https://www.prothomalony.com/
18537
opinion
(১)
চা পানের পদ্ধতির ওপর নির্ভর করে হৃদযন্ত্রের উপকারিতা বা অপকারিতা
সকালের শুরু অনেকের কাছে এক কাপ চা ছাড়া অসম্পূর্ণ। এই অভ্যাস মনকে কেবল চাঙ্গাই করে না, এটি দীর্ঘদিন ধরে হৃদরোগ, স্ট্রোক এবং ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি কমানোর মতো স্বাস্থ্যগত উপকারের সাথে যুক্ত। তবে সম্প্রতি নতুন একটি গবেষণায় বলা হয়েছে যে, মানুষ কীভাবে চা প্রস্তুত করে এবং পান করে তাও তাদের হৃদযন্ত্রের স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
এই বিষয়ে সিএনএন এর ওয়েলনেস বিশেষজ্ঞ ডা. লিয়ানা ওয়েন ব্যাখ্যা দিয়েছেন। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে জার্নাল অব ইন্টারনাল মেডিসিনে। গবেষকরা চীনের ৩০ থেকে ৭৯ বছর বয়সী ৪ লাখ ৮৫ হাজারের বেশি মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন। প্রায় নয় বছর ধরে তাদের অনুসরণ করা হয়। অংশগ্রহণকারীরা তাদের চা পানের অভ্যাস সম্পর্কে জানিয়েছেন—যেমন তারা কত ঘন ঘন চা পান করেন, কোন ধরনের চা পছন্দ করেন, কতটা কড়া করে বানান এবং কতটুকু গরম অবস্থায় তা পান করেন।
এই সময়ে হৃদরোগ, স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাক সহ রক্তনালীর রোগের ১৪ হাজার ৮০০ এর বেশি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।
ফলাফলে দেখা গেছে, যারা সপ্তাহে অন্তত তিন দিন চা
পান করেছেন, তাদের রক্তনালীর রোগের ঝুঁকি প্রায় ১১ শতাংশ কম ছিল। বয়স, ধূমপান, পরিশ্রম, ওজন এবং আগের রোগ হিসাব করার পরও এই পার্থক্য টিকে ছিল।
এবং মাঝারি ধরনের কড়া চা রক্তনালীর রোগ ও হৃদরোগের ঝুঁকি কমানোর সাথে যুক্ত। আর গ্রিন টি-র তুলনায় ব্ল্যাক টি বা লাল চা বহু ধরনের হৃদরোগের ঝুঁকি কমানোর ক্ষেত্রে বেশি কার্যকর দেখা গেছে।
তবে সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য হলো—যারা অতিরিক্ত গরম বা "ধোঁয়া ওঠা ফুটন্ত" চা পান করার কথা জানিয়েছেন, যারা নিয়মিত চা পান করেন না তাদের তুলনায় তাদের রক্তনালীর রোগের ঝুঁকি ১৬ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে, যারা স্বাভাবিক তাপমাত্রার বা কুসুম গরম চা পান করেন—খুব বেশি তীব্র গরম নয়—তাদের হৃদরোগের ঝুঁকি নিয়মিত চা না খাওয়া মানুষের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
ডা. ওয়েন সতর্ক করে বলেছেন, তাপমাত্রা মাপা হয়নি, অংশগ্রহণকারীরা নিজেরাই জানিয়েছেন। তবু বার্তাটি পরিষ্কার, মুখ বা গলা পুড়ে যায় এমন গরম চা নিয়মিত খাওয়া উচিত নয়। বারবার খুব গরম পানীয় খেলে খাদ্যনালীর ক্যান্সারের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
চায়ে প্রাকৃতিকভাবে পলিফেনল এবং ফ্ল্যাভোনয়েড নামক উপাদান থাকে, যেগুলোতে শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও প্রদাহবিরোধী গুণাগুণ বিদ্যমান। এই উপাদানগুলো রক্তনালীর ভেতরের কোষগুলোকে সুরক্ষামূলক আবরণ দেয় এবং ধমনী শিথিল ও প্রসারিত হতে সাহায্য করে। ফলে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং হৃদযন্ত্রের ওপর বাড়তি চাপ কমে। নিয়মিত চা পান করলে তা রক্তচাপ, কোলেস্টেরলের মাত্রা এবং কার্ডিওভাসকুলার স্বাস্থ্যের অন্যান্য সূচকগুলোকে উন্নত করতে সাহায্য করে, যা স্ট্রোক বা হার্ট অ্যাটাকের মতো মারাত্মক ঝুঁকি হ্রাস করে। চিনিযুক্ত পানীয়ের বদলে চিনি ছাড়া চা বেছে নিলে অতিরিক্ত চিনি খাওয়া কমে।
ব্ল্যাক টি এবং গ্রিন টি একই গাছ ক্যামেলিয়া সিনেনসিস থেকে আসে। পাতা প্রক্রিয়াজাত করার পদ্ধতির পার্থক্যের কারণে তাদের পলিফেনলের গঠন আলাদা হয়। পূর্বের গবেষণাগুলোতে উভয় চা-এর ক্ষেত্রেই বিভিন্ন স্বাস্থ্যগত উপকারের কথা জানা গেছে। বর্তমান এই গবেষণায় দেখা গেছে যে, গ্রিন টি উপকারিতা প্রদান করলেও ব্ল্যাক টি হৃদরোগের ঝুঁকি কমানোর সাথে আরও সুসংগত বা জোরালোভাবে যুক্ত।
ডা. ওয়েন বলেছেন, গ্রিন টি ভালোবাসেন এমন কাউকে ব্ল্যাক টি'তে যেতে হবে না। চিনি ছাড়া এই উভয় চা-ই একটি হৃদরোগ-বান্ধব সুষম খাদ্যের অংশ হতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, সপ্তাহে অন্তত একদিন চা পানকারীদের মধ্যে যারা দিনে প্রায় ছয় থেকে আট কাপ পান করেছেন, তাদের ঝুঁকি সবচেয়ে কম ছিল। এর চেয়ে বেশি খেলে ঝুঁকি আবার বাড়তে শুরু করে। তবে ডা. ওয়েন জোর দিয়ে বলেছেন, এর মানে এই নয় যে সবাইকে ছয় থেকে আট কাপ খেতে হবে।
চায়ে ক্যাফেইন থাকে। এক কাপ আট আউন্স ব্ল্যাক টি' বা লাল চায়ে সাধারণত ৩০ থেকে ৫০ মিলিগ্রাম ক্যাফেইন থাকে। গ্রিন টি-তে সাধারণত এর চেয়ে কম থাকে, তবে প্যাকেটে স্পষ্ট উল্লেখ না থাকলে বেশিরভাগ চা-ই ক্যাফেইনমুক্ত নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অনুযায়ী দিনে ৪০০ মিলিগ্রাম ক্যাফেইন সাধারণত বিপজ্জনক নয়। গর্ভবতীদের জন্য দিনে ২০০ মিলিগ্রামের মধ্যে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়।
করণীয়
• ঠান্ডা করে পান করুন: চা একটু ঠান্ডা করে চুমুক দেওয়া যায় এমন অবস্থায় পান করুন।
• চিনি ছাড়া বেছে নিন: চিনি ছাড়া চা বেছে নিন, চিনি বা মধু মেশানো এড়িয়ে চলুন।
• ক্যাফেইনের দিকে খেয়াল রাখুন: ঘুমের সমস্যা, উদ্বেগ বা বুক ধড়ফড় করলে মোট ক্যাফেইনের দিকে খেয়াল রাখুন।
• জোর করে শুরু করবেন না: যারা এখন চা পান করেন না, তাদের শুধু হৃদয়ের জন্য চা শুরু করার প্রয়োজন নেই।
• প্রমাণিত উপায়গুলো মানুন: নিয়মিত হাঁটা, ধূমপান থেকে দূরে থাকা, রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং পুষ্টিকর খাবার হৃদয়ের জন্য প্রমাণিত উপায়।
সুস্থতা কোনো একক পানীয়ের উপর নির্ভর করে না। সঠিক অভ্যাসই সবচেয়ে বড় সুরক্ষা। আপনার হৃদরোগ বা রক্তচাপ থাকলে, চা খাওয়ার অভ্যাসে বড় পরিবর্তন আনার আগে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলে নিন।
(২)
কানে হেডফোন কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে?
সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কানে হেডফোন, এই ছবিটা এখন খুব চেনা। ঘুম থেকে উঠে গান, যাতায়াতের পথে পডকাস্ট, কাজের ফাঁকে মিউজিক, বাসন মাজার সময়ও কানে কিছু একটা বাজছে। এই অভ্যাস যতটা নিরীহ মনে হয়, ততটা নিরীহ নয়। অতিরিক্ত হেডফোন ব্যবহার একাকিত্ব বাড়াতে পারে, মনোযোগ কমাতে পারে এবং নীরবতার সঙ্গে থাকার ক্ষমতাও কেড়ে নিতে পারে।
সিএনএনএর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এডিসন রিসার্চের জরিপে দেখা গেছে- ১৩ থেকে ৩৪ বছর বয়সীরা দিনে গড়ে ৪ দশমিক ৫ ঘণ্টা কিছু না কিছু শোনেন। স্পটিফাই জানিয়েছে, ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২৫ নভেম্বর পর্যন্ত তাদের মোট স্ট্রিমের ৫৬ শতাংশই এসেছে জেন জি থেকে।
হেডফোন কি আমাদের আলাদা করে দিচ্ছে?
সিএনএন কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, আরভিনের চ্যান্সেলরস প্রফেসর অব ইনফরমেটিক্স।ডা. গ্লোরিয়া মার্ক বলেছেন, মানুষ হেডফোন ব্যবহার করে অন্যদের থেকে নিজেকে আড়াল করতে।
উইসকনসিন ম্যাডিসন বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর হেলদি মাইন্ডস এর প্রতিষ্ঠাতা রিচার্ড ডেভিডসন বলেছেন, ক্যাম্পাসে হাঁটতে থাকা প্রায় ৯০ শতাংশ শিক্ষার্থীর কানে হেডফোন থাকে। দশ বছর আগে এমনটা ছিল না। তাঁর ভাষায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় সুযোগ হলো ভিন্ন মানুষের সঙ্গে দেখা হওয়া, কিন্তু সবাই হেডফোন পরে থাকলে কেউ কারও সঙ্গে কথা বলে না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হেডফোন ব্যবহার একাকিত্ব বাড়াতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি ৫ জনের মধ্যে ১ জন একাকিত্বে ভোগেন। অপরিচিত মানুষের সঙ্গে ছোট ছোট মুহূর্তের আলাপও আমাদের ভালো থাকার জন্য জরুরি। এই সাধারণ সংযোগগুলো আমাদের ভালো থাকাকে টিকিয়ে রাখে। কিন্তু হেডফোন পরে থাকলে সেই সুযোগগুলো আমরা হারিয়ে ফেলি।
তাছাড়া, ক্রমাগত হেডফোন ব্যবহার আমাদের নীরবতার মধ্যে থাকার ক্ষমতা নষ্ট করে দিচ্ছে। ডা. মার্ক বলেছেন, মানুষ এখন আর চুপচাপ বসে মনকে ঘুরে বেড়াতে দেওয়ার সুযোগ পায় না। সবসময় হাতের কাছে কিছু না কিছু আছে সেই শূন্যতা পূরণ করার জন্য। অথচ সেই শূন্যতাকেই তিনি সমৃদ্ধ অভিজ্ঞতা বলেছেন।
ডেভিডসন একে বলেছেন সচেতনতার পেশি। গান শোনা বা ফোন দেখা মুহূর্তের জন্য অযাচিত চিন্তা থেকে মুক্তি দিতে পারে, কিন্তু তা স্থায়ী সমাধান নয়।
২০১০ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাপ্তবয়স্করা জেগে থাকার সময়ের প্রায় ৪৭ শতাংশ সময় আসলে তারা যা করছেন তা নিয়ে ভাবেন না।
সিএনএন এর সম্পাদকীয় নোটে সতর্ক করা হয়েছে, ক্রমাগত হেডফোন ব্যবহার শ্রবণশক্তিরও ক্ষতি করতে পারে। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অন ডেফনেস অ্যান্ড আদার কমিউনিকেশন ডিসঅর্ডারস অনুযায়ী প্রাপ্তবয়স্কদের ২৪ শতাংশের অন্তত একজনের কানে শ্রবণশক্তি কমেছে। ৮৫ ডেসিবেল বা তার বেশি শব্দ দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করতে পারে।
করণীয়
• হেডফোন ছাড়া সময় রাখুন: দিনে কিছু সময় হেডফোন ছাড়া থাকুন, বিশেষ করে হাঁটা বা অপেক্ষা করার সময়।
• ভলিউম কম রাখুন: ভলিউম কম রাখুন, দীর্ঘ সময় জোরে গান শুনবেন না।
• নীরবতা অনুশীলন করুন: দিনে কয়েক মিনিট চুপচাপ বসে চারপাশ দেখুন।
• ছোট আলাপ করুন: অপরিচিত কারও সঙ্গে ছোট আলাপে আগ্রহী হোন।
• কাজের সময় খুলে রাখুন: কাজের সময় প্রয়োজন ছাড়া হেডফোন খুলে রাখুন।
হেডফোন জীবনকে সহজ করে, কিন্তু তা যেন মানুষের সঙ্গে সংযোগের বদলে না হয়। মাঝে মাঝে হেডফোন খুলে রাখা, চারপাশে তাকানো এবং নীরবতাকে গ্রহণ করাই মনের জন্য সত্যিকারের বিশ্রাম হতে পারে। আপনার যদি দীর্ঘদিন ধরে একাকিত্ব বা মনোযোগের সমস্যা থাকে, তাহলে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলে নিন।
(৩)
ডিপারসোনালাইজেশন-ডিরিয়েলাইজেশন ডিসঅর্ডার: লক্ষণ ও করণীয়
ডিপারসোনালাইজেশন-ডিরিয়েলাইজেশন ডিসঅর্ডার হলো এমন একটি মানসিক স্বাস্থ্যগত অবস্থা, যেখানে ব্যক্তি নিজের শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন বোধ করেন (যেন নিজের শরীরকে বাইরে থেকে দেখছেন) অথবা চারপাশের পরিবেশকে অবাস্তব মনে করেন—কিংবা এই উভয় অনুভূতিই একসাথে কাজ করে। এটি খুব আতঙ্কজনক বা অস্বস্তিকর হতে পারে, যার ফলে মনে হতে পারে যে কেউ বুঝি কোনো স্বপ্নের জগতে বসবাস করছে।
মেয়ো ক্লিনিক জানায়, অনেকেরই জীবনের কোনো না কোনো সময়ে ক্ষণস্থায়ীভাবে এমন অনুভূতি হতে পারে। তবে যখন এই অনুভূতিগুলো বারবার ফিরে আসে বা কখনো পুরোপুরি যায় না এবং দৈনন্দিন কাজকর্ম ব্যাহত করে, তখন এটিকে এই ডিসঅর্ডার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। সাধারণত চরম মানসিক চাপ, সহিংসতা বা কোনো ধরনের আঘাতমূলক বা ট্রমাটিক (trauma) অভিজ্ঞতার শিকার হয়েছেন এমন ব্যক্তিদের মধ্যে এই সমস্যাটি বেশি দেখা দেয়। এটি গুরুতর আকার ধারণ করতে পারে এবং ব্যক্তিগত সম্পর্ক, কর্মক্ষেত্র এবং দৈনন্দিন স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করতে পারে। এর প্রধান চিকিৎসা হলো সাইকোথেরাপি বা টক থেরাপি। অবস্থার ওপর ভিত্তি করে অনেক সময় চিকিৎসকরা ওষুধও ব্যবহার করে থাকেন।
কারণসমূহ ও ঝুঁকির কারণ:
মেয়ো ক্লিনিক জানায়, এই ডিসঅর্ডারের সুনির্দিষ্ট কারণ পুরোপুরি স্পষ্ট নয়, তবে জিনগত ও পরিবেশগত প্রভাবের পাশাপাশি অতিরিক্ত মানসিক চাপ এবং ভয় এই অবস্থার সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে শৈশবের কোনো ট্রমা বা তীব্র মানসিক আঘাতমূলক ঘটনার সাথে এর যোগসূত্র রয়েছে।
তবে এই সমস্যাটির ঝুঁকি বাড়ানোর পেছনে কিছু বিষয় কাজ করে। যেমন: মানসিক চাপপূর্ণ পরিস্থিতি এড়ানোর প্রবণতা বা নিজের আবেগগত অনুভূতিগুলো ভাষায় প্রকাশ করতে সমস্যায় পড়া। শৈশবে বা প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় সহিংসতা কিংবা নির্যাতনের মতো কোনো বেদনাদায়ক বা ট্রমাটিক ঘটনার মুখোমুখি হওয়া বা তা প্রত্যক্ষ করা। সম্পর্ক, অর্থ বা কর্মক্ষেত্র সংক্রান্ত বড় ধরনের জটিলতা।
দীর্ঘমেয়াদী বা মারাত্মক বিষণ্ণতা অথবা প্যানিক অ্যাটাকসহ তীব্র উদ্বেগ এবং নেশাদ্রব্য বা ওষুধের অপব্যবহার- যা এই ধরনের লক্ষণ বা পর্বগুলোকে উস্কে দিতে পারে।
লক্ষণসমূহ:
ডিপারসোনালাইজেশ বা ডিরিয়ালাইজেশনের অল্প সময়ের অনুভূতি স্বাভাবিক, কিন্তু তা বারবার ও দীর্ঘস্থায়ী হলে কাজ, পড়াশোনা ও দৈনন্দিন জীবনে সমস্যা তৈরি করে। এ সময় মনে হয় নিজের শরীর বা চারপাশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছি, তবে এটা শুধু অনুভূতি, বাস্তব নয়, এটা রোগী বুঝতে পারে। তাদের জন্য এই অনুভূতি ভাষায় বোঝানো কঠিন লাগে। এই দুশ্চিন্তা থেকে বারবার নিজেকে পরীক্ষা করা ও কোনটা সত্যি তা যাচাই করার প্রবণতা বাড়ে। সাধারণত কৈশোরের মাঝামাঝি বা শেষে, অথবা প্রাপ্তবয়স্কের একদম শুরুতে দেখা দেয়। শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে এটি বিরল।
ডিপারসোনালাইজেশনের লক্ষণের মধ্যে রয়েছে:
•নিজের চিন্তা, অনুভূতি, শরীর বা শরীরের কোনো অংশকে বাইরে থেকে প্রত্যক্ষ করছেন এমন বোধ হওয়া। যেমন—মনে হতে পারে আপনি নিজের মাথার ওপর বাতাসে ভাসছেন।
•নিজেকে একটি রোবট মনে হওয়া অথবা আপনার কথা বলা ও চলাফেরার ওপর নিজের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই বলে মনে হওয়া।
•নিজের শরীর, হাত বা পা বিকৃত বা সঠিক আকৃতির নয় বলে মনে হওয়া। এগুলো স্বাভাবিকের চেয়ে বড় বা ছোট মনে হতে পারে। অথবা মনে হতে পারে আপনার মাথা যেন তুলা দিয়ে পেঁচানো রয়েছে।
•নিজের অনুভূতি কিংবা চারপাশের পৃথিবীর প্রতি সাড়াদানের ক্ষমতা মানসিকভাবে বা শারীরিকভাবে অসাড় হয়ে যাওয়া।
•নিজের স্মৃতিগুলোতে কোনো আবেগ না থাকা এবং মনে হওয়া যে স্মৃতিগুলো আপনার নিজের নাও হতে পারে।
ডিরিয়েলাইজেশনের লক্ষণের মধ্যে রয়েছে:
•মানুষ এবং আপনার চারপাশের পরিবেশকে অবাস্তব মনে হওয়া—যেন আপনি কোনো সিনেমা বা স্বপ্নের ভেতর বাস করছেন।
•ভালোবাসার মানুষগুলোর থেকে মানসিকভাবে বিচ্ছিন্ন বোধ করা, যেন আপনাদের মাঝে একটি কাঁচের দেয়াল রয়েছে।
•চারপাশের দৃশ্যপট অদ্ভুত আকৃতির, ঝাপসা বা বর্ণহীন মনে হওয়া। অথবা পরিপার্শ্বকে ত্রিমাত্রিকের বদলে দ্বিমাত্রিক (চ্যাপ্টা, যেখানে কোনো গভীরতা নেই) মনে হওয়া। আবার কখনো কখনো চারপাশ স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি স্পষ্ট বা তীব্রভাবে চোখে পড়া।
•সময় নিয়ে অবাস্তব চিন্তা করা; যেমন খুব সাম্প্রতিক কোনো ঘটনাকে বহুদূর অতীতের ঘটনা বলে মনে হওয়া।
•বস্তুর দূরত্ব, আকৃতি ও আকার সম্পর্কে অবাস্তব চিন্তা আসা।
এই অবস্থার পর্বগুলো কয়েক ঘণ্টা, কয়েক দিন, কয়েক সপ্তাহ বা মাসব্যাপী স্থায়ী হতে পারে। কিছু মানুষের ক্ষেত্রে এই পর্বগুলো ডিপারসোনালাইজেশন বা ডিরিয়েলাইজেশনের একটি চলমান স্থায়ী অনুভূতিতে রূপ নেয়, যা সময়ে সময়ে কমতে বা বাড়তে পারে।
করণীয়::
ক্ষণস্থায়ী ডিপারসোনালাইজেশন বা ডিরিয়েলাইজেশন খুবই সাধারণ এবং সবসময় উদ্বেগের কারণ হয় না। তবে বিচ্ছিন্নতা ও পরিবেশ সম্পর্কে বিভ্রান্তির অনুভূতি যদি ক্রমাগত বা গুরুতর হতে থাকে, তবে তা এই ডিসঅর্ডার কিংবা অন্য কোনো শারীরিক বা মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার লক্ষণ হতে পারে। যদি অনুভূতিগুলো আপনাকে অস্বস্তিতে ফেলে বা আপনার আবেগপ্রবণতাকে ব্যাহত করে, অনুভূতিগুলো দূর না হয় বা বারবার ফিরে আসে এবং কাজ, সম্পর্ক বা দৈনন্দিন কাজকর্ম পরিচালনা করতে বাধা সৃষ্টি করে, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
অভিমত থেকে আরো পড়ুন