https://www.prothomalony.com/

15614

opinion

অভিমত

বাংলাদেশের স্বাধীনতার অকৃত্রিম বিদেশি বন্ধুরা

প্রকাশ: ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫ ০৬:৫৫

বাঙালির অস্থিমজ্জায় ও মননে জড়িয়ে আছে ১৯৭১ সালের আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা এবং বাঙালির অসামান্য বীরত্ব গাঁথা। স্বাধীনতার মাস অর্থাৎ মার্চ এলেই আমাদের চোখে স্বাধীনতার স্মৃতিগুলি উঁকি দেয়। সেই সময় শুরু থেকেই দেশি এবং বিদেশি সাংবাদিকরা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নৃশংসতার ছবি বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরেছেন। শুধু সাংবাদিকই নন রয়েছেন গায়ক এবং অন্যান্যরা। গায়কের গান, সাংবাদিকের কলম এবং কবির কবিতা প্রতিটি জায়গাতেই বাঙালির প্রতি নিমর্মতা প্রকাশ পেয়েছে এবং তা বিশ্ব মিডিয়ায় আলোড়ন তুলেছে। কারণ পাকিস্তান বাহিনী যুদ্ধের শুরু থেকেই প্রচার করতে চেয়েছে এই যুদ্ধ ভারতের ইন্ধনে ঘটছে।

যারা ঘটাচ্ছে তারা পাকিস্তানের অখন্ডতার শত্রæ। পাকিস্তান ভুল তথ্য বিশ্ব মিডিয়ার সামনে তুলে ধরতে প্রচেষ্টা রেখেছে। বাংলাদেশের মানুষের উপর নির্মমতার সংবাদ প্রচারেও ছিল নানা বাধা। পাকিস্তান এই যুদ্ধ ভারতের উস্কানি বলে তাদের শিক্ষা দিতে হবে এরকম একটা ঘটনা বোঝাতে চেয়েছিল। এই খবরই তারা তাদের মতো করে বিদেশে প্রচার করতে থাকে। ফলে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ভুল খবরাখবর পৌঁছাতে শুরু করে। সাংবাদিকদের ওপর পাকিস্তানের চাপ ছিল প্রবল। এই চাপ উপেক্ষা করেই সাংবাদিকরা বিশ্ব মিডিয়ায় তুলে ধরেছেন পাক বাহিনীর নির্মমতা। সেই চাপ উপেক্ষা করে গুটিকতক সাংবাদিক সাহসী কাজটি করেছিলেন বা করতে সক্ষম হয়েছিলেন। সেই সময় কোনো ঘটনার প্রচার এখনকার মতো এতটা সহজ ছিল না। ফলে খবর সংগ্রহ করতে জীবনের ঝুঁকি নিয়েই রণাঙ্গনে যেতে হতো এবং সংবাদ সংগ্রহ করতে হতো। এটা ছিল মারাত্বক ঝুঁকিপূর্ণ একটি কাজ।

আমাদের বিদেশি বন্ধুদের মধ্যে অন্যতম একজন হলেন সাংবাদিক সাইমন ড্রিং। ১৯৭১-এ তিনি ছিলেন কম্বোডিয়ার রাজধানী নমপেনে দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ-এর রিপোর্টার হিসেবে। সে সময় লন্ডনের সদর দপ্তর থেকে তাকে বলা হলো, ‘পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত। সেখানে বড় কিছু ঘটতে যাচ্ছে, তুমি ঢাকায় যাও।’ ৬ মার্চ ঢাকা আসেন তিনি। ২৫ মার্চ গণহত্যা শুরুর পর সব সাংবাদিককে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে অবরুদ্ধ করে পাকিস্তান সেনাবাহিনী। সেনা কর্তৃপক্ষ জানায়, শহরের পরিস্থিতি খুবই খারাপ, নিরাপত্তার স্বার্থে হোটেলের ভেতরেই অবস্থান করতে হবে তাদের। পরদিন সকালেই সব সাংবাদিককে বিমানবন্দরে নিয়ে তুলে দেয়া হয়। কিন্তু সেখানে সাইমন ড্রিং ছিলেন না। জীবনের ঝুঁকি নিয়েই অবস্থান করেন ঢাকায়। ২৭ মার্চ কারফিউ তুলে নেয়া হলে মোটরভ্যানে করে ঢাকা ঘুরে দেখেন তিনি। তারপর লিখেছিলেন, ‘ট্যাংকস ক্র্যাশ রিভোল্ট ইন পাকিস্তান’ নামক এক কলাম। ৩০ মার্চ এটি ছাপা হয়েছিল লন্ডনের ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকায়।


সাইমন ড্রিং-এর এই লেখার ফলেই পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বর্বরতার কথা জানতে পারে পুরো বিশ্ব। হত্যাযজ্ঞ শুরু হওয়ার পর হোটেল ইন্টার কন্টিনেন্টালের সব সাংবাদিকদের পরদিন সকালেই বিমানবন্দরে নিয়ে তুলে দেওয়া হয়। কিন্তু সেই চোখ এড়িয়ে থেকে যান এখানেই। সাহসের এখানেই শুরু। এরপর তিনি একের পর এক প্রতিবেদন পাঠাতে শুরু করেন। বিশ্বের দৃষ্টি বাংলাদেশের দিকে ঘুরিয়ে দেন।

তখন বাংলা অগ্নিগর্ভ। ওই প্রতিবেদনে তিনি উল্লেখ করেন, আল্লাহর নামে আর অখন্ড পাকিস্তান রক্ষার অজুহাতে ঢাকা আজ ধ্বংসপ্রাপ্ত ও সন্ত্রস্ত এক নগর’। তাকে পাকিস্থান সরকার জোরপূর্বক দেশ থেকে বের করে দিয়েছিল এবং তিনি পুনরায় কলকাতায় ফিরে সেখান থেকেই মুক্তিযুদ্ধের খবরাখবর পাঠাতেন। মুক্তিযুদ্ধের শুরু এবং শেষ অর্থাৎ বাঙালির বিজয়ের দিনের স্বাক্ষিও তিনি। তিনিই ছিলেন বাংলাদেশে চালানো পাকিস্থানী সেনাবাহিনীর প্রথম প্রত্যক্ষদর্শী। নিজের জীবন বিপন্ন করে তিনি পাকিস্থানী বাহিনীর এই নির্মমতার খবর সংগ্রহ করেন এবং বিশ^কে জানান এবং সাথে সাথে বাঙালির পক্ষে বিশে^ একটি জনমত ও পাকিস্থানী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জন্মে ভূমিকা পালন করে। তারপর বিশ^ বাংলাদেশের ওপর চালানো এই নির্মমতার খবর জানতে পারে। সাংবাদিকতার অসীম শক্তি সত্য প্রকাশের। সেই সত্য প্রকাশে যে মারাত্বক ঝুঁকি থাকে এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত একজন সাংবাদিক তা জানেন। বিশেষ করে সেই পরিস্থিতি যদি হয় কোনো যুদ্ধাবস্থা,আগ্রাসন বা এরকম কোনো পরিস্থিতি যেখানে শাসকগোষ্ঠীর চালানো বন্দুকের গুলিতে নিরীহ মানুষ মারা যায়।

সাইমন ড্রিং কেবল বাংলাদেশের বন্ধু ছিলেন না তিনি ছিলেন পৃথিবীর মানুষের অকৃত্রিম বন্ধু। দক্ষিণ আফ্রিকার দুর্ভিক্ষপীড়িত অঞ্চলের জনগণকে সহায়তার জন্য তিনি একটি দাতব্য তহবিলের ধারণা তুলে ধরেন। এই তহবিল সৃষ্টির ইতিহাসের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ছিল যেখানে ১২০ টি দেশে ২০ মিলিয়ন মানুষ এ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৮৬ সালে তিনি দুটি দাতব্য তহবিল গড়ে। এই তহবিলে পূর্বের চেয়েও বেশি দেশের বেশি মানুষ অংশগ্রহণ করে। মানুষের জন্য সায়মন ড্রিং এভাবেই প্রচেষ্টা করেছেন। তাদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছেন। বাংলাদেশ জন্মলগ্নের দুঃসময়ের ওই স্মৃতিময় সময়গুলিতে সাইমন ড্রিং এবং আরও কয়েকজন সাংবাদিক ঝুঁকি নিয়ে এদেশের প্রকৃত পরিস্থিতি বিশ^বাসীর কাছে তুলে ধরেছিলেন। এসব বন্ধু দেশগুলোর সমর্থন আদায়ের পথ সুগম করেছিল। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ব্যাপারে একটি জনমত গড়ে ওঠে এবং পাকিস্তানের অত্যাচার এবং নির্মমতায় তীব্র সমালোচনার সৃষ্টি হয়।

সাংবাদিক সাইমন ড্রিং ছাড়াও জর্জ হ্যারিসন, পন্ডিত রবিশংকর কিংবা অ্যালেন গিনসবার্গদের ভূমিকা অবিস্মরণীয়। বাংলার মানুষ আজন্ম তাদের প্রতি প্রকাশ করবে কৃতজ্ঞতা। গণমাধ্যমে সাংবাদিকরা যখন সাহসের সাথে পাকিস্তানের বর্বরতা তুলে ধরছে অন্যদিকে প্রয়োজন ছিল একটি সাংস্কৃতিক বিপ্লবের। সেই আবেদনে সাড়া দিয়ে এগিয়ে আসে পন্ডিত রবি শংকর, জর্জ হ্যারিসনসহ আরো অনেকেই। আয়োজন করেন কনসার্টের। বাংলাদেশের মানুষের জন্য কিছু একটা করতে চাইছিলেন তিনি। তাই উদ্যোগ নিলেন ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’-এর। সময়টা ১৯৭১ সালের ১ আগস্ট। ইতিহাস সাক্ষি হতে চলেছিল সেদিন। মেডিসিন স্কয়ারের সেই কনসার্টে জড়ো হলেন জর্জ হ্যারিসন, বব ডিলান, এরিক ক্ল্যাপটন, লিওন রাসেল, রিঙ্গো স্টার, বিলি প্রেস্টন, পন্ডিত রবিশঙ্কর, ওস্তাদ আলী আকবর খান এবং ওস্তাদ আল্লা রাখাসহ অনেকেই। এই কনসার্টের পর পুরো বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ল বাংলাদেশের অবস্থা। এই ঘটনা নাড়িয়ে দিলো সারা বিশ্বকে। মানুষের মনে জন্মালো বাঙালিদের প্রতি নৃশংসতার প্রতিবাদে ঘৃণা। এর বিপরীতে পাকিস্তানের প্রতি বিশ্ববাসীর মনে জন্ম নিল ঘৃণা এবং প্রতিবাদ। মুক্তিযুদ্ধে আমাদের আরেক সাংস্কৃতিক বন্ধু অ্যালেন গিনসবার্গ। বাংলা সাহিত্যের কালজয়ী লেখক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বন্ধু ছিলেন তিনি। তার লেখা ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ কবিতাটি ছিল মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে এক শক্তিশালী সাংস্কৃতিক বিপ্লব।

১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশে এসেছিলেন অ্যালেন গিনসবার্গ। বাংলার শহর থেকে গ্রাম যখন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর দেওয়া আগুনে ভস্মিভূত হচ্ছে তখন তিনি পথে হেঁটে হেঁটে মানুষের ভয়ার্ত চেহারা, ক্ষুধার্ত মুখ দেখে কষ্ট পান। ভারী বর্ষণ উপেক্ষা করে নৌকাযুগে যশোর এসেছিলেন কবি। বাংলাদেশের মানুষের ভয়াবহ দুর্ভোগ দেখে লিখেছিলেন সেই জনপ্রিয় কবিতা ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড।’ এই কবিতার কয়েকটি লাইন হলো- শত শত চোখ আকাশটা দেখে, শত শত শত মানুষের দল যশোর রোডের দুধারে বসত বাঁশের ছাউনি কাঁদামাটি জল কাদামাটি মাখা মানুষের দল, গাদাগাদি করে আকাশটা দেখে আকাশে বসত মরা ইশ্বর, নালিশ জানাবে ওরা বল কাকে ঘরহীন ওরা ঘুম নেই চোখে, যুদ্ধে ছিন্ন ঘর বাড়ি দেশ মাথার ভিতরে বোমারু বিমান, এই কালোরাত কবে হবে শেষ। কবিতাটি ১৯৭১ সালের ২০ নভেম্বর সেইন্ট জর্জ চার্চে ‘বাংলাদেশের জন্য মার্কিনিরা’ শীর্ষক কবিতা পাঠের আসরে আবৃত্তি করেন ‘যশোর রোড’। অগণিত দর্শকের মধ্যে সেখানে বব ডিলানও উপস্থিত ছিলেন।

এ তো শুধু কবিতা নয়, এটি ইতিহাস। বাংলাদেশ জন্মের ইতিহাস। ইতিহাস আমাদের সেই বন্ধুদের স্মরণে রেখেছে চিরকাল। বাংলাদেশ জন্ম নেওয়ার অবিস্মরণীয় মুহূর্তে প্রাণ বাজি রেখে এগিয়ে আসা এই অকৃত্রিম বন্ধুদের প্রতি রইলো ভালোবাসা।
 


অলোক আচার্য
প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট, পাবনা।

 

অভিমত থেকে আরো পড়ুন