https://www.prothomalony.com/
18530
opinion
পৃথিবীর কোনো এক দূরদেশের শহরে সন্ধ্যা নামছে। জানালার বাইরে গাছের পাতা ঝরে পড়ছে, বাতাসে শীতের আভাস। রাস্তায় মানুষের ব্যস্ততা, ঘরে ফেরার তাড়া, পরিচিত শহরের নিজস্ব ঋতুচক্র। অথচ দূরদেশে বসবাসকারী কোনো এক বাঙালির মনে হঠাৎ ভেসে উঠছে অন্য এক দৃশ্য—বাংলার মাঠে পেকে ওঠা ধান, শিশিরভেজা ঘাস, গ্রামের সরু পথ, ভোরের কুয়াশা আর নতুন ফসলের ঘ্রাণ। যে প্রকৃতি থেকে সে বহু দূরে, সেই প্রকৃতিই যেন মুহূর্তের জন্য তার মনের ভেতর জীবন্ত হয়ে ওঠে। তখন তার কাছে বাইরের ঋতু আর মনের ঋতু এক থাকে না। প্রকৃতির ক্যালেন্ডারে যে হেমন্ত অনুপস্থিত, স্মৃতির ভেতর সেই হেমন্তই হয়তো সবচেয়ে উপস্থিত।
প্রশ্ন জাগে, প্রবাসে হেমন্ত কি সত্যিই প্রকৃতির একটি ঋতু, নাকি স্মৃতির মধ্য দিয়ে ফিরে আসা এক হারানো সময়? মানুষ যখন নিজের পরিচিত ভূগোল ছেড়ে অন্য কোনো দেশে বসবাস শুরু করে, তখন কি তার ভেতরে আরেকটি ভূগোল তৈরি হয়, যেখানে ফেলে আসা প্রকৃতি, মানুষ, ভাষা ও অভিজ্ঞতা পাশাপাশি বেঁচে থাকে?
ঋতু শুধু আবহাওয়ার পরিবর্তন নয়; মানুষের জীবন ও সংস্কৃতির সঙ্গেও তার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। বাংলাদেশের হেমন্তের সঙ্গে কৃষিজীবন, পাকা ধান, নবান্ন, গ্রামীণ উৎসব, পারিবারিক স্মৃতি ও শৈশবের বহু অভিজ্ঞতা জড়িয়ে আছে। কারও কাছে হেমন্ত মানে বাবার সঙ্গে মাঠে যাওয়া, কারও কাছে মায়ের রান্নাঘরে নতুন চালের ঘ্রাণ, কারও কাছে বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে গ্রামের পথে ঘুরে বেড়ানো। এসব অভিজ্ঞতা সময়ের সঙ্গে অতীত হয়ে যায়, কিন্তু তাদের অনুভূতি মানুষের মন থেকে সহজে মুছে যায় না। ফলে একটি ঋতু একসময় প্রকৃতির অভিজ্ঞতার পাশাপাশি ব্যক্তিগত স্মৃতিরও বাহক হয়ে ওঠে।
প্রবাসে এই সম্পর্কটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে দেখা দেয়। কারণ সেখানে মানুষ শুধু একটি দেশ ছেড়ে আসে না; অনেক সময় ছেড়ে আসে পরিচিত ঋতুর ভাষা, প্রকৃতির চেনা রূপ, দৈনন্দিন জীবনের অভ্যাস এবং সম্পর্কের একটি দীর্ঘ পরিসর। নতুন দেশে সে নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেয়। কাজ করে, সংসার গড়ে, বন্ধুত্ব তৈরি করে, নতুন সমাজের অংশ হয়। কিন্তু তার ভেতরে ফেলে আসা দেশের একটি মানসিক ভূগোলও থেকে যায়। সেই ভূগোলে হয়তো পুরোনো বাড়ির উঠোন আছে, আছে গ্রামের রাস্তা, পরিচিত নদী, শীতের সকালের কুয়াশা কিংবা হেমন্তের সোনালি মাঠ।
মানুষের স্মৃতির একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, তা কেবল অতীতকে সংরক্ষণ করে না; অনেক সময় অতীতকে নতুন করে নির্মাণও করে। সময়ের ব্যবধানে কোনো অভিজ্ঞতার কিছু অংশ স্পষ্ট থাকে, কিছু অংশ ঝাপসা হয়ে যায়। আবার কোনো সাধারণ ঘটনা পরবর্তী জীবনে অসাধারণ গুরুত্ব পেয়ে ওঠে। শৈশবে যে গ্রামের পথ দিয়ে প্রতিদিন হেঁটে যাওয়া হতো, দূরদেশে বসে সেই পথই একদিন হয়ে উঠতে পারে জীবনের সবচেয়ে আপন দৃশ্য। যে ঋতুকে একসময় স্বাভাবিক মনে হতো, দূরে চলে যাওয়ার পর তার অনুপস্থিতিই তাকে বিশেষ অর্থ দেয়।
এখানে স্মৃতি শুধু অতীতের প্রতি আবেগ নয়; বর্তমানের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক তৈরিরও একটি মাধ্যম। কোনো পরিচিত গান, খাবারের স্বাদ, ভাষার উচ্চারণ কিংবা বাতাসে ভেসে আসা কোনো গন্ধ হঠাৎ মানুষকে বহু দূরের একটি সময়ে ফিরিয়ে নিতে পারে। মনোবিজ্ঞানের গবেষণায় দেখা যায়, গন্ধের সঙ্গে স্মৃতি ও আবেগের বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে। এ কারণেই পরিচিত কোনো ঘ্রাণ অনেক সময় দীর্ঘদিনের পুরোনো অভিজ্ঞতাকে অপ্রত্যাশিতভাবে জীবন্ত করে তোলে। প্রবাসীর কাছে নতুন চালের ঘ্রাণ কিংবা হেমন্তের মাঠের স্মৃতি তাই শুধু একটি দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি নয়; তা হতে পারে নিজের অতীত ও পরিচয়ের সঙ্গে আবার সংযুক্ত হওয়ার অভিজ্ঞতা।
কিন্তু স্মৃতির এই আশ্রয়েরও একটি দ্বন্দ্ব রয়েছে। অতীতের প্রতি অতিরিক্ত আকর্ষণ কখনো কখনো মানুষকে বর্তমান থেকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে। যে প্রবাসী প্রতিনিয়ত ফেলে আসা দেশের কথা ভাবেন, তিনি হয়তো নতুন দেশের প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও মানুষের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলার সুযোগ হারান। অতীত তখন আশ্রয়ের পাশাপাশি এক ধরনের মানসিক আবদ্ধতাও তৈরি করতে পারে। স্মৃতি মানুষকে শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত রাখে, কিন্তু সেই স্মৃতির মধ্যে আটকে গেলে জীবনের নতুন সম্ভাবনাগুলো অদেখা থেকে যায়।
প্রবাসী জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হলো, সেখানে পরিচয় একরৈখিক থাকে না। একজন মানুষ জন্মসূত্রে বাংলাদেশের, বসবাসের সূত্রে কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য কিংবা ইউরোপের কোনো দেশের নাগরিক হতে পারেন। তাঁর দৈনন্দিন জীবন নতুন সমাজের নিয়ম, ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে গড়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে বাংলা ভাষা, পারিবারিক ঐতিহ্য, সাহিত্য, খাবার ও উৎসবের মধ্য দিয়ে নিজের পূর্বপরিচয়ও বহন করতে পারেন। এই দুই পরিচয় পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হওয়া জরুরি নয়। বরং মানুষের পরিচয় যে একাধিক অভিজ্ঞতা ও সাংস্কৃতিক পরিসরের সমন্বয়ে গড়ে উঠতে পারে, প্রবাসজীবন তার একটি বাস্তব উদাহরণ।
তবে প্রথম প্রজন্মের প্রবাসী এবং দ্বিতীয় প্রজন্মের অভিজ্ঞতা এক নয়। প্রথম প্রজন্মের কাছে হেমন্ত হয়তো প্রত্যক্ষ স্মৃতির বিষয়। তারা নিজের চোখে পাকা ধানের মাঠ দেখেছেন, নবান্নের উৎসবে অংশ নিয়েছেন, শৈশবের গ্রামীণ জীবন অনুভব করেছেন। কিন্তু দ্বিতীয় প্রজন্মের অনেকের কাছে সেই হেমন্ত বাবা-মায়ের গল্প, ছবি, গান কিংবা পারিবারিক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে পরিচিত। তারা হয়তো কখনো বাংলাদেশের হেমন্ত দেখেনি, তবু পারিবারিক স্মৃতির উত্তরাধিকার থেকে একটি মানসিক সম্পর্ক তৈরি করতে পারে। প্রশ্ন হলো, যে স্মৃতি নিজের অভিজ্ঞতায় অর্জিত নয়, সেটিও কি মানুষের পরিচয়ের অংশ হতে পারে? সম্ভবত পারে, তবে তা প্রত্যক্ষ স্মৃতির অনুলিপি নয়; বরং উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া অভিজ্ঞতার নিজস্ব পুনর্নির্মাণ।
এখানে প্রকৃতির ঋতু ও স্মৃতির ঋতুর মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। প্রকৃতির ঋতু নির্দিষ্ট সময় ও ভূগোলের নিয়ম মেনে আসে। কিন্তু স্মৃতির ঋতুর কোনো নির্দিষ্ট ক্যালেন্ডার নেই। একটি গান, পুরোনো ছবি, পরিচিত খাবারের স্বাদ কিংবা দূরদেশের কোনো বিকেল হঠাৎ বহু বছর আগের একটি সময়কে ফিরিয়ে আনতে পারে। কখনো একটি পরিচিত ঘ্রাণ মানুষকে এমন এক অতীতে নিয়ে যায়, যার কথা সে দীর্ঘদিন ভাবেনি। মনোবিজ্ঞানে গন্ধের মাধ্যমে আত্মজীবনীমূলক স্মৃতি জেগে ওঠার এই অভিজ্ঞতা নিয়ে গবেষণা রয়েছে। তবে সব স্মৃতি বা সব ইন্দ্রিয়ের ক্ষেত্রে এর প্রভাব সমান নয়।
তাহলে কি স্মৃতি প্রকৃতির বিকল্প হয়ে উঠতে পারে? পুরোপুরি নয়। কারণ প্রকৃতি শুধু স্মৃতির বিষয় নয়, তা বর্তমানেরই প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা। প্রবাসের কোনো শহরের শীত, বসন্ত কিংবা শরৎও মানুষের জীবনে নতুন অনুভূতি ও নতুন স্মৃতি তৈরি করে। যে মানুষ একসময় বাংলাদেশের হেমন্তকে নিজের একমাত্র পরিচিত ঋতু বলে জানতেন, তিনি হয়তো কয়েক বছর পর নতুন দেশের কোনো ঋতুর মধ্যেও সৌন্দর্য খুঁজে পান। তাঁর জীবন তখন শুধু ফেলে আসা দেশের দিকে ফিরে থাকে না; নতুন ভূগোলেও শিকড় ছড়াতে শুরু করে।
সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন দেশকে ভালোবাসার অর্থ কেবল অতীতকে আঁকড়ে ধরে থাকা বলে বিবেচিত হয়, অথবা নতুন দেশে আপন হয়ে ওঠাকে পুরোনো পরিচয় হারিয়ে ফেলা মনে করা হয়। মানুষের শিকড় সবসময় এক জায়গায় স্থির থাকে না। জীবনের অভিজ্ঞতা, সম্পর্ক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগের মধ্য দিয়ে তার পরিচয় বিস্তৃত হতে পারে। নিজের ভাষা ও স্মৃতিকে ধারণ করেও অন্য ভাষা, সংস্কৃতি ও মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা সম্ভব। বরং এই বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতা মানুষকে নিজের পরিচয় সম্পর্কে আরও সচেতন করে তুলতে পারে।
হেমন্তের প্রকৃতি প্রতিবছর ফিরে আসে, কিন্তু মানুষের জীবন একই জায়গায় ফিরে যায় না। যে উঠোনে একদিন শিশিরভেজা সকালে দাঁড়িয়ে ধান কাটার দৃশ্য দেখা হয়েছিল, সেখানে হয়তো এখন অন্য মানুষ বাস করে। যে পথ দিয়ে শৈশবে হাঁটা হতো, সেটিও বদলে গেছে। পরিচিত মানুষদের কেউ কেউ আর পৃথিবীতে নেই। সময় শুধু মানুষকে দূরে নিয়ে যায় না; তার পরিচিত জগতকেও বদলে দেয়। ফলে প্রবাসীর স্মৃতিতে যে হেমন্ত বেঁচে থাকে, তা সবসময় বর্তমান বাংলাদেশের হেমন্তের সঙ্গে মেলে না। সেটি অনেকাংশে তার নিজের জীবনের একটি সময়, নিজের হারানো সম্পর্ক ও অভিজ্ঞতার সংরক্ষিত রূপ।
হয়তো এ কারণেই প্রবাসে হেমন্তের অর্থ শুধু একটি ঋতুকে স্মরণ করা নয়; বরং নিজের জীবনের অতীত ও বর্তমানকে নতুন করে বুঝতে পারা। মানুষ যে ভূখণ্ডে বসবাস করে, তার বাইরেও তার একটি মানসিক জগৎ থাকে। সেখানে জন্মভূমি আছে, শৈশব আছে, ভাষা আছে, আবার নতুন জীবনের অর্জন ও অভিজ্ঞতাও আছে। মানুষ এই দুই জগতের কোনো একটিকে অস্বীকার না করেও নিজের জীবনকে অর্থবহ করে তুলতে পারে।
দূরদেশের জানালার বাইরে তখন হয়তো শীত আরও ঘনিয়ে এসেছে। বাংলাদেশের কোনো গ্রামে নতুন ধানের ঘ্রাণে ভরে উঠছে উঠোন, কোথাও নবান্নের আয়োজন, কোথাও আবার ফসল ঘরে তোলার ব্যস্ততা। দুটি ভূগোলের মধ্যে দূরত্ব অনেক, কিন্তু স্মৃতির কাছে সেই দূরত্ব সবসময় সমান থাকে না। একটি গান, একটি গন্ধ কিংবা একটি ঋতুর নাম মুহূর্তেই মানুষকে নিজের অতীতের কাছে ফিরিয়ে নিতে পারে। কিন্তু সেই প্রত্যাবর্তন কি সত্যিই দেশে ফিরে যাওয়া, নাকি নিজের ভেতরে বহন করে চলা এক হারানো সময়ের সঙ্গে পুনরায় দেখা করা? মানুষ কি শেষ পর্যন্ত নিজের দেশেই ফিরে যেতে চায়, নাকি স্মৃতির ভেতরে যে দেশটি তৈরি করে, সেখানেই তার সবচেয়ে গভীর প্রত্যাবর্তন ঘটে?
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট, কক্সবাজার, বাংলাদেশ।
অভিমত থেকে আরো পড়ুন