https://www.prothomalony.com/
18583
opinion
প্রকাশ: ০৮ নভেম্বর ২০২৬ ০৪:০৬
মানুষ সময়ের মধ্যে জন্ম নেয়, সময়ের মধ্যেই বেড়ে ওঠে, নিজের অভিজ্ঞতা ও বিশ্বাস দিয়ে সময়কে ব্যাখ্যা করে। যে সমাজে তার জন্ম, যে ইতিহাস তাকে ঘিরে রাখে, যে ভাষায় সে চিন্তা করতে শেখে, যে মূল্যবোধে তার চেতনা গড়ে ওঠে—সবকিছুই তার সময়বোধকে প্রভাবিত করে। অথচ মানুষ প্রায়ই মনে করে, সে নিজের সময়কে বুঝতে পারছে, তার প্রকৃতি ও গতিপথ সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন। কিন্তু সত্যিই কি তা সম্ভব? যে সময়ের চিন্তা, সংস্কার ও সীমাবদ্ধতার ভেতরে দাঁড়িয়ে আমরা পৃথিবীকে দেখি, সেই সময়কে কি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে বিচার করা যায়? নাকি নিজের সময়কে বোঝার চেষ্টা করতে গিয়েও আমরা অজান্তে তারই তৈরি দৃষ্টিভঙ্গির কাছে ফিরে যাই?
প্রশ্নটি আপাতদৃষ্টিতে সময়ের, কিন্তু গভীরে এটি মানুষের জ্ঞান ও আত্মোপলব্ধির প্রশ্ন।
সময়কে আমরা সাধারণত অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ—এই তিনটি ভাগে বুঝতে অভ্যস্ত। কিন্তু মানুষের জীবনে সময় কেবল দিন, মাস কিংবা বছরের ধারাবাহিকতা নয়। সময় মানুষের অভিজ্ঞতা, স্মৃতি, আকাঙ্ক্ষা, ভয়, বিশ্বাস ও প্রত্যাশার সঙ্গে মিশে থাকে। একই সময় একজন মানুষের কাছে সম্ভাবনার, অন্যজনের কাছে অনিশ্চয়তার; কারও কাছে পরিবর্তনের, কারও কাছে হারিয়ে যাওয়ার। অর্থাৎ সময় এক হলেও সময়কে অনুভব করার অভিজ্ঞতা সবার এক নয়।
এখানেই নিজের সময়কে বোঝার প্রথম জটিলতা। আমরা সময়ের বাইরে দাঁড়িয়ে তাকে দেখি না; বরং সময়ের ভেতরে থেকেই তার অর্থ নির্মাণ করি। আমাদের চিন্তার ভাষা, সামাজিক অবস্থান, রাজনৈতিক বাস্তবতা, সাংস্কৃতিক অভ্যাস এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা সেই নির্মাণকে প্রভাবিত করে। ফলে নিজের সময় সম্পর্কে আমাদের উপলব্ধি কখনোই সম্পূর্ণ মুক্ত বা নিরপেক্ষ নয়।
ইতিহাসের দিকে তাকালে এই সীমাবদ্ধতা আরও স্পষ্ট হয়। অতীতের বহু সমাজ নিজেদের বিশ্বাস, প্রতিষ্ঠান ও জীবনব্যবস্থাকে স্বাভাবিক এবং চিরস্থায়ী বলে মনে করেছিল। একসময় যে ধারণা প্রশ্নাতীত ছিল, পরবর্তী সময়ে সেটিই অযৌক্তিক কিংবা অন্যায় বলে বিবেচিত হয়েছে। যে সামাজিক বৈষম্য একসময় প্রচলিত নিয়মের অংশ ছিল, সময়ের পরিবর্তনে মানুষ তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। যে রাজনৈতিক কর্তৃত্ব একসময় অপরিবর্তনীয় বলে মনে হয়েছিল, ইতিহাসের প্রবাহে তা ভেঙে পড়েছে।
কিন্তু এসব পরিবর্তনের মধ্যেও একটি প্রশ্ন থেকে যায়—সেই সময়ের মানুষ কি বুঝতে পেরেছিল যে তারা ইতিহাসের একটি পরিবর্তনশীল অধ্যায়ের মধ্যে বসবাস করছে? নাকি ভবিষ্যৎ যে তাদের বিশ্বাস ও ব্যবস্থাকে ভিন্নভাবে বিচার করবে, তা তাদের কল্পনারও বাইরে ছিল?
সম্ভবত প্রতিটি যুগের মানুষের মধ্যেই নিজের সময় সম্পর্কে একধরনের আত্মবিশ্বাস কাজ করে। তারা নিজেদের অভিজ্ঞতাকে সত্যের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মাপকাঠি মনে করে। অথচ ইতিহাসের একটি বড় শিক্ষা হলো, কোনো সময়ই নিজের সম্পর্কে সম্পূর্ণ সত্য জানতে পারে না। কারণ সময়ের কিছু বাস্তবতা তার সমকালীন মানুষের চোখে দৃশ্যমান হয় না। কোনো কোনো অন্যায় এতটাই স্বাভাবিক হয়ে ওঠে যে মানুষ তাকে অন্যায় বলেই চিনতে শেখে না। কোনো কোনো ধারণা এতটাই প্রতিষ্ঠিত হয় যে তার বাইরে চিন্তা করাকেই অস্বাভাবিক মনে হয়।
এখানে হেগেলের ইতিহাসচিন্তার একটি তাৎপর্য স্মরণ করা যায়। তার ভাবনায় কোনো যুগকে বুঝতে হলে তার নিজস্ব ঐতিহাসিক বাস্তবতা ও চেতনার বিকাশকে বিবেচনায় নিতে হয়। অর্থাৎ একটি সময়কে অন্য সময়ের মাপকাঠিতে বিচার করলেই তার পূর্ণ অর্থ ধরা পড়ে না। আবার কার্ল মার্ক্স দেখিয়েছেন, মানুষের চিন্তা ও চেতনা তার বস্তুগত জীবন এবং সামাজিক সম্পর্ক থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। মানুষ যে সমাজে বাস করে, সেই সমাজের উৎপাদনব্যবস্থা, শ্রেণিসম্পর্ক ও ক্ষমতার কাঠামোও তার চিন্তার জগৎকে প্রভাবিত করে।
এই দুই চিন্তার ভেতর দিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলব্ধি তৈরি হয়—মানুষ শুধু নিজের সময়কে ব্যাখ্যা করে না, নিজের সময়ের দ্বারাও ব্যাখ্যাত হয়।
তবে কি মানুষ নিজের সময়ের বন্দি? সে কি কখনো নিজের যুগের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করতে পারে না? বিষয়টি এত সরল নয়। কারণ মানুষ সময়ের ভেতরে থেকেও সময়কে প্রশ্ন করতে পারে। নিজের অভিজ্ঞতার বাইরে অন্যের অভিজ্ঞতা জানতে পারে, অতীতের সঙ্গে বর্তমানের তুলনা করতে পারে, প্রচলিত বিশ্বাসের বিপরীতে নতুন যুক্তি দাঁড় করাতে পারে। এখানেই মানুষের চিন্তার স্বাধীনতা ও আত্মসমালোচনার গুরুত্ব।
মিশেল ফুকো দেখিয়েছেন, জ্ঞান ও ক্ষমতার সম্পর্ক কীভাবে কোনো নির্দিষ্ট সময়ের সত্য বলে বিবেচিত ধারণাগুলোকে গড়ে তোলে। কোনো সমাজে কোন বক্তব্য গ্রহণযোগ্য, কোন প্রশ্ন অগ্রহণযোগ্য, কোন জ্ঞান প্রতিষ্ঠিত হবে—এসবের পেছনেও ক্ষমতার সম্পর্ক কাজ করতে পারে। ফলে নিজের সময়কে বোঝার অর্থ শুধু সমকালীন ঘটনাবলি জানা নয়; বরং এটিও অনুসন্ধান করা যে, আমাদের কাছে কোন সত্যগুলো স্বাভাবিক বলে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং কেন হয়েছে।
এই অনুসন্ধান বর্তমান পৃথিবীতে বিশেষভাবে জরুরি। আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন তথ্যের অভাবের চেয়ে তথ্যের আধিক্য অনেক সময় বড় সমস্যা হয়ে উঠছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মুহূর্তের মধ্যে অসংখ্য সংবাদ, মতামত ও প্রতিক্রিয়া আমাদের সামনে হাজির করছে। পৃথিবীর এক প্রান্তের ঘটনা অন্য প্রান্তের মানুষের দৈনন্দিন আলোচনার অংশ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এত তথ্যের মধ্যেও মানুষ কি নিজের সময়কে আগের চেয়ে ভালো বুঝতে পারছে?
তথ্য জানা আর সময়কে বোঝা এক বিষয় নয়। কোনো ঘটনার তাৎক্ষণিক খবর পাওয়া যায়, কিন্তু তার ঐতিহাসিক কারণ, সামাজিক প্রভাব কিংবা দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি বুঝতে সময় লাগে। দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানোর অভ্যাস অনেক সময় গভীরভাবে চিন্তা করার ক্ষমতাকে সংকুচিত করে। আমরা কী ঘটছে তা জানতে পারি, কিন্তু কেন ঘটছে, এর পেছনে কোন কাঠামো কাজ করছে এবং এর পরিণতি কোথায় গিয়ে পৌঁছাতে পারে—এসব প্রশ্ন অনেক সময় অনালোচিত থেকে যায়।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশও সময় সম্পর্কে মানুষের ধারণাকে নতুনভাবে প্রভাবিত করছে। যে কাজ একসময় দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও অনুশীলনের মাধ্যমে সম্পন্ন হতো, প্রযুক্তি তা অল্প সময়ে করে দিচ্ছে। জ্ঞান অর্জনের পদ্ধতি বদলাচ্ছে, মানুষের কাজের ধরন বদলাচ্ছে, এমনকি মানুষ নিজের বুদ্ধিবৃত্তিক সামর্থ্য সম্পর্কেও নতুন করে ভাবতে বাধ্য হচ্ছে। কিন্তু প্রযুক্তিগত অগ্রগতি কি মানুষের প্রজ্ঞারও সমান অগ্রগতি নিশ্চিত করছে? দ্রুততর পৃথিবীতে বাস করলেই কি আমরা সময়ের গভীরতর অর্থ বুঝতে শিখছি?
এখানে একটি পার্থক্য মনে রাখামাত্র প্রয়োজন। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলানো আর সময়ের পরিবর্তনের তাৎপর্য বোঝা এক নয়। প্রথমটি অভিযোজনের বিষয়, দ্বিতীয়টি চেতনার। মানুষ নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করতে শিখতে পারে, নতুন সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারে; কিন্তু সেই পরিবর্তন তার স্বাধীনতা, মর্যাদা, সম্পর্ক ও মানবিকতার ওপর কী প্রভাব ফেলছে, তা বোঝার জন্য প্রয়োজন সমালোচনামূলক চিন্তা।
নিজের সময়কে বোঝার ক্ষেত্রে অতীতের ভূমিকা তাই গুরুত্বপূর্ণ। অতীত কেবল স্মৃতির ভান্ডার নয়, বর্তমানকে যাচাই করারও একটি আয়না। ইতিহাস আমাদের শেখায়, কোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থা, সামাজিক মূল্যবোধ কিংবা সাংস্কৃতিক বিশ্বাসই চিরস্থায়ী নয়। আবার অতীতের সবকিছু অতিক্রম করার মতো অপ্রয়োজনীয়ও নয়। কোন অভিজ্ঞতা আমাদের সমৃদ্ধ করেছে, কোন বিশ্বাস আমাদের সংকীর্ণ করেছে, কোন ভুলের পুনরাবৃত্তি আমরা এখনো করে চলেছি—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ইতিহাসের প্রয়োজন।
একইভাবে ভবিষ্যতের কল্পনাও বর্তমানকে বোঝার একটি কার্যকর উপায়। আজ আমরা যে সিদ্ধান্ত নিচ্ছি, ভবিষ্যতের মানুষ তার কী মূল্যায়ন করবে? পরিবেশ ধ্বংস, প্রকৃতির ওপর মানুষের আধিপত্য, যুদ্ধ, বৈষম্য কিংবা প্রযুক্তির অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার সম্পর্কে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের কোন প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করাবে? এই প্রশ্নগুলো বর্তমানের আত্মতুষ্টিকে ভেঙে দিতে পারে। কারণ ভবিষ্যতের সম্ভাব্য বিচারকে সামনে রাখলে বর্তমানের অনেক স্বাভাবিক বলে মেনে নেওয়া আচরণও নতুন করে প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
সাহিত্য, দর্শন ও শিল্পের কাজও অনেকটা এখানেই। এগুলো মানুষকে শুধু তার সময়ের গল্প শোনায় না, সময়ের প্রচলিত বোধের বাইরেও তাকাতে শেখায়। একজন সাহিত্যিক যখন সমকালীন জীবনের আড়ালে লুকিয়ে থাকা অসংগতি তুলে ধরেন, তখন তিনি নিজের সময়েরই একটি বিকল্প পাঠ নির্মাণ করেন। একজন দার্শনিক যখন প্রতিষ্ঠিত সত্যকে প্রশ্ন করেন, তখন তিনি সময়ের প্রচলিত চিন্তার সীমানা পরীক্ষা করেন। বিজ্ঞানও একইভাবে আমাদের শেখায়—কোনো ধারণাই প্রমাণ ও পর্যবেক্ষণের ঊর্ধ্বে নয়; নতুন প্রমাণ এলে পুরোনো ব্যাখ্যা সংশোধন করতে হয়।
অর্থাৎ নিজের সময়কে বুঝতে হলে শুধু সময়ের সঙ্গে চললেই চলে না, সময়ের প্রচলিত ধারণার বিরুদ্ধেও কখনো দাঁড়াতে হয়। এর জন্য প্রয়োজন চিন্তার স্বাধীনতা, ভিন্ন অভিজ্ঞতার প্রতি সংবেদনশীলতা এবং নিজের বিশ্বাসকে সংশোধন করার মানসিক প্রস্তুতি।
তবু কি মানুষ সম্পূর্ণভাবে নিজের সময়ের বাইরে যেতে পারবে? সম্ভবত না। কারণ সময়ের বাইরে দাঁড়ানোর যে কল্পনা, সেটিও কোনো না কোনো সময়ের ভাষা ও অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই তৈরি হয়। আমরা যত দূরেই যেতে চাই, আমাদের চিন্তার মধ্যে সমকালীনতার কিছু ছাপ থেকে যায়। কিন্তু এই সীমাবদ্ধতা মানুষকে চিন্তা থেকে বিরত রাখার কারণ হতে পারে না। বরং নিজের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সচেতন হওয়াই গভীরতর উপলব্ধির সূচনা।
হয়তো মানুষ কখনোই নিজের সময়ের সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ দর্শক হতে পারে না। সে একই সঙ্গে সময়ের অংশ, সময়ের সাক্ষী এবং সময়ের সমালোচক। তার জ্ঞান অসম্পূর্ণ, তার দৃষ্টিভঙ্গি সীমাবদ্ধ; কিন্তু প্রশ্ন করার ক্ষমতা তাকে সেই সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি দাঁড় করায়। নিজের সময়কে বোঝার জন্য তাই সময়ের বাইরে চলে যাওয়ার চেয়ে বেশি প্রয়োজন নিজের ভেতরের অদৃশ্য সীমারেখাগুলো চিনে নেওয়া।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু এই নয় যে, আমরা আমাদের সময়কে কতটা বুঝতে পারছি। আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, আমরা কি নিজেদের সময়ের প্রচলিত সত্যকে সন্দেহ করার সাহস রাখি? যে সময় আমাদের চিন্তা করতে শেখায়, সেই সময়ের চিন্তাকেই কি আমরা প্রশ্ন করতে পারি? নাকি ভবিষ্যৎ একদিন আমাদের দিকে তাকিয়ে এমন কিছু প্রশ্ন করবে, যেগুলোর উত্তর খুঁজতে আমরা আজও প্রস্তুত নই?
সম্ভবত কোনো সময়কে সত্যিকার অর্থে বুঝতে পারার প্রথম শর্ত হলো, সেই সময় সম্পর্কে নিজের বোঝাপড়াকেও প্রশ্ন করতে শেখা। কারণ মানুষ সময়ের বাইরে যেতে না পারলেও নিজের সময়ের অন্ধকারকে চিনতে শেখার মধ্য দিয়েই হয়তো তার সবচেয়ে দূরের দৃষ্টিতে পৌঁছাতে পারে।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট, কক্সবাজার।
অভিমত থেকে আরো পড়ুন