https://www.prothomalony.com/

5834

opinion

অভিমত

মন কাঁদে

প্রকাশ: ৩১ জুলাই ২০২৩ ১১:০৬

প্রবাস কখনও হয় না দেশ। যতই বলি না কেন প্রবাসে আমরা ভাল আছি বেশ। প্রবাস একটা যান্ত্রিক জীবন। প্রায়ই ব্যস্ত থাকতে হয় কাজে। মন হুহু করে কাঁদে যখন মনে পড়ে প্রবাসীদের নিয়ে সেই গান (আবার তুমি আসবে দেশে আমায় কথা দাও)। প্রিয়তমার আকুতি চলে এসো আবার তাড়াতাড়ি। অথচ আমরা প্রবাসীরা কত ভালবাসার মানুষ দেশে রেখে  প্রবাস নামক জেলে পড়ে থাকি। ফোনে কথা বললে বাচ্চারা যখন কাঁদে আমরাও কেঁদে ফেলি। পরিবারের সাথে কথা বলতে বলতে হঠাৎ আর কথা বলে যায় না, নিশ্চুপ হয়ে যেতে হয়। হ্যালো হ্যালো বলি। ফোনে দীর্ঘ নিশ্বাসের শব্দ শোনা যায়।

কি সান্তনা দিব? বলার ভাষা হারিয়ে ফেলি। আমরা মাঝে মাঝে চুপ হয়ে বোবা কান্না কাঁদি। চোখে পানি টলমল করে। মনটা কত খারাপ থাকে। মুখের হাসি কোথায় যায় চলে? কাজে গেলেও চিন্তা করি, বাসায় আসলে আরো বেশি চিন্তা করি। চিন্তা না করলেও চিন্তা কোথায় থেকে চলে আসে? রাতে শুলে ধরে না ঘুম। কত রাত জেগে বসে থাকি। মাঝে মাঝে কেঁদে বালিশ ভিজিয়ে ফেলি। মন কেমন আনচান করে। অনেক সময় মাথায় হাত দিয়ে কত কিছু ভাবি। মনের দুঃখ ভুলে যাওয়ার জন্য গুণ গুণ করে গান করি। কত নাটক দেখি, কত সিনেমা দেখি । কোন কিছুই ভাল লাগে না। দেশের জন্য মন কাঁদে।

দেশের কোন খারাপ সঃবাদ শুনলে মন আরো বেশি কাঁদে।যদি শুনি দুর্ঘটনায় লোক মারা গেছে, বন্যায় দেশ ডুবে যাচ্ছে, খরায় দেশ পুড়ে যাচ্ছে, অতি বৃষ্টি বা অনাবৃষটি হচ্ছে, মানুষ অনেক কষ্টে আছে । আত্নীয় স্বজন কারো অসুখের কথা শুনলে বা কেউ মারা গেলে কত কাঁদি প্রবাসে বসে। বাবা মা'র কথা মনে পড়লে মন আরো বেশি কাঁদে। বাবা, মায়ের মৃত্যুর সংবাদ শুনলে মনে হয় কলিজা যাচ্ছে ফেঁটে। মন চায় এখনি টিকিট কেটে দেশে যাই চলে। চার দেওয়ালের মাঝখানে বসে হাউমাউ করে কাঁদি।

বিদেশে না আছে তেমন আপনজন। বিপদ আপদে সৃষ্টিকর্তা ছাড়া তেমন কাউকে পাওয়া যায় না। কত যে সৃষ্টিকর্তা কে ডাকি। বিদেশে নিজের সব কাজ নিজেই করতে হয়। ইচ্ছা হলেই কাজ থেকে ছুটি নেওয়া যায় না। অনেক সময় অসুস্হ শরীর নিয়েও কাজে যেতে হয়। কখন রাত যায় আর কখন দিন আসে বোঝা যায় না। কত প্রবাসী  কত অমানবিক পরিশ্রম করে। বিদেশে কেউ অসুস্হ হয়ে হাসপাতালে পরে থাকে। অনেকে লাশ হয়ে দেশে ফিরে। কত প্রবাসীর লাশ থাকে মর্গে পড়ে। কতজন আবার বিদেশে এসে জেলে থাকে পড়ে। দেশ থেকে প্রবাসের উদ্দেশ্য রওনা দিলে দেশের সব কিছু তাঁকিয়ে দেখে বারে বারে। তারা ভাবে আর কি ফিরে আসতে পারব দেশে। ফোনে কতজন কল দেয় কখন প্লেনে রওনা দেবে। প্রবাসীরা কথা বলার সময় মনের অগোচরে হাউমাউ করে ফেলে কেঁদে।

দেশের কত কিছুর কথা মনে পড়ে। দেশে রাস্তাঘাট, হাঁটবাজার, স্কুল কলেজ, মসজিদ, মাদ্রাসা আরো যে কতকিছু। দেশের মাটি কখনও ভোলা যায়? গানে বলে (এই দেশেতে জন্ম যেন এই দেশেতে মরি)। আমরা যারা প্রবাসী শারীরিক ভাবে বিদেশে থাকলেও মানসিকভাবে দেশে থাকি। দেশে যাওয়ার জন্য মনটা ব্যাকুল থাকে। অনেক সময় ছেলে মেয়ে জিজ্ঞাসা করে বাবা কবে আসবে দেশে?  তাদের কাছে বলি এই তো চলে আসবো। এভাবে কতবার যে বলি। মন কাঁদে। মাঝে মাঝে গা হাত পা থরথর করে কাঁপে। মুখের ভাষা যায় হারিয়ে। ধরাবাঁধা নিয়মের মধ্যে থাকতে থাকতে জীবনটা একঘেয়ে হয়ে যায়। ভালো খাবারও ভালো লাগে না। মনে হয় কলিজা ফেটে দীর্ঘ নিশ্বাস বের হচ্ছে। কাজে যাই মন খারাপ করে। হাসিখুশি যায় জীবন থেকে চলে। প্রবাসীরা অপরের কথা ভাবতে ভাবতে নিজের নিয়ে ভাবার আর সময় পায় না। নিজের শরীরের নিয়মিত যত্ন নিতে পারে না। মুখ রোদে পুড়ে কালো হয়ে যায়। কত দাগ মুখে পড়ে যায়। চিন্তা করতে করতে মাথার চুল পেকে যায়। শরীরে এক সময় অসুখ বিসুখ এসে বাসা বেঁধে ফেলে। স্মরণশক্তি লোভ পেতে থাকে । কর্মক্ষমতাও কমে যেতে থাকে। তারা কত বেদনাভরা জীবন নিয়ে প্রবাসে বাস করে।

এক সময় তাদের চাওয়া আর পাওয়ার কিছু থাকে না। বিদেশে দীর্ঘ সময় পার করে দেশে আসে ফিরে দেখে কতজন গেছে দুনিয়া ছেড়ে চলে। তারা অপরের জন্য নিজের জীবন বিলিয়ে দেয়। অনেক প্রবাসী তার কষ্টের উপার্জিত অর্থ আর ভোগ করতে পারে না। শেষ বয়সে যখন ভোগ করবে অসুস্হ হয়ে থাকে বেডে পড়ে থাকে।  সৃষ্টি কর্তাকে ডাকে আর কাঁদে হাউমাউ করে। 

অভিমত থেকে আরো পড়ুন