https://www.prothomalony.com/

18558

opinion

অভিমত

দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ: মূল্যায়ন কালের প্রেক্ষিতে

প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর ২০২৬ ০১:৪২

জন্ম মৃত্যু দুটিই শ্বাশত চিরন্তন সত্য। মৃত্যু সাধারণত প্রকৃতির রহস্যময় নিয়মানুসারে জীবনের স্বাভাবিক ক্রমপরিণতি বলে অভীহিত। সে পরিণতি অর্থাৎ মুত্যুকে আটকাতে মানুষ চিরতরে ব্যর্থ। তারপরও মানুষ প্রাণপণে চেষ্টা করে নিজেকে আরও ক’টা দিন বাঁচিয়ে রাখার জন্য। জর্জ বানার্ডশ বলতেন মানুষের অন্তত সাড়ে তিনশত বছর বেঁচে থাকা উচিত। তা না হলে একজন ব্যক্তির পক্ষে তার কর্মের প্রাপ্তির ভিত গড়া কিছুতেই সম্ভব হয় না। বানার্ডশ তার নিজের জীবন সম্বন্ধে গভীরভাবে বিশ্বাস করতেন। তাঁর ধারণা ছিল তিনি অন্ততঃ দেড় শত বছর বাঁচবেন যদি না তিনি কোন দূর্ঘটনায় পতিত হন। কিন্তু ১৯৫০ সালে ৯৪ বছর বয়সে হঠাৎ গোসলখানায় পা পিছলে তিনি মারা যান। আমাদের আপনজন প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ সর্বজন শ্রদ্ধেয় দার্শনিক, মানবহিতৈষী, অবিস্মরণীয় ও অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ আমাদের মধ্যে বেঁচেছিলেন ৯০ বছরেরও বেশী সময়। অনেক চেষ্টা তদবির করেও তাকে মাত্র আরও ক’টা দিন বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি।

দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফের মৃত্যুর মাসেক দিন আগে আমি তাঁর বাসায় গিয়েছিলাম। ভাল মন্দ অনেক আলাপ আলোচনার পর বিনয়ের সাথে জানতে চেয়েছিলাম, তিনি ক’দিন থেকে লিখছেন না কেন? বললাম আমার মত লক্ষ লক্ষ পাঠক আপনার লেখা পড়ার জন্য প্রতিদিন অধির আগ্রহে অপেক্ষা করছে। বললেন পা-এর ব্যথায় নড়াচড়া করা যায় না। মজা করে তাকে বলেছিলাম, দাদা পা-টা বদলে নিলে কেমন হয়। হেসে বলেছিলেন আর বদলে লাভ কি! ট্রেনে উঠার সময় তো হয়ে গিয়েছে। এ আলাপের পর মাসেক দিন তাঁর সাথে আমার যোগাযোগ ছিলনা, বিভিন্ন কাজে আমিও ছিলাম ভীষণ ব্যস্ত। একদিন ভোরে পূবালী ব্যাংকের পরিচালক আলহাজ্ব এম এ রকিব হঠাৎ আমাকে ফোন করে দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফের মৃত্যু সংবাদ জানালেন। তখন ক্ষনিকের জন্য হতভম্ব হয়ে পড়েছিলাম। ভাবছিলাম রকিব ভাই বোধ হয় মজা করছেন আমার সঙ্গে। খবরটা বোধ হয় সত্য নয়। তাৎক্ষনিক আমি তাঁর মেয়ে সাদিয়া চৌধুরী পরাগের কাছে ফোন করে নিশ্চিত হলাম। আমার জন্য এ ভীষণ দুঃসংবাদটি সত্যই হয়ে গেল।

১৯৭৪ সালে দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়। ঢাকায় থাকতাম তাঁর বাসায় যাওয়া আসা ছিল। সুযোগ পেলেই দু’কথা বলার চেষ্টা করতাম, প্রশ্ন করতাম কিছু জানার বা শিখার আগ্রহে বয়সের হিসাবে বেশ ফারাক। কিন্তু তিনি আদর করতেন বলেই পাশে যেতাম কথা বলতাম দাদা বলেই সম্বোধন করতাম। পরবর্তী পর্যায়ে বৈবাহিক সূত্রে দাদা নাতি সম্পর্ক আমাদের রয়েই গেল। মজা করে বলতেন তুমিতো আগে থেকেই আমার নাতি, আমি দাদা, বৈবাহিক সূত্রেও তুমি আমার নাতিন জামাই মন্দ না আমাদের সম্পর্ক আরো দৃঢ় হলো। আসলে রাশভারি এ মানুষটির ভিতরে যে আরও এক ভিন্ন মানুষ লুকিয়েছিল তার সঙ্গে মেলামিশা না করলে হয়ত জানতেই পারতামনা। আমি তাঁকে যেভাবে দেখেছি তার মহৎ জীবনের যতখানি জেনেছি, তারই নিরিখে কালের প্রেক্ষিতে তার মূল্যায়ন বক্ষ্যমান প্রবন্ধের লক্ষ্য। কাজটি নিঃসন্দেহে দূরূহ। মরহুম আজরফের সঙ্গে আমার যে গভীর ও আন্তরিক সম্পর্ক ছিল তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতেই এ দায়িত্ব আমাকে নিতে হলো।

অপরিচিত মানুষের সঙ্গে চট করে কথা বলতেন না দেওয়ান সাহেব। কিন্তু একবার মিশে গেলেই হয়, রীতিমত জমিয়ে কথা বলতেন। তাইতো অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে তার সঙ্গে। ক্লান্তিকর কাজের পর অসহ্য যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিত দেওয়ান আজরফের রসে ভরা মন্তব্য। স্বীয় মেধাবলে আত্মপ্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তিনি জয়ী হয়েছিলেন। জাত, ধর্ম, বর্ণ নিবিশেষে সকল মানুষকে ভালবাসতেন। ফলশ্রুতিতে শিক্ষা-হিতৈষী ও মানবপ্রেমিক হিসাবে এক অনুকরণীয় আদর্শের প্রতীক ও প্রেরণার উৎস হয়ে তিনি অমর হয়ে আছেন। শিক্ষা, সমাজসেবা ও মানব কল্যাণের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিচরণ করেছেন তিনি।

এ মূহুর্তে অনেক কিছুই মনে পড়ছে। অনেক স্মৃতি। কাগজে লিখতে গিয়ে বা অতীত জানার জন্য প্রতি মূহুর্তে প্রয়োজন হত তথ্য ও পরিসংখ্যান। সে সময় কম্পিউটার বা ইন্টারনেট ছিলনা । কিন্তু আমাদের ভরসা ছিলেন দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ। রাজনীতি থেকে অর্থনীতি প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং ভিয়েতনামের যুদ্ধ থেকে শুরু করে হাল আমলের উপসাগরীয় যুদ্ধ অথবা এ অঞ্চলে তথা উপমহাদেশের অতীত ও বর্তমান বিষয়াদি সম্পর্কে তার ছিল গভীর জ্ঞান। ছিলেন এক জীবন্ত তথ্য ভান্ডার। খুব কম লোকই তার কাছে কোনও কিছু জানতে চেয়ে হতাশ হয়ে ফিরেছেন। ধর্মীয় বিশ্বাসে একজন নিষ্ঠাবান মুসলমান হলেও ধ্যান-ধারণায় একজন যথার্থ মানুষের পরিচয়ে তিনি ধন্য হয়েছেন। তাই তিনি হিন্দু-মুসলমান, বৌদ্ধ-খৃষ্টান সকল সম্প্রদায়ের কাছে সমানভাবে সমাদৃত ছিলেন। এ যুগে বড় দুর্লভ এ ধরনের ভালবাসা। বিশ্ব বিশ্রুত অসাম্প্রদায়িক মনীষীদের সার্থক উত্তরসূরী হিসাবে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্পে জর্জরিত ও ইজম বিভ্রান্ত পৃথিবীর জন্য মহান শিক্ষাই যেন রেখে গেছেন দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ।

দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ অত্যন্ত বলিষ্ঠ নীতির অধিকারী ছিলেন। কোথাও কোন ভূল থাকলে স্পষ্টভাবে ধরিয়ে দিতে কোন দিনই দ্বিধা করতেন না। সামনে প্রশংসা করে পিছনে সমালোচনা করতে কখনও তাকে দেখা যায়নি। এ দিক দিয়েও তিনি ছিলেন ব্যতিক্রম। প্রায়শই দুঃখ করে বলতেন এ অঞ্চলের বেশীরভাগ পাঠক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত না করে গুরত্বহীন বিষয়গুলো নিয়েই ব্যস্ত হয়ে পড়েন। নিত্য দিনের জীবন যন্ত্রণা নিয়ে অসংখ্য খবর, প্রবন্ধ, নিবন্ধ প্রকাশ হলেও পাঠকদের সাড়া মিলে নিতান্তই কম। এ নিয়ে তার আক্ষেপ ছিল সতত। ফলে মাঝে মধ্যে অনুযোগের সুরে বলতেন আর কত লিখব। কাদের জন্যই লিখব। নিজেদের জীবন-যন্ত্রণা সম্পর্কেই মানুষ এত নিস্পৃহ। শুধু শুধু লিখে কাগজ নষ্ট করার মানে কিছু হয় কি? কোন দিনে উচ্চস্বরে কথা বলতে শুনিনি দেওয়ান আজরফের মুখে। সহকর্মী, আত্মীয়-স্বজন কারো সমস্যার কথা শুনলেই বিচলিত হয়ে পড়তেন তিনি। এক রাশভরি নিখাট ভদ্রলোক ছিলেন এ মহান ব্যক্তিটি। এ পরিচয়েই তিনি কিংবদন্তীর নায়ক হয়ে বেঁচে থাকবেন মানুষের হৃদয়ের মনিকোঠায়।

আজ মনে পড়ছে ঢাকার জালালাবাদ এসোসিয়েশনের অফিস কক্ষে বসে একদিন কোনও এক বিশিষ্ট ব্যক্তি সম্বন্ধে তাঁর মৃত্যুর পর কাগজের পাতায় স্মৃতিচারণ করে লেখার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। পাশের চেয়ারে বসেছিলেন দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ। ঐ প্রয়াত ব্যক্তির ছবি কাছে পাচ্ছিলামনা। রসিকতা করে দেওয়ান সাহেবকে বলেছিলাম দাদা প্রয়োজনে কোন কিছু না পেলে বড় সমস্যায় পড়তে হয়। বিচলিত হতে হয়। নিজের স্মৃতিচারণ করে বিস্তৃত জীবনের একটা লেখা তৈরী করে আমাকে দিয়ে যাবেন। সঙ্গে একটা ছবিও, যাতে করে  সহসাই লে-আউট করে ফেলতে পারি।

না, আমার এ আবদারটুকু তিনি রাখেননি। একেবারে নিঃশব্দে সবার কাছ থেকে তিনি বিদায় নিলেন। সে দিনের সে রসিকতা যে এত তাড়াতাড়ি নির্মম বাস্তব হয়ে দেখা দিবে তা ভাবতে এখনও ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু এটাতো কাগজের লে-আউট নয় যে, যখন খুশী একটাকে উঠিয়ে আরেকটা বসিয়ে দেয়া যায়। এটাতো জীবনের লে-আউট। একবার চলে গেলে শত চেষ্টা করেও ফিরিয়ে আনা যায়না। দেওয়ান সাহেব তো চলে গেলেন কিন্তু রেখে গেলেন অনেক স্মৃতি। সে স্মৃতি নিয়েই নূতন দিনের পথ চলা শুরু করতে হবে। এটাইতো নিয়তি, এটাই নিয়ম।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

অভিমত থেকে আরো পড়ুন