https://www.prothomalony.com/
5820
opinion
হার্ভেস্ট মুনের সবচেয়ে উপযুক্ত বাংলা নিশ্চয়ই নবান্নের চাঁদ। আমেরিকায় সেপ্টেম্বর মাসের পূর্ণিমাকে বলা হয় হার্ভেস্ট মুন। কারণ এ সময়েই এখানে ফসল তোলা হয়। ২০২১ সালে প্রথমবারের মত হন্টন ক্লাবের পক্ষ থেকে নিউইয়র্কের বাঙালিরা হার্ভেস্ট মুন বা নবান্নের চাঁদ দেখার আয়োজন করে। আমাদের অতি প্রিয়জন প্রকৃতিপ্রেমী মানুষ প্রকৌশলী সৈয়দ ফজলুর রহমানের মাথায়ই প্রথম ধারণাটি আসে। তিনি বিষয়টি নিয়ে আমার সঙ্গে আলাপ করেন। আমি আগ্রহ প্রকাশ করি এবং নবান্নের চাঁদ দর্শন উৎসবের আয়োজন করি। বাংলাদেশে যখন ছিলাম আমার খুব ইচ্ছে ছিল 'জ্যোৎস্না উৎসব' করবো। কোনো এক পূর্ণিমা রাতে দলে-বলে অরণ্যে চলে যাব। সারারাত জ্যোৎস্না দেখব। কিন্তু সময় এবং সুযোগ দুইয়ের সমন্বয় ঘটাতে পারিনি। আমার সেই অতৃপ্তি চাঙা হয়ে ওঠে ফজলুর রহমানের প্রস্তাবে। একুশ সালেও অনুষ্ঠানটির নাম দিয়েছিলাম "চন্দ্রালোকিত কবিতা"। কিন্তু তখন সবাই এতোটাই চন্দ্রমুগ্ধ বা জোৎস্নাতাড়িত হয়ে পড়ে যে কবিতার কথা ভুলেই যায়। নিউইয়র্কে বসবাসরত একদল নারী-পুরুষ, শিশু-যুবা অতলান্তিকের পাড়ে দাঁড়িয়ে মুগ্ধ দৃষ্টিতে দেখছিল সন্ধ্যার প্রান্ত ছুঁয়ে জলধির গর্ভ থেকে উঠে আসা এক সুবিশাল চাঁদ। এই মুগ্ধতার ঘোরে আমরা আচ্ছন্ন ছিলাম বহুদিন। গত বছর যারা যেতে পারেননি সোশ্যাল মিডিয়ায় ছবি দেখে খুব আফসোস করেন এবং তাদের অনেকেই এ-বছর " নবান্নের চাঁদ" দর্শন কিছুতেই মিস করতে চাননি। এবারও অনুষ্ঠানটির নাম রেখেছি "চন্দ্রালোকিত কবিতা"।

যাওয়ার আগে আমাকে খসরুল আলম, যিনি বাংলাদেশে একজন সাহসী সাংবাদিক ছিলেন, আমেরিকায় একজন কালচারাল এক্টিভিস্ট, বেশ ক'বার জিজ্ঞেস করেন আমাদের দোল পূর্ণিমার সঙ্গে কি হার্ভেস্ট মুনের কোনো মিল আছে? না, দোল পূর্ণিমার সঙ্গে হার্ভেস্ট মুনের কোনো মিল নেই। দোল পূর্ণিমার জন্ম বেশ কিছু পৌরাণিক ঘটনা/গল্প থেকে, হার্ভেস্ট মুন একটি বাস্তব চিত্র। দোল পূর্ণিমা হয় ফাল্গুন মাসে। রাধা-কৃষ্ণের প্রেম থেকে এই উৎসব সৃষ্টি হয়েছে। দোল পূর্ণিমার সময়েই কোনো কোনো জায়গায় হোলি উৎসব পালন করা হয়। রাধা এবং অন্যান্য গৌরবর্ণের গোপিনীরা কৃষ্ণবর্ণের শ্রীকৃষ্ণকে পছন্দ করবে কিনা যৌবনে এ নিয়ে কৃষ্ণের মধ্যে কিছুটা হীনমন্যতা ছিল। কৃষ্ণের মা তাকে বলেন তুমি যে রঙ ইচ্ছে গোপিনীদের মুখে মেখে দিও, তারা সেই রঙ ধারণ করবে। কৃষ্ণ তখন রাধা এবং অন্যান্য গোপিনীর মুখে রঙ মেখে দিতে লাগলেন। এ থেকেই হোলি এবং দোল পূর্ণিমার সৃষ্টি হয়েছে। কৃষ্ণ কী করে কালো হলেন এ নিয়েও গল্প আছে। শ্রীকৃষ্ণের মামা কংস রাজা জানতেন তার কোনো এক ভাগ্নে তাকে হত্যা করবে। সেই ভীতি থেকে তিনি কৃষ্ণকে হত্যা করার ফন্দি আঁটেন। কংস রাক্ষসী পুতানাকে নিয়োগ করেন কৃষ্ণকে হত্যা করার জন্য। পুতানা মমতাময়ী মাতৃরূপী নারী সেজে শিশু কৃষ্ণকে বুকের দুধ পান করায়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তা ছিল বিষ। কিন্তু কৃষ্ণ শুধু বিষই পান করেনি পুতানার রক্তও পান করে। এর ফলে পুতানা কিছুক্ষণের মধ্যেই রাক্ষসী রূপ পায় এবং পুড়ে ছাই হয়ে যায়। এই বিষ পানের কারণেই কৃষ্ণ কালো হয়। পুতানার আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়াটিও দোল পূর্ণিমা উৎসবের সঙ্গে যুক্ত হয়। উৎসবের আগের দিন অশুভ পোড়ানোর প্রতীক হিসেবে নেড়াপোড়ানো হয়। কৃষ্ণের ঘটনা ছাড়াও বিষ্ণুর অন্য অবতার নৃসিংহের একটি কিংবদন্তিও হোলির সঙ্গে আলোচিত হয়। তবে অধিকাংশ মানুষ হোলি বা দোল পূর্ণিমা প্রেমের উৎসব হিসেবেই পালন করে।
.jpg)
আগস্টের শেষে, সেপ্টেম্বরের শুরুতে আমেরিকার বেশিরভাগ জায়গায় ফসল তোলার সময়। সুপ্রাচীন কালে যখন বৈদ্যুতিক আলো ছিল না বা আলোর অপ্রতুলতা ছিল তখন কৃষকেরা এই সময়ের পূর্ণিমার আলোকে কাজে লাগাতো ফসল তোলার যাবতীয় কাজ-কর্ম করার জন্য। দিনের গরমে যতটা কাজ করা যায় রাতের শীতল আবহাওয়ায় তার চেয়ে অধিক কাজ করা যায় বলে কৃষকেরা জ্যোৎস্নার আলোয় সারারাত কাজ করত। তাই সেপ্টেম্বরের পূর্ণিমার নাম হয়ে যায় হারভেস্ট মুন। পরবর্তিতে এ নিয়ে নানান গল্প, রূপকথা লেখা হয়েছে, এখনও হচ্ছে। পশ্চিমা সাহিত্যে জ্যোৎস্নার সঙ্গে নেকড়ের একটা সম্পর্ক আমরা প্রায়শই দেখি। অক্টোবরের পূর্ণিমাকে ব্লাডমুন বা রক্তচাঁদ বলা হায়। ব্লাডমুন নিয়েই নেকড়ের গল্পগুলো বেশি লেখা হয়েছে। এইসব গল্প কখনো কখনো কিংবদন্তি হয়ে ওঠে। যেমন গ্রিক রূপকথার অনেক গল্পই কিংবদন্তি। তবে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত ইউরোপ-আমেরিকা মিথগুলোকে মিথের জায়গায় রেখেই সাহিত্য রচনা করে। এগুলো কখনোই তাদের জীবনাচারের অংশ হয়ে ওঠে না। আরো স্পষ্ট করে যদি বলি তাহলে বলতে হয় পশ্চিমের শিক্ষিত সমাজ মিথকে ধর্ম বানিয়ে ফেলে না, যা ভারতীয়রা করে। ভারতীয়রা সকল পৌরাণিক গল্পকেই হিন্দু ধর্মের অনুষঙ্গ বানিয়ে ফেলেছে। যে কারণে ধর্ম আর রূপকথা একাকার হয়ে গেছে।
গত সন্ধ্যায়, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, নিউইয়র্কের ফার রকাওয়ে বিচে হন্টন ক্লাব দ্বিতীয়বারের মত আয়োজন করে হারভেস্ট মুন উৎসব, যার শিরোনাম ছিল "চন্দ্রালোকিত কবিতা"। এবারের আয়োজন ছিল কিছুটা গোছানো। বিকেল সাড়ে পাঁচটা থেকে সকলে সমবেত হতে থাকে। চলে অনানুষ্ঠানিক আড্ডা, চা, সিঙ্গারা, সোডার সঙ্গে সমুদ্র থেকে উঠে আসা উতল হাওয়ায় বুক ভরে নিঃশ্বাস নেয়া। এখানে আছে সমুদ্রের তির ধরে ছুটে চলা প্রশস্ত বোর্ড ওয়াক, যার দৈর্ঘ্য সাড়ে পাঁচ মাইল। আমেরিকার বিভিন্ন জায়গায় সমুদ্রের পাড়ে এরকম বোর্ড ওয়াক আছে। অধিকাংশ জায়গায়ই এগুলো কাঠের তৈরি ডেকের মত। কোথাও কোথাও শৈল্পিকভাবে কংক্রিট-নির্মিত। বোর্ড ওয়াকের একপাশে, সমুদ্রের দিকে মুখ করে, পাতা আছে সারি সারি বেঞ্চ। একটু পরপরই ময়লা ফেলার বিন, বেশ কিছু পাবলিক টয়লেট, উন্মুক্ত পাবলিক শাওয়ার আছে। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো এই সৈকতেই শুধুমাত্র ফ্রি কার-পার্কিং আছে, নিউইয়র্কের আর কোনো সৈকতে এটা পাইনি।
আমরা সবাই আগে থেকে আলোচনা করে খাবারের দায়িত্ব ভাগ করে নিয়েছি। ভূনা খিচুড়ি, ডিম ভূনা, চায়নিজ শব্জি, সালাদ, সিঙ্গারা, গুড়ের চা, নানা রকম সফট ড্রিংক, এসর্টেড বাংলা মিষ্টি, জর্দা, ভর্তা, আচার, ছোলা এবং মিষ্টি পান। মোদ্দা কথা বাঙালি রসনাতৃপ্তির পরিপূর্ণ আয়োজন।
ভায়লা সালিনা লিজার অনুরোধে আমি পড়ে শোনাই 'বাড়ি আছ' কবিতাটি। সুলতানা ফেরদৌসী, শেলী জামান খান, শওকত রিপন এবং শাহ আলম দুলাল নিজের লেখা কবিতা/ছড়া পড়ে শোনান। গান করেন মুক্তি জহির, আলমা এবং ভায়লা সালিনা লিজা। হিন্দি এবং উর্দূ কবিতা পড়েন আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু। সৈয়দ ফজলুর রহমান, খসরুল আলম, কাজী ফৌজিয়া হার্ভেস্ট মুন উৎসব নিয়ে কথা বলেন। রুমা দিলরুবা আলম, কামরুন মনি, শেলি ভাবী ডিসিপ্লিন ঠিক রাখার জন্য তটস্থ ছিলেন সারাক্ষণ। আমাদের কন্যা জল যাতে জলে ঝাঁপিয়ে না পড়ে সেজন্য খুব নীরবে তাকে চোখে চোখে রাখছিলেন জলের ফুপু কাজী ফৌজিয়া। আবৃত্তিজন ড. বিলকিস রহমান দোলা ঘনিষ্ঠজনের অসুস্থতায় মন খারাপ থাকা সত্বেও আরিবাকে নিয়ে ছুটে আসেন, সঙ্গে আমাদের জন্য নিয়ে আসেন নানান রকমের মিষ্টি। রুহুল কুদ্দুস ভাই শেষ মুহূর্তে যোগাযোগ করলেও ঠিক সময়েই চলে আসেন। লাকী আপা এবং টগর ভাই শেষের দিকে এসে যুক্ত হন এবং আগামী শুক্রবারে তাদের বাসায় সবাইকে আমন্ত্রণ জানান।
এক পর্যায়ে আমরা এতোটাই চন্দ্রমোহিত হয়ে পড়ি যে ফেরার কথা প্রায় ভুলেই যাচ্ছিলাম। একের পর এক একক এবং সববেত গান হচ্ছিল লাউডস্পিকারে। যদিও সমুদ্রের গর্জনের সঙ্গে ইলেকট্রনিক যন্ত্র তেমন পেরে উঠছিল না। এই সময়ের সবচেয়ে আলোচিত গান 'সাদা সাদা কালা কালা' সকলে মিলে গাইতে শুরু করলে শ্বেতাঙ্গ সান্ধ্যভ্রমণকারীদের অনেকেই থেমে আমাদের গান শুনতে শুরু করে।
এভাবে অত্যন্ত আনন্দঘন একটি জ্যোৎস্না সন্ধ্যা আমরা প্রকৃতির সান্নিধ্যে সকলে মিলে একসাথে কাটাই। যারা ২০২২ সালে আমাদের জ্যোৎস্না উৎসব মিস করেছেন আশা করছি এ-বছর তারা যোগ দেবেন এবং এই আনন্দযজ্ঞে শামিল হবেন।
অভিমত থেকে আরো পড়ুন