https://www.prothomalony.com/
18548
opinion
আমি একটু অন্যরকম মানুষ। ভালো-মন্দ, পক্ষে-বিপক্ষে, প্রতিটি বিষয়ই উল্টেপাল্টে দেখা, প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্ন করা এবং কোনো কিছুকে অন্ধভাবে মেনে না নেওয়া আমার স্বভাব। এ কারণে অনেকেই আমাকে জটিল মানুষ মনে করেন। কেউ কেউ আমার রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও বিভ্রান্ত হন। কখনো তাঁদের মনে হয়, আমি আওয়ামী লীগের সমর্থক; কখনো মনে করেন বিএনপির পক্ষের মানুষ। আবার কারও ধারণা, আমি জামায়াতের অনুসারী; সাম্প্রতিক সময়ে কেউ কেউ আমাকে এনসিপির সমর্থক বলেও বিবেচনা করছেন। অথচ আমার বক্তব্য খুব পরিষ্কার; আমি কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের পরিচয়ে নিজেকে সীমাবদ্ধ করতে চাই না।
আমি বাংলাদেশপন্থি মানুষ। দেশের স্বার্থ, মানুষের জীবন, জনস্বাস্থ্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা যেখানে গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে প্রচলিত রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে বাস্তবতা আমার কাছে বেশি মূল্যবান। কোনো বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তোলা মানেই কোনো দলের বিরোধিতা করা নয়; আবার কোনো প্রচলিত ব্যবস্থার সমালোচনা করলেই কাউকে বিশেষ রাজনৈতিক মতাদর্শের অনুসারী বানিয়ে দেওয়া যায় না। আমার কাছে দেশপ্রেমের অর্থ হচ্ছে, দেশের মানুষের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে; এমন যেকোনো অভ্যাস, সংস্কৃতি কিংবা ব্যবস্থাকে প্রশ্ন করার সাহস রাখা। মানুষ আমার সঙ্গে একমত হবেন, নাকি দ্বিমত পোষণ করবেন, সেটি তাঁদের নিজস্ব বিবেচনার বিষয়। কিন্তু কোনো ধারণা সমাজে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে বলেই সেটিকে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে রাখা যাবে না।বিশেষ করে যখন কোনো সামাজিক প্রবণতার সঙ্গে জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ কিংবা মানুষের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তার প্রশ্ন জড়িয়ে থাকে, তখন সেই প্রবণতা নিয়ে আলোচনা করা জরুরি। আমার বর্তমান উদ্বেগও তেমন একটি বিষয়কে ঘিরে।
আমি এখানে কোনো রাজনৈতিক বিতর্ক সৃষ্টি করতে চাই না, কাউকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করাও আমার উদ্দেশ্য নয়। আমি কথা বলতে চাই আমাদের শহর ও জনপদে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠা ছাদবাগান সংস্কৃতি নিয়ে। যে সংস্কৃতিকে অনেকে সৌন্দর্য, শখ, বিনোদন এবং আধুনিক জীবনযাপনের প্রতীক হিসেবে দেখছেন, তার কিছু সম্ভাব্য নেতিবাচক দিকও আমাদের বিবেচনায় নেওয়া উচিত। বিশেষ করে ডেঙ্গুর বিস্তার, মশার প্রজনন, ভবনের ছাদের স্থায়িত্ব এবং নগরবাসীর স্বাস্থ্যঝুঁকির সঙ্গে এই প্রবণতার কোনো সম্পর্ক আছে কি না, তা গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা দরকার। জনপ্রিয়তার মোহে পড়ে আমরা যেন কোনো সম্ভাব্য বিপদকে উপেক্ষা না করি। আমি এই ছাদবাগান সংস্কৃতিকে ফ্যাশন হিসেবে দেখছি। আমার কথা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। আমাকে কেউ কেউ গালমন্দ করতে পারেন। কিন্তু আমি সোজাসাপ্টা কথা বলার মানুষ। তাই এটাকে আত্মঘাতী ফ্যাশন বলছি।
আমার ধারণা, আমাদের দেশে ছাদবাগান জনপ্রিয় করে তোলার ক্ষেত্রে গণমাধ্যমেরও একটি ভূমিকা রয়েছে। এ প্রসঙ্গে চ্যানেল আইয়ের কৃষিবিষয়ক অনুষ্ঠান এবং শাইখ সিরাজের ছাদবাগান নিয়ে প্রচারিত প্রতিবেদন ও সাক্ষাৎকারের কথা আমার মনে পড়ে। এসব অনুষ্ঠান অনেক মানুষকে ছাদে গাছ লাগাতে উৎসাহিত করেছে; এমন ধারণা অমূলক নয়। তবে কোনো একটি ব্যক্তি বা গণমাধ্যমকে ছাদবাগানের বিস্তার কিংবা ডেঙ্গু বৃদ্ধির জন্য সরাসরি দায়ী করার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ আমার হাতে নেই। আমার বক্তব্যের উদ্দেশ্য কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা নয়; বরং একটি জনপ্রিয় সামাজিক প্রবণতার পরিণতি নিয়ে আলোচনা শুরু করা।
একটা সময়ে যেসব পরিবারের বাড়ির সামনে বা আশপাশে গাছ লাগানোর মতো জমি ছিল না, তাঁদের কাছে ছাদবাগান ছিল প্রকৃতির সান্নিধ্য পাওয়ার একটি সুন্দর উপায়। শহরের সীমিত জায়গায় কিছু ফুল, ফল, সবজি কিংবা ঔষধি গাছ লাগিয়ে তাঁরা নিজেদের মতো করে সবুজ পরিবেশ তৈরি করেছেন। এই উদ্যোগের ভালো দিক অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু সমস্যা দেখা দেয় যখন একটি সীমিত পরিসরের শখ ধীরে ধীরে সামাজিক ফ্যাশনে পরিণত হয় এবং প্রয়োজন-অপ্রয়োজন বিবেচনা না করেই সবাই সেই প্রবণতা অনুসরণ করতে শুরু করেন।
বর্তমানে অনেক শহরে এমন বাড়িও দেখা যায়, যেগুলোর সামনে কিংবা আঙিনায় যথেষ্ট খালি জমি রয়েছে। সেই জমিতে ফলদ, বনজ, ঔষধি কিংবা শাকসবজির বাগান করার সুযোগও আছে। তারপরও বাড়ির ছাদ, বারান্দা এবং জানালার গ্রিলে অসংখ্য টব সাজিয়ে বাগান করাকে অনেকে বেশি আধুনিক ও আকর্ষণীয় মনে করছেন। প্রশ্ন হচ্ছে, যেখানে মাটিতে গাছ লাগানোর সুযোগ রয়েছে, সেখানে কেন এমনভাবে ছাদকে বাগানে রূপান্তরিত করতে হবে, যার জন্য নিয়মিত পানি সরবরাহ, নিষ্কাশনব্যবস্থা, ছাদের অতিরিক্ত ভার বহনের সক্ষমতা এবং রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়গুলো আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন?
একটি শখ যখন পরিবেশ ও স্থাপনার নিরাপত্তা বিবেচনা ছাড়াই অনুসরণ করা হয়, তখন তার উপকারের পাশাপাশি ক্ষতির সম্ভাবনাও তৈরি হয়। আমার আপত্তি গাছের প্রতি নয়, সবুজের প্রতিও নয়। আমার প্রশ্ন এমন এক ফ্যাশন নিয়ে, যেখানে বাড়ির সামনে পর্যাপ্ত জমি থাকা সত্ত্বেও ছাদেই বাগান করতে হবে; এমন একটি মানসিকতা তৈরি হয়েছে। আমরা কি শখ পূরণের পাশাপাশি তার সম্ভাব্য ঝুঁকিগুলোও বিবেচনা করছি?
ছাদবাগান নিয়ে আমার সবচেয়ে বড় উদ্বেগ ডেঙ্গুর বিস্তার। বাংলাদেশে ডেঙ্গু এখন আর শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক সমস্যা নয়; দেশের বিভিন্ন শহর ও জনপদেও এই রোগের প্রকোপ দেখা যাচ্ছে। এ অবস্থায় মশার প্রজননস্থল শনাক্ত করা এবং সেগুলো ধ্বংস করা অত্যন্ত জরুরি। এডিস মশা সাধারণত জমে থাকা তুলনামূলক পরিষ্কার পানিতে ডিম পাড়ে। ফুলের টব, টবের নিচের ট্রে, পানির পাত্র, পরিত্যক্ত বোতল, ছাদের নালা, ড্রাম কিংবা অন্য কোনো পাত্রে পানি জমে থাকলে সেখানে এডিস মশার বংশবিস্তারের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
ছাদবাগানে প্রতিদিন বা নিয়মিত পানি দেওয়া হয়। পানি দেওয়ার সময় গাছের গোড়ায় যতটা পানি পড়ে, তার বাইরেও অনেকটা পানি টবের গায়ে, নিচের ট্রেতে কিংবা ছাদের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়তে পারে। কোনো কোনো টবের নকশা, নিচের পাত্র কিংবা আশপাশের অগোছালো ব্যবস্থাপনায় পানি আটকে থাকে। বৃষ্টির পানি যুক্ত হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। এসব স্থানে জমে থাকা পানি নিয়মিত অপসারণ না করলে মশার প্রজননের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হতে পারে।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি; এডিস মশা শুধু ছাদবাগানেই জন্মায় না, কিংবা ময়লা পানিতে জন্মানোর চেয়ে পরিষ্কার পানিতে কয়েক গুণ বেশি বংশবিস্তার করে; এমন সরলীকৃত দাবি সব পরিস্থিতিতে সঠিক নয়। এডিস মশার প্রজননের জন্য পানির পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি পাত্রের ধরন, পানির স্থায়িত্ব, পরিবেশ ও অন্যান্য উপাদানও গুরুত্বপূর্ণ। ফলে ছাদবাগানকে ডেঙ্গু বিস্তারের একমাত্র কারণ বলা বৈজ্ঞানিকভাবে সমর্থনযোগ্য হবে না। কিন্তু ছাদবাগানের কারণে যদি কোথাও অনিয়ন্ত্রিতভাবে পানি জমে থাকে, তবে সেটি যে মশার প্রজননস্থল হয়ে উঠতে পারে, তা উপেক্ষা করারও সুযোগ নেই। আমার বক্তব্য হচ্ছে, যেসব স্থানে প্রতিদিন পানি ব্যবহার করা হয়, সেখানে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা ঠিক আছে কি না, টবের নিচে পানি জমছে কি না এবং বৃষ্টির পর ছাদে কোথাও পানি আটকে থাকছে কি না, তা নিয়মিত পরীক্ষা করা উচিত। ডেঙ্গু প্রতিরোধের জন্য বাড়ির ছাদও নজরদারির বাইরে থাকতে পারে না। সৌন্দর্যের জন্য সাজানো একটি বাগান যেন অজান্তেই মশার প্রজননস্থলে পরিণত না হয়, সেটি নিশ্চিত করা বাড়ির মালিকেরও দায়িত্ব।
আমাদের দেশে ছাদবাগানকে ঘিরে যে সামাজিক উৎসাহ তৈরি হয়েছে, তার সঙ্গে আরেকটি বিষয় যুক্ত হয়েছে; অবসর কাটানোর একটি আকর্ষণীয় মাধ্যম হিসেবে বাগান করার প্রবণতা। সম্প্রতি আমার পরিচিত দুজনের কথা মনে পড়ছে। তাঁরা তাঁদের স্ত্রীদের অবসর সময়কে আনন্দময় করার জন্য ছাদে বাগান তৈরির উদ্যোগ নিয়েছেন। তাঁদের এই উদ্দেশ্যকে আমি নেতিবাচকভাবে দেখতে চাই না। পরিবারের সদস্যদের আনন্দ, মানসিক প্রশান্তি এবং প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তাঁদের বাড়ির সামনেই যথেষ্ট খালি জমি রয়েছে, যেগুলো নিয়মিত লোক লাগিয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা হয়। আমার প্রশ্ন, সেই জমিগুলোতেই যদি পরিকল্পিতভাবে ফুল, ফল, শাকসবজি কিংবা ঔষধি গাছের বাগান তৈরি করা যায়, তাহলে ছাদে অতিরিক্ত পানি, মাটি ও টবের ব্যবস্থাপনার ঝুঁকি নেওয়ার প্রয়োজন কতটা?
মাটিতে বাগান করলে গাছের শিকড় স্বাভাবিকভাবে বিস্তারের সুযোগ পায়, বৃষ্টির পানি মাটিতে প্রবেশ করতে পারে এবং উপযুক্ত পরিকল্পনায় বাড়ির আশপাশের পরিবেশও সুন্দর রাখা যায়। অবশ্য মাটির বাগানেও পানি জমতে দেওয়া যাবে না; সেখানে পরিত্যক্ত পাত্র কিংবা অন্য কোনো স্থানে পানি আটকে থাকলে মশার প্রজনন হতে পারে। তবু যেখানে নিরাপদে মাটিতে বাগান করার সুযোগ রয়েছে, সেখানে ছাদের ওপর অতিরিক্ত ভার সৃষ্টি করে একই কাজ করার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়।
আমাদের সমাজে অনেক সময় কোনো কাজ জনপ্রিয় হয়ে উঠলে তার বিকল্পগুলোকে আমরা গুরুত্ব দিতে ভুলে যাই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সুন্দর ছাদবাগানের ছবি, পরিচিতজনের প্রশংসা কিংবা প্রতিবেশীর সঙ্গে প্রতিযোগিতা; এসবও মানুষের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে। ফলে বাগান করার মূল উদ্দেশ্য, অর্থাৎ প্রকৃতির সান্নিধ্য, স্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং আনন্দ লাভের বিষয়টি কখনো কখনো বাহ্যিক প্রদর্শনীর আড়ালে চলে যায়। আমি মনে করি, বাড়ির সামনে খালি জমি থাকলে সেটিকে পরিকল্পিত বাগানে রূপান্তরিত করা, গাছের যত্ন নেওয়া এবং পরিবারের সদস্যদের সেই কাজে যুক্ত করা আরও কার্যকর বিকল্প হতে পারে। এতে অবসরও সুন্দরভাবে কাটবে, বাড়ির চারপাশও সবুজ হবে, আর ছাদকে বাগানে রূপান্তরিত করার আগে তার নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে যে বাড়তি চিন্তা করতে হয়, তার অনেকটাই এড়ানো সম্ভব হবে। তবে যে পদ্ধতিতেই বাগান করা হোক, পানি জমতে না দেওয়া এবং নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার বিষয়টি অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে।
ছাদবাগানের সম্ভাব্য ক্ষতি শুধু মশার প্রজননস্থল তৈরির আশঙ্কায় সীমাবদ্ধ নয়; ভবনের স্থায়িত্বের প্রশ্নটিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। একটি ভবনের ছাদ নির্দিষ্ট নকশা, উপকরণ ও ভার বহনের সক্ষমতা বিবেচনা করে নির্মাণ করা হয়। সেখানে অতিরিক্ত মাটি, বড় টব, পানিভর্তি পাত্র, ভারী বাগানসামগ্রী কিংবা অন্য কোনো স্থাপনা যোগ করার আগে প্রকৌশলগত বিষয়গুলো বিবেচনা করা দরকার। মাটি ও পানির সম্মিলিত ওজন অনেক সময় ধারণার চেয়ে বেশি হতে পারে। ছাদে পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে গেলে কিংবা জলরোধী স্তরে ত্রুটি দেখা দিলে দীর্ঘমেয়াদে স্যাঁতসেঁতে ভাব, পানি চুইয়ে পড়া, প্লাস্টার নষ্ট হওয়া এবং অন্যান্য রক্ষণাবেক্ষণজনিত সমস্যা তৈরি হতে পারে। গাছের শিকড়, অপরিকল্পিত টব স্থাপন, নিয়মিত পানি দেওয়ার পদ্ধতি এবং ড্রেনের ওপর ময়লা জমে থাকাও পরিস্থিতিকে জটিল করতে পারে। অবশ্য ছাদবাগান করলেই ভবনের আয়ু কমে যায়, এমন সিদ্ধান্ত দেওয়া ঠিক হবে না। যথাযথ নকশা, উপযুক্ত জলরোধী ব্যবস্থা, নিরাপদ ভারবণ্টন এবং সঠিক নিষ্কাশনব্যবস্থা থাকলে পরিকল্পিত ছাদবাগান করা সম্ভব। সমস্যা তৈরি হয় যখন এসব বিষয় যাচাই না করেই কেবল সৌন্দর্য বা শখের জন্য ছাদে বাগান স্থাপন করা হয়।
আমার পরিচিত কয়েকজন তাঁদের ভবনের ছাদে স্যাঁতসেঁতে ভাব ও পানি চুইয়ে পড়ার সমস্যার কথা জানিয়েছেন। তবে তাঁদের অভিজ্ঞতা থেকে সব ছাদবাগানের ক্ষেত্রে একই সিদ্ধান্ত টানা যায় না; প্রতিটি ভবনের অবস্থা আলাদাভাবে পরীক্ষা করা দরকার। এ কারণেই আমি মনে করি, ছাদবাগান করার আগে ভবনের নকশা ও ভার বহনের সক্ষমতা সম্পর্কে যোগ্য প্রকৌশলীর পরামর্শ নেওয়া উচিত। পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা ঠিক আছে কি না, জলরোধী স্তর অক্ষত আছে কি না এবং টবের অবস্থান নিরাপদ কি না, সেসবও পরীক্ষা করতে হবে। একই সঙ্গে ভবনের ছাদে নিয়মিত পানি জমছে কি না, ড্রেন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে কি না এবং নিচের তলায় কোনো স্যাঁতসেঁতে দাগ দেখা দিচ্ছে কি না, সেদিকেও নজর রাখা জরুরি। একটি বাড়ি মানুষের দীর্ঘদিনের সঞ্চয় ও পরিশ্রমের ফল। সাময়িক সৌন্দর্য কিংবা শখের কারণে সেই সম্পদের স্থায়িত্ব ঝুঁকির মুখে পড়ুক, তা নিশ্চয়ই কেউ চাইবেন না। তাই ছাদবাগানের সৌন্দর্যের পাশাপাশি এর রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়, সম্ভাব্য ক্ষতি এবং ভবনের নিরাপত্তা নিয়েও আমাদের সচেতন আলোচনা হওয়া দরকার।
আমি জানি, এই লেখার সঙ্গে অনেকেই একমত হবেন না। কেউ বলতে পারেন, ছাদবাগান তো পরিবেশকে সবুজ করে, গরম কমাতে সাহায্য করতে পারে, মানুষকে মানসিক প্রশান্তি দেয় এবং বাড়িতে নিরাপদ সবজি উৎপাদনের সুযোগ তৈরি করে। এসব যুক্তির যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। পরিকল্পিত ছাদবাগান নগরজীবনে সবুজের ঘাটতি পূরণে ভূমিকা রাখতে পারে। তাই ছাদবাগান সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়ার দাবি তোলার আগে এর উপকারিতা, ঝুঁকি এবং নিরাপদ ব্যবস্থাপনার বিষয়গুলো বিবেচনা করা উচিত। আমার মূল বক্তব্য ছাদে গাছ লাগানোর বিরুদ্ধে অন্ধ অবস্থান নেওয়া নয়; বরং অপরিকল্পিত ছাদবাগান, পানি জমার ঝুঁকি, মশার সম্ভাব্য প্রজননস্থল এবং ভবনের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা।
একইভাবে ডেঙ্গুর বিস্তারকে কেবল ছাদবাগানের ফল হিসেবে দেখাও ঠিক হবে না। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, পানি নিষ্কাশনের দুর্বলতা, নির্মাণাধীন ভবনের জমে থাকা পানি, পরিত্যক্ত পাত্র, ছাদ ও বারান্দার বিভিন্ন জলাধার, জনসচেতনতার ঘাটতি এবং মশা নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত ব্যবস্থাপনার অভাবসহ বহু বিষয় ডেঙ্গুর বিস্তারে ভূমিকা রাখতে পারে। কোন এলাকায় ছাদবাগানের সঙ্গে এডিস মশার ঘনত্ব কিংবা ডেঙ্গুর প্রকোপের সম্পর্ক কতটা, তা জানতে মাঠপর্যায়ের গবেষণা, মশার প্রজননস্থল জরিপ এবং নির্ভরযোগ্য তথ্য-উপাত্ত প্রয়োজন। আমার আশঙ্কাকে তাই চূড়ান্ত বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত হিসেবে নয়, বরং গুরুত্ব দিয়ে যাচাই করার মতো একটি জনস্বাস্থ্যসংক্রান্ত প্রশ্ন হিসেবে দেখা উচিত। নগর কর্তৃপক্ষ, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, কীটতত্ত্ববিদ, পরিবেশবিদ, স্থাপত্যবিদ ও প্রকৌশলীরা সম্মিলিতভাবে বিষয়টি পরীক্ষা করতে পারেন। ছাদবাগানপ্রেমীদেরও এ আলোচনায় যুক্ত করা দরকার, যাতে তাঁদের অভিজ্ঞতা এবং বাস্তব সমস্যাগুলো জানা যায়।
কোনো সামাজিক অভ্যাসকে প্রশ্ন করা মানেই সেটিকে নিষিদ্ধ করার দাবি নয়। বরং সেই অভ্যাস কীভাবে নিরাপদ, স্বাস্থ্যসম্মত ও পরিবেশবান্ধব করা যায়, তা খুঁজে বের করাই বুদ্ধিমানের কাজ। তবে যেখানে ছাদে পানি জমে মশার প্রজনন হচ্ছে, সেখানে অবিলম্বে ব্যবস্থা নিতে হবে। টবের নিচের পাত্র খালি রাখা, জমে থাকা পানি অপসারণ করা, ড্রেন পরিষ্কার রাখা এবং নিয়মিত ছাদ পরিদর্শনের মতো সহজ পদক্ষেপও গুরুত্বপূর্ণ। আমরা যেন সৌন্দর্যের প্রতি আকর্ষণ থেকে স্বাস্থ্যঝুঁকিকে অবহেলা না করি, আবার যথাযথ প্রমাণ ছাড়া একটি ভালো উদ্যোগকেও সামগ্রিকভাবে দোষারোপ না করি।
লিখতে গিয়ে লেখাটা দীর্ঘ হয়ে গেল! এখানেই সমাপ্তি টানতে চাচ্ছিলাম। কিন্তু আমার ভেতরে জমে থাকা কথা শেষ না হওয়ায়; আমাকে আরো কিছু বলতে হচ্ছে, ডেঙ্গু আমাদের জন্য কোনো হালকা সমস্যা নয়। প্রতিবছর এই রোগে মানুষের মৃত্যু, পরিবারের দুর্ভোগ এবং চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর চাপ আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। এই পরিস্থিতিতে মশার সম্ভাব্য প্রতিটি প্রজননস্থল শনাক্ত করা জরুরি। বাড়ির আঙিনা, বারান্দা, ছাদ, ফুলের টব, পানির পাত্র কিংবা নির্মাণাধীন স্থাপনা; কোনো স্থানই অবহেলার সুযোগ নেই। আমার মনে হয়, ছাদবাগান নিয়ে একটি বিস্তৃত জনসচেতনতামূলক আলোচনা এখন সময়ের দাবি। সেই আলোচনায় ছাদবাগানের উপকারিতা যেমন থাকবে, তেমনি থাকবে অপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার ঝুঁকি, ডেঙ্গু প্রতিরোধ, পানি নিষ্কাশন এবং ভবনের স্থায়িত্বের বিষয়গুলো।
ছাদবাগান করতে চাইলে করুন, কিন্তু আগে নিশ্চিত হোন যে আপনার ভবন সেই অতিরিক্ত ভার বহন করতে সক্ষম, পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা কার্যকর এবং কোথাও মশার প্রজননের সুযোগ তৈরি হচ্ছে না। বাড়ির সামনে পর্যাপ্ত জমি থাকলে সেখানে বাগান করার বিকল্পটিও বিবেচনা করুন। শুধু ফ্যাশনের কারণে ছাদে বাগান করতেই হবে; এমন মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসা দরকার। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত সবুজ পরিবেশ তৈরি করা, বাড়ির সৌন্দর্য বৃদ্ধি করা এবং মানুষের জীবনকে আরও নিরাপদ করা। উপরে উল্লেখিত তিনটির মধ্যে কোনো বিরোধ তৈরি হলে আবেগের বদলে যুক্তি, তথ্য ও বাস্তবতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আমাকে গালি দিন কোন অসুবিধা নাই। কিন্তু আমি কাউকে গালাগাল করতে বলছি না, কাউকে তাঁর শখ ত্যাগ করতেও জোর করছি না। তবে এটা মনে করিয়ে দিচ্ছি, শখ বেশি দিন স্থায়ী হয় না। শখ মরে গেলে তখন ছাদ বাগানের কি যে বিতিকিচ্ছিরি অবস্থা হয়, সেটা কেবল ভুক্তভোগীরাই জানেন। আমার নেতিবাচক কথা বলার কারণ ; আমি শুধু চাই, আমরা বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখি, গবেষণার মাধ্যমে প্রকৃত ঝুঁকি নির্ণয় করি এবং প্রয়োজনীয় সতর্কতা গ্রহণ করি। আমার আশঙ্কা সত্য হোক বা আংশিক সত্য হোক, জনস্বাস্থ্য ও ভবনের নিরাপত্তার প্রশ্নে আগেভাগে সতর্ক হওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
তবে ছাদবাগান নিষিদ্ধ করার আন্দোলনের পরিবর্তে অপরিকল্পিত ছাদবাগান রোধ, পানি জমার সব উৎস নির্মূল এবং নিরাপদ বাগানচর্চা নিশ্চিত করার আন্দোলনই বেশি যুক্তিসংগত। ছোট্ট একটি মশার কামড়ে যেন আর কোনো পরিবারকে প্রিয়জন হারাতে না হয়, আর সামান্য অসতর্কতার কারণে যেন কোনো ভবন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, এই সচেতনতাই হোক আমাদের সম্মিলিত অঙ্গীকার। জনপ্রিয়তার স্রোতে গা ভাসানোর আগে আমাদের ভাবতে হবে, যে কাজটি করছি, তা সত্যিই কতটা উপকারী এবং তার আড়ালে কোনো অদৃশ্য ঝুঁকি লুকিয়ে আছে কি না। দেশকে ভালোবাসার অর্থ আমার কাছে এটাই; প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্ন করা, যুক্তির ভিত্তিতে সত্য অনুসন্ধান করা এবং মানুষের কল্যাণে প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের পক্ষে দাঁড়ানো।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশুসাহিত্যিক। সাবেক সভাপতি মৌলভীবাজার প্রেসক্লাব ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, মৌলভীবাজার বিএনএসবি চক্ষু হাসপাতাল, বাংলাদেশ।
#
ঠিকানা:
আবদুল হামিদ মাহবুব
'কমলকুঞ্জ'
কালেঙ্গা সড়ক
সোনাপুর
মৌলভীবাজার-৩২০০ ।
মোবাইল: ০১৭১১১৭৮৭৮৪
ই-মেইল: [email protected]
অভিমত থেকে আরো পড়ুন