https://www.prothomalony.com/
16464
opinion
আমরা যখন প্রযুক্তিতে মঙ্গল গ্রহে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছি, তখন আমাদের ঘরের অন্দরে "অনেক" নারীরা মধ্যযুগীয় বর্বরতার শিকার হচ্ছে। এখনো বহু নারীর জীবন শুরু হয় ভয় দিয়ে, দিন কাটে সহিংসতার আতঙ্কে, আর শেষ হয় নীরবতায়। গ্রামীণ কিংবা নিম্নবিত্ত সমাজের অন্ধকারে এই সহিংসতা কখনো গোপনে ঘটে, কখনো প্রকাশ্যে, কিন্তু তার মূল চরিত্র অপরিবর্তিত -পুরুষের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার নির্মম প্রচেষ্টা।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিও আমাদের তথাকথিত সভ্য সমাজের মুখোশটি টেনে হিঁচড়ে খুলে দিয়েছে। একটি বদ্ধ ঘরে স্ত্রীকে পৈশাচিক কায়দায় মারধর করছেন স্বামী, পেটের ওপর লাথি মারছেন, নারীটি চিৎকার করছেন। আর দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা পরিবারটি কেবল ভাবছে-পুরুষটি আইনি ঝামেলায় ফেঁসে যাবে কি না! এই দৃশ্যটি কেবল একটি পারিবারিক সহিংসতার চিত্র নয়, বরং এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী সামাজিক ব্যাধি, যা জেনিটিক্যালি আমাদের মজ্জায় মিশে গেছে।
কেন একজন পুরুষ তার সঙ্গীকে পশুর মতো মারে? এর উত্তর লুকিয়ে আছে তার বিকৃত মনস্তত্ত্বে। মনোবিজ্ঞানের আলোকে দেখা যায়, সহিংস পুরুষের আচরণ মূলত শেখা আচরণ-এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে স্থানান্তরিত একটি সামাজিক রীতি। তারা পরিবারে নিজ পিতা ও মাতার মধ্যে একই দর্শন অনুভব করে। ফলে সমাজের প্রতিটি কোষে গড়ে ওঠে এক ধরনের অসম ক্ষমতাবোধ, যেখানে "কিছু" পুরুষ অনুভব করে নারীর ওপর আধিপত্য করা তার প্রাকৃতিক অধিকার। এই মানসিক কাঠামো থেকে জন্ম নেয় এক বিকৃত অহং-যেখানে নারীকে মানুষ নয়, বরং নিয়ন্ত্রণযোগ্য সম্পত্তি হিসেবে দেখা হয়।
একজন পুরুষ যখন তার স্ত্রীকে মারধর করে, তখন সে আসলে রাগ প্রকাশ করছে না, বরং তার ক্ষমতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করছে। সমাজের নিম্নবিত্ত বা প্রান্তিক স্তরে, যেখানে একজন পুরুষ বাইরে সারাদিন লাঞ্ছিত বা ক্ষমতাহীন থাকে, সে তার সেই 'ক্ষমতার ক্ষুধা' মেটায় ঘরের ভেতরে। স্ত্রীকে আঘাত করার সময় সে যে আধিপত্য অনুভব করে, তা তাকে এক প্রকার 'সুডো-স্যাটিসফ্যাকশন' দেয়। সে মনে করে, ভয়ের রাজত্ব কায়েম করাই পৌরুষ। এই যে 'মালিকানা' বোধ-যেখানে স্ত্রীকে মানুষ নয়, বরং জড়বস্তু বা পাঞ্চিং ব্যাগ মনে করা হয়-তা মূলত বংশপরম্পরায় পাওয়া একটি বিষাক্ত শিক্ষা।
একজন নারী কেন এমন নির্যাতন সহ্য করে বছরের পর বছর? উত্তরে আমরা দেখতে পাই-সামাজিক প্রশিক্ষণ ও ভয়। আমাদের সমাজ ব্যবস্থা একজন নারীকে শৈশব থেকেই শিখিয়ে দেয়-'সহ্য করাই নারীর ধর্ম'। যে নারী যত বেশি মার খেয়েও মুখ বুজে সংসার করে, সমাজ তাকে তত বেশি 'সতী' বা 'আদর্শ' তকমা দেয়। সমাজ তাকে শেখায়, সংসার রক্ষা করা তার দায়িত্ব, প্রতিবাদ মানেই অশান্তি। ধর্ম, পরিবার, এমনকি প্রেমের ভাষায়ও নারীর আত্মত্যাগকে মহিমা দেওয়া হয়। এই তকমা পাওয়ার নেশায় এবং মাথা গোঁজার ঠাঁই হারানোর ভয়ে নারীরা বছরের পর বছর এই নরকবাস সয়ে যায়।
অথচ এই নীরবতাই অপরাধীকে আরও সাহসী করে তোলে। পরিবার যখন নারীকে রক্ষা না করে অপরাধী পুরুষকে বাঁচানোর পথ খোঁজে, তখন প্রমাণিত হয় যে আমাদের সমাজে নারীর জীবনের চেয়ে 'পারিবারিক সম্মান' বা 'পুরুষের দাপট' অনেক বেশি মূল্যবান। ফলে নারীর চেতনা ক্রমে এমনভাবে গড়ে ওঠে যে, নির্যাতনকে সে ভাগ্য হিসেবে মেনে নেয়।
তাছাড়া, এ সমাজে যে নারী প্রতিবাদ করে, তাকে "বেপরোয়া", "অভদ্র" বা "পুরুষবিদ্বেষী" বলা হয়। অথচ সে অপরাধী নয়-অপরাধী সেই সমাজব্যবস্থা, যা নারীর মানবিক মর্যাদাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং তার দুঃখকে 'সহ্যগুণ' হিসেবে মহিমান্বিত করে।
যদি রাষ্ট্র নারীকে আত্মরক্ষার পূর্ণ অধিকার দিত-যেমন আত্মরক্ষার্থে প্রতিরোধমূলক শক্তি প্রয়োগ(কারাতে, জুডো, বা অন্য কোনো মার্শাল আর্ট)- তাহলে তার মনেও শক্তি ও আত্মবিশ্বাসের বীজ গড়ে উঠত। কিংবা রাষ্ট্র যদি আইনত নারীদের এই অধিকার দিত যে, নির্যাতনের মুহূর্তে আত্মরক্ষার্থে তারা যদি আক্রমণকারীর ওপর পাল্টা আঘাত হানে (তা সে হাতের রগ কেটে দেওয়া হোক বা অন্য কোনো কঠোর প্রতিরোধ), তবে তাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে না-তাহলে হয়তো দৃশ্যপট বদলে যেত। যখন একজন নিপীড়ক জানবে যে তার প্রতিটি আঘাতের বিপরীতে প্রাণঘাতী পাল্টা আঘাত আসতে পারে, তখনই তার তথাকথিত 'পৌরুষ' থমকে দাঁড়াবে।
সহিংসতার দ্বিতীয় অপসনে যাবার আগে আমি মনে করি, বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায়, প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রতিটি মেয়ের জন্য কারাতে বা মার্শাল আর্ট বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। শারীরিক শক্তির অভাবকে কৌশল দিয়ে জয় করার এই শিক্ষা নারীকে একজন মানুষ হিসেবে আত্মবিশ্বাসী করবে।
কেউ বলতে পারেন, "পারিবারিক শিক্ষা, নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠাই হবে এইসব শারীরিক নির্যাতন রোধের হাতিয়ার।"
এইখানে একটু বিরতি টানতে হয়। যুগের পর যুগ ধরে নারী অধিকার নিয়ে কয়েক হাজার সভা-সেমিনার হয়েছে, পাঁচ তারকা হোটেলের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে গোলটেবিল বৈঠক হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতার রুক্ষ জমিতে পরিবর্তন কতটুকু? পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশে পারিবারিক সহিংসতার গ্রাফ নিচে নামেনি, বরং রূপ বদলেছে।
এই যে কাঠামোগত ব্যর্থতা, তার কারণ হলো আমরা উপসর্গ নিয়ে নাড়াচাড়া করি, কিন্তু রোগের মূলে হাত দিই না। প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থার ফাঁকফোকর দিয়ে অপরাধীরা বেরিয়ে আসে, কারণ সমাজ এখনো মনে করে 'ঘরের বিষয় ঘরেই থাকা ভালো'। এই 'ভালো থাকা'র মূল্য দিতে গিয়ে প্রতিদিন কত নারীকে নিজের অস্তিত্ব বিসর্জন দিতে হচ্ছে, তার হিসাব কোনো সেমিনারের খসড়া প্রতিবেদনে থাকে না।
বাংলাদেশে নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে কঠোর আইন রয়েছে, কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। আইনের দরজা পর্যন্ত যেতে গেলে নারীকে পেরোতে হয় অসংখ্য সামাজিক ও প্রশাসনিক বাধা- লজ্জা, ভয়, পারিবারিক চাপ, অর্থনৈতিক নির্ভরতা। অনেক ক্ষেত্রেই পুলিশ বা বিচারব্যবস্থা নির্যাতনের অভিযোগে নিরপেক্ষ থাকে না। ফলে নারী জানে, অভিযোগ জানানো মানেই নিজের বিপদ বাড়ানো।
ধর্মীয় ও নৈতিকতার দোহাই দিয়ে নারীকে নিয়ন্ত্রণে রাখার শত শত নীতি ও ফতোয়া আমাদের মুখে মুখে ঘোরে। নারী 'অবাধ্য' হলে বা 'ব্যভিচারী' হলে তাকে কীভাবে শাসন করতে হবে, তার জন্য সমাজের স্বঘোষিত রক্ষকদের অভাব হয় না। অথচ একই সমাজে পুরুষের পরকীয়া, বহুবিবাহ কিংবা স্ত্রীর ওপর পাশবিক নির্যাতন নিয়ে নীরবতার সংস্কৃতি বিদ্যমান। নৈতিকতার এই পাল্লাটি একপাক্ষিক।
পুরুষ যখন নিজের জৈবিক ও মানসিক বিকৃতি চরিতার্থ করতে নারীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, তখন তথাকথিত 'নৈতিক শিক্ষা' কোথায় থাকে?
তাছাড়া, প্রশ্ন জাগে, এই নৈতিক শিক্ষাটা দিবে কে? যখন বংশপরম্পরায় একটি পুরুষ তার নিজের পিতাকে দেখেছে মাকে মারধর করতে, তখন তার কাছে সেই সহিংসতাই 'স্বাভাবিক' আচরণ। এই 'জেনেটিক ভায়োলেন্স' বা উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সহিংসতা কোনো সাধারণ নীতিবাক্য দিয়ে মুছে ফেলা সম্ভব নয়।
সমাজের যে নোংরা স্তূপের কথা আমরা বলি, যেখানে ধর্ষিতা ও মৃত নারীর চরিত্র নিয়ে শতবার ধর্ষণ চলে আর নিপীড়ককে আড়াল করা হয়, সেই পচা গলিতে বাস করে
আমরা যখন জীবন্ত নারীর সম্মান দিতে চাই-তখন ভাবতে হয়, নৈতিকতা আসলে কতটুকু অবশিষ্ট আছে?
অনেকে মনে করেন, নারীর অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতাই বোধহয় এই নির্যাতনের একমাত্র রক্ষাকবচ। কিন্তু রূঢ় বাস্তবতা হলো-টাকা বা ক্যারিয়ার নারীকে সহিংসতার হাত থেকে মুক্তি দিতে পারেনি। বহু স্বাবলম্বী, উচ্চশিক্ষিত নারীও দিনের পর দিন স্বামীর পৈশাচিক মার সহ্য করে যাচ্ছেন। পরিসংখ্যান বলছে, নির্যাতন কেবল অশিক্ষিত বা গরিব পরিবারে সীমাবদ্ধ নয়; বরং ক্ষমতার দাপট দেখানোর এই নেশা শিক্ষিত বিত্তবানদের অন্দরমহলেও সমানভাবে বিদ্যমান।
উদাহরণ হিসেবে আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রুমানা মনজুরকে দেখি, যিনি উচ্চশিক্ষিত ও স্বাবলম্বী হওয়া সত্ত্বেও তার স্বামী হাসান সাইদের অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হয়ে অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। কিংবা আন্তর্জাতিক অঙ্গনের দিকে তাকালে দেখা যায় জনপ্রিয় পপ তারকা রিহানা যখন তার ক্যারিয়ারের শীর্ষে, তখন তিনি তার সঙ্গী ক্রিস ব্রাউন কর্তৃক ভয়াবহ শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। অর্থাৎ, নারী যত শক্তিশালী বা স্বাবলম্বীই হোক না কেন, যদি সমাজের পুরুষতান্ত্রিক কাঠামো না বদলায় এবং নারীর আত্মরক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠিত না হয়, তবে কেবল 'টাকা' তাকে এই অন্ধকার থেকে মুক্তি দিতে পারবে না।
তাহলে এর সমাধান কোথায়? 'হয়তো' নির্যাতন বন্ধের জন্য প্রয়োজন পশুর মতো আচরণ করা পুরুষের দণ্ড এবং নারীর রুখে দাঁড়ানোর ক্ষমতা।
এই যে 'হয়তো' বলছি--এখানেও আমাদের কলম দ্বিধাগ্রস্ত। আমাদের এই দ্বিধা কোনো ব্যক্তিগত ভীরুতা নয়, বরং এক চরম সামাজিক ট্র্যাজেডির প্রতিফলন। আমরা যখন সমাধানের পথ বাতলে দেই, তখন আমাদের মনের কোণে এক চিলতে সংশয় উঁকি দেয়-আদৌ কি কোনো সমাধান আছে? রাষ্ট্র যদি আইন দেয়, সমাজ কি তার প্রয়োগ করতে দেবে? নারী যদি কারাতে শিখে বা নিজেকে রক্ষা করতে পাল্টা আঘাত করে-সমাজ কি তাকে 'দজ্জাল' অপবাদ দিয়ে একঘরে করবে না? আমাদের কলম যখন 'হয়তো'র বৃত্তে বন্দি হয়, তখন বুঝতে হবে এই সমাজের পচন কত গভীরে, যেখানে নিশ্চিত কোনো সমাধান দিতে লেখকও আজ হিমশিম খাচ্ছে।
আসলে আমরা যারা সময়কে কলমে বাঁধি, তারা কোনো শখ থেকে লিখি না; লিখি ভেতরের সেই দাহ আর তীব্র আক্ষেপ থেকে। আমরা নারীর ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের সমাধান খুঁজি, আইনের বই ঘাটি, দর্শনের পাতায় নতুন পথের সন্ধান করি। নিজ নিজ ভাবনায় একটা সমাধানের নকশা আঁকার চেষ্টা করি—কখনো আত্মরক্ষার কৌশলে, কখনো কড়া আইনি সংস্কারে। কিন্তু দিনশেষে যখন খবরের কাগজের পাতায় আবার সেই একই পৈশাচিকতার পুনরাবৃত্তি দেখি, তখন মনে হয় কিছুই পরিবর্তন হয়নি। সমাজ যেন এক স্থবির পাথর, যেখানে আমাদের প্রতিবাদের শব্দগুলো ধাক্কা খেয়ে বারবার আমাদের কাছেই ফিরে আসে।
এই যে পরিবর্তনের দীর্ঘসূত্রতা, এটাই একজন লেখকের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি। তবুও আমরা লিখি, কারণ চুপ থাকা মানে এই পচা গলির অন্ধকারে নিজেকে বিলীন করে দেওয়া। হয়তো আমাদের এই শব্দগুলোই কোনো একদিন কোনো এক নারীর ভেতরে আগ্নেয়গিরি হয়ে জ্বলবে, যা তাকে 'সহিষ্ণু ভিকটিম' থেকে 'প্রতিরোধের প্রাচীর' হিসেবে গড়ে তুলবে।
অভিমত থেকে আরো পড়ুন