে যাওয়ার অনুমতি চাইলে তা দিতে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নির্দেশ দিয়েছেন (সহিহ বুখারি)।

তারাবিহ ও তাহাজ্জুদ মূলত একই সালাত— রমজানে যাকে তারাবিহ বলা হয়, বাকি এগারো মাসে তাকে তাহাজ্জুদ বলা হয়। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, তোমরা রাতের সালাত আদায় করো, কেননা এটি পূর্ববর্তী নেককার লোকদের অভ্যাস, প্রতিপালকের নৈকট্য লাভের উপায় ও গুনাহ মোচনের মাধ্যম (তিরমিযি: ৩৫৪৯)। তিনি আরও বলেন, আল্লাহ সেই ব্যক্তির প্রতি দয়া করেন যে রাতে উঠে সালাত আদায় করে এবং স্ত্রীকেও জাগায়, আর একইভাবে সেই স্ত্রীর প্রতিও দয়া করেন যে স্বামীকে জাগায় (সুনানে আবু দাউদ)। জান্নাতে এমন মসৃণ প্রাসাদের কথাও তিনি বলেছেন, যা তাদের জন্য প্রস্তুত রয়েছে যারা নরম কথা বলে, ক্ষুধার্তকে খাওয়ায়, নিয়মিত সিয়াম পালন করে এবং রাতে মানুষ যখন ঘুমায় তখন সালাত আদায় করে (তিরমিযি)।

রাত্রিকালীন জিকির-আজকারও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহ বলেন, স্মরণ করাও, কেননা স্মরণ মুমিনের উপকার করে (সূরা যারিয়াত: ৫৫); আরও বলেন, যারা দাঁড়িয়ে, বসে ও শুয়ে সর্বাবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করে (সূরা আলে ইমরান: ১৯১)। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি রাতে জেগে নির্দিষ্ট কালিমা পাঠ করে এবং দোয়া করে, তার দোয়া কবুল হয় (সহিহ বুখারি: ১১৫৪)। তবে জিকির নীরবে করতে হবে, কেননা আল্লাহ বলেন, তোমার প্রভুকে সকাল-সন্ধ্যা বিনীতভাবে, উচ্চ শব্দ ছাড়াই স্মরণ করো (সূরা আরাফ: ২০৫)।

রাতে এমন একটি বিশেষ মুহূর্ত রয়েছে যখন দোয়া কবুল হয়। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, প্রতি রাতের শেষ তৃতীয়াংশে আল্লাহ দুনিয়ার আসমানে অবতরণ করে বলতে থাকেন, কে আছে যে আমাকে ডাকবে, আমি তার ডাকে সাড়া দেব; কে আছে যে চাইবে, আমি তাকে দেব; কে আছে যে ক্ষমা চাইবে, আমি তাকে ক্ষমা করব (সহিহ বুখারি: ১১৪৫, সহিহ মুসলিম: ৭৫৮)।

ফজরের সালাত আদায়ের মাধ্যমেই রাতের আমলের পরিসমাপ্তি ঘটে। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ঘুমন্ত অবস্থায় শয়তান মানুষের ঘাড়ে তিনটি গিঁট বেঁধে দেয়; জেগে আল্লাহকে স্মরণ করলে একটি গিঁট খুলে যায়, অজু করলে আরেকটি, আর সালাত আদায় করলে শেষ গিঁটটিও খুলে যায়, ফলে সে সকালে প্রফুল্ল ও নির্মল চিত্তে জাগে; অন্যথায় অলস ও কলুষিত মনে জাগ্রত হয় (সহিহ বুখারি: ১১৪২)।

মুমিন নারী-পুরুষকে তাদের প্রতিটি রাত্রি আল্লাহর স্মরণে, তাঁর বিধান মেনে এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দেখানো পথে অতিবাহিত করার সর্বাত্মক চেষ্টা করতে হবে। দিনের কর্মব্যস্ততায় যে সুযোগ কম মেলে, রাতের নিরিবিলি মুহূর্তে সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে একাগ্রচিত্তে আল্লাহর ইবাদত করা এবং তাঁর কাছে নিজের চাওয়া-পাওয়া ব্যক্ত করা যায়। আল্লাহ আমাদের সকলকে রাত্রিকালীন সময় তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের পথে ব্যয় করার তাওফিক দান করুন। আমীন।
 

অভিমত থেকে আরো পড়ুন