https://www.prothomalony.com/

5075

opinion

অভিমত

মার্কিন ভিসা নীতি, পরস্পরের দোষারোপ, দেশের মর্যাদা ও ভবিষ্যত

প্রকাশ: ০১ জুন ২০২৩ ১১:৪৬

আমাদের দেশের রাজনীতিকরা কি খুব বেশি ভদ্র হয়ে গিয়েছেন? এক গালে চড় দিলে আরেক গাল পেতে দেবেন, এতটাই ভদ্র? না, প্রশ্নটা এমনিতেই করা নয়। এই যে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এমন একটি ভিসা নীতি ঘোষণা করলো তা নিয়ে বিরূপ কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। বিশেষ করে ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকেও অনেকটা স্বাগত জানানো হয়েছে এই নীতিকে। আর বিরোধীপক্ষ তো স্বাগত জানাতে এক পা বাড়িয়েই ছিলো। ফলে যুক্তরাষ্ট্রও স্বস্তি প্রকাশ করেছে তাদের প্রতিক্রিয়ায়। অথচ এই ভিসা নীতি আমাদের জন্য অমর্যাদাকর। 

এখন মূল কথায় আসি। উগান্ডা ও নাইজেরিয়াসহ পাঁচটি দেশের জন্য এমন ভিসা নীতি গ্রহণ করেছিলো যুক্তরাষ্ট্র। ২০২১-এ উগান্ডার নির্বাচনে ব্যাপক জালিয়াতি হয়। বাধা সৃষ্টি করা হয় নির্বাচনী প্রক্রিয়ায়। নাইজেরিয়া ও বেলারুশের ঘটনাও তাই। অর্থাৎ সুষ্ঠু নির্বাচন যেখানে অনুষ্ঠিত হয় না বা হতে দেয়া হয় না, সেখানেই এই ভিসা নীতি। মধ্য অ্যামেরিকার দেশ নিকারুগুয়ার উপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয় নির্বাচনজনিত কারণেই। সোমালিয়ার ঘটনাও তাই। তারই ধারাবাহিকতায় ষষ্ঠ দেশ হচ্ছে বাংলাদেশ। ফলাফলটা দাঁড়ালো সর্বাসাকুল্যে আমরা উগান্ডা, নাইজেরিয়া ধরণের দেশের সমান্তরালে। অনেকে ট্রল করে এ ঘটনাকে ‘সিক্স প্যাক’ বলছেন। তাই বলছি, এতদিন উগান্ডাকে কথায় কথায় ট্রল করেছেন, এখন কী করবেন? ট্রলের যোগ্য হবার পরেও আমরা এই নীতিকে স্বাগত জানিয়েছি।এর অর্থ হলো আমরা মেনে নিয়েছি আমাদের নির্বাচন ত্রুটিপূর্ণ। বিরোধীরা তো বলছে দীর্ঘদিন ধরেই, এখন ভিসা নীতির বিরোধীতা না করে তারই স্বীকৃতি দিলো অপরপক্ষও। আর আমাদের নির্বাচন কমিশন এটাকে স্রেফ আন্তরাষ্ট্রীয় ব্যাপার বলে চালিয়ে দিলেন। আজব না? ভিসা নীতির কারণ হলো নির্বাচন সুষ্ঠু না হবার সম্ভাবনা এবং তা অতীত পর্যবেক্ষণ থেকেই। আর ভিসা নীতি ধরে এই নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনেরই। 

অনেকে মনে করছেন ভিসা নীতি নির্বাচন পরবর্তী বিষয়। তারা সম্ভবত ব্লিনকেনের টুইট ঠিক ভাবে পড়েননি। টুইটের শেষ হয়েছে, ‘the democratic election process in Bangladesh’ এভাবে। ডেমোক্রেটিক ইলেকশন প্রসেস যার শাব্দিক অর্থ গণতান্ত্রিক নির্বাচনী প্রক্রিয়া। নির্বাচনী প্রক্রিয়া কি নির্বাচন শেষ হবার পরে হয়? বুঝলে কথা পরিষ্কার, এই ভিসা নীতির কার্যক্রম এখন থেকেই শুরু হয়ে গিয়েছে। হয়ে যাবার কথা। কারণ যুক্তরাষ্ট্রভিসা নীতিমালায় বলেছে, ভোট জালিয়াতি, ভোটারদের ভীতি প্রদর্শন, জনগণকে স্বাধীনভাবে সভা-সমাবেশ ও শান্তিপূর্ণভাবে জমায়েত হওয়ার অধিকার থেকে বিরত রাখতে বল-প্রয়োগ বা সহিংসতা। এছাড়া আছে রাজনৈতিক দল, ভোটার, নাগরিক সমাজ এবং মিডিয়ার স্বাধীন মত প্রকাশে বাধা বা প্রতিবন্ধকতা তৈরির যে কোনো পদক্ষেপ, ইত্যাদি হলো নির্বাচনী প্রক্রিয়ার অন্তরায়। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হচ্ছে এবং বলা যায়,যা এখন থেকেই কার্যকর, তা রয়েছে শেষ অংশটুকুর মধ্যে। কী বলা হয়েছেশেষ অংশে, বলা হয়েছে, ‘এছাড়া আছে রাজনৈতিক দল, ভোটার, নাগরিক সমাজ এবং মিডিয়ার স্বাধীন মত প্রকাশে বাধা বা প্রতিবন্ধকতা তৈরির যে কোনো পদক্ষেপ, ইত্যাদি হলো নির্বাচনী প্রক্রিয়ার অন্তরায়’। অতএব বুঝে দেখুন, কতটা গভীর ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে। কোন জায়গাগুলোকে চিহ্নিত করে দেয়া হয়েছে। 

নির্বাচনী প্রক্রিয়াগুলোর ধারাবাহিকতা সম্পর্কে যাদের ধারণা আছে, অন্তত রাজনীতিটা যারা বোঝেন তারা জানেন, এই যে দ্রব্যমূল্য কমানোর দাবী এটাও সেই প্রক্রিয়ার মধ্যেই পড়ে। কারণ একটা রাজনৈতিক দল তাদের পক্ষে জনমত সৃষ্টি করে এভাবেই। রাজনৈতিক সভা-সমাবেশও তারই অধীনে। আর সেটাই অত্যন্ত পরিষ্কার ভাবে জানিয়ে দিয়েছে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদের সে নীতিতে। আমির আজিজের সেই বিখ্যাত কবিতার মতন, ‘আমি এমন ভাবে তা বলে যাবো যা বধিরও শুনতে পাবে, এমন স্পষ্ট লিখে যাবো তা অন্ধও পড়তে পারবে’। 

ভিসা নীতি কাদের বিরুদ্ধে যাবে, যারা নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করবে। এখন আসি বাধাগ্রস্ত করবে কারা, রাজনীতিবিদরা তো রয়েছেনই, বলা হয়েছে প্রশাসন ও বাহিনী সংশ্লিষ্টদের কথাও। প্রশাসনের বিরুদ্ধে বিরোধীদের বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। আর রাজনীতিবিদরা বরাবরই পরস্পরের দোষারোপ নিয়ে আছেন। কিন্তু উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো ভিসা নীতিতে বিচার বিভাগকেও যুক্ত করা হয়েছে। এই যুক্ত করা থেকেও ধারণা করা যায় ভিসা নীতি কার্যকরের প্রক্রিয়া সম্ভবত নির্বাচনী প্রক্রিয়ার সাথেই শুরু হয়েছে।বলতে পারেন ইশতেহান ঘোষণা হলো না, প্রক্রিয়া কীভাবে শুরু হবে? উপরেই বলেছি নির্বাচনী প্রক্রিয়ার একটি ধাপ হচ্ছে জনমত গঠন। আর এই গঠনের ব্যাপারটি দীর্ঘ। এমন না ইশতেহার ঘোষণা করা হলো, তারপর বিরোধীরা মাঠে গিয়ে বলতে শুরু করবেন, জিনিসের দাম কমাতে হবে ইত্যাদিসব। সুতরাং বুঝতে হলে আক্কেলমান্দ হওয়া জরুরি। বুঝতে হবে জনমত গঠন ও তাতে বাধা দেবার বিষয়টি। সে কারণেই বিচার বিভাগের সংযুক্তিকরনের ব্যাপারটি ‘আক্কেলমান্দ কা লিয়ে’ যাদের জন্য ‘ইশারা কাফি’। 

তবে সবদিক থেকেই এই ভিসা নীতি আমাদের জন্য অমর্যাদাকর। যে নীতি আমাদের উগান্ডা ও নাইজেরিয়ার সাথে তুল্য করেছে। যে নীতি সারাবিশ্বে জানান এবং একধরণের স্বীকৃতি দিয়েছে যে, আমাদের নির্বাচন ও নির্বাচনী প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ। অথচ এর প্রতিবাদ না করে এই নীতি কার বিরুদ্ধে যাবে তা নিয়ে আমাদের রাজনীতিকরা বাহাস করছেন। অন্তত ক্ষমতাসীনরা এর প্রতিবাদ জানাতে পারতেন। বলতে পারতেন, না আমরা নাইজেরিয়া বা উগান্ডার মতন নই। এই নীতি আমাদের প্রতি অন্যায় আরোপ। তা না করে তারা আছেন বিরোধীপক্ষ এই নীতিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এমন আলাপে।অথচ বিরোধীপক্ষের ক্ষতি হওয়ার বাকি কী আছে। তাদের প্রধান জেলে, আরেকজন নির্বাসিত। হাজারো মামলায় লাখো কর্মী আসামী। অসংখ্য কর্মীকারারুদ্ধ। প্রতিনিয়ত গ্রেপ্তার হচ্ছেন কেউ না কেউ। তারপর আর তাদের কতটা ক্ষতি হবে। 

সুতরাং অন্যের ক্ষতির চিন্তা না করে, দেশের মর্যাদাহানীর কথা চিন্তা করাটাজরুরি। ক্ষমতাসীনদের জন্য তো জরুরি অবশ্যই সাথে বিরোধীপক্ষের জন্যও। কারণ দেশ সবার উপরে। এর সাথে জড়িত রয়েছে আগামী প্রজন্ম এবং দেশের সার্বিক ভবিষ্যত ও ভাবমর্যাদা। আমরা উগান্ডা বা নাইজেরিয়ার সাথে তুল্য হতে চাই না। বর্হিবিশ্ব আমাদের সে চোখে দেখুক, আমরা তা চাই না। বিদেশে গেলে কেউ আঙুল তুলে আমাদের দেখাক আমরা তা চাই না।

অভিমত থেকে আরো পড়ুন