https://www.prothomalony.com/

8917

opinion

অভিমত

সাদি মহম্মদের কণ্ঠ শুনেছেন, তাঁর নিঃশ্বাসে শূন্যতার শব্দ শুনেননি

প্রকাশ: ১৭ মার্চ ২০২৪ ০৮:৪১

রোজা রেখে নামাজ পড়েছিলেন, ইফতার করেছিলেন, গানের রেওয়াজ করেছিলেন, বইও পড়েছিলেন। তারপরই দরজা বন্ধ করেন কাজ করবেন বলে। এরপরের খবর সবার জানা। 

দেশসেরা রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী সাদি মহম্মদ। আত্মহত্যা করেছেন। একজন শিল্পী যখন আত্মহত্যা করেন, তখন তার মৃত্যুর পর নানা প্রশ্ন উঠে। এই প্রশ্নগুলি ব্যক্তির কাজকে ঘিরে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে এবং প্রেক্ষাপটের উপর নির্ভর করেই উঠে। সবচেয়ে তাৎক্ষণিক প্রশ্নটি হলো, কেন একজন শিল্পী নিজের জীবন কেড়ে নিলেন? শিল্পীর কাজে কি তাঁর ভেতরের সংগ্রামের প্রতিফলন ঘটেছিল? মানুষ তখন শিল্পীর মানসিক অবস্থা বা ব্যক্তিগত চ্যালেঞ্জের ইঙ্গিতগুলি অনুসন্ধান করতে তাঁর কাজ, আচরণগুলো পরীক্ষা করেন এবং বোঝার চেষ্টা করেন যে, শিল্পীর কাজ বা আচরণ কোনো প্রকার মানসিক স্বাস্থ্য সংগ্রামের অন্তর্দৃষ্টি দেয় কিনা। প্রশ্ন উঠতে পারে, শিল্পীর সিদ্ধান্তে কি বাহ্যিক কোনো কারণ ছিল, যেমন- একাকিত্ব, পারিবারিক দ্বন্ধ, সম্পর্কের ভাঙন, আর্থিক সমস্যা বা জীবনের অন্যান্য চাপ কি শিল্পীর আত্মহত্যার পিছনে ভূমিকা রাখছে কিনা, শিল্পীর আত্মহত্যা কি ঠেকানো যেত কিনা- যে কোনো আত্মহত্যার পর এই প্রশ্নগুলো প্রায়ই উঠে আসে। সাদি মহম্মদের আত্মহত্যা নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠবে, এটাই স্বাভাবিক। 

বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগের আমেরিকার সবচেয়ে বিখ্যাত লেখক ও কবিদের একজন ছিলেন অ্যান সেক্সটন। তিনি আত্মহত্যা করেছিলেন। আমেরিকান কবি নোভেলিস্ট সিলভিয়া প্ল্যাথ আত্মহত্যা করেছিলেন। দুর্দান্ত সব কাজ করার পরও ভিনসেন্ট ভ্যান গো তার ভবিষ্যত সম্পর্কে অনিশ্চিত ছিলেন এবং অনুভব করেছিলেন যে একজন মানুষ এবং একজন শিল্পী হিসাবে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন। তিনিও অবশেষে আত্মহত্যা করেন। নৃত্যশিল্পী এবং অভিনেতা স্টিফেন বস আত্মহত্যা করেছিলেন। অভিনেত্রী জুলি ক্রুজ আত্মহত্যা করেছিলেন। পাঁচবারের গ্র্যামি বিজয়ী, আমেরিকান স্বাক্ষরকারী-গীতিকার এবং অভিনেত্রী নাওমি জুড আত্মহত্যা করেছিলেন। বিউটি কুইন, এটোর্নি চেসলি ক্রিস্ট ব্যাপক সফলতা অর্জনের পরও আত্মহত্যা করেছিলেন। এবং তারা প্রত্যেকেই মারাত্মক ডিপ্রেশন অর্থাৎ হতাশায় ভুগছিলেন। কাজেই আত্মহত্যা শুধুমাত্র অপ্রাপ্তি বা সুস্পষ্ট সংগ্রামকারী ব্যক্তিরাই করেন না। সফল, সার্থক ব্যক্তিরাও আত্মহত্যা করেন, যখন ডিপ্রেশন ভয়ানক আকার ধারণ করে। রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী, শিক্ষক ও সুরকার সাদি মহম্মদও তাদেরই একজন যিনি রবীন্দ্রসংগীত জগতে দুর্দান্ত অবদান রেখেও জীবনের সমাপ্তি টেনেছেন নিজেকে ঝুলিয়ে দিয়ে। 

একজন মানুষ কখন আত্মহত্যা করেন? কেন করেন? 

একজন মানুষের আত্মহত্যা করার পিছনে বহু কারণ থাকে। ইসাইডোলজি, মনস্তাত্ত্বিক ও বিশেষজ্ঞদের মতে, মানসিক অসুস্থতা আত্মহত্যার অন্যতম প্রধান কারণ। বিশেষজ্ঞ মাইকেল মোসকোস, জেনিফার অ্যাকিলিস ও ডগ গ্রে'র মতে, আত্মহত্যার কারণগুলোর মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক, পরিবেশগত ও সামাজিক কারণ রয়েছে। হতাশা, বিষণ্ণতা,  উদ্বিগ্নতা, আত্মবিশ্বাস হারানো, বিচার ক্ষমতা হ্রাস পাওয়া, আবেগ নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতা...বিভিন্ন বিষয়গুলো আমাদের আত্মহত্যার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। একজন মানুষ যখন মনে করেন যে,তিনি বেঁচে থাকার সমস্ত উপকরণ হাড়িয়ে ফেলেছেন এবং তার চলে যাওয়ায় পৃথিবীর কিছু যায় আসেনা, তখনই তিনি আত্মহত্যার পথ বেছে নেন! এটা তার অভিমান। আবার অনেকেই জীবনের কঠিন মুহুর্তগুলো থেকে মুক্তির পথ খুঁজে না পেয়ে, পারিবারিক সহায়তার অভাবে, একাই নিজের জীবনের সমাপ্তি টানতে এই পথ বেছে নেন। মানসিক অবসাদ ও বিষাদ্বের পাশাপাশি আত্মহত্যার আরো একটি সুক্ষ্ম কারণ, যা মানুষকে সহজেই আত্মহননের পথে ঠেলে দেয়, তা হলো নিঃসঙ্গতা।  অনেক সমাজবিদরা মনে করেন নির্দিষ্ট কিছু সামাজিক বিধিবিধান অনুসরণ করা থেকেই নিঃসঙ্গতার উৎপত্তি। আবার কিছু সাইকোলজিস্ট মনে করেন ব্যক্তিগত সম্পর্ক স্থাপনে ব্যর্থতা, নিজের অনুভূতির যথার্থ প্রকাশ না করতে পারা এবং অধীনস্থ সামাজিক প্রক্রিয়া থেকেই নিঃসঙ্গতা বা একাকিত্বের অনুভূতি চরম আকার ধারণ করে। নিঃসঙ্গতার সঙ্গে সংযুক্ত থাকে মানুষের মনের সাধারণ অসন্তোষ, অসুখী মনোভাব, বিষণ্ণতা, উদ্বেগ, শূন্যতা ও একঘেয়েমি অনুভূতি।

যতটুকু মিডিয়ার বদৌলতে জানা যায, সাদি মহম্মদের শৈশব থেকে আজ পর্যন্ত উত্তরণের দীর্ঘ একটা পথ চলা সহজ ছিল না। কন্টকময় বাধা বিপত্তি পেরিয়েই তিনি হয়ে উঠেছিলেন আজকের জনপ্রিয় রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী। মুক্তিযুদ্ধের প্রথম প্রহরে বাবাকে হারান তিনি, চোখের সামনেই বাবাকে হত্যা করতে দেখেন। একটি শিশুর জন্য এ দৃশ্য-ভয়ানক দীর্ঘস্থায়ী ট্রমা। একটি সুস্থ স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের জন্য একটি পরিবার অনস্বীকার্য। পরিবার, মানুষের সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি, বোঝাপড়া, আশ্রয়, নিরাপত্তা আর সহমর্মিতায় টিকে থাকার লড়াইয়ে বড় একটা ভূমিকা পালন করে। সাদি মহম্মদ স্ত্রী সন্তান নিয়ে সে পরিবারে গঠন করেননি। তিনি ছিলেন অবিবাহিত। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, পরিবেশ এবং তার আশা-প্রত্যাশার সাথে সামঞ্জস্যহীনতার কারণেই হয়তো তিনি অবিবাহিত থেকেছেন। তিনি তাঁর মা'কে দিয়েই হয়তো সে শূন্যতার অনেকটা পূরণ করেছিলান। ঘুম ভেঙ্গেই তিনি মা'কে খুঁজতেন। গত বছরের জুলাই মাসে মা জেবুন্নেছাকেও হারান তিনি। এরপর আরো একা হয়ে গেলেন। সাদি মহম্মদের স্বজন বলতে ভাই বোন আর শিল্প সংগীত জগতের অন্যন্য বন্ধুরা শুভাকাঙ্খীরা ছিলেন। একজন বোনও মারা যান মায়ের মৃত্যুর পাশাপাশি। এসবই একজন মানুষের মনের উপর বিরাট নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। 

বেশ কিছুদিন ধরে সাদি মহাম্মদ মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন বলে বিবিসিকে জানান বাংলাদেশের জনপ্রিয় নৃত্যশিল্পী শামীম আরা নিপা। সাদি মহম্মদের মানসিক অবস্থা নিয়ে শামীম আরা নীপা  বলেন, 'কয়েক দিন ধরেই বিষণ্নতায় ভুগছিলেন, শিবলী আমাকে বলেছিল, তুই একটু আয়, আমরা সাদি ভাইকে একটু বোঝাতে চাই, তুই থাকলে সাদি ভাই কথা শোনে। এসেছিলাম, অনেকক্ষণ কথা হলো, কথা দিয়েছিল আর ডিপ্রেশনে যাবে না। তখন বলছিলাম, তুমি একজন চিকিৎসকের কাছে যাও, উত্তরে বলেছেন, "না, আমারটা আমি বুঝব। তোমরা আমাকে নিয়ে ভেবো না"(News24)। নয়াদিগন্তের এক প্রতিবেদনে, এর আগেও তিনি আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন বলে জানান, শামীম আরা নীপা। প্রথম আলো প্রতিবেদনে শামীম আরা নীপা বলেন, 'ওনার মা মারা যাওয়ার পর থেকেই একটা ট্রমার মধ্যে চলে যান তিনি। ঠিক স্বাভাবিক ছিলেন না মানসিকভাবে।' 

তার মানে এটা স্পষ্ট যে সাদি মুহম্মদ মারাত্বক ডিপ্রেশনে ছিলেন যার উপযুক্ত চিকিৎসা করানো হয়নি। কিংবা তিনি করাতে চাননি। যে মানুষটা এর আগেও আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন এবং পরিবার সেটা জানতেন, সেক্ষেত্রে পরিবার সাদি মহম্মদকে এই সঙ্কট থেকে বেড়িয়ে আসতে ঠিক কতটা পাশে ছিলেন বা সহযোগীতা করেছিলেন, আমার জানা নেই। কারো মধ্যে যখন আত্মহত্যার প্রবণতা আসে, তখন সেটা পরিবারকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হয়। যে কোনো উপায়ে এই সময় সাদি মহম্মদের সঠিক চিকিৎসা দরকার ছিল, যা তিনি পাননি। 

নিউজ২৪ এর প্রতিবেদনে বলা হয়, 'নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তার এক স্বজন জানান, মায়ের মৃত্যুর পর একধরণের নিরাপত্তাহীনতা ও অনিদ্রায় ভুগতেন। সেজন্য তিনি এক মনোচিকিৎসকেরও শরণাপন্ন হোন। ঘুমের অসুধ খেতেন প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী। কিন্তু রাতের পর রাত ঘুম হতো না বলে সাদি বলতেন। তার ভেতরে একটু হতাশাও ছিল। সেজন্য নিজেকে একটু গুটিয়েও নিয়েছিলেন।' 

যদি তিনি ডিপ্রেশনের ঔষধও নিয়ে থাকেন, তবে কেন তার ঘুম হতো না? তারমানে ডিপ্রেশন ঔষধ ঠিক মতো কাজ করেনি এবং এই ঔষধ তাকে ইনসোমনিয়াতে ফেলেছিল। 

জনস হপকিন্সের নারী এবং পুরুষদের ঘুমের সমস্যা নিয়ে একটি গবেষণায় দেখা গেছে, সুস্থ নারী এবং পুরুষ যাদের সারা রাত ঘুমের ব্যাঘাত ঘটেছিল, পরের দিন তাদের ইতিবাচক মেজাজ ৩১ শতাংশ কমে যায়। ডেটা দেখায় যে, ঘুমের ব্যাঘাত বা চলমান অনিদ্রা একজন ব্যক্তির মানসিক স্থিতিস্থাপকতাকে দুর্বল করে ডিপ্রেশনের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। অর্থাৎ এই অনিদ্রা মানুষের ইতিবাচক আবেগকে বাফার করে যা মানুষকে মানসিক চাপ এবং জীবনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে সহায়তা করে। কাজেই ডিপ্রেশনের ঔষধ নেবার পর যদি তাঁর রাতের পর রাত ঘুমের ব্যঘাত ঘটে, তবে বলা যায় যে, এই ডিপ্রেশনের ঔষধও তাঁর ডিপ্রেশনকে আরো ঝুঁকিতে ফেলেছিল। মনোচিকিৎসরা কারো ডিপ্রেশন কেবল একটি ঔষধের মাধ্যমেই মোকাবেলা করেন না। একটা দিয়ে কাজ না হলে আরেক ঔষধের প্রয়োগ করেন। সাদি মহম্মদ কি সঠিক চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে পেরেছিলেন? যিনি ডিপ্রেশনের ঔষধ দিয়েছিলেন, তিনি কি নিয়মিত সাদি মহাম্মদের অবস্থার খোঁজ রেখেছিলেন? আরো একটা বিষয় হল, কিছু কিছু ডিপ্রেশনের ঔষধ কোনো কোনো রোগীকে আত্মহত্যার ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। একজন ব্যক্তির ডিপ্রেশন কমার সাথে সাথে কখনো আশাহীনতা ও অসহায়ত্ববোধ কম অনুভব হতে পারে। এটি আশার কথা শোনালেও যারা আশাহীন বোধ করেন না বা অসহায়ত্ববোধ করেন না কিন্তু তখনো হতাশ বোধ করছেন, তারা আত্মহত্যাকে সমাধান হিসাবে বিবেচনা করতে পারেন। অর্থাৎ হতাশাজনক লক্ষণগুলির হ্রাস আত্মহত্যার ধারণা বা সম্ভাবনা বাড়িয়ে তুলতে পারে। মানসিক স্বাস্থ্য পেশাদাররা এই ঝুঁকি সম্পর্কে অবশ্যয়ই সচেতন। সেক্ষেত্রে বলতে বাধ্য হচ্ছি, তিনি সঠিক চিকিৎসা ও যত্ন পাননি। 

আরো একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল-ডিপ্রেশনের ঔষধের পাশাপাশি পারিবারিক সহযোগিতা। পারিবারিক সহযোগিতা না থাকলে শুধুমাত্র ঔষধের মাধ্যমে কোনো রোগী খুব কমই সেরে উঠতে পারেন। সাদি মহম্মদ যথেষ্ট পারিবারিক সহযোগিতা, মনোযোগ পেয়েছিলেন কি? তবে কি তাঁর একমাত্র নিরাপত্তা, আশ্রয়, সুখ দুঃখ ভাগ করার জন্য পরিবারে কেবল মা'ই ছিলেন? 

সংগীতশিল্পী অনিমা রায়, শামীম আরা নীপা, শিবলী মোহাম্মদ, তাদের একই কথা মিডিয়ার বহু পত্রিকায় উড়ছে, 'ছাত্র-ছাত্রী ও শ্রোতাদের ভালোবাসায় সিক্ত হলেও রাষ্ট্রীয় কোনো সম্মান পাননি সাদি মহম্মদ। কাজের স্বীকৃতি পাননি বলে অভিমান ছিল সাদি মহম্মদের।' প্রথম আলোর প্রতিবেদনে জানা যায়, রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী অনিমা রায়, সাদি মুহম্মদের মৃত্যুর প্রায় ১৫ দিন আগে তাঁর সঙ্গে দেখা করেন কেরানীগঞ্জে বাংলাদেশ টেলিভিশনের "গানের ঝরনাতলা" রেকর্ডিং অনুষ্ঠানে। সেখানে সাদি মুহম্মদের সাথে তার দীর্ঘক্ষণ গল্প হয়। গল্পে উঠে আসে অতীতের কথা, তাঁর বাবার মৃত্যুর কথা, মায়ের কথা। অনিমা রায় বলেন, 'সেদিন সারাক্ষণ অভিমানের কথাই বলেছিলেন তিনি। এত গুণী একজন শিল্পী জাতীয় কোনো পুরস্কার পাননি।  জাতীয়ভাবে কোনো সম্মানিত করা হয়নি তাঁকে। বলেছিলেন, তাঁকে যেন কখনো মরণোত্তর পদক না দেওয়া হয়।' 

জাতীয় রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদে তাকে ন্যূনতম একজন সদস্য হিসাবেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি- এটা দুঃখজনক। তিনি যদি এ নিয়ে হতাশ হয়ে থাকেন, তবে তা খুবই স্বাভাবিক। তবে শুধু একারণে তিনি আত্মহত্যা করবেন, এটা যৌক্তিক নয়। উইকিপিডিয়া ঘেটেও তাঁর দুর্দান্ত কাজের তেমন কোনো প্রাপ্তি চোখে পড়েনি। চ্যানেল আই ২০১২ সালে তাকে আজীবন সম্মাননা পুরস্কার প্রদান করে, আর  ২০১৫ সালে বাংলা একাডেমি তাকে রবীন্দ্র পুরস্কার প্রদান করে। ব্যাস! এই ছিল তাঁর অর্জন। অথচ এই শিল্পী সত্তর দশকের শেষ থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত প্রায় ৪৫ বছরের মতো কাজ করে গেছেন। বাংলাদেশে মেধা যোগ্যতার মান যাচাই ছাড়াই একুশে পদক, স্বাধীনতা পদক, রাষ্ট্রীয় পদক অনেকের হাতে। এসব পদক নিতে, মর্যাদা পেতে কৌশল জানতে হয়, ধর্না দিতে হয়, তোয়াজ করতে হয়। এমন সব কথাই মিডিয়াতে উঠে আসছে। সাদি মহম্মদ তা করেননি। তাই হয়তো প্রাপ্য মর্যাদাও পাননি। একজন মহীরুহ শিল্পী নিজের মনেই কাজ করেন, তিনি কখনোই পদকের আশা করেন না। কিন্তু তার প্রাপ্য সম্মানটুকু কাউকে না কাউকে দিতেই হয়। একজন  শিল্পীকে যথাসময়ে তার প্রাপ্য সম্মানটুকু দেয়ার দায়িত্বটা কার? নিশ্চয়ই রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের।শিল্পী হিসেবে তিনি দেশকে দিয়েছেন অনেক কিছু, শ্রম, সময়, প্রতিভার সবটুকু। বিনিময়ে কতটা সম্মান পেয়েছেন, কতটা বাকি থেকে গেছে, সেই হিসাব কষার সময় এসেছে আজ। 

যারা বলছ্ন, মায়ের মৃত্যুর পর সাদি মহম্মদ ট্রমাতে চলে যান অর্থাৎ ডিপ্রেশনের শুরু, কিংবা পুরস্কৃত না হওয়ায় ডিপ্রেশনে গিয়ে আত্মহত্যা করেছেন, তারা ভুল বলছেন। সংগীত জগতে যথাযথ মূল্যায়ন না পাওয়া, মায়ের মৃত্যু, বোনের মৃত্যু এগুলি হতে পারে তাঁর ডিপ্রেশনের খণ্ড খণ্ড একটা অংশ। একটি ঘটনা বা একদিনের ঘটনায় কেউ আত্মহত্যা করে না। বছরের পর বছর ডিপ্রেশনের সাথে লড়ে লড়ে যখন স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার আর কোনো উপায় খুঁজে না পান, তখনই মানুষ এ পথ বেঁছে নেন। সাদি মহম্মদের বহু বছর ধরেই ভেতর অল্প অল্প ডিপ্রেশন তৈরি হচ্ছিল এবং এর ঘনত্ব বাড়ছিল যা তার পরিবারও বোঝেনি, সংগীত জগতের কেউ বোঝেনি। না বোঝারই কথা। বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে ক'জন ভাবেন? ক'জন বোঝার চেষ্টা করেন যে, এই মানসিক স্বাস্থ্য শারীরিক স্বাস্থ্যের মতই গুরুত্বপূর্ণ কিছু যার নিয়মিত চিকিৎসা ও যত্ন দরকার! জ্বর কাঁশি হলে আমরা ডাক্তারের কাছে ছুটি। কিন্তু ডিপ্রেশন, অ্যাংজাইটি যে জ্বর কাঁশির মতই মনের স্বাস্থ্য সঙ্কট যারও চিকিৎসা দরকার, তা নিয়ে আমরা ভাবিনা। আমরা এখনো ডিপ্রেশন অ্যাংজাইটির মতো বিষয়গুলিকে প্রাধান্য দিতে শিখিনি। আমরা বুঝতেই চাই না সামান্য ডিপ্রেশনের শুরু থেকেই যদি চিকিৎসা যত্ন না করা হয় তবে তা এক সময় ভয়ানক রূপ ধারণ করতে পারে।

বলা হচ্ছে তিনি স্বেচ্চামৃত্যু গ্রহণ করেছেন। সাদি মহম্মদ স্বেচ্ছামৃত্যু গ্রহণ করেননি। তিনি আত্মহত্যা করেছেন। আত্মহত্যা (সুইসাইড) ও স্বেচ্ছামৃত্যু(ইউথেনেশিয়া) এক নয়। আত্মহত্যা ব্যক্তির ইচ্ছায় সকলের অগোচরে, অজ্ঞাতে, নিভৃতে সংগঠিত হয়। আর স্বেচ্ছামৃত্যুর ক্ষেত্রে ব্যক্তির স্বাধীন ইচ্ছাকে কিছু প্রক্রিয়া মেনে বৈধ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন সাপেক্ষে, চিকিৎসকের সহায়তায় কার্যকর করা হয়, যাকে বলা হয় ভলান্টারি ইউথেনেশিয়া। অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে, অসহ্য যন্ত্রণা দুর করার জন্য মৃত্যু অপরিহার্য হয়ে ওঠলেই কেবল এটি প্রযোজ্য। কখনো এমন অবস্থায় ব্যক্তি মতামত প্রদানে অক্ষম হলে, ব্যক্তির পক্ষ থেকে পরিবারের অনুমোদনক্রমে তা বাস্তবায়িত হয়, যাকে বলে নন-ভলান্টারি ইউথেনেশিয়া।

অর্থাৎ, অতি বয়স্ক, যন্ত্রণাময় অবস্থা বা রোগ যা নিরাময় অযোগ্য, এমন অবস্থায় চিকিৎসকের পরামর্শে রোগী নিজে অথবা তার স্বজনের লিখিত আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালত স্বেচ্ছামৃত্যুর অনুমতি দিতে পারে। এজন্য ব্যক্তির বয়সও ১৮ এর উপর হতে হবে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ-দুইভাবেই স্বেচ্ছামৃত্যু হয়। পরোক্ষ স্বেচ্ছামৃত্যুর ক্ষেত্রে লাইফ সাপোর্ট তোলে নিয়ে স্বাভাবিক মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করা হয়। আর, প্রত্যক্ষ স্বেচ্ছামৃত্যুর ক্ষেত্রে রোগীকে মাত্রাতিরিক্ত ব্যথানাশক ঔষধ দেয়া হয়। এতে রোগী ধীরে ধীরে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। কাজেই সাদি মহম্মদ স্বেচ্চামৃত্যু গ্রহণ করেননি, আত্মহত্যা করেছেন।

২০০২ সালের এপ্রিলে নেদারল্যান্ড পৃথিবীর প্রথম দেশ হিসেবে ইউথেনেশিয়াকে বৈধ ঘোষণা করে। কানাডায় ২০১৬ সালে 'বিল সি-১৪' এর মাধ্যমে ইউথেনেশিয়াকে অনুমোদন দেওয়া হয়। আমেরিকার শুধুমাত্র ছয়টি প্রদেশে এটা আইনসম্মত; বাকি প্রদেশে অবৈধ। অস্ট্রেলিয়া,ক্যানাডা, ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র, নিউজিল্যান্ড, ইন্ডিয়াতে স্বেচ্ছামৃত্যু বৈধ। বাংলাদেশে এটা অবৈধ। মেহেরপুরের এক ফল বিক্রেতা তোফাজ্জল হোসন এর ২৪ এবং ১৩ বছর বয়সী দুই ছেলে ও ৮ বছর বয়সী নাতির জন্য স্বেচ্ছামৃত্যুর আবেদন করেছিলেন। তারা তিনজনই ডাচেন মাস্কুলার ডিস্ট্রফিতে আক্রান্ত। এই রোগে আক্রান্ত কোনো ব্যক্তি সর্বোচ্চ ৩০ বছর বয়স পর্যন্ত বাঁচতে পারে। অনেক বছর পরিবারের এই তিন সদস্যের ভরণপোষণের সর্বাত্মক চেষ্টা করেন তিনি।তাদের চিকিৎসা করানোর জন্য নিজের শেষ সম্বল দোকান বিক্রি করে বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন হাসপাতালে নিয়ে যান; তবে কোনো কিছুই ফলপ্রসূ হয়নি। অবশেষে আর কোনো পথ খুঁজে না পেয়ে তাকে ইউথেনেশিয়ার মতো সিদ্ধান্ত নিতে হয়। তবে বাংলাদেশে স্বেচ্ছামৃত্যুর আইনি বিধান না থাকায় সেটা কার্যকরী হয়নি। 

মনোবিজ্ঞানী এরিকসন তার 'লাইফ সাইকেল(জীবনবৃত্ত)'  তত্ত্বে জীবনকে নবযাতক থেকে বৃদ্ধকাল পর্যন্ত কয়েকটি ধাপে ভাগ করেছেন। এই লাইফ সার্কেলে, জীবনের শেষ ধাপে একজন পরিপূর্ণ সফল ও সুখী মানুষ জীবন সমাপ্ত করেন এবং যাপিত জীবন নিয়ে পূর্ণ তৃপ্তি ও সন্তুষ্টি অর্জন করেন। এ সময় ব্যক্তি জীবনকে পরিপূর্ণ মনে করেন এবং আসন্ন মৃত্যুকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে মানসিকভাবে প্রস্তুতি নেন। এ লাইফ সার্কেলে মৃত্যু মানুষের কাছে অনাকাক্সিক্ষত কিছু বা আফসোসের কোনো বিষয় হয় না। স্বেচ্ছামৃত্যু ‌অসহনীয়  যন্ত্রণা, অপারগা থেকেই আসলেও কেউ আবার পরিপূর্ণতা, আত্মতৃপ্তি নিয়েও স্বেচ্ছামৃত্যুর কথা ভাবতে পারেন। এমন 

মানুষের সংখ্যা কম হতে পারে, তবে আছে। অস্ট্রেলিয়ার ১০৪ বছর বয়সী বিজ্ঞানী ডেভিড গুডাল, তাদেরই একজন। সুইজারল্যান্ডের লাইফ সার্কেল হাসপাতালে কষ্টবিহীন ইনজেকশনে স্বেচ্ছা মৃত্যুবরণ করেন তিনি। মৃত্যুর আগেরদিন সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, 'আমার সামর্থ্য দিনদিন কমে আসছে... আমি সৌভাগ্যবান যে আমার শান্তিপূর্ণ জীবনাবসান হচ্ছে।' তিনি অসুস্থ বা মরণাপন্ন ছিলেন, এমনটা নয়। তিনি শুধুমাত্র জীবনটাকে আর টেনে নিতে চাচ্ছিলেন না। এই সমাপ্তি ছিল তার স্বইচ্ছায়। তাঁর নিজের ভাষায়: যথেষ্ট হয়েছে, গুডবাই। 

সাদি মহম্মদ, বাংলাদেশে রবীন্দ্র সঙ্গিত জগতের একট উজ্জল নক্ষত্র। রবীন্দ্রসংগীতকে অনেকের দুয়ারে পৌঁছে দিয়েছেন সাদি মহম্মদ। কিন্তু আমরা পৌঁছে দিতে পারিনি তাঁর হাতে প্রাপ্য সম্মানটুকু। আমরা কেবল সাদি মহম্মদের সংগীতের কণ্ঠ শুনেছি। আমরা শুনতে পারিনি বা শোনার চেষ্টা করিনি তাঁর একাকিত্ব আর অভিমান নিয়ে ছুঁড়ে দেয়া নিঃশ্বাসের শূনতার শব্দ। এ ব্যর্থতা কার? এ লজ্জা কার? আমাদের সবার। পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র-এ ব্যর্থতা এ লজ্জা সবার। 

অভিমত থেকে আরো পড়ুন