https://www.prothomalony.com/

15379

opinion

অভিমত

প্রতিহিংসার রাজনীতি—অশুভ চক্র থেকে বেরিয়ে আসার সময়

প্রকাশ: ১৬ নভেম্বর ২০২৫ ২৩:৪৮

প্রতিহিংসা রাজনীতিতে কোনো কল্যাণ আনে না। এটি ইতিহাসে বহুবার প্রমাণিত সত্য। ক্ষমতার পালাবদল যতবার হয়েছে, প্রতিশোধের আগুন ততবারই সমাজকে দগ্ধ করেছে। রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট হয়েছে। বিচার ব্যবস্থার মানক্ষুণ্ন হয়েছে। গণতন্ত্রের ভিত্তি দুর্বল হয়েছে। আর তাই আজ নতুন করে ভাবার সময় এসেছে—প্রতিহিংসার চক্র থেকে বেরিয়ে না এলে আমাদের ভবিষ্যৎ আরও সংকটময় হয়ে উঠবে।

মানুষ যখন ক্ষমতায় থাকে, তখন মনে হয় তার অধিকার সবকিছু। বিরোধীরা যেন শত্রু। সমালোচনা যেন অপরাধ। আর ক্ষমতা হাতছাড়া হলে বিপরীত পক্ষের হাতে প্রতিশোধের পথ খুলে যায়। এভাবেই দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতির ভেতর একটি অশুভ চক্র তৈরি হয়েছে—“তুমি আমাকে করেছ, আমিও তোমাকে করবো।” এই চক্রে পতিত হলে রাষ্ট্র আর জনগণ—দু’জনই হারায়।

রাজনীতিতে প্রতিহিংসা যে সর্বনাশ ডেকে আনে, তার উদাহরণ আমাদের উপমহাদেশে বহু। পাকিস্তানের সামরিক শাসনকালের নিষ্ঠুরতা। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে ক্ষমতাকে কেন্দ্র করে রক্তাক্ত সংঘাত। একের পর এক হত্যাকাণ্ড, পাল্টা প্রতিশোধ, জরুরি অবস্থা, রাজনৈতিক দমন—এসব কখনো দেশকে সমৃদ্ধ করেনি। বরং প্রতিবারই আমাদের সমাজকে আরও অনিরাপদ করেছে।

তাই যখন বলা হয়, “আমি প্রতিহিংসার শিকার হয়েছি বলে আমিও প্রতিশোধ নেব”—এ কথা শুধু অপরিণত নয়, বিপজ্জনক। অন্যায় হলে তার প্রতিকার আছে। বিচারব্যবস্থা আছে। আইন আছে। কিন্তু প্রতিশোধের মানসিকতা আইনকে অতিক্রম করে যায়। সেখানে যুক্তি থাকে না। থাকে শুধু প্রতিহিংসার তীব্রতা। এই আগুন কখনোই একটি সীমায় থেমে থাকে না। সেটি ধীরে ধীরে গোটা সমাজে ছড়িয়ে পড়ে।

আমাদের রাজনীতিতে আরেকটি অসুখ দীর্ঘদিন ধরে আছে—বিচারকে দলীয় চশমায় দেখা। কেউ ক্ষমতায় থাকলে মনে হয়, সব মামলা ন্যায়সঙ্গত। আর ক্ষমতায় না থাকলে সব মামলা প্রতিহিংসাপরায়ণ। এই মনোভাব বিচারব্যবস্থাকে দুর্বল করে। জনগণের আস্থা নষ্ট করে। রাষ্ট্রের ভিত্তিকে ঝুঁকির মুখে ফেলে।

বিচারকে প্রশ্নাতীত রাখার দাবি তাই শুধু একটি নীতি নয়, রাষ্ট্র পরিচালনার ভিত্তি। আইন যদি নিরপেক্ষ না হয়, আদালত যদি বিশ্বাসযোগ্য না হয়, প্রশাসন যদি দলীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে চলে—তাহলে রাজনীতির প্রতিহিংসা কখনোই থামবে না। সমাজে ন্যায়বোধ প্রতিষ্ঠা করা কঠিন হয়ে যাবে। আর সাধারণ মানুষ মনে করবে দেশ শক্তির কাছে বন্দী।

প্রতিহিংসা শুধু রাজনীতির সমস্যা নয়। এটি সামাজিক সম্পর্কেও বিষ ছড়ায়। ক্ষমতায় থাকা মানুষদের আচরণ সাধারণ মানুষ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে। রাজনীতিবিদেরা যদি শত্রুতা ও প্রতিশোধে মেতে ওঠেন, সমাজ একই পথে হাঁটতে শেখে। ফলে ভিন্নমত সহ্য করার ক্ষমতা কমে যায়। সহিংসতা বাড়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে পাড়া-মহল্লা পর্যন্ত প্রতিহিংসার ভাষা ছড়িয়ে পড়ে।

আমাদের দরকার এমন নেতৃত্ব, যারা কঠিন সময়ে শান্ত থাকার শিক্ষা দেন। যারা প্রতিহিংসার বদলে আইনের শাসনকে অগ্রাধিকার দেন। যারা দেখাতে পারবেন—ক্ষমতা মানে প্রতিশোধ নেওয়ার অধিকার নয়। কোনো দেশে গণতন্ত্র পরিপক্ব হয় তখনই, যখন ক্ষমতাসীন ও বিরোধী—দু’পক্ষই আইনের প্রতি সমান আস্থা রাখে। ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বিচারবিভাগের রং বদলায় না। প্রশাসন বদলায় না। নীতি বদলায় না। কেবল নেতৃত্ব বদলায়।

রাজনীতিতে প্রতিহিংসার বৃত্ত ভাঙতে হলে আমাদের কিছু মৌলিক নীতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

প্রথমত, আইনের শাসনের প্রতি অবিচল সম্মান। আইন যদি সবার জন্য সমান না হয়, প্রতিহিংসা কখনো থামবে না। আদালতকে স্বাধীন হতে হবে। তদন্ত সংস্থাগুলোকে পেশাদার হতে হবে। বিচার যেন কখনো রাজনৈতিক প্রতিশোধের হাতিয়ার না হয়—এ নিশ্চয়তা দিতে হবে।

দ্বিতীয়ত, বিরোধী মতকে সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করার সংস্কৃতি গড়া। বিরোধীকে শত্রু ভাবলে প্রতিহিংসা জন্মে। কিন্তু বিরোধীকে প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখতে পারলে সহনশীল রাজনীতি গড়ে ওঠে।

তৃতীয়ত, ক্ষমতার অপব্যবহার বন্ধ করা। ক্ষমতা হাতে পেলে সবাই যেন মনে না করে—এটাই সুযোগ “ওদের শায়েস্তা করার।” এমন মানসিকতার অবসান ঘটাতে হবে।

চতুর্থত, স্মৃতি থেকে শিক্ষা নেওয়া। অতীতের প্রতিহিংসা আমাদের কী ক্ষতি করেছে—এ কথাটি ইতিহাসের সামনে তুলে ধরতে হবে। নতুন প্রজন্মকে বোঝাতে হবে, রাষ্ট্র কারও ব্যক্তিগত প্রতিশোধের জায়গা নয়।

পঞ্চমত, সংলাপের সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনা। যেসব রাজনৈতিক সংঘাত সহজেই মীমাংসা করা যায়, সেগুলোকে প্রতিশোধের পথে ঠেলে দিলে ক্ষতি শুধু রাজনৈতিক দলের নয়—সম্পূর্ণ রাষ্ট্রের।

রাজনীতি যদি সত্যিই জনগণের জন্য হয়, তাহলে সবার আগে দরকার একটি শান্ত, স্থিতিশীল, ন্যায়নিষ্ঠ পরিবেশ। প্রতিহিংসা সেখানে বড় বাধা। প্রতিশোধ কখনো কোনো জাতিকে এগিয়ে নিতে পারে না। বরং দেশকে পিছিয়ে দেয়, দুর্বল করে।

আজকের বাংলাদেশে রাজনৈতিক বিরোধ আছে, থাকবে। মতের পার্থক্য আছে, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এসব মতবিরোধ যেন প্রতিহিংসার অশুভ চক্রে রূপ না পায়—এ দায় রাজনীতির সব পক্ষের। যিনি প্রতিহিংসার শিকার হয়েছেন, তাঁর পক্ষে প্রতিহিংসার প্রতিশোধ নেওয়া সহজ। কিন্তু সেই প্রবৃত্তিকে জয় করতে পারাই নেতৃত্বের প্রকৃত গুণ। রাষ্ট্রনায়কত্ব এখানেই।

অতএব সময় এসেছে নতুন পথ বেছে নেওয়ার। সেই পথ হলো—আইনের প্রতি অটল আস্থা। ন্যায়বিচারের প্রতি অবিচল বিশ্বাস। ক্ষমতার বদলে নৈতিকতার শক্তি। প্রতিহিংসার রাজনীতি নয়—সহনশীল, মানবিক, গণতান্ত্রিক রাজনীতি।

অশুভ চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে হবে এখনই। কারণ প্রতিহিংসা কখনোই কল্যাণ বয়ে আনে না। আর আমরা যদি সত্যিই উন্নত, শান্তিপূর্ণ, মানবিক রাষ্ট্র গড়তে চাই—তাহলে প্রতিহিংসাকে নয়, আইনকেই সর্বোচ্চ স্থান দিতে হবে।
 

অভিমত থেকে আরো পড়ুন