https://www.prothomalony.com/
11966
foundation
বড় বিচিত্র এই প্রবাসের জীবন। জীবন মৃত্যুর খেলাও এখানে বড় বিচিত্রভাবে আসে। আজকে যে আসে বুক ভরা স্বপ্ন নিয়ে কাল তাকেই মৃত্যুর হিমশীতল জগতে প্রবেশ করতে হয়। যে জীবন পলাশের- শিমুলের, যে জীবন কেটে যায় গ্রামের পথের ধুলোবালি মাখা বাতাসে আর ধানক্ষেতের সবুজ ঢেউ দেখে! সে জীবনটাকে আবার প্রবাসে এসে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে বরণ করতে হয় হিমশীতল ফিউনারেল হোমে। মৃত্যুবরণ করতে হয় নির্জন রিহাব সেন্টারে। এই অনিবার্য করুণ পরিণতি প্রবাসীরা চায় না। কিন্তু তারপরও জীবনের বাঁকে বাঁকে এসব আমাদের মানতে হয়। জীবনের তাগিদে অনেকেই আবার বেছে নেয় এমন কিছু কাজ, যা দেশে থাকতে আমরা কল্পনাও করি না। তারপরও হাসিমুখি করে যায় সব কাজ। প্রবাসে কাজ নিয়ে কারও ছোট বড় ভেদাভেদ নেই। দূর প্রবাসে থাকলেও দেশ সব সময় প্রবাসীদের মনের উপর আচঁড় কেটে যায়। এইসব হিসাব নিয়েই আমাদের উত্তরের জনপদ।
অন্তিম যাত্রা
বয়স্ক ভদ্রলোকের বয়স আর কত হবে? এই আশি ছুঁই ছুঁই। বড্ড শখ করে বড় ছেলের কাছে এসেছিলেন। আমাদের এক বন্ধুর বাবা উনি, আমরা যখন গত মার্চ মাসে উনার সাথে দেখা করতে যাই তখনও নিউইয়র্কে বেশ শীত। বাংলাদেশ থেকে নতুন এসেছেন বলে ওই শীত উনারা সহ্য করতে পারছিলেন না। গায়ে পরতে পরতে কাপড় পরেও ঠাণ্ডায় কাঁপছিলেন। গাছের শরবতী লেবু, নাড়ু আর কয়েক রকম আঁচার নিয়ে এসেছেন সাথে করে। জিজ্ঞাসা করলাম, "আমেরিকা কেমন লাগছে মেসো?"
চেহারায় অসন্তুষ্টি ফুটিয়ে উত্তর দিলেন, "একদমই ভালো না। এই শহরে সবাই যার যার ঘরে কাজে ব্যস্ত থাকে। কারো কাছে কোন সময় নাই। আমার মতো বুড়ো মানুষের জন্য এই শহর না।"
বুঝলাম বেশি বয়সের কারণে এখানের কোন চাকচিক্যই মেসোকে ছুঁতে পারছে না। আমেরিকার এই বন্দী জীবন উনি পছন্দ করেন নাই। সকাল ন'টার মধ্যেই ছেলে, ছেলের বউ বের হয়ে যায়। একমাত্র নাতি বের হয় আরো সকালে, তাঁর অফিস আবার নিউ জার্সিতে। তারপর থেকে সেই সন্ধ্যা পর্যন্ত একলা একলাই সময় কাটান উনি। উনার স্ত্রী সাথে থাকেন অবশ্য, কিন্তু তাঁরও বয়স হয়েছে। ছেলের সংসারের সবই অচেনা, অজানা। রান্নাঘরের ফ্রিজে কোথায় কি থাকে তা তাদের জানা নেই। ওভেন, মাইক্রোওভেন, হুভার কিভাবে চালায় তা উনারা জানেন না। কি দিয়ে কি রান্না হবে, কখন কোন বেলায় কি খাওয়া হবে সবই সকাল বেলা কাজে যাবার আগে ছেলের বউ বুঝিয়ে দিয়ে যায়। এরপর থেকে শুধু শুয়ে-বসা থাকা ছাড়া আর কোন কাজ থাকে না। মোবাইলে কতক্ষণ গল্প চলে চেনা পরিচিতদের সাথে। বাংলাদেশে রাত বাড়ার আগেই ছেলে-মেয়ে-পরিজনের সাথে কথা সেরে ফেলেন। আফসোসের স্বরে ওই একই কথা, "এদেশে কে থাকবে বলতো?"
উনি নারায়ণ চন্দ্র সাহা, কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলায় দীর্ঘ সময় ধরে পরিবার নিয়ে উনার বসবাস ছিল। বড় ছেলে কুড়ি বছরের উপরে হয়ে গেল দেশ ছেড়েছে। ছেলে তার পরিবার নিয়ে এখন থাকে নিউইয়র্ক শহরে। বাকি দুই সন্তান দেশেই থাকে। বড় ছেলের আবদারে অনিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও গ্রিনকার্ড নিয়ে এদেশে ঢুকেছিলেন দশ বছর আগে। ছেলের সে কি খুশি, প্রতি সপ্তাহান্তে এদিক ওদিক ঘুরতে নিয়ে যেত। হোয়াইট হাউজ, স্ট্যাচু অফ লিবার্টি, নায়াগ্রা ফলস, হারশি চকোলেট ফার্ম, মিউজিয়াম কতকিছুই তো ঘুরে ঘুরে দেখিয়েছে। কিন্তু তাতে নারায়ণ চন্দ্রের মন ভরেনি। উনার মন চান্দিনা গ্রামেই পড়ে থাকতো। বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে চলা বাটাখাসি নদীর কথা মনে পড়তো। বাটাখাসি নদীর পাশেই ছিল নারায়ণ চন্দ্রের আদিবাড়ি, সেখানে বড় হয়েছিলেন তিনি। নায়াগ্রা ফলসের বিপুল পানির সামনে দাঁড়িয়ে উনি বাটাখাসি নদীর কথা ভাবছিলেন। বর্ষাকালে কি প্রমত্ত ঢেউ থাকতো, ঢেউয়ের মাথায় সাঁতার সাঁতরেই ছোটবেলা কেটেছিল নারায়ণ চন্দ্রের।
ছয়মাস যেতে না যেতেই উনি বায়না ধরলেন ছেলের কাছে, "বাবা, আমাকে দেশে পাঠিয়ে দে। এখানে ভালো লাগে না, মন টেকে না।"
শত অনুরোধ উপেক্ষা করে গ্রিনকার্ডের শর্ত না মেনে একদিন দেশেই ফিরে গেলেন নারায়ণ চন্দ্র। তবে তার অদৃষ্টে লেখা ছিল উল্টো কাহিনী। বছর খানেক আগে নারায়ণ চন্দ্র অসুখে পড়লেন। সব শুনে বড় ছেলে আবারো আমেরিকায় আনার প্ল্যান করে ফেললো। এবারে বাধ্য হলেন নারায়ণ চন্দ্র ছেলের কাছে আসতে। শরীরে অসুখ বেঁধেছে, আগের মতো শক্তি আর সাহস পান না। তাই উচু গলায় ছেলেকে না করতে পারলেন না।
ডাক্তারের কাছে রেগুলার চেকআপে ধরা পড়ল নারায়ণ চন্দ্রের দুটো কিডনিই নষ্ট, আর বেশিদিন কাজ করবে না। ডাক্তার সাফ জানিয়ে দিল যে এক্কেবারে শেষ মুহূর্তে এসে পড়েছে রোগী। ডায়ালাইসিস চলতে লাগলো, সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার চান্স নেই খুব একটা। মাঝেমধ্যে বাড়ি গেলে আবারো ফিরে আসতে হয় রিহ্যাব সেন্টারে। এভাবেই পাঁচ মাস কেটে গেল।
রিহ্যাব সেন্টারে রোগীর বিছানার পায়ের দিকে ছোট্ট একটা জানালা। সেই দিকে অনবরত তাকিয়ে থাকেন নারায়ণ চন্দ্র। জানালার পিছনের আলো কখনো থাকে উজ্জ্বল, আবার কখনোবা নিকষ কালো। কত দিন-রাত-মাস কেটে গেল নারায়ণ তার হিসাব রাখতে পারেন না। তাঁর মন শুধু ঘুরপাক খেয়ে বেড়ায় বাটাখাসি নদী আর ঘুগড়ার বিলের পানিতে। এখন হয়তো সেখানে দিন, বাসার সামনের রাস্তায় মানুষের সরগরম চলাচল। বেলা বাড়ার সাথে ফেরিওয়ালার হাক-ডাক বেড়েছে। সবকিছুই ঠিকঠাক জায়গামতো আছে, শুধু নারায়ণ চন্দ্রই নেই ওখানে।
তাদের অফিস বারান্দার বিল্ডিংয়ের সামনে এতোক্ষণে লোকজন জড় হয়ে হয়তোবা চা খাচ্ছে, রাজনীতির আড্ডা হচ্ছে। সব দৃশ্য চোখের সামনে ভাসলেও নারায়ণ তার কিছুই ছুঁতে পারছেন না। গ্রামে তাদের ধান-চালের ব্যবসা ছিল, দুই ছেলেকে ঢাকায় রেখে পড়ালেখা করিয়েছেন। একমাত্র মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। স্ত্রীকে নিয়ে বেশ দিন কাটাচ্ছিলেন হেসে খেলে। সৃষ্টিকর্তা তার সুখ বেশিদিন স্থায়ী করলেন না। এই বিদেশি মাটিতে এনে ফেললেন, এখানে আলো, বাতাস, আকাশ, খাবার কিছুই ভালো লাগে না। রিহ্যাব সেন্টারে সুন্দর পরিপাটি পোশাক পরিহিত নার্স তদারকি করে, তাদের কেউ চেনা মুখ না। বেসুরা ইংরেজী ভাষায় তারা কথা বলে, নারায়ণ কিচ্ছু বোঝেন না। প্রতিদিন বিকালে তাঁর স্ত্রী আসেন, বড় ছেলে রাতে এসে মাকে সাথে করে বাড়ি ফিরে যায়। রাতে নারায়ণের একবিন্দু ঘুম হয় না। পানিতে ফুলে থাকা শরীরে অসহ্য যন্ত্রণা করে।
নারায়ণ চন্দ্র কিন্তু ফিরতে পারলেন না। জীবনের কাছে ফেরা হল না তাঁর। বৃষ্টি মুখরিত ডিসেম্বরের এক ভোরে তিনি অমর্ত্যলোকে যাত্রা শুরু করলেন। অন্তিম যাত্রার উদ্দেশ্যে তার দেহ রাখা হয়েছিল ফিউন্যারেল হোমে, সপ্তাহের মাঝখানে হলেও প্রচুর মানুষ দেখতে এসেছিল। বড় ছেলে আনুষ্ঠানিকতায় ব্যস্ত, সামনের চেয়ারে নারায়ণ চন্দ্রের স্ত্রী বজ্রাহতের মতো বসে ছিলেন। হাতে সেলফোন ধরা, ভিডিও কলের মাধ্যমে দুই ছেলে-মেয়ে দেশ থেকে বাবার অন্তিম যাত্রা দেখছে। নারায়ণ চন্দ্রের স্ত্রীর একটাই কথা, "আমি তো দুইটা টিকিট কেটে আমেরিকায় আসলাম, এখন একলা ফিরবো কিভাবে?"
বাইরে তখন বৃষ্টি আরো ঘন হয়ে পড়ছিল, এই বৃষ্টিতে শীত আরো বাড়ে। মানুষের জীবন বড় অদ্ভুত, কোন দেশে তার দেহ জন্মাবে আর কোন দেশে দেহবসান হবে তার উত্তর জানা নেই।
এক অস্থির সময়ের কথা
এই জনপদের মানুষের মনে এখন অস্থিরতা। যেমন অস্থিরতা চলছে আমেরিকানদের তেমনি চলছে আমেরিকান বাংলাদেশিদের। বর্তমানে অস্থিরতা আর্থ-সামাজিক এবং রাজনৈতিক। রাজনীতির এই অস্থিরতা শুরু হয়েছে এবছরের জুলাই থেকে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেখ হাসিনার বিদায়। ১৫ বছরের শাসনের পর হাসিনা ছাত্র -জনতার অসহযোগ আন্দোলনের প্রেক্ষিতে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। এরপর থেকে মানুষের মনে চলছে আশা নিরাশার দ্বন্দ্ব সংঘাত। দেশ থেকে অনেক দূরে সুদূর এই প্রবাসে থেকেও মানুষ দেশের এই পরিবর্তনের পক্ষে বিপক্ষে মত দিয়েছেন। মত দিতে গিয়ে প্রবাসের মানুষেরা দ্বিখন্ডিত হয়েছেন। কখনো মতবিরোধ এত কঠিন এবং প্রকট হয়েছে যে সামাজিকভাবে একজন আরেকজনের মুখ দেখা বন্ধ করেছেন। চায়ের আড্ডায় তুমুল হয়েছে রাজনীতি। আবার আমেরিকার নির্বাচন নিয়েও চলেছে মতবিরোধ, আলোচনা-সমালোচনা। অনেকেই আছেন ট্রাম্পের রাজনীতি পছন্দ করছেন না। আবার অনেকে গভীর আশায় বুক বাঁধছেন ট্রাম্পকে নিয়ে।
নিউইয়র্কে বাংলাদেশিদের তীর্থস্থান জ্যাকহন হাইটস। এখানে বাঙালিরা আসেন; বাজার করেন, ব্যবসা করেন। প্রচুর বাংলাদেশি রেস্টুরেন্ট আছে এখানে। বাঙ্গালিরা এসব রেস্টুরেন্টে আসেন, বসেন রাজনীতির আলোচনায় টেবিল গরম করেন। ফুটপাতে বসে প্রচুর বাঙালিরা ব্যবসা করছেন। তাদের সাথে কথা বললে জানা যায় দেশের এবং প্রবাসের তাদের চিন্তা ভাবনা এবং তাদের অবস্থানগত সমস্যা ও আশা- নিরাশা কাহিনী।
এই জনপদের প্রতিনিধি কথা বলেন ফুটপাতে কর্মরত কিছু মানুষের সাথে। যারা সকালে আসেন ফুটপাতে দোকান সাজিয়ে বসেন। আবার সন্ধ্যা নামলেই ফিরে যান ঘরে। মাঝের দীর্ঘ একটা সময় ব্যস্ত থাকেন বেচাকেনায়। এরা মূলত শ্রমজীবী মানুষ। এদের অধিকাংশই একটু বয়স্ক। জিজ্ঞেস করলেই জানা যায় ছেলে অথবা মেয়ে তাদেরকে নিয়ে এসেছেন। সংসারের প্রয়োজনে কারণে তারা এ কাজে ব্যস্ত রাখছেন নিজেদেরকে।
সাম্প্রতিক বাংলাদেশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনে তাদের ভেতর মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। কেউ বলেন দেশটা শেষ করে দিয়ে গেছেন হাসিনা। কেউ বলেন ভালোই তো ছিলাম। এসব পরিবর্তনের কারণে আমাদের কতজনের চাকরি নাই, কতজন দেশ ছেড়ে বিদেশে পালায় গেছে এটা আমাদের ভালো লাগে না।
আবার অনেকেই চিন্তিত আছেন ট্রাম্পের ক্ষমতায় আসা নিয়ে। এমনই একজন বললেন, ছেলে মেয়ের জন্য আমি আবেদন করেছি। এখন ট্রাম্প যদি ঝামেলা করে তাহলে ওদের আসতে অনেক দেরি হবে। আবার কেউ আছেন কাগজ নাই। তারা চিন্তায় আছেন ট্রাম্প তাদেরকে আমেরিকা থেকে বের করে দিবে কিনা। কি হবে সংসারের? খেটে খাওয়া গরিব মানুষ। দেশেও কিছু নাই এ দেশেও কিছু জমা করতে পারেননি। কি হবে তাদের? এমনই চিন্তা ভাবনায় ছেয়ে আছে তাদের মন। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম আকাশচুম্বী। ঘর ভাড়াও আকাশছোঁয়া। সবকিছু মিটিয়ে তারা কোনরকম দিন গুজরান করছেন। দেশে ফেলে আসা স্বজনদেরকে সেভাবে সাহায্য করতে পারছেন না।
বাঙালি পরিচালিত অনেক শাড়ির দোকান এবং কাপড়ের দোকান জ্যাকসন হাইটসে আছে। এখানে যারা কাজ করেন তারা মূলত মহিলা। এরকমই একজন মহিলার সাথে আলাপ হলো। উনি জানালেন বিক্রি আগের চাইতে অনেক কমে গেছে। কেন কমে গেছে জানতে চাইলে বলেন মূলত অর্থনৈতিক টানাপোড়েন এর জন্য দায়ী। মানুষের বেতন বাড়েনি কিন্তু জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে, ঘর ভাড়া বেড়েছে।
এসবের মাঝেই আবার দেখা যাচ্ছে এখানে স্লোগান চলছে, মিটিং চলছে। কেউ জয় বাংলা ধ্বনিতে মুখরিত করছেন, কেউ বাংলাদেশ জিন্দাবাদ ধ্বনিতে মুখরিত করছেন। আবার কাউকে দেখা যাবে লাল সবুজ শাড়ি পরে, কপালে লাল টিপ, খোপায় বেলি ফুলের মালা গুজে গান গাইছেন "আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি।"
এভাবেই চলছে বিদেশের মাটিতে আমাদের বাঙালি সমাজ। তারা ভালো থাকুক, বেঁচে থাকুক সুন্দরভাবে। জনপদের পক্ষ থেকে এই আমাদের কামনা।
ফাউন্ডেশন থেকে আরো পড়ুন