https://www.prothomalony.com/
5829
opinion
দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকা বাবা বা মা মারা গেলে সন্তানদের বলতে শুনেছি, ভালোই হয়েছে,কষ্ট পাচ্ছিলেন!' বাবা-মা'র মৃত্যুও তবে 'ভালো কিছু' হয় সন্তানদের কাছে। যদিও বেঁচে থাকার এবং বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করাই জীবধর্ম! আর এমন কথা শুনলে মনে হয় কষ্ট ছেলে মেয়েরাই পাচ্ছিল! হয়তোবা বৃদ্ধটি একটি ঘর দখল করে ছিলেন।পরিবারের অনেক ঝক্কি ছিল।অনেক খরচ হতো।
আর বৃদ্ধরা অনেক সময়ই নিজেরা বাঁচতে পারেন না, তাঁদের বাঁচিয়ে রাখতে হয়। সে দায়িত্ব প্রধানত পুত্র কন্যাদের ওপর বর্তায়।যেমন জন্মের পর শিশুকালে তাদের বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব ছিল বাবা-মা'র। তবে এমন পরিস্থিতির জন্য ব্যক্তি হিসেবে ছেলে মেয়েদের সম্পূর্ণ দায়ী করা সমীচীন হবে না। এরা আধুনিক হিংস্র সভ্যতার প্রসব করা ভোগবাদী সমাজের প্রডাক্ট।
অশক্ত বৃদ্ধ মানুষ প্রাচীনকাল থেকেই সমাজ সংসারের সমস্যা, বোঝা। বিভিন্ন সমাজ বিভিন্নভাবে এই সমস্যার সমাধান করতে চেয়েছে।অস্ট্রেলিয়ার একশ্রেনীর আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে সমাজ স্বীকৃত পদ্ধতি ছিল বৃদ্ধ পিতাকে মাথার পেছনে পাথর দিয়ে আঘাত করে হত্যা করবে পরিবারের জেষ্ঠ পুত্র। সিদ্ধান্তটা পরিবার থেকেই আসতো। মজার ব্যপার ঐ জনগোষ্ঠীই আবার বৃদ্ধা মা' কে হত্যা করতো না।
জাপানে এক জনগোষ্ঠী অথর্ব বৃদ্ধদের একটা ডোলায় করে সঙ্গে কিছু খাদ্য পানীয় দিয়ে দূরবর্তী পাহাড়ে রেখে আসতো।ভারতীয় উপমহাদেশে ধর্মীয় বিধানের মোড়কে বৃদ্ধদের বাণপ্রস্থ, সন্যাস গ্রহণে উৎসাহিত করা হতো। স্বেচ্ছায় বৃদ্ধরা সমাজ- সংসার ত্যাগ করতেন। উদ্দেশ্য একই, সংসারকে ভারমুক্ত করা।
বাংলাদেশে সামন্ততান্ত্রিক কৃষি নির্ভর অর্থনীতির কালে যৌথ পরিবার প্রথা প্রচলিত ছিল,পরিবারগুলোর টিকে থাকার প্রয়োজনেই। তখন পরিবারের গঠনে অনেক ধরনের মানুষ থাকতো পরিবারের অংশ হিসেবে। সে কারণে বৃদ্ধদের পরিবারের কাঠামোর ভেতরে ঠাঁই দেয়াটা সহজ ছিল।পরিচর্যা করার মানুষের অভাব হতো না। এখনকার আর্থসামাজিক অবস্থায় সেটির সুযোগ প্রায় নেই বললেই চলে।
আগে কখনো কোন বৃদ্ধাশ্রমে, বাংলাদেশে বা এদেশে যাইনি।এবার এক নিকটাত্মীয়কে দেখতে গেলাম নিউ ইয়র্কের এক নার্সিংহোমে। আত্মীয়টি গুরুতর অসুস্থ হয়ে দীর্ঘদিন হাসপাতালে ছিলেন।বর্তমানে ঠাঁই হয়েছে নার্সিংহোমে। না উনার পরিবার উনাকে পরিত্যাগ করেনি।উনার বর্তমানে যে শুশ্রূষা, চিকিৎসা প্রয়োজন সেটা কোনভাবেই বাসায় প্রদান করা সম্ভব নয়, প্রতিষ্ঠানিক সহায়তার প্রয়োজন। উনাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য, ভালো রাখার জন্য নার্সিং হোমের বিকল্প নেই। বিশাল বহুতল ভবন। লবিতে ভিজিটর হিসেবে নাম রেজিস্টর করতে হলো।এতোদিন কোভিড নিয়ে যে কড়াকড়ি সর্বত্র ছিল, সেটা শিথিল করেছে। লিফটের বারো তলায় দরজা খুলতেই ফিনাইল,লাইজল, ইত্যাদি জাতীয় জীবানু নাশকের ঝাঁঝালো গন্ধ। প্রথমেই চোখ এবং মন ধাক্কা খায় প্যাসেজে সারি সারি হুইলচেয়ারে বসা জরাগ্রস্ত কিছু মানব-মানবীকে দেখে। করিডোরে এনেছে তাঁদের রুমের বাইরে একটু 'বেড়ানোর' অনুভূতি দিতে। একজন স্বাস্থ্যকর্মী তদারকিতে। তাঁদের শরীরিভঙ্গিতে, চাহনীতে অসহায়ত্ব ! মনটা বিষন্ন হয়ে গেল জীবনের পরিনতির শেষের পরিচ্ছেদের কিছু অংশ দেখে।
আমার আত্মীয়ের ঘরে গিয়ে দেখি, উনার জন্য বরাদ্ধ আলাদা একটা ঘর। হুইলচেয়ারে বসে টিভিতে একটা মুভি দেখছেন, ওয়েস্টার্ন। উনার সামনে টেবিলে রবীন্দ্রনাথের গল্পগুচ্ছ পাতা খোলা অবস্থায়। উনার মস্তিষ্ক সম্পূর্ণ কার্যক্ষম ! উনি প্রয়োজনীয় পুষ্টি, চিকিৎসা ,ওষুধপত্র ,শশ্রুষা সবই পাচ্ছেন। পরিস্থিতির বিবেচনায় উনি খুব ভালো আছেন। এগুলো সরকারি হওয়ায় ব্যক্তি কারোর প্রতি কৃতজ্ঞ, আনত ইত্যাদি বোধ করার কিছু নেই। স্বাস্থ্যবীমা থেকে ব্যয় নির্বাহ হয়। বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত অতি দক্ষ নার্স, সেবাকর্মীরা দেখভাল করে থাকেন।
আমাদের সমাজে বৃদ্ধাশ্রম নিয়ে নেতিবাচক মনোভাব আছে। বাবা-মা'কে বৃদ্ধাশ্রমে দেয়াটাকে সমাজে ভালো চোখে দেখা হয় না।আবার ছেলে মেয়ের কাছে ঠাঁই হলেও বাবা-মাকে নিজেদের ছোট্ট ফ্ল্যাটেও সঙ্কুলান করা যায় না। তাঁদের দেখ ভালের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থার আয়োজন করা সম্ভব হয় না। অনেক সময়ই তাঁরা অবহেলা অযত্নের শিকার হন। অসুস্থ হলে অবস্থাটা আরও সঙ্গীন হয়ে দাঁড়ায়। আবার সামান্য কারণেও বয়স্ক মানুষেরা আহত বোধ করেন। তাছাড়া সারাজীবন যে ব্যক্তি সংসারের কর্তা বা কর্ত্রী ছিলেন তাঁর মধ্যে পরাশ্রিতের অনুভূতির জন্ম বড় পীড়াদায়ক হয়। অল্পতেই তাঁদের অহম আহত হয়।
ঢাকায় বা বাংলাদেশে এখন অনেক পরিবার আছে, যাঁদের সন্তানেরা সব প্রবাসে স্থায়ী। শুধু বয়স্ক বাবা-মা দেশে থাকেন 'Empty nest' শূন্য নীড়ে। ঐসব বৃদ্ধ দম্পতি কতোদিন নিজেরা একা থাকার মতো সক্ষম থাকবেন? অশক্ত হলে তখন কি হবে? বা একজনের অবর্তমানে অন্যজনের কী হবে ?
আমাদের দেশের প্রধান দুটি ধর্মেই বৃদ্ধ বয়সে সুরক্ষা দেবার জন্য বাবা-মার সেবা যত্ন করার কথা, সন্তুষ্ট রাখার কথা বহুভাবে বহু জায়গায় বলা হয়েছে। 'বাবা-মার পায়ের নিচে সন্তানের বেহেস্ত', পিতৃ প্রীতিমাপন্নে প্রিয়তে সর্ব দেবতা পিতাহী পরম তপঃ!' ইত্যাদি ইত্যাদি। ধর্মের সুবচনগুলো মানুষ অনুসরণ করলে পৃথিবী তো কবেই সুখলোকে পরিণত হতো ।
উন্নত দেশগুলো এই সমস্যার সমাধান হিসেবে এনেছে বৃদ্ধাশ্রম, নার্সিংহোম । মূলতঃ রাষ্ট্রীয় অর্থানকুল্যে, রাস্ট্রীয় উদ্যোগে।আপাততঃ সমাজ এর চাইতে ভালো কোন ব্যবস্থার প্রচলন করতে পারেনি। আমাদের অঞ্চলের দেশগুলোয় বৃদ্ধাশ্রম বিকশিত হয়নি। বাংলাদেশে ব্যবসা হিসেবে এটা হাঁটিহাঁটি পা পা করে এগুচ্ছে।সরকারি উদ্যোগ অতি অপ্রতুল। কিছু কিছু জায়গায় সমাজসেবীরা কিছু করার চেষ্টা করছেন।
চিকিৎসা বিজ্ঞানের এবং মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতির কারণে জীবনযাপনের মানের উন্নতি হবার ফলে মানুষের আয়ূষ্কাল বৃদ্ধি পেয়েছে। বৃদ্ধি পেয়েছে এবং পাবে বৃদ্ধ মানুষের সংখ্যা । নিরব ট্র্যাজিক কাহিনী রচিত হবে ঘরে ঘরে, যদি না এই সমস্যার দিকে নজর দেয়া না হয়। তবে সব পরিবারে এমন হয় সেটা নিশ্চয়ই নয়। কিছু কিছু পরিবারে বৃদ্ধরা যথেষ্ট যত্নে এবং ভালোবাসায় থাকেন। তবে সেই পরিবারগুলোকে এখন ব্যতিক্রম হিসেবে ধরা যায়। আমার দেশে, চাইলেই পাবার মতো বৃদ্ধাশ্রমের ব্যবস্থা যেন হয়। বিত্তবানরা উদ্যোগী হতে পারেন নিজেদেরই কাজে লাগবে হয়তো এক সময়।
বৃদ্ধদের শেষ খেয়ায় ওঠার আগে অপেক্ষার জন্য ভালো একটা ওয়েটিং রুম যেন হয় বৃদ্ধাশ্রমগুলো, যেগুলোতে তাঁদের জন্য নিরাপত্তা, সম্মান এবং প্রয়োজনীয় শুশ্রুষার ব্যবস্থা থাকবে।কারো কাছে যেন তাঁদের 'নত হয়ে বা কৃতজ্ঞ হয়ে থাকতে না হয়।থাকতে না হয় যেন কারো ভার হয়ে, বিরক্তির কারণ হয়ে, অবহেলায়, অনাদরে!
একটা জীবন যাপনের শেষে জীবনের কাছে এটুকু দাবি তাঁরা করতেই পারেন!
অভিমত থেকে আরো পড়ুন