https://www.prothomalony.com/
8065
foundation
প্রকাশ: ১০ জানুয়ারী ২০২৪ ০৯:২৮
"নাচ যেমন আমার অক্সিজেন তেমনি গবেষণার কাজও"-ক্যান্সারবিজ্ঞানী এবং নৃত্যশিল্পী সুবর্ণা আফরিন খান এমনটিই জানালেন এবারের টক শো'তে। প্রথম আলো উত্তর আমেরিকার সাপ্তাহিক সম্প্রসার "টক অফ দ্য উইক" এ এবারের অতিথি ছিলেন সুবর্ণা আফরিন খান। পেশায় তিনি একজন ক্যানসার বিজ্ঞানী। বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউজার্সির নোভারটিস ফার্মাসিউটিক্যালে
'সেল এন্ড জিন' থেরাপি'র সহযোগী পরিচালক হিসাবে যুক্ত আছেন। সেই সাথে তিনি নোভার্টিস এ 'ক্রিম্যারিক এনিটিজেন রিসেপটর -টি' ক্যান্সার সেল থেরাপি উন্নয়নের জন্য একাধিক প্রকল্প পরিচালনা করছেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয থেকে মাইক্রো-বায়োলজিতে অনার্স করেছেন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, নিউজার্সির রাটগার্রস্ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ক্যান্সার সেল বায়োলোজিতে মাস্টার্স এবং পিএইচডি সম্পন্ন করেছেন।
'সেল এন্ড জিন' আসলে কি এবং এর কার্যকারিতা নিয়ে রোকেয়া দীপার প্রশ্নে তিনি বলেন," ক্যান্সারের চিকিৎসায় বহুল প্রচলিত কেমো থেরাপি। এর পূর্বে ছিল রেডিয়্যাশন থেরাপি, কেমোথেরাপিতে ক্যন্সারের সেলগুলোর সাথে সাথে অনেক সুস্থ সেল ও নষ্ট হয়ে যায়। এর ফলে অনেক ধরনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতো মানব দেহে। ২০১৭ সালে প্রথম জিন থেরাপির মেডিসিন প্রয়োগ শুরু হয়।আমরা জানি কেমো থেরাপিতে অনেকগুলো পর্যায়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়, কিন্তু 'সেল এন্ড জিন' থেরাপিতে একটি ডোজ-ই ব্যবহার করা হয়। জিন থেরাপি শুধু ক্যান্সার নয় বরং অন্যান্য জেনেটিক সমস্যার ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা হয়। বিশেষ করে বাচ্চাদের স্পাইনাল ভাস্কুলার ডিসফাংশন এর ক্ষেত্রে জিন থেরাপিটা কার্যকরী ভূমিকা পালন করছে।"
তিনি বলেন, আলাদা করে সেল থেরাপির কথা বলতে গেলে,
ব্লাড ক্যান্সারের ক্ষেত্রে সেল থেরাপিটা যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করছে। মূলত ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীর কাছ থেকে রক্ত নিয়ে রক্তের 'টি-সেল' গুলো আলাদা করে, 'টি-সেল' গুলোকে জেনিটেক্যালি মোডিফাই করে, সেই রক্ত আবার রোগীর শরীরে দেওয়া হয় পরবর্তীতে মোডিফাই করা 'টি-সেল' গুলো রোগীর রক্তের মধ্যে থাকা ক্যান্সার সেলগুলোকে খুঁজে খুঁজে ধংস করে দেয়।"
ক্যান্সার সেল থেরাপি উন্নয়নের জন্য একাধিক প্রকল্প পরিচালনা করছেন সুবর্ণা খান। সে সম্পর্কেও জানালেন।
ক্যান্সারের ওষুধ বাজারে আনতে হলে কী কী পদক্ষেপ নিতে হবে, সেই সম্পর্কেও বলেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের নিউজার্সিতে সুবর্ণা খান এর একটা স্কুল আছে। সেখানে নাচে নাচে শিশুদের শেখানো হয় বাংলাদেশের ঐতিহ্য। যুক্তরাষ্ট্রের নিউজার্সিতে ১৬ বছর ধরে 'সৃষ্টি একাডেমি অব পারফর্মিং আর্টস' নামের একটি নিবন্ধিত নাচের স্কুলও পরিচালনা করছেন তিনি। একজন বিজ্ঞানীকে সাধারণত আমরা এমন শিল্পসমৃদ্ধ কাজে তেমন দেখিনা। বিজ্ঞানী মানেই গভীর চিন্তা ও গবেষণার এক চিত্র উঠে আসে আমাদের সামনে। যাইহোক, একজন বিজ্ঞানীর মাঝে এই শিল্পসত্তা বিরল হলেও সুবর্ণা খান বহুগুণে গুণান্বিত। এ নিয়ে তিনি বলেন, "আমি আসলে ছোটবেলা থেকেই নাচ শিখি। আমার মা খুব করে চাইতেন আমি নাচ করি। আমার মা নাচ শিখতে পারেননি, উনাদের সময়ে সমাজ ব্যবস্থা ভিন্ন ছিল। মেয়েদের নাচ শেখা, নাচ করার প্রচলন কম ছিল। উনি এক প্রকার ধরে বেঁধেই আমাকে নাচ শেখাতে নিয়ে যেতেন, আমার নাচের হাতেখড়ি রুপনম মরিয়মের কাছ থেকে। এরপর আলপনা মমতাজ, সোমা মততাজ, শিবলী মোহাম্মদ, বেলায়েত হোসেন খান- এরা সবাই আমার গুরু। আমার কাছে সাইন্স আর নিত্যকলা এ দুটোর মধ্যে কোন কনফ্লিক্ট নেই। সাইন্স আর নাচের কোরিওগ্রাফি দুটোই আমার কাছে এক্সপেরিমেন্ট। দুটোই আমার কাছে সৃষ্টিশীল কাজ। একটা ল্যাবে করছি আর একটা স্টেজে করছি।"
কর্মব্যস্ত জীবনে আমাদের বিনোদন বা বিশ্রামের দরকার আছে। কাজ আর দায়িত্বের মাঝখানে নিজের মনের খোরাক যোগাতে না পারলে আমরা অনেক সময় ক্লান্ত হয়ে পড়ি। সুবর্ণা খানের কোনো ক্লান্তি নেই। তিনি কাজ, দায়িত্ব এবং উপভোগের জায়গাটা ব্যালেন্স করেই সামনে এগিয়ে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, "আমার কাছে মনে হয়, আমাদের এই কর্মব্যস্ত জীবনে একটু শিল্পের ছোঁয়া থাকা জরুরি। এতে মন সতেজ থাকে, এক ধরনের শক্তি প্রদান করে শিল্প। ল্যাবে একটা এক্সপেরিমেন্ট এর রেজাল্ট ভালো আসলে যেমন একটা ভালোলাগা কাজ করে, তেমনি শিল্পের ব্যাপারটাও আমাকে যতটা ভাললাগা ও শক্তি দেয়, তা অন্য কিছুতে আমি পাই না।"
১৭/১৮ বছর যাবত পেশাগতভাবে সুবর্ণা খান একজন ক্যানসারবিজ্ঞানী। ১৫ বছর ধরে ক্যানসার–বিষয়ক নানা গবেষণার সঙ্গে যুক্ত। একই সাথে শিশুদের নৃ্ত্যের মাধ্যমে দেশের ঐতিয্যকে বিদেশের মাটিতে তুলে ধরছেন। একজন বিজ্ঞানী এবং একজন নৃত্যশিল্পী- কোনটা তাকে বেশি টানে, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, "আমার মনে হয় আমাদের জীবনে একজন মানুষ হিসেবে একটা উদ্দেশ্য আছে, আর সেটা হলো 'টু সার্ভ টু গিভ। আমার মনে হয়েছে এই বয়েসে এসে 'টু সার্ভ'-করি। আমার কাজ হচ্ছে কমিউনিটিকে কিছু দেওয়া। এজন্য আমি দুটোকেই সমানভাবে উপভোগ করি।
আমাদের একটা ড্রাগ যখন ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শেষ করে অনুমোদিত হয়ে মার্কেটে আসে, আমার কাছে মনে হয় এর একটা অংশে আমি আছি, যদিও সেটা খুবই ছোট একটা অংশ। একজন মানুষ যখন সুস্থ হয়ে উঠে এটা বিশাল একটা পাওয়া। তেমনি একটা বাচ্চা যখন আমার কাছে আসে, নাচ শেখে এবং আস্তে আস্তে বেড়ে উঠে একটা সময় সে নিজের থেকে এগিয়ে যায়, নিজের মতো করে নাচটাকে একটা পর্যায়ে নিয়ে যায়, একটা ভালো অবস্থান তৈরি করে, তখন এখানেও আমার একটা অবদান আছে বলে মনে হয় যা একটা বিশাল পাওয়া। এখানে আমাকে দুটোই সমান ভাবে টানে।"
পেশাগত জীবনের পাশাপাশি শিল্প সংস্কৃতিমূলক কাজগুলি করে যাচ্ছেন তিনি নিয়মিত। এ দুটোই বৃহৎ পরিসরের কাজ। দুটো একসাথে ব্যালেন্স করা সম্পর্কে তিনি বলেন, "এটা আসলেই কঠিন। নিজের প্রেশারগুলো নিজে ম্যানেজ করা যায় কিন্তু পরিবারের উপর যে প্রেশার আসে এটা আসলেই কঠিন। তবে এই দিক দিয়ে বলতে গেলে আমি অনেক সৌভাগ্যবান, কারণ আমার স্বামী এবং আমার দুই ছেলে আমাকে সবকিছুতেই সবসময় সহযোগিতা করে এসেছে। বিশেষ তরে, আমার স্বামী শুরু থেকে আমার পড়াশোনা, উচ্চশিক্ষা, ক্যারিয়ার এবং আমার নাচের স্কুল- সব ব্যাপারে আমাকে সাপোর্ট দিয়ে গেছে। যার কারনে আমার সবকিছু ম্যানেজ করা সহজ হয়েছে, আমি তার কাছে কৃতজ্ঞ।"
সুবর্ণা খান পলিটিক্যাল ফ্যামিলির একজন। পরিবার সম্পর্কে তিনি বলেন, "আমাদের পরিবার পুরোটাই রাজনীতির সাথে জড়িত। আমার বাবা রাশেদ খান মেনন ওয়ার্কার্স পার্টির চেয়ারম্যান, বাবা-মা দুজনেই মেম্বার অব পার্লামেন্ট। আমার বাবা-মা দুজনেই ছাত্র জীবন থেকে রাজনীতির সাথে জড়িত। আমার দাদা স্পিকার এবং চিপ জাস্টিক ছিলেন৷ আমার চাচারা, আবু জাফর বাইতুল্লা, এনায়েতুল্লা খান, তারাও যার যার জগৎ থেকে নাম করেছেন সাংবাদিক এবং ডিপ্লমেট হিসেবে। এবং আমার ফুফু সেলিনা রহমান, তিনিও রাজনীতির সাথে জড়িত। আমি আসলে রাজনৈতিক পরিমণ্ডলেই বেড়ে উঠেছি।"
সুবর্ণা খান তার জীবন দর্শন সম্পর্কে বলেন, "আমার কাছে মনে হয় আমরা মানুষ। আমাদের একটা প্রিভিল্যাজ থাকা উচিত। আমরা একসময় থাকবো না, কিন্তু আমাদের এমন কিছু একটা করে যাওয়া দরকার যা অন্য কাউকে পরিবর্তন করবে বা সমাজে একটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এর জন্য খুব বড়ো কিছু হতে হবে তা কিন্তু না। আমার কাছে মনে হয়, নিজ অস্তিত্বের একটা অর্থ থাকতে হবে এবং আমি আমার মতো করে সেটা চেষ্টা করে যাই।"
এভাবেই শেষ হয় ৪ জানুযারি, বৃহস্পতিবারের অনুষ্ঠানটি। অনুষ্ঠানটির সঞ্চালনায় ছিলেন রোকেয়া দীপা এবং কারিগরি সহযোগিতায় ছিলেন এইচ বি রিতা। প্রথম আলো উত্তর আমেরিকার "টক অফ দ্য উইক" প্রতি বৃহস্পতিবার নিউইয়র্ক সময় রাত নয়টায় সরাসরি ফেসবুক লাইভে সম্প্রচারিত হয়ে থাকে। আমাদের ইউটিউব চ্যানেল Prothom Alo USA, ফেসবুক পেইজ https://www.facebook.com/prothomalony?mibextid=LQQJ4d।
ফাউন্ডেশন থেকে আরো পড়ুন