https://www.prothomalony.com/
16371
opinion
জনাব তারেক রহমান সাহেব,
আসসালামু আলাইকুম।
আপনি নিশ্চয় জানেন যে,
একটি জাতি তার ভাষা ও সংস্কৃতির মধ্য দিয়েই বিশ্বে পরিচিতি লাভ করে। বাংলা ভাষা শুধু আমাদের রাষ্ট্রভাষা নয়; এটি আত্মত্যাগের ইতিহাস বহন করে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত—কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা কি সেই মর্যাদাকে কৌশলগতভাবে ব্যবহার করতে পেরেছি?
বাংলা ভাষা বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা এবং জাতীয় পরিচয়ের ভিত্তি। ভাষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতায় প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে মাতৃভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্ব দিয়েছে।
বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় ভাষা ও সংস্কৃতি রাষ্ট্রের ‘সফট পাওয়ার’ হিসেবে কূটনীতি, অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়—তারা ভাষাকে কেবল শিক্ষার মাধ্যম নয়, কূটনৈতিক শক্তি হিসেবেও ব্যবহার করেছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ তাদের ভাষা ও সংস্কৃতির আন্তর্জাতিক প্রচার ও কৌশলগত প্রভাব বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিশেষায়িত সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছে। যেমন—ব্রিটিশ কাউন্সিল, জার্মান কালচারাল সেন্টার, আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ, আমেরিকান সেন্টার, কোরিয়ান কালচারাল সেন্টার প্রমুখ। এই প্রতিষ্ঠানগুলো বিশ্বের নানা প্রান্তে তাদের ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এর মাধ্যমে তারা অর্থনীতি, বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কেও লাভবান হয়েছে।
তাহলে বাংলাদেশ কেন পারবে না?
**বাংলা ভাষার বিশ্বায়ন: সময় কি এখনই নয়?**
উপর্যুক্ত মডেলসমূহ বিবেচনায় রেখে বাংলাদেশের জন্য একটি সমন্বিত ও প্রাতিষ্ঠানিক সাংস্কৃতিক নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠা সময়োপযোগী ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
জনাব তারেক রহমান,
আজ আমাদের প্রয়োজন একটি সুপরিকল্পিত “বাংলাদেশ কালচারাল সেন্টার (বিসিসি)” নামে একটি আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করা, যা পর্যায়ক্রমে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ শহরসমূহে স্থাপন করা হবে এবং সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হবে। প্রয়োজনে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বিত কাঠামো গড়ে তোলা যেতে পারে। বিশেষ করে লস অ্যাঞ্জেলেস, নিউইয়র্ক, ওয়াশিংটন ডিসি-র মতো শহর থেকে পরীক্ষামূলকভাবে শুরু করা যেতে পারে।
পরবর্তীতে ধাপে ধাপে এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের অন্যান্য দেশে সম্প্রসারণ করা হবে।
প্রবাসী বাংলাদেশিদের শক্তিশালী উপস্থিতি এবং সাংস্কৃতিক উদ্যোগ এই প্রকল্পের ভিত্তি হতে পারে।
এই কেন্দ্রগুলোতে থাকবে বাংলা ভাষা শিক্ষা, সাহিত্যচর্চা, নাটক, সঙ্গীত, নৃত্য, মূকাভিনয়, আবৃত্তি, চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, চারুকলা প্রদর্শনী এবং পর্যটন তথ্যকেন্দ্র।
আমাদের কৌশলগত উদ্দেশ্য হবে—
১. বাংলা ভাষার আন্তর্জাতিক শিক্ষা ও স্বীকৃতি বিস্তার।
২. সাংস্কৃতিক কূটনীতি শক্তিশালীকরণ।
৩. সাহিত্য, শিল্প ও ঐতিহ্যের বৈশ্বিক প্রচার।
৪. পর্যটন ও সাংস্কৃতিক অর্থনীতির সম্প্রসারণ।
৫. মুক্তিযুদ্ধ ও ভাষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক বর্ণনা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উপস্থাপন।
৬. প্রবাসী বাংলাদেশিদের সাংস্কৃতিক সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি।
বিশেষভাবে স্থানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করে বাংলা ভাষাকে ঐচ্ছিক বিদেশি ভাষা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার প্রচেষ্টা নেওয়া যেতে পারে।
প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রশাসনিক কাঠামো হিসেবে সেখানে থাকবে—মহাপরিচালক, ভাষা ও শিক্ষা পরিচালক, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম পরিচালক, অর্থ ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা এবং স্থানীয় সাংস্কৃতিক সমন্বয়ক।
অবকাঠামোগত ব্যবস্থায় থাকবে—ভাষা শিক্ষা শ্রেণিকক্ষ, গ্রন্থাগার ও গবেষণা কেন্দ্র, বহুমুখী মিলনায়তন, চলচ্চিত্র প্রদর্শনী ও চারুকলা গ্যালারি, পাশাপাশি পর্যটন ও তথ্যকেন্দ্র।
কার্যক্রমের পরিধির মধ্যে থাকবে ভাষা ও শিক্ষার আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন বাংলা ভাষা কোর্স, সার্টিফিকেট ও ডিপ্লোমা প্রোগ্রাম, স্থানীয় স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে একাডেমিক সমন্বয়, শিক্ষক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম—নাটক, সঙ্গীত, নৃত্য ও চলচ্চিত্র উৎসব ইত্যাদি।
আন্তঃদেশীয় সাংস্কৃতিক বিনিময় কর্মসূচি হিসেবে থাকবে সাহিত্য সম্মেলন ও বইমেলা, গবেষণা ও প্রকাশনা, অনুবাদ প্রকল্প, ভাষা ও সংস্কৃতিবিষয়ক গবেষণা, ডিজিটাল আর্কাইভ প্রতিষ্ঠা, পর্যটন ও অর্থনৈতিক সংযোগ, বাংলাদেশভিত্তিক পর্যটন প্রচার, সাংস্কৃতিক শিল্প ও সৃজনশীল অর্থনীতির প্রচারণা, বিনিয়োগ ও বাণিজ্যিক সংযোগে তথ্য সহায়তা।
এর ফলে আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলা ভাষার প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি বৃদ্ধি পাবে। বাংলাদেশের ইতিবাচক আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি সুদৃঢ় হবে। সাংস্কৃতিক কূটনীতির মাধ্যমে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদার হবে। সৃজনশীল শিল্প ও পর্যটন খাতে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সুফল অর্জিত হবে। প্রবাসী ও নতুন প্রজন্মের মধ্যে জাতীয় পরিচয় শক্তিশালী হবে।
জনাব তারেক রহমান,
বাংলাদেশের ভাষা ও সংস্কৃতি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আরও সুসংহতভাবে উপস্থাপনের জন্য “বাংলাদেশ কালচারাল সেন্টার” প্রতিষ্ঠা একটি সময়োপযোগী ও কৌশলগত উদ্যোগ।
এটি কেবল সাংস্কৃতিক বিনিয়োগ নয়—রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক শক্তিবৃদ্ধির একটি কাঠামোগত পদক্ষেপ।
ভাষা শুধু আবেগ নয়—এটি অর্থনৈতিক সম্পদও।
সংস্কৃতি শুধু ঐতিহ্য নয়—এটি কূটনৈতিক শক্তি।
বাংলাদেশ যদি পরিকল্পিতভাবে বিশ্বে তার ভাষা ও সংস্কৃতিকে উপস্থাপন করতে পারে, তবে তা হবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক কৌশলগত বিনিয়োগ।
সময় এসেছে বাংলা ভাষাকে বিশ্বমঞ্চে নতুনভাবে প্রতিষ্ঠিত করার।
আপনার সদয় বিবেচনার জন্য প্রস্তাবটি উপস্থাপন করা হলো।
বিনীত—
কাজী মশহুরুল হুদা
মূকাভিনয় শিল্পী
লস অ্যাঞ্জেলেস, যুক্তরাষ্ট্র।
অভিমত থেকে আরো পড়ুন