https://www.prothomalony.com/

11740

foundation

ফাউন্ডেশন 

টক অফ দ্য উইক - একজন রিয়েলএস্টেট এজেন্টকে দক্ষতার সাথে সৎ থাকতে হবে –মাসুম আহমদ

প্রকাশ: ০৫ ডিসেম্বর ২০২৪ ০২:৩০

"যে কোন কাজের একটা নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া আছে, যা অনুসরণের মাধ্যমে কাজটি সহজতর হয়। আমি মনে করি কেউ বাড়ি কিনতে চাইলে, একজন পেশাদার রিয়েল এস্টেট এজেন্ট নিয়োগের মাধ্যমে কাজটি খুবই সহজ এবং আশঙ্কামুক্ত ভাবে সম্পন্ন করতে পারবেন। সেই সাথে এই কাজে সৎ থাকা আবশ‍্যক। কেবল ব‍্যবসায়িক ভাবনায় না গিয়ে বাড়ি কেনায় ক্লায়েন্টকে 'বাড়িটি' সম্পর্কে যে কোনো সমস‍্যাগুলো সম্পর্কে অবগত করতে হবে"- রিয়েল এস্টেট ব্যবসা প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ কথাগুলো তুলে ধরেন মাসুম আহমদ। 

২৮ নভেম্বর বৃহস্পতিবার, প্রথম আলো উত্তর আমেরিকার সাপ্তাহিক সম্প্রচার "টক অফ দ্য উইক" অনুষ্ঠানে  অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন তিনি। মাসুম আহমদ রিয়েল এস্টেট ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত আছেন দীর্ঘ তেরো বছর ধরে। তিনি আইআরএস-এ (IRS) একজন ইনফরমেশন টেকনোলজি স্পেশালিস্ট হিসেবে কাজ করছেন। এছাড়াও, মাসুম আহমদ একজন লেখক ও কবি। অনুষ্ঠানে মাসুম আহমদ কথা বলেছেন রিয়েল এস্টেটের বর্তমান অবস্থা, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা, এবং বিনিয়োগের উপযুক্ত সময় ও কৌশল নিয়ে। 

শুরুতেই দীর্ঘ সময় ধরে রিয়েল এস্টেট ব‍্যবসার অভিজ্ঞতা সম্পর্কে জানান মাসুম আহমদ। রিয়েলএস্টেট ব্যবসার বর্তমান অবস্থা এবং মর্টগেজ রেট সম্পর্কে তিনি বলেন, 'ক্রেতাদের চোখে বর্তমানে রিয়েলএস্টেট ব্যবসার অবস্থা অনুকূলে না। কারন বাড়ির মুল্য ও ইন্টারেস্ট রেট বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু বাড়ি সেলারদের জন্য মার্কেট ভালো। শেষ দুই মাসে ইন্টারেস্ট রেট কিছুটা কমলেও আগামী বছরের আগে আর কোন আশা নেই। স্বাভাবিক নিয়মে বাড়ির মূল্য কমলে ইন্টারেস্ট রেট বাড়ে, কিন্তু বর্তমানে এই হিসাব মিলছে না।' 

উপস্তাপিকা ফরিদা ইয়াসমীন প্রশ্ন রাখেন, বর্তমানে কোন ধরনের প্রপার্টির চাহিদা বেশি? মাসুম আহমেদ জানান, 'রিয়েলএস্টেটের হিসাব লোকেশন এবং কমিউনিটি অনুযায়ী ভিন্ন হয়ে থাকে। নিউইয়র্কে কাজ করার সুবাদে বলব, আমাদের বাঙালি কমিউনিটিতে মাল্টি ফ্যামিলি হাউজের চাহিদা বেশি। তারা বরাবরই দুই-তিন ফ্যামিলি হাউজ কিনতে চায়। কারণ মাল্টি ফ্যামিলি হাউজ কেনার জন্য কিছু বাড়তি সুবিধা পেয়ে থাকেন। এপার্টমেন্টের ভাড়া দিয়ে তারা মর্টগেজে হেল্প করতে পারে। কিন্তু বর্তমান মার্কেটে প্রাইস বেড়ে যাওয়ায় অনেকে মাল্টি ফ্যামিলি হাউজ কেনার মন-মানসিকতা থেকে সরে এসেছে। কারণ রেন্ট দিয়ে মর্টগেজ শোধ হচ্ছে না, নিজের পকেট থেকে দিতে হচ্ছে। তাই অনেকেই সিঙ্গেল ফ্যামিলি হাউজ কেনার ব্যাপারে ঝুঁকছে। যদি কেউ নিজে থাকার জন্যে প্রথমবারের মতো কোন প্রোপার্টি কেনেন, সেক্ষেত্রে বর্তমান সময়টা হচ্ছে বেস্ট সময়। কিন্তু বিনিয়োগের উদ্দেশ্যে প্রোপার্টি কেনার জন্যে এখন সময়টা অনেক কঠিন।' 

যারা একাধিক প্রপার্টিতে বিনিয়োগ করতে চান, তাদের জন্য পরামর্শ  হিসাবে মাসুম আহমদ বলেন, 'মাল্টি ফ্যামিলি বাড়ির ক্ষেত্রে অনেকগুলো দরকারি ব্যাপার থাকে, যেমন কয়টা বেডরুম, কয়টা ফ্লোর, কোন লোকেশন, জায়গার দাম কতটুকু বেড়েছে কিংবা বৃদ্ধির সম্ভাবনা আছে। একজন বায়ারের প্রাইমারি বাড়ি হচ্ছে প্রথম কেনা বাড়ি যেটাতে সে বসবাস করবে। এরপর সেই ব্যক্তির ক্রয়কৃত সবকিছুই ইনভেস্টমেন্ট প্রোপার্টি এবং বিজনেস বলে গণ্য হবে। ওই প্রোপার্টি থেকে পাওয়া রেন্ট তার ইনকাম হিসাবে ট্যাক্স রিটার্নে দেখাতে হবে। আবার তৎক্ষণাৎ লাভ পেতে অনেকেই প্রোপার্টি কিনে বেচতে পারে। এই বিনিয়োগ প্রকল্পে অনেক বাঙালি আছে, যা রিয়েল এস্টেটের বড় একটা সেক্টর। ফোর-ক্লোসার প্রোপার্টি, অকশন প্রোপার্টি, ব্যাংক প্রোপার্টি, শর্ট সেল প্রোপার্টি ইত্যাদি লাভজনক ব্যবসায় যে কেউ বিনিয়োগ করতে পারে।'

একজন নতুন বিনিয়োগকারীর জন‍্য রিয়েল এস্টেটে বিনিয়োগ করার আগে কিছু বিষয় বিবেচনা করা উচিত। বাড়ি কেনার ক্ষেত্রে লোকেশন নির্বাচন একটি বড় বিষয়। সঠিক লোকেশন নির্বাচনের ক্ষেত্রে পরামর্শস্বরূপ মাসুম আহমদ বলেন, 'বিনিয়োগ যদি হয় নিজে থাকার জন্য একটা প্রাইমারি হাউজ, তাহলে প্রথমেই তাকে জানতে হবে মর্টগেজ, ডাউন পেমেন্ট সম্পর্কে। কোন এলাকায় কত ফ্যামিলি হাউজ কিনবে সেটা নির্ধারণ করে রিয়েলএস্টেট কোম্পানির মাধ্যমে  একজন এজেন্টের সাথে কাজ শুরু করতে হবে। এজেন্ট তাকে বিষয়টা সম্পর্কে অবহিত করে বাড়ি কেনা পর্যন্ত সাহায্য করবে। প্রোপার্টি কেনা বা বিক্রির সময় একজন ভালো রিয়েল এস্টেট এজেন্ট নির্বাচন করা খুব জরুরি ব্যাপার।'

যারা প্রথমবার বাড়ি কিনতে চান, তাদের জন্য বিবেচনায় রাখা জরুরি বিষয় সম্পর্কে মাসুম আহমদ বলেন, 'বাড়ি কেনার আগে একটা তালিকা তৈরি করতে হবে। যেমন, নিজের ইচ্ছা বা প্রয়োজনসকি, কেমন বাড়ি কিনতে চান, কোন লোকেশনে, কত মূল্যের মধ্যে কিনতে চান, কত নগদ হাতে আছে, কত পরিমাণ লোন নিতে সক্ষম হবেন...ইত্যাদি। আরো কিছু উপ-প্রয়োজনীয় বিষয় যেমন, কয়টা বেডরুম, সাবওয়ে-বাসের কাছাকাছি লোকেশন, পারকিং থাকা জরুরি কিনা, বাড়ি ইটের নাকি ফ্রেমের, বেইসমেন্ট থাকা জরুরি কিনা, এগুলো ঠিক করে রাখা উচিত। আর এজন্যেই একজন রিয়েলএস্টেট এজেন্ট দরকার, যারা প্রত্যেকের ক্যাপাসিটি অনুযায়ী একজনের জন্য উপযুক্ত বাড়ি খুঁজে দেবে। প্রি-এপ্রুভ্যাল এবং লোনের পরিমাণ জানা থাকলে তখনই রিয়েলএস্টেট কাজ শুরু করতে পারেন।' 

মাসুম আহমদ একজন রিয়েল এস্টেট এজেন্ট হিসাবে বাঙালিদের সাথে কাজ করেছেন দীর্ঘ সময়। এই অভিজ্ঞতায় তিনি জানান, 'অনেক বাঙালি কাস্টমারদের মুখোমুখি হয়েছি, সবচাইতে ভালো দিকগুলো হচ্ছে তারা বায়ার হিসাবে খুব সিরিয়াস। বাঙালিরা বাড়ি কেনার ইচ্ছা পোষণ করলে বাড়ি কিনবেই। একজন বায়ার যখন বাড়ি কেনে একমাত্র তখনই একজন রিয়েলএস্টেট এজেন্টের ইনকাম হয়। এছাড়া আমরা কিছু নৈতিক সমস্যার মুখোমুখি হই। যেমন, বাঙালি বায়াররা বাড়ি কেনার ব্যাপারে একই সময়ে একের অধিক এজেন্টের সাথে কাজ করে। এজন্যে এজেন্টদের মধ্যে জটিলতার সৃষ্টি হয়। কারণ আমরা বাঙালি কাস্টমারের সাথে এক্সক্লুসিভ সাইন করাই না। তাছাড়া বাঙালি কাস্টমারদের মধ্যে পেশাদারিত্বের সমস্যা আছে। তারা সবকিছুতেই নিজের মতো করে দেখে ও পেতে চায়। এখন নতুন আইন হয়েছে, বায়াররা নিজ খরচে এজেন্টদের নিয়োগ করবে। এটার জন্যে প্রথমেই তাদের সাইন করিয়ে নিতে হবে, এইজন্যে পে করতে হবে। বাঙ্গালিরা প্রথমেই পে করতে চায় না। বাড়ি দেখার সময় তারা বেতনের মাধ্যমে সাইন করিয়ে নেবে। আরো একটা সমস্যা যে, বাঙালি কাস্টমাররা দলবলসহ বাড়ি দেখতে আসে, আর সেকারণে একাধিক মতামত প্রকাশ হয় এবং তারা ডিসিশান নেবার সময় ইতস্তত করে।' 

মাসুম আহমদের কাছে জানতে চাওয়া হয়, রিয়েল এস্টেট মার্কেটে কাজ করতে চাইলে একজন সফল এজেন্ট হওয়ার জন্য কোন দক্ষতাগুলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ? তিনি উত্তরে জানান, 'অনেকদিন ধরে কাজ করছি, এই প্রফেশনটা পুরোপুরি কাস্টমার সার্ভিস রিলেটেড। যে যত ভালো কাস্টমার সার্ভিস দিতে পারবে সে তত বেশি টিকে থাকবে। এই পেশায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে ধৈর্য ও সততা। বিচিত্রপূর্ণ মানুষের সাথে আমাদেরকে কাজ করতে হয়। ধৈর্য রেখে বিনযীভাবে তাদের সময় দিতে হয়, বোঝাতে হয়। সফলতা তো এমনি এমনি আসে না, সেটা কাজ করে অর্জন করতে হয়। বাঙালি কমিউনিটিতে কাজ করি তাই একটা নেটওয়ার্ক হয়ে গেছে। কোন কাস্টমারকে ভালো সার্ভিস দিলে তার দ্বারা আরেকজন কাস্টমার পাওয়ার সম্ভবনা থাকে। আমি বিজ্ঞাপন ছাড়াই কাজ করি, কিন্তু আমার কাস্টমারের কমতি নেই। আমি মনে করি এর কারণ হচ্ছে সততা এবং সৌহার্দ‍্যপূর্ণ আচরণ।'

আগামী বছরগুলোতে রিয়েল এস্টেট মার্কেটের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে মাসুম আহমদ খুব আশাবাদী। তিনি বলেন, 'রিয়েলএস্টেট বিজনেস অনেকটা ইনভেন্টের উপর নির্ভরশীল। আমার মতে, নিউইয়র্কের মতো চাহিদাসম্পন্ন শহরে এই ব্যবসা কোনভাবে ড্রপ করবে না। কারণ এখানে বসত বাড়ির চাহিদা বেশি, বাড়ির সংখ্যার চাইতে কেনার মানুষের সংখ্যা বেশি। ২০০৮ সালে রিয়েলএস্টেট ব্যবসায় ধ্বস নামলেও প্যামডামিকের সময় সেভাবে ড্রপ করেনি।'

ব‍্যক্তিগত ইন্সপেকশন প্রসঙ্গে দর্শকদের এক প্রশ্নের জবাবে মাসুম আহমদ বলেন, 'বাড়ি কেনার ক্ষেত্রে নিজে ইন্সপেকশন করতে পারবেন। কারো অফার গ্রহণের পর প্রথম কাজ হবে ইন্সপেকশন করানো। ইন্সপেকশনের পর রিপোর্ট ভালো করে রিভিউ করে রিয়েলএস্টেট এজেন্ট এবং এটর্নিকে পাঠাতে হবে। রিপোর্টের ভিত্তিতে বাড়ির কোন মেরামত প্রয়োজন হলে সেটা এজেন্টের সাথে সমঝোতায় আসা সম্ভব। সুতরাং নিজস্ব ইন্সপেকশন জরুরি, ব্যাংকের ইন্সপেকশন তারা পরেই  করবে।' 

দর্শকের পক্ষ থেকে ব্যাংক এপ্রেইসাল বিষয়ে তিনি বলেন, 'মূল্যের উপর ভিত্তি করে ব্যাংক এপ্রেইসাল করা হয়। আসলে আমরা বাড়ি কিনি না, ব্যাংকের সাথে ত্রিশ বছরের একটা বিজনেস করি আমরা। প্রাথমিক ভাবে আমাদেরকে ২০% ইনভেস্টমেন্ট করতে হয়, ব্যাংক দেয় বাকি ৮০%। ত্রিশ বছর ধরে ব্যাংকে এই টাকা ইন্টারেস্টসহ প্রদান করার চুক্তি হয় আমাদের। টাকা পুরো শোধ হবার পর আমরা বাড়ির মালিক হই। ৮০% ইনভেস্টমেন্টের পর ব্যাংক লাভবান হবে কিনা সেইজন্যেই এপ্রেইজাল করে।' 

ক্লোজিং সময়ে হোম ইনস‍্যুরেন্স যুক্ত করার ব‍্যাপারে মাসুম আহমদ বলেন, 'ক্লোজিং এর আগে অবশ্যই ইন্স্যুরেন্স যুক্ত করতে হবে। ইন্স্যুরেন্স দুই ভাবে যুক্ত করা যায়। যারা লোন করছে তারা সেই লোন নেবার জায়গা থেকেই ইন্স্যুরেন্স নিয়ে ক্লোজিং করতে পারবেন, এতে ঝামেলা কম হয়। পরে চাইলে ইন্স্যুরেন্স পরিবর্তন করে ভালো কোন ডিলে যাওয়া যায়।'

প্রয়জনীয় তথ্য প্রদানের মাধ্যমে সেদিনের অনুষ্ঠানটি শেষ হয়। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনায় ছিলেন ফরিদা ইয়াসমীন।  পরিচালনা ও কারিগরি সহযোগীতায় ছিলেন এইচ বি রিতা। প্রথম আলো উত্তর আমেরিকার "টক অফ দ্য উইক" অনুষ্ঠানটি প্রতি বৃহস্পতিবার নিউইয়র্ক সময় রাত নয়টায় ফেসবুক লাইভে প্রচারিত হয়।  

ফাউন্ডেশন  থেকে আরো পড়ুন