https://www.prothomalony.com/

6111

opinion

অভিমত

ছোট হয়ে আসছে দুর্নীতিবাজদের পৃথিবী, পালাচ্ছে তারা

প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৩ ১১:২০

প্রথম আলোর একটি প্রতিবেদন নিয়ে আলাপ শুরু করি। 'সিঙ্গাপুর থেকে কেন অর্থ পাচারকারীরা চলে যাচ্ছেন', এমন শিরোনামে প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়েছে। সিঙ্গাপুর অর্থ পাচারকারীদের জন্য একটি নিরাপদ দেশ ছিলো। বিশ্বের যত দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদ, আমলা, চোর-ডাকাতদের অর্থ লুকানোর তীর্থক্ষেত্র ছিলো সিঙ্গাপুর। কিন্তু এখন সেই সিঙ্গাপুরও বিরূপ আচরণ করছে এসব চোর-ডাকাতদের সাথে। অভিযান চলছে অবৈধ অর্থ-সম্পদের বিরুদ্ধে। ফলে চোরেরা পালাচ্ছে সিঙ্গাপুর থেকে। 

কিন্তু এখানেই শেষ নয়। এই প্রতিবেদনের মূল ব্যাপারটি রয়েছে আরো পরে, যেখানে উপশিরোনাম করা হয়েছে, 'কেন সিঙ্গাপুর কঠোর হচ্ছে'। এই প্রশ্নের মধ্যেই রয়েছে অনেক জবাব, যে জবাবে আমাদের দেশের অর্থ পাচারকারীদের জন্যও সতর্কবার্তা রয়েছে। প্রথম আলো বলছে, 'অর্থের অবৈধ ব্যবহার সারা বিশ্বের জন্যই বড় মাথাব্যথা। জাতিসংঘের হিসাবে বিশ্বে অবৈধ অর্থপ্রবাহের পরিমাণ আট শ বিলিয়ন থেকে দুই ট্রিলিয়ন ডলার, যা বিশ্বের মোট জাতীয় উৎপাদনের (জিডিপি) ২ থেকে ৫ শতাংশ।' আর আমাদের দেশের পাচারকৃত অর্থের যে পরিমাণ শোনা যায় তা জিডিপি'র কত অংশ সেটা বের করাও কঠিন কিছু নয়। আর যা বেরুবে তা আমাদের অর্থনীতির জন্য নিশ্চিত সুখকর নয়। সুখকর নয় সারা বিশ্বের কাছেও কারণ, একটি গোষ্ঠীর কাছে সম্পদের বিশাল অংশ এবং যা অবৈধ তাকুক্ষিগত থাকার ফলে বিশ্ব অর্থনীতি তার ভারসাম্য হারাচ্ছে। সুষম বন্টন হচ্ছে না কোন কিছুরই এবং এর জন্য দায়ী দুর্নীতিবাজ তথা চোরেরা। এরমধ্যে আমাদের দেশের চোরেরাও রয়েছেন। এরা সিদ্দিক চোরা নয় যে বলবে, 'ভুল হইয়া গ্যাছে ক্ষমা কইরা দেন'। 

যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে আমাদের দেশে অনেক কথা হয়। কেন ‍যুক্তরাষ্ট্র এত খড়গহস্ত তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। বলি শোনেন। প্রথম আলো'র প্রতিবেদন থেকেই বলি, বারাক ওবামা ২০১০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের জন্য একটি আইন করেন, যে আইনে শুধু দেশের ব্যাংকে নয় বিদেশের ব্যাংকে জমা অর্থ-সম্পদের হিসেব দিতে হয় যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের। শুধু তাই নয় বিদেশী ব্যাংকগুলোও মার্কিন নাগরিকদের ব্যাংক হিসেব দিতে বাধ্য থাকবে এই আইনের আওতায়। 'ফরেন অ্যাকাউন্ট ট্যাক্স কমপ্লায়েন্স অ্যাক্ট (এফএটিসিএ)' নামের এই আইনের মাধ্যমে দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধটা ঘোষণা করে গিয়েছিলেন বারাক ওমাবা। ২০১৪ সাল থেকে জি-২০ ও ওইসিডি'র সাথে যুক্ত দেশগুলোও ওবামার নীতি তথা মার্কিন নীতি অনুসরণ করা শুরু করে। নিজেদের মধ্যে এ ব্যাপারে তথ্য-আদান প্রদানের একটি প্রক্রিয়া গড়ে তোলে। সুতরাং যারা বলেন, যুক্তরাষ্ট্র কেন আমাদের নিয়ে মাথা ঘামায়, তাদের কাছে প্রশ্ন করি, আমাদের দেশ থেকে লক্ষ কোটি টাকা কি পাচার হয়ে যায়নি? খোদ সরকার পাচারকৃত টাকা দেশে ফিরিয়ে আনার তাগিদ দিচ্ছে। সরকারই স্বীকার করে নিয়েছে যে, টাকা পাচার হয়েছে। এটা কি দুর্নীতি নয়? এই টাকাগুলো দুর্নীতিলব্ধ নয়? তাহলে কেন যুক্তরাষ্ট্র মাথা ঘামাবে না? এই মাথা ঘামানোর ফলে সুইস ব্যাংকগুলো কিছুটা হলেও তথ্য দিতে বাধ্য হচ্ছে। না হলে আমরা জানতাম কোথা থেকে যে এক বছরেই দশ হাজার কোটি টাকা সুইস ব্যাংক থেকে তুলে নিয়েছে বাংলাদেশী চোরেরা। 

প্রতিটি দেশই নিজের স্বার্থে অন্য দেশের ব্যাপারে নাক গলায়। যেমন ভারতের একটি বার্তা নিয়ে কথা হচ্ছে। ভারত বর্তমান সরকার প্রধানকে দুর্বল না করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে বলেছে, বার্তাটি এমন। এর সত্যতা বিষয়ে স্বীকার বা অস্বীকার কোনটাই করেনি ভারত। আমাদের সরকারের এক দায়িত্বশীল বলেছেন, ভারত তার নিজের স্বার্থেই একথা বলেছে। একদম ঠিক। প্রতিটি দেশই নিজের স্বার্থ চিন্তা করেই সবকিছু করে। অ্যামেরিকা বাংলাদেশে যা করছে তা নিজের স্বার্থ চিন্তা করেই। তবে ভারতের স্বার্থের সাথে তাদের স্বার্থের ফারাকটা হলো, তারা তাদের রাষ্ট্রীয় নীতির বাস্তবায়ন ঘটাতে চায় আর ভারত সরকার দলীয় নীতির। কারণ ভারতের বর্তমান যে রাজনৈতিক অবস্থা তাতে বাংলাদেশের জনগণের বিশাল অংশের চাওয়ার বিরুদ্ধে সর্বমতের রাষ্ট্রীয় ঐক্য হওয়া সম্ভব নয়। যেটা ভারতের শাসকদল বিজেপি'র সাথে হওয়া সম্ভব। 

নির্বাচনের ব্যাপারে আসি। যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে এবং ভিসানীতি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশের নির্বাচনকে সামনে রেখে। যুক্তরাষ্ট্র যে সব দেশের নির্বাচন নিয়ে কথা বলেছে, নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে, সেখানে সত্যিকার অর্থেই কি ভালো নির্বাচন হয়েছে? কম্বোডিয়া থেকে বেলারুশ, সবখানেই নির্বাচনের নামে প্রহসন হয়েছে। আমাদের দুটো নির্বাচন নিয়েও কথা রয়েছে। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া তার একটি উদাহরণ। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় যখন ১৫৩ সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তখন কথা ওঠা স্বাভাবিক। এই স্বাভাবিকতাকে অস্বীকার করার কোনো শক্ত যুক্তি নেই। যেমন বিএনপি সরকারের সময় ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে প্রহসনের নির্বাচন বলা হয়। কিন্তু সেই নির্বাচনকেও জাস্টিফাই করার রাস্তা রয়েছে। কারণ সেই নির্বাচনের পর সংসদের মূল কাজই ছিলো তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠা করা। তারপরেই সংসদ বিলুপ্ত হয়েছে। সেই সংসদকে ধরে রেখে সে সময়ের সরকার পাঁচ বছর টেনে নিয়ে যায়নি। 

যুক্তরাষ্ট্র নির্বাচনের ব্যাপারে মাথা ঘামাচ্ছে এটা বাংলাদেশের জন্য সত্যিকার অর্থেই স্বস্তিদায়ক নয়। কিন্তু এছাড়া আর কোনো উপায় আছে কি একটা অন্তর্ভূক্তিমূলক সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য? যারা এতে আপত্তি জানান, তারা কি নিশ্চয়তা দিতে পারবেন এমন একটা নির্বাচনের? পারবেন না, পরিবেশ এমন নির্বাচনের সহায়ক নয়। যুক্তরাষ্ট্রের অন্য স্বার্থ অবশ্যই রয়েছে। যারমধ্যে দুর্নীতিবাজদের অর্থ পাচার। যা বিশ্বের অর্থনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট করছে। এটাও তাদের রাষ্ট্রীয় স্বার্থ। কারণ বিশ্বের অর্থনীতিকে শাসন করা দেশ হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। রয়েছে নিজেদের প্রভাবের স্বার্থও। যেমন ভারতের অনেক বড় স্বার্থ রয়েছে বাংলাদেশে। ভারত মূলত একটি ইউনিয়ন। বলতে পারেন সোভিয়েতের মত। ভারত ১৯৪৭ এর আগে কখনোই একটি এককরাষ্ট্র ছিলো না। আমরা যাকে ভারতবর্ষ বলে উল্লেখ করি, ১৯৪৭ এর আগে মূলত তা কোনো একক সত্তা ছিলো না। অনেকগুলো রাজ্য তা স্বাধীন বা করদ হোক সব মিলিয়েই ইংরেজদের শাসনে ছিলো। স্বাধীন রাজ্যগুলোরও ইংরেজদের কর দিতে হতো। এই যে আমরা বলি, বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজদ্দৌলার কথা, সেটাই প্রমাণ করে, ভারতবর্ষ কোনো একক সত্তা নয়, ছিলো না। শুধুমাত্র ইংরেজরা এই ভূখণ্ড ছেড়ে যাবার পর ভারত-পাকিস্তান দুটি একক স্বতন্ত্র সত্তারূপে প্রকাশিত হয়। এদিক দিয়ে ইংরেজদের গালি'র সাথে সাথে ধন্যবাদও দিতে হয় বর্তমানের একক ভারত যা ইন্ডিয়া হয়ে উঠেছে তার অধিবাসীদের। অবশ্য ১৯৪৭ এর পরেও সিকিম, হায়দ্রাবাদ ইত্যাদি স্বাধীন রাজ্যের অস্তিত্ব ছিলো। লেন্দুপ দর্জির লোলুপতার কথা তো আমরা জানিই। জানি কীভাবে সাম্রাজ্যবাদ স্বাধীন দেশ হায়দ্রাবাদকে অঙ্গীভূত করেছিলো। অন্য সাম্রাজ্যবাদের সাথে এই সাম্রাজ্যবাদের খুব কি পার্থক্য রয়েছে? সাম্রাজ্যবাদের ভয় থাকে নিজ সাম্রাজ্য বিলুপ্তির। বাংলাদেশ দাঁড়িয়ে গেলে অন্যদের জন্য 'আইডল' হতে পারে। 

যাকগে, শিবের গীত বাদ। আসি দুর্নীতিবাজদের কথায়, চোরদের কথায়। যারা দেশ থেকে দুর্নীতির মাধ্যমে উপার্জিত অর্থ মূলত সিঙ্গাপুর, দুবাই, সুইটজারল্যান্ডের মতন দেশগুলোর ব্যাংকে জমা করেন। অনেকেই মলোয়েশিয়াতেও জমা করতেন। কিন্তু মালোয়েশিয়ার রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে সাড়ে চার'শ কোটি ডলার হাওয়া হয়ে যাওয়ার পর মালোয়েশিয়া কিছুটা সতর্ক হয়ে ওঠে। সেই হাওয়া হয়ে যাওয়া অর্থের একটা ভাগ ওঠে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাকের ওয়ালেটেও। এই কেলেঙ্কারির ঘটনা উদঘাটন করে দেশটির গণমাধ্যম। মূলত গণমাধ্যমের কাজই তাই। যখন খোদ গণমাধ্যমই দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে, তখন সম্ভাবনার প্রায় অনেকটাই তিরোহিত হয়। যখন গণমাধ্যমকর্মীরা অর্থ-সম্পদের কাছে বিক্রি হয়ে যান, তখন মানুষের সর্বশেষ রাস্তার একটি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর খোলা থাকে বিচার-বিভাগ। সে নিয়ে আর না বলি, বলাটা বিপজ্জনক বলে। মালোয়েশিয়া ও তার জনগণ রক্ষা পেয়েছে গণমাধ্যম এবং বিচার-বিভাগ দুটো পথই তাদের সমুখে খোলা ছিলো বলে। 

মালোয়েশিয়ার মতন সিঙ্গাপুরও নিজেদের বাঁচাবার চেষ্টা করছে। আরও কঠোর ও কঠিন আইন করছে সিঙ্গাপুর। জাল তথ্য ও কাগজপত্র দিয়ে সিঙ্গাপুরের ব্যাংকে দুর্নীতিলব্ধ পাচারকরা অর্থ জমানোর দিন শেষ হয়ে আসছে। তাই পাচারকারীরা সিঙ্গাপুর থেকে পালাচ্ছে। যেমন পালাচ্ছে সুইটজারল্যান্ড থেকে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে তো আমাদের দেশের অনেক পাচারকারী ইতোমধ্যে পাততাড়ি গুটিয়েছেন। সবকিছুই যখন অতিরিক্ত হয়ে যায় তখন প্রকৃতিই প্রতিশোধ নিতে শুরু করে। এই যে গুটিকয়েক মানুষের হাতে বিশ্বের সম্পদের মূল অংশ, তাতে অর্থনৈতিক ভারসাম্য ভয়াবহ ভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। যার ফলে দেশগুলোর অর্থনৈতিক দুর্যোগ সামাল দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। যেটা উপলব্ধি করা গেছে করোনাকাল ও তার পরবর্তীতে। তাই বাধ্য হয়েই দেশগুলোকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হচ্ছে।পালাচ্ছে দুর্নীতিবাজরা। এটাও প্রকৃতির প্রতিশোধ। এই প্রতিশোধের হাত থেকে কারোরই নিস্তার নেই।

অভিমত থেকে আরো পড়ুন