https://www.prothomalony.com/
5819
opinion
‘আমাদের শরীরের ভিতরে কোন মেকানিজম বা কেমিস্ট্রি নাই যেটা শরীরকে অসুস্থ করে তুলবে। অসুস্থ হওয়ার পিছনে আমাদের অনিয়ম কাজ করে। তাই বলবো, আমি সুস্থ আছি, আমার শরীরের প্রতিটি কোষ শতভাগ কর্মক্ষম। সুতরাং আমি যাই করি না কেন আমার শরীর তা সাপোর্ট করে।
এই সফলতার পিছনের কাহিনী হচ্ছে, আমি প্রতিদিন প্রতিযোগিতা করেছি গতকালের নাসিরের সাথে আজকের নাসিরের। আমাকে সাহায্য করেছিল নাইকি কোম্পানির একটা রানিং এপ, দৌড়ই আমার একমাত্র এক্সারসাইজ। গত ২৭জুলাই বৃহস্পতিবার ম্যারাথন দৌড় নিয়ে প্রথম আলো উত্তর আমেরিকার জনপ্রিয় সম্প্রচার ‘টক অফ দ্য উইক’ অনুষ্ঠানে এই গুরুত্বপূর্ণ কথাগুলো বলেছিলেন মোহাম্মদ নাসির সিকদার। তিনি একজন ম্যারাথনার ও দৌড়বিদ। কাজ করছেন ‘ওবিসিটি ফ্রি ওয়ার্ল্ড’ নিয়ে। পেশায় একজন সফটওয়্যার অটোমেশন ইঞ্জিনিয়ার, কর্মরত আছেন বিশ্বখ্যাত কোম্পানি IBM-এ। নাসির সিকদার-ঢাকা কলেজ থেকে 'এইচ এস সি' এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভাষাবিজ্ঞানে পড়াশোনা শেষ করেছেন।
ম্যারাথন, একটি রোড রেস, যাকে দূরপাল্লার দৌড়ও বলা হয়। একসময় চূড়ান্তরকম ওবিসিটি আক্রান্ত নাসির শিকদার দৌড়ের মাধ্যমে ওবিসিটি মুক্ত হয়েছেন। নিজের সুস্থতা ও দৌড় জীবনের অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করে নিচ্ছেন আরও হাজারও মানুষের সাথে। একটি ওবিসিটি মুক্ত পৃথিবীর স্বপ্ন দেখেন তিনি। ম্যারাথনে আসার কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘২০১৯ সালের শেষের দিকে আমি অসুস্থ হয়ে পড়ি, হার্টের ব্লক, হাই ব্লাড প্রেসার, উচ্চ কোলেস্টেরল ও স্লিপ এপনিয়া সহ অনেক বড় অসুখ ছিল। নিয়মিত ওষুধ খেতাম। শারীরিক অসুস্থতার কারণ জানতে যেয়ে ডাক্তার ও গবেষকদের নানান তথ্য ঘেঁটে বুঝলাম যে সেই তরুণ বয়সের স্বাস্থ্য আবারো ফিরে পাওয়া সম্ভব। টার্গেট করলাম যে কোন ভাবেই আমাকে ছাত্র জীবনের সেই তারুণ্যে ফিরে যেতে হবে। প্যাকেটজাত প্রসেসড খাবার, ভাজা-পোড়া খাবার, জেনেটিক্যালী মোডিফাইড খাবার থেকে বেরিয়ে আসলাম। এতে করে আমার ওজন এক বছরে ২০-২৫ পাউন্ড কমে গেল। এক্ষেত্রে আমেরিকান ডাক্তার স্টিফেন গান্ডি’র কথা উল্লেখযোগ্য। ছয়মাস পর আমি দৌড় শুরু করি, হার্টের সমস্যার জন্যে রান্নায় তেল বর্জন করি। এভাবেই এগিয়ে যাই।‘
প্রথম কবে, কোথায়, কতগুলো ম্যারাথনে এ পর্যন্ত অংশ নিয়েছেন এ প্রসঙ্গে নাসির জানান, ‘আমি সুস্থ হতে চাইতাম। "টার্গেট ছিলো যেন প্রতিদিন ৫০ মিনিটে ৫ মাইল দৌড়াতে পারি এবং এই টার্গেট দুবছর এ পূরণ করবো। শুরু করলাম প্রতিদিন ৩ মাইল দৌড়ের মাধ্যমে যা শুরুতে ৯০ মিনিট লাগত শেষ করতে।" প্রথম দিকে হার্টে ব্যাথা করত। তেল বর্জনের জন্য হার্টের সমস্যা অনেকটাই চলে গেল। একটানা পনের ষোল মাইল দৌড়ানো দেখে একজন শুভাকাঙ্ক্ষী আমাকে ম্যারাথনে যোগদান করে বললেন। আইডিয়া পছন্দ হলো, এভাবেই আমার ম্যারাথন শুরু হয়। ২০২১ সালের মে মাসে আমি আট ঘন্টা দৌড়াই। প্রথম ইন্টারন্যাশনাল ম্যারাথন করি সান ফ্রান্সিসকোতে। প্রথম সবকিছুতে মানুষ নার্ভাস থাকার মতোই আমি ম্যারাথনে নার্ভাস ছিলাম। তবে কোন সমস্যায় পড়লে আমি ইন্টারনেট থেকে সমাধান বের করেছি, ডাক্তারদের সাথে আলোচনা করেছি। যেদিন ত্রিশ হাজার মানুষের মধ্যে আমি দৌড় শুরু করেছিলাম, প্রথমে ভয় পেয়েছিলাম। কিন্তু একসময় মনে হয়েছিল আমি আগের তুলনার দ্বিগুণ গতি পেয়েছি।
‘অবিসিটি ফ্রি ওয়ার্লড্’- র প্রচার নিঃসন্দেহে ব্যক্তি ও সমাজের জন্য সচেতনমূলক একটি কাজ। এই প্রচারে নানা ধরণের কাজ করে থাকেন নাসির সিকদার। তিনি বলেন, ওবিসিটি বা শারীরিক স্থুলতা এখন বিশ্বজুড়ে। বি-এম-আই(Body mass index) স্কেলে যখন কেউ ৩০ এর উপরে চলে যায় তখন তাকে ওভারওয়েট বলে এবং ওবিসিটির ধাপগুলো শুরু হয়। ওবিসিটিতে আক্রান্ত মানুষেরা অবশ্যম্ভাবী কিছু রোগে আক্রান্ত হয়। যেমন ডায়াবেটিস, হার্টের ব্লকেজ, ব্রেইন ফগ, স্লিপ এপ্নিয়া, সহ আরো অনেক রোগের সম্ভবনা দেখা দেয়। এসব থেকে মুক্তি পেতে হলে প্রথমে মাইন্ড সেট করে প্রতিদিন বাইরে একঘন্টা দৌড়াতে হবে। দৌড় ৯০ভাগ মানুষের জন্যেই সম্ভব, প্রমাণিত হয়েছে যে কোন বয়সেই দৌড় সম্ভব। জয়েন্ট ব্যাথার জন্যে অনেকে দৌড়াতে পারেন না। তবে আমার কাছে প্রমাণ আছে যে, দৌড়ের ফলে একটা সময় পরে শরীরে কোন ব্যাথা থাকে না। দৌড় শরীরকে পরিশোধিত করে, কোষে জমে থাকা টক্সিক বের করে দেয়।
আগামীতে ‘ওবিসিটি ফ্রি ওয়ার্লড্ -নিয়ে নাসির সিকদারের রয়েছে পরিকল্পনা। এ সম্পর্কে তিনি জানান, ‘সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকেই আমার এই কনসেপ্ট তৈরি হয়েছিল। সোশ্যাল মিডিয়াতে আমন্ত্রণ জানিয়ে আমি যদি মানুষকে অনুপ্রাণিত করতে পারি তবেই আমি সার্থক। খাদ্যভ্যাস বদলানো এবং দৌড়ের মাধ্যমে মানুষের সুস্থ থাকা সম্ভব। শুধু ওবিসিটি নয়, সব অসুখই পালাবে। সোশ্যাল মিডিয়াতে এবং ইউটিউবে চ্যানেলের মাধ্যমে আমি তেল ছাড়া রান্না করা শেখাই। বাঙ্গালী মা-বোনদের উদ্দেশ্যে বলবো, যে পরিবারের মায়েরা একটিভ সেই পরিবারের বাচ্চারা সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হয়। তাই সব মা’দের ঘরে ঘরে সচেতনতা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
এভাবেই দৌড়বিদ মোহাম্মদ নাসির সিকদার দর্শকদের কাছে সম্পূর্ণ নিজস্ব অভিজ্ঞতার আলোকে সুস্থ থাকার উপায়গুলো বিশদ বর্ণনার মাধ্যমে তুলে ধরেন। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনায় ছিলেন রোকেয়া দীপা এবং কারিগরি সহযোগিতায় ছিলেন এইচ বি রিতা। প্রতি বৃহস্পতিবার সময় রাত নয়টায় প্রথম আলো উত্তর আমেরিকার ’টক অফ দ্য উইক’ অনুষ্ঠানটি ফেসবুক পেজ থেকে সরাসরি সম্প্রচারিত হয়ে থাকে।
অভিমত থেকে আরো পড়ুন