https://www.prothomalony.com/

18579

bangladesh

বাংলাদেশ

‘ব্লকেড ’৭১’: মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ফিলাডেলফিয়ার প্রতিবাদ স্মরণ

প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর ২০২৬ ২২:৫৯

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস শুধু দেশের ভেতরে সংঘটিত যুদ্ধ, প্রতিরোধ আর আত্মত্যাগের ইতিহাস নয়। একাত্তরে বাংলাদেশের মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন বিশ্বের নানা প্রান্তের বিবেকবান মানুষও। যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়ায় অস্ত্রবাহী জাহাজ অবরোধ করে পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন স্থানীয় কোয়েকার সম্প্রদায়ের কর্মী, শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মার্কিন নাগরিক। তাঁদের সেই সাহসী অবস্থান ছিল বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের পক্ষে এক অনন্য আন্তর্জাতিক সংহতি।

১৯৭১ সালের সেই বিস্মৃতপ্রায় ইতিহাস এবং প্রতিবাদে অংশ নেওয়া মানুষদের অবদান স্মরণ করতে গত শুক্রবার (৬ নভেম্বর) ফিলাডেলফিয়ায় অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘ব্লকেড ’৭১’ শীর্ষক প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনী ও স্মরণানুষ্ঠান।

ফিলাডেলফিয়ার ১২১৯ ভাইন স্ট্রিটে বিকেল চারটায় শুরু হওয়া এ আয়োজনে প্রদর্শিত হয় পরিচালক আরিফ ইউসুফ নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র ‘ব্লকেড’। পাশাপাশি ছিল ১৯৭১ সালের ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঐতিহাসিক দলিল ও আলোকচিত্রের প্রদর্শনী, শিল্পকর্ম তৈরির আয়োজন এবং খাবারের ব্যবস্থা। প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনীর পর অনুষ্ঠিত হয় আলোচনা পর্ব।

অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সানিপ মল্লিক। আলোচনার শুরুতে বক্তব্য দেন ফিলাডেলফিয়া সিটি কাউন্সিলের অ্যাট-লার্জ সদস্য ডা. নিনা আহমাদ। তিনি বলেন, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিদেশের মাটিতে সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের সাহসী ভূমিকার ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া জরুরি। এ ধরনের প্রামাণ্যচিত্র ইতিহাসের অনালোচিত অধ্যায় সম্পর্কে জানার সুযোগ তৈরি করে।

এ সময় তিনি প্রফেসর ডা. জিয়াউদ্দিন আহমেদের অবদানের কথাও উল্লেখ করেন। প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের সময় ১৯৭১ সালের ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের খুঁজে বের করা এবং তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনে তিনি পরিচালককে সহযোগিতা করেছিলেন।

পরে শ্রীদেবী শ্রীপতির সঞ্চালনায় বিশেষ আলোচনায় অংশ নেন পরিচালক আরিফ ইউসুফ, ১৯৭১ সালের অবরোধে অংশগ্রহণকারী ফিলিপস টেলরের ছেলে ড্যান টেলর এবং ওই আন্দোলনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ড. গেরি’স। আলোচনায় উপস্থিত ছিলেন প্রফেসর ডা. জিয়াউদ্দিন আহমেদও।

প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে আরিফ ইউসুফ জানান, দীর্ঘ প্রস্তুতি, তথ্য সংগ্রহ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকারের মধ্য দিয়ে তিনি এই ইতিহাস সংরক্ষণের চেষ্টা করেছেন। একাত্তরের সেই প্রতিবাদে অংশ নেওয়া মানুষদের স্মৃতি ও অভিজ্ঞতা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ধরে রাখাই ছিল তাঁর অন্যতম উদ্দেশ্য।

ড্যান টেলর তাঁর মা-বাবার স্মৃতিচারণা করে বলেন, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁরা কীভাবে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অস্ত্রবাহী জাহাজ অবরোধের আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন। তাঁদের সেই অবস্থানের পেছনে ছিল মানবিক দায়বদ্ধতা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানোর সাহস।

ড. গেরি’সও ১৯৭১ সালের অবরোধ আন্দোলনের সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততা এবং সেই সময়ের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। প্রফেসর ডা. জিয়াউদ্দিন আহমেদ বলেন, প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের উদ্যোগ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগের অভিজ্ঞতা ছিল ইতিহাসের এই অধ্যায় পুনরুদ্ধারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

আলোচনায় বক্তারা বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রাম আন্তর্জাতিক পরিসরেও মানুষের বিবেক ও মানবিকতাকে আলোড়িত করেছিল। ফিলাডেলফিয়ায় অস্ত্রবাহী জাহাজ অবরোধের ঘটনা তারই একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিদেশি নাগরিকদের এমন ভূমিকা যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও প্রচার করা প্রয়োজন।

অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে সংগীত পরিবেশন করেন শিল্পী দেবী (Devi)। তাঁর সংগীত পরিবেশনার মধ্য দিয়ে স্মরণানুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে।

আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত ছিল সাউথ এশিয়ান আমেরিকান ডিজিটাল আর্কাইভ (SAADA)। যুক্তরাষ্ট্রে দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত আমেরিকানদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও অবদান সংরক্ষণ এবং প্রচারে কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি। ঐতিহাসিক দলিল, আর্কাইভ, প্রদর্শনী, বই ও শিক্ষামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে মার্কিন সমাজে দক্ষিণ এশীয়দের অবদান তুলে ধরাই এর অন্যতম লক্ষ্য।

অনুষ্ঠানটি বাস্তবায়নে ফিলাডেলফিয়া সিটি কাউন্সিলের অ্যাট-লার্জ সদস্য ডা. নিনা আহমাদ নগর তহবিল নিশ্চিত করেন। আয়োজকেরা অনুষ্ঠানটির পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে তাঁর সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ফিলাডেলফিয়ার অস্ত্রবাহী জাহাজ অবরোধের ঘটনা কেবল একটি প্রতিবাদের স্মৃতি নয়; এটি দূরদেশের মানুষের সঙ্গে বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষের সংহতিরও দলিল। ‘ব্লকেড ’৭১’ প্রামাণ্যচিত্র ও স্মরণানুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে সেই ইতিহাস আবারও ফিরে এসেছে আলোচনায়। স্বাধীনতার পক্ষে একাত্তরে যাঁরা নিজ দেশের সীমানার বাইরে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করেছিলেন, তাঁদের অবদান স্মরণ করার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের আন্তর্জাতিক ইতিহাসও সমৃদ্ধ হলো। 

বাংলাদেশ থেকে আরো পড়ুন