https://www.prothomalony.com/
5350
opinion
বিদেশে গেলে বুদ্ধিমানদের বুদ্ধি আরো শানিত হয় আর মতান্ধরা আরো অন্ধ হয়। ডগমা আক্রান্ত এমন এক প্রবাসী 'তালেবর' এর লেখা পড়লাম। তিনি এতদিনে বুঝলেন, বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক রাজনীতির অংশ। অতীতের কথা বাদ দিলাম, বিগত দুটি নির্বাচনে বিশেষ করে সুজাতা সিংয়ের তৎপরতাতেও তিনি বুঝতে পারেননি যে বিশ্ব রাজনীতির বাইরে নয় বাংলাদেশ। সম্ভবত তিনি ম্যাপ খুলে কোনদিন বাংলাদেশের ভৌগলিকঅবস্থানও দেখেননি। অবস্থানগত গুরুত্বও তার মাথায় নেই। তার ধারণা সম্ভবত এবারই যুক্তরাষ্ট্র ও পিটার হাস বাংলাদেশকে বিশ্ব রাজনীতিতে টেনে এনেছে। তার বাইরে আর কিছু নেই।
ডগমা আক্রান্ত এমন অনেকেই আছেন যাদের ধারণা, 'এ আর এমন কী'মোদি আর বাইডেন দেখা হলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। ভারত বাংলাদেশের পক্ষে দুতিয়ালী করবে এবং সব ঠিক করেই মোদি ভারতে ফিরবেন। বিশ্ব রাজনীতি এবং বর্তমান প্রেক্ষাপট সম্পর্কে কতটা অজ্ঞ হলে এমন চিন্তা মাথায় আসতে পারে। অবশ্য ভারতের এক শ্রেণির পেইড কলামনিস্ট উঠে-পড়ে লেগেছেন এমন একটা ধারণা প্রতিষ্ঠা করার জন্য। এমন ধারণা যারা প্রতিষ্ঠা করতে চাচ্ছেন তারা জ্ঞানপাপী। জেনেশুনেই বিষ করেছেন পান। আর আমাদের কিছু দেশী এবং প্রবাসী 'তালেবর' সেই বিষ না জেনেই পান করে বসে আছেন।
গ্লোবাল পলিটিক্সের বিষয় অনেকটাই পরিবর্তন হয়ে গেছে। আগেরসিলেবাসে পড়লে এবারের পরীক্ষায় পাস তো 'দূর কা বাত', ফেলও কপালেজুটবে না। খুব সরল ভাবে সামান্য একটু বলি। পশ্চিমা বিশ্ব রাশিয়াকে অর্থনৈতিক ভাবে চাপে ফেলতে যে পরিমান স্যাংশন দিয়েছে, তাতে রাশিয়ার হাতে এতদিনে হারিকেন ওঠার কথা। কিন্তু এখন পর্যন্ত রাশিয়ার অর্থনীতিকিছুটা ধুঁকে হলেও চলছে। আর রাশিয়ার অর্থনীতির নিভু নিভু এই প্রদীপ জ্বালানোর তেল জোগাচ্ছে যে কয়টা দেশ তারমধ্যে ভারত অন্যতম। যুদ্ধ চালাতে গেলে দুই পক্ষেরই ক্ষতি হয়। হাল জামানায় অর্থনৈতিক ক্ষতিটাই সবচেয়ে বড় ক্ষতি। ইউক্রেনে প্রক্সি ওয়ার চালাতে যে ক্ষতি অ্যামেরিকারও হয়েছে। আর সেই ক্ষতিটা দীর্ঘায়িত হওয়ার একটা অনুষঙ্গ হলো ভারতের বর্তমান সরকার। পশ্চিমা বিশ্ব তেতে আছে ভারতের উপর। তারোপর নিজের দেশে বিরোধীরা সব একাট্টা হচ্ছে। সুতরাং নিজের তাপ প্রশমন বাদ দিয়ে অন্যের শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ করাটা খুব বেশি জরুরি নয়।
'তালেবর'দের ধারণা অ্যামেরিকা চাপাচাপি করলে বাংলাদেশ ভারতের বলয় থেকে চীনের বলয়ের মধ্যে ঢুকে পড়বে। ঢুকে পড়ার বাকি আছে কতটুকু সে হিসেবটা কি 'তালেবর'গণ দিতে পারবেন? পারবেন না। কারণ তারা জানেনই না তলে তলে পানি কতটা গড়িয়েছে। এক সময় চীনকে ঠেকাতে দক্ষিণ এশিয়ার কর্তৃত্ব ভারতের হাতে দিয়ে রেখেছিলো অ্যামেরিকা। কিন্তু ভারত এতে সম্পূর্ণত ব্যর্থ হয়েছে। আর এই ব্যর্থতার অন্যতম কারণ হলো, ভারত কখনা জনগণের রাজনৈতিক চিন্তা বুঝতে চেষ্টা করেনি। তারা শক্তি যুগিয়েছে নিজেদের পছন্দের দলকে, যা সম্পূর্ণ ক্ষমতাভিত্তিক। কিন্তু জনগণের সমর্থন না থাকলে যে ক্ষমতার ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে পড়ে, তা বোঝার ক্ষমতা ধারণ করতে পারেনি দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে ভারতের স্টেক হোল্ডাররা। শ্রীলঙ্কার কথাই বলি, সেখানে দুর্নীতি পরায়ণ শাসকদের বেছে নিয়েছিলো ভারত। লোভীদের বেছে নিলে যা হয়। তাদের লোভ কোনো নীতি-নৈতিকতা মানে না। তারা বিক্রি হয় লোভের কাছে, অর্থের কাছে।বেনিয়া চীন সেটা বুঝেই টোপ ফেলেছিলো। আর তাতেই শ্রীলঙ্কা ধরা পড়েছিলো চীনা অর্থের জালে। সেই জাল কাটতে খোদ যুক্তরাষ্ট্রকে পরোক্ষে মাঠে নামতে হয়েছিলো। ভারতীয় কৌশল ব্যর্থ হয়েছিলো বলেই পরোক্ষে মাঠে নামতে হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রকে। নেপাল, মালদ্বীপ সবখানেই ব্যর্থ হয়েছে ভারতীয় কৌশল। বাধ্য হয়েই মালদ্বীপকেও প্রকাশ্যে সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সতর্ক করতে হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রকে স্বয়ং। ছোট্ট একটা দ্বীপরাষ্ট্রকেও সামলানোর ক্ষমতা নেই ভারতের। আর আমাদের 'তালেবর'রা আশা করছেন, বাংলাদেশের বিষয় যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে দেবে পুনর্বার ভারতের কাছে। আজব চিন্তা এদের।
ফুটনোট : এই যে 'তালেবর'দের কথা বললাম, এরা মূলত দু'ধারি তলোয়ার, সবদিকেই কাটে। এদের দ্বারা ক্ষতি বই লাভ হয় না কখনো। কীভাবে বলি। এই যে তারা 'ভারত সব ঠিক করে দেবে' এমন তত্ত্ব হাজির করেছে, এতে ক্ষতি হচ্ছে খোদ শাসকগোষ্ঠীর। ভারতীয় পেইড কলামনিস্টরা তাই করছেন। তারা প্রমাণ করতে চাচ্ছেন ভারতই বাংলাদেশের ক্ষমতা পরিবর্তন কিংবা রাখার মূল চাবিকাঠি, দেশের জনগণ কিছু নয়। এতে খোদ নির্বাচন ব্যবস্থাই প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। আর বিশ্বের কাছে পরিষ্কার হচ্ছে, 'ডাল মে কুচ কালা হ্যায়'। সত্যি কথা বলতে গেলে, যতটুকু বাকি আছে এই 'তালেবর'রা ততটুকু ডোবানোর জন্য যথেষ্ট।
অভিমত থেকে আরো পড়ুন