https://www.prothomalony.com/

5804

opinion

অভিমত

শুধু ডেঙ্গুতে নয় সবকিছুতেই দিশেহারা মানুষ

প্রকাশ: ২৭ জুলাই ২০২৩ ১০:৩৯

কী ভয়াবহ অবস্থা। ডেঙ্গু আক্রান্ত ছয় বছরের কন্যাকে হাসপাতালে ভর্তি করতে ছুটে গিয়েছিলেন বাবা-মা। শয্যা নেই বলে গুরুতর অসুস্থ বাচ্চা মেয়েটিকে ফিরিয়ে দেয়ার কথা বলা হয়েছে হাসপাতাল থেকে। বাচ্চা অসুস্থ, বাঁচাতে হবে। উদভ্রান্ত পিতা জড়িয়ে পড়লেন ডাক্তারের সাথে বচসায়। এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু তার পরিণতিতে সেই অসুস্থ কন্যাকে রেখেই বাবাকে পুলিশের হাতে তুলে দেয়া হলো। মেয়েকে বাঁচাতে গিয়ে বাবার যেতে হলে কয়েদখানায়। হাসপাতালেও বাচ্চা মেয়েটিকে রাখা সম্ভব হলো না।উপায় ছিলো না। বাচ্চাটির মায়ের কথা ভাবেন। একা মা কতটা অসহায়।তিনি কী করবেন, বাচ্চার চিকিৎসা করাবেন, না স্বামীকে জেল থেকে ছাড়াবার ব্যবস্থা করবেন?

ঢাকাসহ সারাদেশে ডেঙ্গু ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। প্রতিদিন মারা যাচ্ছে মানুষ।আর আমাদের কর্তাদের কেউ এমন অবস্থা ফেলেই গিয়েছিলেন বিদেশ ভ্রমণে। একবার মশা মারার নামে নষ্ট ওষুধ কেনা হলো, কোটি টাকা গেলো পানিতে। আবার বলা হচ্ছে পদ্ধতি ভুল ছিলো। গাপ্পি মাছ ছাড়ার গপ্পো করা হলো। কিন্তু এসব গাল-গল্প কোনই কাজে আসেনি। বরং ঢাকা থেকে ডেঙ্গু ছড়িয়েছে সারাদেশে। প্রতিদিন মারা যাচ্ছে মানুষ। সংখ্যাও নেহাত কম নয়। অনেকটা করোনাকালের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। অক্সিজেনের অভাবে অ্যাম্বুলেন্সে মানুষ মারা যাচ্ছে। হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ছুটছে মানুষ। 

মহামারীর কথা বাদ দিলাম, সাধারণ পরিস্থিতিতেই চিকিৎসার অবস্থা কী? একজন মানুষের হার্ট অ্যাটাক বা ব্রেইন স্ট্রোক হয়েছে, খোদ ঢাকাতেই বলুন তো কোথায় যাবেন, বিশেষ করে দরিদ্র মানুষেরা। জাতীয় হৃদরোগ হাসপাতালটি বিশেষায়িত হাসপাতাল। সবেধন নীলমনি। কিন্তু কদিন আগেই খবরে দেখলাম, সেখানের ক্যাথল্যাব বন্ধ। মানে নষ্ট। অপারেশন হচ্ছিল না। জানি না, এখন কী অবস্থা। আর ব্রেইন স্ট্রোক, যার চিকিৎসা চার ঘন্টার মধ্যে করাতে পারলে রোগী সুস্থ হয়, না হলে পঙ্গুত্ব। জীবন্মৃত হয়ে বেঁচে থাকা। বাঁচার জন্য ভরসা নিউরো সায়েন্স হাসপাতাল। কিন্তু সেখানে চার ঘন্টার মধ্যে পৌঁছা কি সম্ভব? ঢাকার একমাথা থেকেই পৌঁছা সম্ভব নয়, জেলা-উপজেলা তো দূর কা বাত। 

ঢাকার বাইরে দেশের মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালগুলোতে নেই কার্ডিয়াক বা নিউরো বিভাগ। থাকলেও নামমাত্র। সেখানে রোগীকে ম্যানেজ করার কোনো সুযোগ-সুবিধা নেই। চিটাগাং হাসপাতাল, দিনাজপুরের হার্ট ফাউন্ডেশন ছাড়া কি দেশের মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালগুলোতে স্টেন্টিং কিংবা বাইপাস সম্ভব? স্ট্রোকের চিকিৎসা? আমরা পদ্মাসেতু বানাচ্ছি হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করে বিপরীতে একটা জেলা হাসপাতালেওকার্ডিয়াক কিংবা নিউরো সার্জারির ইউনিট স্থাপন করা সম্ভব হয়নি। শত কোটি টাকার আতশবাজি পোড়াতে পারি, নানা দিবস মিলে উৎসবে হাজার কোটি টাকার মচ্ছব হয়, কিন্তু জেলা ও উপজেলা হাসপাতালগুলিকে চিকিৎসার জন্য স্বয়ংসম্পূর্ণ করা সম্ভব হয় না। 

এই যে উন্নয়নের নামে এত কথা, মানুষের জীবনের চেয়ে কংক্রিটের স্থাপনা কি খুব বেশি প্রয়োজন? মানুষের চিকিৎসা দেয়া যাচ্ছে না। হাসপাতালগুলি জরাজীর্ণ। এক্সরে আছে তো, আলট্রাসনোগ্রাম নেই। যন্ত্রপাতি বেশিরভাগ সময়ই নষ্ট থাকে। মানুষের মৌলিক অধিকারের মধ্যে অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থানের পরই চিকিৎসা। আর কঙক্রিটের জঞ্জাল কোনো মৌলিক অধিকারের মধ্যে পড়ে না, ওগুলো বাড়তি সুবিধা। ফ্যান হলেও চলতো, কিন্তু আরামের জন্য এসি ব্যবহারের মতন। কিন্তু এসি'র আরাম অনেক সময় ব্যাকফায়ার করতে পারে। হাতি কেনা হয়তো যায়, পালা কঠিন। কঙক্রিটের জঞ্জালও তাই। ঋণের কিস্তি শোধ, রক্ষণাবেক্ষণ, লোক-লস্কর এবং তস্কর আর বেতন-ভাতা সবমিলিয়ে অবস্থা হাতি পালার মতই। সুতরাং ব্যাকফায়ার করাটা অসম্ভব কিছু নয়। 

যে ঘটনাটি দিয়ে শুরু করেছিলাম, শেষ করি তাই দিয়ে। ঘটনার খবর দিয়েছিলো প্রথম আলো'র অনলাইন। শিরোনামটা ছিলো এমন, 'ডেঙ্গু: মেয়েকে হাসপাতালে ভর্তি করতে গিয়ে বিতণ্ডায় বাবা গ্রেপ্তার, দিশাহারা পরিবার'। বাচ্চা মেয়েটি যার নাম আদিবা। শিশু আদিবা হয়তো বুঝবে না, কিন্তু আমরা বড়দের অনেকেই বুঝি যে, আমরাও দিশেহারা। শুধু আদিবার পরিবারই নয়, একটা শ্রেণি বাদে দিশেহারা পুরো দেশের সিংহভাগ মানুষ।

অভিমত থেকে আরো পড়ুন