https://www.prothomalony.com/

7764

foundation

ফাউন্ডেশন 

টক অফ দ্যা উইক-- যুদ্ধের অভিজ্ঞতায় আছে বিজয়ের আনন্দ, পরাজয়ের গ্লানি, হত্যা, প্রতিশোধ, বিশ্বাসঘাতকতা- ড. নুরুন নবী

প্রকাশ: ১৮ ডিসেম্বর ২০২৩ ১৩:৫৮

যুদ্ধ রোমান্টিক কোন ব্যাপার না। এতে আছে বিজয়ের আনন্দ, পরাজয়ের গ্লানি, হত্যা, প্রতিশোধ, বিশ্বাসঘাতকতা; সবকিছু মিলিয়েই যুদ্ধের অভিজ্ঞতা রয়েছে। আমরা জানি বাংলাদেশ এমনি স্বাধীন হয়নি। এই স্বাধীনতার জন্য বিশ্বের অন্য কোনো জাতি এতো ত্যাগ স্বীকার করেনি। রক্তের বিনিময়ে এ দেশ আমরা পেয়েছি এবং এটা সম্ভব হয়েছিল কারণ বঙ্গবন্ধু আমাদের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন, আমাদের একত্রিত করেছিলেন। আমরা যারা যুদ্ধ করেছি, এ মাসে তাদের অনুভূতি অন্যদের থেকে একটু বেশিই হবে।- বিজয়ের মাসে নিজ অনুভূতি নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ড. নুরুন নবী। 

স্বাধীন বাংলাদেশের ৫২ বছর পেরিয়ে ৫৩তে পদার্পণের দিন ১৬ ডিসেম্বর, মহান বিজয় দিবস। এক অবিস্মরণীয় বীরত্বগাথা গৌরবময় দিন। দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তি সংগ্রামের মাধ্যমে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর শোষণ বঞ্চনার অবসান ঘটিয়ে মুক্তিকামী মানুষ ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর অর্জন করেছিল বিজয়। গণতন্ত্রের চেতনা স্বাধীনতা অর্জনের মাধ্যমে পূর্ণতা পেয়েছিল এ দিনে। অগণিত মানুষের আত্মত্যাগ আর সীমাহীন কষ্টের প্রহর কেটে নতুন সূর্যোদয় ঘটেছিল ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর। এই দিনকে সামনে রেখে গত ১৪ই ডিসেম্বর প্রথম আলো উত্তর আমেরিকার জনপ্রিয় সাপ্তাহিক সম্প্রচার "টক অফ দ্য উইক" অনুষ্ঠানে  উপস্থিত ছিলেন বরেণ্য এ অতিথি-ড.নুরুন নবী। 

ড.নুরুন নবী, ভাষা ও সাহিত্যের জন্য একুশে পদক পেয়েছেন। শুধু উত্তর আমেরিকায় নয়, সারা বিশ্বের অগ্রসর স্বদেশীর কাছে পরিচিত ও শ্রদ্ধেয় নাম ড. নুরুন নবী। নিউজার্সির প্লেন্সবরো টাউনশিপ কাউন্সিলে বারবার নির্বাচিত হয়ে আসছেন তিনি। দেশের জন্য যুদ্ধ করে বিজয় অর্জন করা ড.নুরুন নবী-এ প্রজন্মের উজ্জ্বল প্রতিনিধি। দীর্ঘদিন আমেরিকা বাস করছেন তিনি। "টক অফ দ্য উইক" অনুষ্ঠানে ডঃ নুরুন নবী কথা বলেছেন মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতা ও বিজয়ের গল্প নিয়ে। শুরুতেই জাতির জনক বাঙালির মহান নেতা বঙ্গবন্ধু সহ, দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করা পূর্বসূরীদের শ্রদ্ধা জানান তিনি। 

ড. নুরুন নবীর কাছে '৭১-এর অভিজ্ঞতা নিয়ে জানতে চান রোকেয়া দীপা। তিনি বলেন, 'ছাত্র জীবন থেকে পূর্ব আর পশ্চিম পাকিস্তানের যে বৈষম্য ছিল যা আমি দেখতে পাচ্ছিলাম, জানতে পারছিলাম, তখন মনে হতো একজন নেতা দরকার যে পাকিস্তানিদের শাসন আর শোষণ থেকে আমাদের মুক্তি দিবে। সূর্য যেমন জীবনীশক্তি সমগ্র জীবকুলের জন্য, একজন নেতাও তেমনি একটি জাতির জীবনীশক্তি। বাঙালির নেতা শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন বাঙালিদের সেই জীবনীশক্তি। আর একজন মানুষ বীর হয়ে উঠে বিশ্বাস ও শক্তির বলে।' 

বীর মুক্তিযোদ্ধা ড.নুরুন নবী, যিনি ১৯৬৬-এ ময়মনসিং এ  প্রথম দেখেন বঙ্গবন্ধুকে, তখনই বঙ্গবন্ধুকে নেতা হিসাবে নির্বাচন করে নেন এবং তিনি বিশ্বাস করেছিলেন যে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই বাঙালির মুক্তির পথ প্রদর্শক। সে বিশ্বাস থেকেই তার রাজনৈতিক চিন্তাধারা, নীতি নৈতিকতার অগ্রযাত্রা শেখ মুজিবুর রহমান এর আদর্শকে ঘিরে। 

তিনি বলেন, 'ইতিহাসের পর্যায় সারণীতে প্রথম সারিতে জায়গাপ্রাপ্ত স্বর্ণাক্ষরে  লিখা নাম-শেখ মুজিবুর রহমান! যার ডাকে, মুক্তির লক্ষ্যে লাখ লাখ বাঙালি ঝাপিয়ে পড়েছিল স্বাধীনতা যুদ্ধে। বঙ্গবন্ধু যে বিশ্বাসের বীজ ছয় দফায় বুনে গিয়েছেন, অঙ্কুরিত সেই বীজে ৭ই মার্চ এর ভাষণ, ধারালো কাচির অগ্রভাগ যে আগুনে পুড়িয়ে তপ্ত করে উজ্জ্বল করা হয়, তিনি সে আগুন দিয়ে গিয়েছেন সেদিন বাঙালিদের মনে, বিশেষ করে ছাত্র সমাজের ভেতর সে আগুন খুব তীব্রভাবে আকর্ষণ করেছিল।'  তারই ফলাফলে ২৫শে মার্চ সন্ধ্যার পর যুবক নুরুন নবী সহ গোটা পঞ্চাশের মতো ছাত্র পাকিস্তানি আর্মির গাড়ি আটকে দিতে উদ্ধত হয়। এবং পাকিস্তানি আর্মিদের কালো নকশার প্রথম ধ্বংসলীলার শুরুটা তাদের তাজা প্রাণ কেড়ে নেওয়ার মাধ্যমেই শুরু হয়। সে যাত্রায় ড.নুরুন নবী ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান, কিন্তু তার ভেতরের প্রাণশক্তিতে তখন ৭ই মার্চের ভাষণের সূর্যরশ্মি। তিনি ফিরে যান নিজ গ্রাম টাঙ্গাইলে। গড়ে তোলেন মুক্তি বাহিনী, একে একে জমা হয় আরো কিছু সাহসী যুবক, যাদের বুকে ছিল মুক্তির আগুন।  

এর পর তারা যুক্ত হয় কাদের সিদ্দিকীর সাথে, শুরু করে অভ্যন্তরীণ যুদ্ধ। এরমধ্যে  ড. নুরুন নবীর উপর দায়িত্ব পড়ে ভারত গিয়ে অস্ত্র আনার। জীবনের পরোয়া না করে নৌকায় করে নদীপথ আর কিছুটা স্থলপথ পেরিয়ে ভারতে পৌঁছেন ড. নুরুন নবী সহ কয়েকজন তরুণ। ভারতীয় সীমান্তরক্ষীদের সাথে আলোচনা করে ছয় নৌকা বহর অস্ত্র নিয়ে পৌঁছান টাঙ্গাইলে। তাদের মুষ্টি আরো শক্ত হয়ে উঠে, বিশ্বাসে আসে আরো দৃঢ়তা। ভারত থেকে আনা তার অত্যাধুনিক  অস্ত্র ব্যবহার করে মুক্তিযোদ্ধারা ধংস করে পাকিস্তানের ৬টি অস্ত্র বোঝাই জাহাজ। ছিদ্র করে দেয় পাক হানাদার বাহিনীদের বুক। একে একে তারা চালাতে থাকে গোপন অপারেশন গুঁড়িয়ে দিতে থাকে শত্রুদের ঘাঁটি। 

এর মধ্যে ড.নুরুন নবী হারিয়েছেন অনেক বন্ধু, সহকর্মী যোদ্ধা। তবুও তারা একটুও পিছপা হননি সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথে। বুকে ছিল বঙ্গবন্ধুর বোনা বীজ মুক্তির সংগ্রাম আর ছিল বিশ্বাস। দীর্ঘ ৯ মাস পরে যখন শুনতে পান পাকিস্তানিরা আত্মসমর্পণ করেছে, তারা ফাঁকা গুলি ছুড়ে মুক্তি উদাযাপন করেন।

যুদ্ধ শেষে যেদিন বিজয়ের পতাকা উড়েছিল, সেই বিজয়ের দিনের কথা শুনতে চাইলে নুরুন নবী বলেন, 'এ মুক্তি আনন্দের, এ মুক্তি নিজের মায়ের কোল রক্ষার। এ মুক্তি বিশ্বাসের। কৃতজ্ঞতা জানাই সকল মুক্তিযোদ্ধাদের, দোয়ায় রাখি সকল শহীদদের, যাদের বুকের তাজা সাহস ও তাজা রক্তের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি স্বাধীন বাংলাদেশ।' 

সেদিনের অনুষ্ঠানে দর্শকদের অনেক প্রশ্ন ছিল। এইচ বি রিতা দর্শকদের কিছু প্রশ্ন নিয়ে উপস্থিত হোন, বিভিন্ন মন্তব্য পড়ে শোনান। সবাই এই বরেণ্য মুক্তিযোদ্ধা ড. নুরুন নবীর প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানান। অনুষ্ঠানটির সঞ্চালনায় ছিলেন রোকেয়া দীপা এবং কারিগরি সহযোগিতায় এইচ বি রিতা। প্রথম আলো উত্তর আমেরিকার "টক অফ দ্য উইক" অনুষ্ঠানটি প্রতি বৃহস্পতিবার নিউইয়র্ক সময় রাত নয়টায় ফেসবুক পেইজে সরাসরি লাইভে সম্প্রচারিত হয়ে থাকে।

ফাউন্ডেশন  থেকে আরো পড়ুন