https://www.prothomalony.com/
5555
opinion
ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই বলে আসছি এখান থেকে রাশিয়ার প্রাপ্তি কিছু নেই ধ্বংস ছাড়া। পশ্চিমারা পুতিনকে জড়িয়ে দিয়েছে এই যুদ্ধে। কারণ তারা জানতো রাশিয়ার অর্থনীতির যে অবস্থা তাতে এমন একটা যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে তাদের ধ্বংস অনিবার্য। তবে পশ্চিমাদের ধারণার মধ্যে ভারতের কার্যক্রম ছিলো না। তারা রাশাকে এভাবে ব্যাকআপ দেবে এতটা ভাবেনি তারা। পুতিন যে সারা বিশ্বের একনায়কদের ঈশ্বর হয়ে উঠেছেন, সেটা পশ্চিমাদের মাথায় তখনো শেকড় গেড়ে উঠতে পারেনি। কিন্তু যতই সময় গড়িয়েছে ততই তারা বুঝতে পেরেছে একনায়কদের একত্বটাকে।
আমি এ কথাটা শুরু থেকেই বলছি। তখন দেখেছি অনেকের কনফিউশন। কেউ তো আমাকে পারে তেড়ে মারতে আসে। অনেকেই যারা কনফিউজড ছিলেন, তারাও দেখি এখন পরিষ্কার ভাবে লিখেন আমার কথার পুনরাবৃত্তি।যে পুনরাবৃত্তিতে বলা হয় , ইউক্রেনে রাশিয়ার অনিবার্য পরাজয়ের কথা। হোক পুনরাবৃত্তি আপত্তি নেই। কারণ পুনরাবৃত্তিটাও কাজের। যত বলা হবে ততো মানুষ বুঝতে পারবে। তাদেরও একটা ফ্যান-ফলোয়ার বেইজ রয়েছে, তারা হয়তো বুঝতে পারবে। কিন্তু মুশকিল হলো এখনো অনেকের ঘোর কাটেনি। লাল মলাটের বই পড়াদের ঘোর সহজে কাটে না। এখনো অনেকে বলছেন, রাশিয়ার কিছু হবে না, বরং ক্ষতিগ্রস্ত হবে অ্যামেরিকা। চোখের অন্ধত্ব হয়তো দূর করা যায়, কিন্তু চিন্তার অন্ধত্ব দূর করা মুশকিল। একটা প্রাইভেট বাহিনীকে ঠেকাতে যে অবস্থা দাঁড়ালো মস্কোর তাতেও এসব অন্ধদের চিন্তাচক্ষু খোলেনি।
এক সময় হয়তো রাশিয়া আমাদের বন্ধু ছিলো। কিন্তু সেই বন্ধুত্ব ছিলো ভারতের স্বার্থে, আমাদের প্রতি মমত্ববোধে নয়। তখনকার ভূ-রাজনীতি আর এখনকার ভূ-রাজনীতি এক নয়। এখন ভারত-চীনের বৈরিতা রাশিয়ার মধ্যস্থতায় কমে এসেছে। চিরশত্রু পাকিস্তানের সাথেও অর্থনৈতিক বলয় গড়ে তুলতে অনেকটাই রাজী ভারত, সাথে রয়েছে চীন। ব্রিকস গড়ে উঠেছে সেধারণাতেই। ব্রিকসের প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের নামগুলো দেখুন, ব্রাজিল, রাশিয়া, চীন, ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকা। এই দেশগুলির আভ্যন্তরীণ অবস্থা কী? ব্রাজিলের সদ্যসাবেক স্বৈরশাসক বলসোনারোকে ব্রাজিলের রাজনীতি থেকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। কোন অকাজটা করতে বাদ রেখেছেন ব্রাজিলের এই স্বৈরশাসক বলতে পারবেন কি? পারবেন না। চীনের প্রেসিডেন্ট আজীবনের। ভারতের মোদিজিকে নিয়ে নাই বললাম। আর রাশিয়া নিয়েই লেখাটা শুরু। সবশেষ যোগ দেয়া দক্ষিণ আফ্রিকার কথা বলতে গেলে, সেদিনও দুর্বৃত্তদের গুলিতে সেখানে নিহত বাংলাদেশীর মুখটা ভেসে ওঠে।আর জার্মান খবরের সংস্থা ডয়চে ভেলে'র প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিলো, 'আগস্টে ব্রিকস-এর সদস্য হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ', হয়তো দায়িত্বশীলরা ভালো বুঝেই যোগ দিতে যাচ্ছেন। এখনো যেহেতু সম্ভাবনা তাই বাংলাদেশের আলাপটাও থাক। তবে বেলারুশ, মিয়ানমার, উত্তর কোরিয়া, কিউবা এসব দেশ যদি ব্রিকসে যোগ দেয়, তাহলে অবয়বটা আরো স্পষ্ট হয়। একনায়কদের সম্মিলনের একটা জায়গা হয়।
আবার ফিরি রাশিয়ার আলাপে। বাংলাদেশের কিছু গণমাধ্যমের খবর ও আলাপ শুনলে মনে হয় রাশিয়া যুদ্ধে জিতে বসে আছে। ভূ-রাজনীতি সম্পর্কে তাদের জ্ঞানের বহর দেখে রীতিমত বিস্মিত হই। জানি না, আসলে তারা কাজের (?) অবসরে সারাবিশ্বের ঘটনার দিকে নজর দিতে সময় পান কিনা। যদিও তাদের কাজ খবর নিয়েই, সেজন্যই কাজের সাথে প্রশ্নবোধক চিহ্নটাকে ব্র্যাকেটবন্দি করা। খবর নিয়ে যারা কাজ করেন, তাদের অন্তত ভূ-রাজনীতি সম্পর্কে ন্যূনতম জ্ঞানটা থাকা উচিত। আমাদের পণ্ডিতদের কথা আলাদা। তারা ফাঁপরবাজি করেই সময় পান না, ভূরাজনীতি নিয়ে ভাবার সময় কখন তাদের। যা দৈববাণী আসে তাই তারা চোখ বুজে বলে যান। তা নিয়েই টকশোতে আলাপ ফাঁদেন, গণমাধ্যমে লিখেন। কদিন আগে কেউ কেউ বললেন, রাশিয়া জ্বালানি বন্ধ করে দিলে ইউরোপ শেষ। কই ইউরোপ কি শেষ? উল্টো তেলের দাম এখন করোনাকালের আগের চেয়েও নেমে গেছে। সৌদি আরব বাধ্য হয়েই তেল উৎপাদন কমিয়েছে, যাতে তেলের দাম কিছুটা বাড়ে। ভাইরে ফাঁপরবাজি আর আয়নাবাজি করে সব সময় টিকে থাক যায় না। বাজিকরি করে ব্যক্তির পেট চলে, কিন্তু দেশ চলতে পারে না।
শেষ করি আমাদের দেশ নিয়ে রাশিয়ার আলাপে। আমাদের দেশের আভ্যন্তরীণ ব্যাপারে অন্যদের নাক গলানোতে নাখোশ তারা। খুব ভালো। কিন্তু আফিগানিস্তানে আগ্রাসন কি ছিলো? মুসলমানদের প্রথম এক্সট্রিমিস্ট হিসেবে চিহ্নিত করেছিলো কারা? এখন ইউক্রেনে কী করছে রাশিয়া? জানি, অ্যামেরিকার কথা বলবেন পণ্ডিতকুলপতিগণ। অস্বীকার করছি না, সারাবিশ্বে নানান গ্যাঞ্জামের পেছনে তারা। আমাদের রাজনীতির রুদ্ধশ্বাস অবস্থার শুরুটা তাদের হাত দিয়েই হয়েছিলো। কিন্তু যখন তারা দেখেছে নিজভুল নীতিতে মধ্যপ্রাচ্যে তাদের আধিপত্য হাতছাড়া। দক্ষিণ এশিয়া ভারতের কাছে ছেড়ে দেয়ায় সেটাও গেছে। কোনো একনায়কই তাদের হাতের মুঠোয় থাকেনি। কারণ একনায়কদের কোনো নীতি নেই। একনায়ক মানেই লোভী, দুর্নীতিবাজ, দুর্বৃত্ত, এদের লোভ কোনো নীতি মানে না। সুতরাং অ্যামেরিকা চেষ্টা করছে, তাদের অবস্থান পুনরুদ্ধারে। রাশিয়া করছে যার উল্টোটা। আর আমাদের কিছু মিডিয়া আর পণ্ডিতদেরও রাশিয়ার মতন 'উল্টো বুঝলিরে রাম' অবস্থা। চিন্তার সীমাবদ্ধতায় যা হয়।
অভিমত থেকে আরো পড়ুন