https://www.prothomalony.com/
17636
opinion
প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০২৬ ০৯:০৬
টানা দ্বিতীয় রাতের মতো ইরানে বোমা হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। যার জেরে বাহরাইনে বিমান হামলা সতর্কীকরণ সাইরেন বেজে উঠেছে এবং কুয়েত "শত্রুভাবাপন্ন ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার" খবর জানিয়েছে। হরমুজ প্রণালী ঘেঁষা ইরানি শহর বুশেহর, চাবাহার, বন্দর আব্বাস, সিরিক, জাস্ক এবং আবু মুসা দ্বীপে বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। ইরানশহরে অন্তত একজন নিহত হয়েছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজে ইরানের কথিত হামলার "প্রতিশোধ" হিসেবেই এই হামলা চালানো হয়েছে।
মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা ইরানে নতুন করে প্রায় ৯০টি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এক বিবৃতিতে জানায়, বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, উপকূলীয় নজরদারি স্থাপনা, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন মজুতাগার, নৌবাহিনীর সক্ষমতা এবং সামরিক সরবরাহ অবকাঠামো লক্ষ্য করে ইরানের উপকূল বরাবর প্রায় ৯০টি সামরিক স্থাপনায় হামলা চালানো হয়েছে। যার লক্ষ্য ছিল হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজ ও নিরীহ বেসামরিক নাবিকদের ওপর হামলা চালানোর ইরানের সক্ষমতা দুর্বল করা। সেন্টকম আরও জানায়, আগের রাতে চালানো আক্রমণাত্মক হামলার ধারাবাহিকতাতেই এই নতুন হামলা চালানো হয়েছে। উল্লেখ্য, এর আগের দিনই যুক্তরাষ্ট্র ইরানে ৮০টিরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলার দাবি করেছিল।
এদিকে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) দাবি করেছে, তারা কুয়েত ও বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটির "গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও স্থাপনায়" হামলা চালিয়েছে। যাকে তারা মার্কিন হামলার বিরুদ্ধে "শাস্তিমূলক প্রতিক্রিয়ার" প্রথম ধাপ বলে অভিহিত করেছে। রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার সংস্থা আইআরআইবি জানায়, আইআরজিসির নৌ ও আকাশ প্রতিরক্ষা বাহিনী মার্কিন হামলার কয়েক ঘণ্টা পরই যৌথ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন অভিযান চালায়। যার লক্ষ্যবস্তু ছিল কুয়েতের ক্যাম্প আরিফজান ও আলি আল সালেম এবং বাহরাইনের জুফায়ের ও শেখ ইসা ঘাঁটি।
আইআরজিসি আরও জানিয়েছে, মার্কিন হামলা তাদের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপকূলীয় প্রদেশগুলোর পাশাপাশি পবিত্র নগরী মাশহাদমুখী পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশের দুটি সেতুতেও আঘাত হেনেছে—যে শহরে আজ সমাহিত করা হবে ইরানের নিহত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে। সংগঠনটির অভিযোগ, এই হামলার লক্ষ্য ছিল "ঐতিহাসিক" এই শেষকৃত্য অনুষ্ঠানকে ম্লান করে দেওয়া। তারা হুঁশিয়ারি দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি আবার হামলা চালায়, তাহলে ইরানের "চূর্ণবিচূর্ণ প্রতিক্রিয়া" অঞ্চলের অন্যান্য মার্কিন ঘাঁটি পর্যন্ত সম্প্রসারিত করা হবে। এর আগে রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আইআরআইবি জানিয়েছিল, আক্কালা শহরের বাইরে আক তেকে খান সেতুতে মার্কিন বাহিনী সাতটি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে, যাতে একটি রেললাইনে দুটি বিস্ফোরণ ঘটে।
ইরাকের নাজাফে খামেনির শেষকৃত্য মিছিলে লাখো মানুষ অংশ নিয়েছেন। ইমাম আলীর মাজারের পাশ দিয়ে তার শবাধার বহন করে নেওয়া হয়। যাকে ঘিরে ব্যাপক জনসমাগম ইরাকে ইরানের বিতর্কিত প্রভাব এবং আঞ্চলিক সংহতির প্রকাশ হিসেবে দেখা হচ্ছে—মিছিলে ইসরায়েলবিরোধী স্লোগান এবং গাজা প্রসঙ্গে বারবার উল্লেখ শোনা গেছে। এরপর কারবালায়ও ইমাম হুসাইন ও হজরত আব্বাসের মাজারে শোকযাত্রায় অংশ নেন হাজারো মানুষ। শেষ পর্যন্ত খামেনিকে তার জন্মশহর মাশহাদে দাফন করা হবে, যেখানে ইতিমধ্যে ইমাম রেজার মাজারের কাছে অসংখ্য মানুষ অপেক্ষা করছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে এই হামলা নিয়ে সমালোচনা বাড়ছে। কংগ্রেসওম্যান ডেলিয়া রামিরেজ ট্রাম্পকে তীব্র ভাষায় সমালোচনা করে বলেছেন, যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্থাপনের অল্প সময়ের মধ্যেই প্রেসিডেন্ট সংঘাত আরও উসকে দিয়েছেন। এক্স-এ দেওয়া পোস্টে তিনি লেখেন, গতরাতে ট্রাম্প ইরানে একের পর এক হামলা চালিয়েছেন। যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠার অল্প পরই, আর আজ তিনি আরও হামলার হুমকি দিচ্ছেন। তিনি আরও লেখেন, যুদ্ধবাজদের ওপর ভরসা করে এই যুদ্ধ থামানো সম্ভব নয়। কংগ্রেসকে অবশ্যই তার এখতিয়ার ফিরিয়ে নিয়ে প্রশাসনকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। রামিরেজের আগে মার্কিন সিনেটর এলিজাবেথ ওয়ারেনও ট্রাম্পের যুদ্ধ থামাতে কংগ্রেসের হস্তক্ষেপ দাবি করেছিলেন। উল্লেখ্য, গত মাসে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট উভয় দলের সমর্থনে একটি "ওয়ার পাওয়ারস রেজল্যুশন" পাস করেছিল। যাতে কংগ্রেসের যুদ্ধ ঘোষণা বা সামরিক শক্তি ব্যবহারের অনুমোদন ছাড়া ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
ওয়াশিংটন থেকে পাওয়া প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প স্পষ্টতই ইঙ্গিত দিচ্ছেন কূটনীতির পথ এখন বন্ধ। তিনি খোলাখুলি বলেছেন, কূটনীতি চালিয়ে যাওয়া তার কাছে "সময়ের অপচয়" মনে হয়েছে। তবে তিনি এটাও অস্বীকার করেননি যে তার দূত জ্যারেড কুশনার ও স্টিভ উইটকফের মাধ্যমে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ এখনো থাকতে পারে। প্রসঙ্গত, ট্রাম্প নিজে কখনো সরাসরি আলোচনায় যুক্ত হননি। তিনি এমনও বলেছেন যে কোনো চুক্তি হলেও ইরান তা মেনে চলবে বলে তিনি আর বিশ্বাস করেন না।
সাবেক রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা মার্জোরি টেইলর গ্রিন, যিনি একসময় ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিলেন, তার ইরান-নীতির যুক্তিকে সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের ইরাক যুদ্ধকালীন বক্তব্যের সঙ্গে তুলনা করেছেন। এক্স-এ তিনি লেখেন, ইরান হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজে বোমা মারায় ট্রাম্প ইরানে বোমা মারছেন। এতে তেলের দাম আবার বাড়তে শুরু করেছে আর শেয়ারবাজার নামছে, যা নতুন করে কেনাকাটার সুযোগ তৈরি করছে। তিনি আরও লেখেন, এরপর ট্রাম্প আবার বলতে শুরু করেন যে তিনি ইরানে বোমা মেরেছেন কারণ "ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র থাকা চলবে না", আর আজ সাংবাদিকদের কাছে অন্তত ৬০ বার একই কথা পুনরাবৃত্তি করেছেন। গ্রিনের ভাষায়, তিনি জানতেন না ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি হরমুজ প্রণালীতে তেল নিয়ন্ত্রণ করছিল। তিনি এই পরিস্থিতিকে ৯/১১-পরবর্তী বুশ যুগের মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ সংক্রান্ত মিথ্যাচার ও যুদ্ধ-অর্থনীতির রাজনীতির সঙ্গে তুলনা করে বলেন, ইরাকের কাছে গণবিধ্বংসী অস্ত্র থাকার দাবির মতোই এটি বাস্তব উদ্বেগের চেয়ে রাজনীতি বেশি, আর রিপাবলিকান পার্টি থেকে ঠিক এমনটাই বন্ধ করতে তারা ভোট দিয়েছিলেন।
সাবেক সিআইএ কর্মকর্তা স্কট উয়েহলিঙ্গার বিশ্লেষণে বলেছেন, চলমান যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজে পাওয়া "অত্যন্ত কঠিন" হবে। তিনি আল জাজিরাকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র আংশিকভাবে এই আশাতেই ইরানে হামলা চালিয়েছে যে এতে হরমুজ প্রণালী নিয়ে ইরানের কৌশলগত হিসাব বদলে যাবে। তার মতে, ট্রাম্পের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্ট করার চেষ্টা করেছে যে হরমুজ প্রণালীতে সহযোগিতায় ইরানের অস্বীকৃতির প্রতিশোধ হিসেবেই এই হামলা। সম্ভবত ট্রাম্প কিছুটা আশা করেছিলেন যে ইরানি শাসকগোষ্ঠী শিক্ষা নিয়ে সমঝোতা স্মারকে ফিরে আসবে। উয়েহলিঙ্গারের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র চেষ্টা করছে হরমুজ প্রণালীতে ইরানের প্রভাব খর্ব করতে—নৌ চলাচল নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র, ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি এবং দ্রুতগতির নৌযান ধ্বংস করা হয়েছে। যাতে প্রণালীতে প্রভাব বিস্তারের ইরানি সক্ষমতা আরও সীমিত হয়ে যায়। তার ধারণা, ট্রাম্প আশা করছেন এই সক্ষমতা কমিয়ে দেওয়া গেলে, বা ইরানিদের বুঝিয়ে দেওয়া গেলে যে তাদের সেই সক্ষমতা আর নেই, তাহলে হয়তো তারা সমঝোতা স্মারকে ফিরে আসবে।
জ্বালানি তেলের বাজারেও এই উত্তেজনার প্রভাব পড়েছে। রয়টার্সের বরাত অনুযায়ী, ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন সামরিক অভিযানের ফলে সংঘাতের দ্রুত সমাধান এবং এর ধারাবাহিকতায় হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে পড়ায় তেলের দাম বেড়েছে। গ্রিনিচ মান সময় রাত ১২টা ৫৪ মিনিট পর্যন্ত ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচার ৭৮ সেন্ট বা ১ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৭৮ দশমিক ৮ ডলারে পৌঁছেছে। একইভাবে মার্কিন ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ফিউচার ৭৪ সেন্ট বা ১ দশমিক ০১ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৭৪ দশমিক ২৬ ডলারে স্থির হয়েছে।
এদিকে গাজা ও লেবাননেও ইসরায়েলি বাহিনীর হামলা অব্যাহত রয়েছে। ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে অন্তত আটজন এবং লেবাননের নাবাতিয়েহ আল-ফাওকায় দুই ব্যক্তি নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
অভিমত থেকে আরো পড়ুন