https://www.prothomalony.com/
5824
opinion
নিউরোলজিস্টের ওয়েটিং রুমে আমরা বেশ কয়েকজন রুগী বসে আছি। আমার দুই পাশে চার জন ভারতীয়। এক পাশে এক জোড়া বয়স্ক দম্পতি। আরেক পাশে মেয়েসহ পৌড় এক ভদ্র লোক। বাবা ভদ্রলোক অনর্গল কথা বলে যাচ্ছেন। মেয়েটি মাঝে মাঝে উত্তর দিচ্ছে। ভদ্রলোকের মনে হয় কথা বলার রোগ আছে। বয়স্ক দম্পতির সাথে কথায় কথায় বের হলো - উনারা দুজনেই আমার ক্লায়েন্ট। ফোনে যোগাযোগ আছে তবে প্যানডেমিকের কারনে কয়েক বছর দেখা হয়নি বলে চিনতে পারিনি। আমি কিছুটা অপ্রস্তুত হলাম। কথা পাগল ভদ্রলোক বয়স্ক দম্পতির সাথে আমাকে হিন্দী বলতে শুনে বেশ অবাক হলেন। ভদ্রলোক কেরালার - হিন্দীতে তেমন পারদর্শীতা নেই। ইংরেজীতেই স্বাচ্ছন্দ বোধ করেন।
সারাজীবন প্রিন্ট মিডিয়ার সাথে জড়িত ছিলেন। সেই সুবাধে অনেক দেশ ভ্রমন করেছেন। এক সপ্তাহ আগে আমাদের কুরবানী ঈদ গেলো। জানতে চাইলেন - ঈদ কেমন হলো, কি পরিমান মাংস এই কয়েক দিনে সাবাড় করলাম ! বললেন যে বিফ উনার খুব প্রিয়। কথা প্রসংগে আরও বললেন যে ভারতে গরু জবাই নিয়ে কিছু ধর্মান্ধ লোকের অহেতুক বাড়াবাড়ি অনুচিত। আমি বললাম - ধর্মীয় কারন দেখিয়ে এমন অরাজকতা সরকারী দলের পৃষ্টপোষকতায়ই হচ্ছে। অথচ ভারতের রপ্তানি আয়ের একটা বিরাট অংশ আসে বিফ থেকে। আরও উল্লেখ করলাম যে বিশ্বের দ্বীতিয় বৃহত্তম বিফ রপ্তানিকারক দেশ হলো ভারত। এটা শুনে তরুণী বিস্ময়ে হতবাক। আরও বললাম - যেই দেশে গরু জবাই নিয়ে হুলুস্থুল চলে সেই দেশে রপ্তানির জন্য কিভাবে সরকারীভাবে হাজার হাজার গরু জবাই করা হয় ! এটা তো নীতিগত ভাবে বেমানান। তরুনী আমার সাথে সহমত প্রকাশ করলো। এই দেশে বেড়ে উঠা তরুনী এতো কিছু জানতো না। ভদ্রলোক কিছুক্ষন চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন যে বিফ রপ্তানির জন্য গরুগুলি ভারতে জবাই হয় না। হাজার হাজার গরু নাকি জবাই করার জন্য বাংলাদেশে পাঠানো হয়। সেখানে প্রসেস করে সেই বিফ বাংলাদেশ থেকেই বিদেশে রপ্তানি করা হয়। আমি প্রতিবাদ করে বললাম যে প্রতি বছর কুরবানীর আগে ব্যবসার জন্য অনেক গরু চোরাই পথে বাংলাদেশে পাচার হয়। কিন্তু ভারতের পক্ষে রপ্তানির জন্য বাংলাদেশে কোন বিফ প্রসেসিং প্লান্ট আছে বলে আমার জানা নেই। তরুনী আবারও সহমত প্রকাশ করলো। ভদ্রলোক একটু থতমত খেয়ে গেলেন।
আমি মনে মনে ভদ্রলোকের প্রশংসা করলাম এই জন্য যে উনি গরু জবাই নিয়ে ধর্মান্ধতার নিন্দা করলেও নিজের দেশের বিরুদ্ধে যাননি। একজন বিদেশীর সামনে নিজের দেশকে অসম্মান করেননি। অথচ আমরা কথায় কথায় নিজের দেশকে অসম্মান করি। রাজনৈতিক ভাবে আমাদের ভিন্ন মতবাদ থাকতেই পারে। কিন্তু দেশটা তো আমাদের জন্মভুমি। এখানে অন্য দেশের লোকজনের সামনে নিজেদের রাজনৈতিক ধান্দাবাজীর জন্য রাস্তাঘাটে মারামারি করি। ভুলে যাই যে বিদেশীরা আমাদেরকে ব্যক্তিগত ভাবে চেনে না। শুধু জানে যে রাস্তাঘাটে মারামারিতে লিপ্ত এই জানোয়ার গুলি প্রবাসী বাংলাদেশী। আবার কিছু লোক নিজের মতলব হাসিলের জন্য দেশের বিরুদ্ধে অনবরত লিখে যাচ্ছেন। অনেক সময় খবরের অথেনটিসিটি যাচাই না করেই সোস্যাল মিডিয়ায় পোষ্ট দেন। অনেকে মজা করার জন্য টিকটক ভিডিও বানায়। কিছু জ্ঞানপাপী লোকজন আবার সেই টিকটিক ভিডিওকে খবরের সোর্স বানিয়ে পোষ্ট দেয়। আমরা ভুলে যাই যে বাংলাদেশের পাসপোর্ট নিয়েই আমরা আজ প্রবাসী। আমাদের শিকড় যেখানে, সেই দেশটির নাম বাংলাদেশ।
অভিমত থেকে আরো পড়ুন