https://www.prothomalony.com/

15129

opinion

অভিমত

কুম্ভিলকবৃত্তি: লেখকের বুদ্ধিবৃত্তিক সততা ও নৈতিকতার অভাব

প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০২৫ ০০:৪৩

'আরে বাবা, লেখা চুরি! ওটা তো বুদ্ধিবৃত্তিক জগতের সবচেয়ে 'সহজ সরল' পদ্ধতি। কেন কষ্ট করে নতুন কিছু ভাববেন, যখন গুগল বা পাশের বন্ধুর খাতায় সব তৈরি করাই আছে?'—লেখা চুরি নিয়ে নিজের সাথে নিজের এভাবেই দ্বন্দ্ব শুরু হতে দেখি।

এ যেন হীরের দোকানে গিয়ে নকল পাথর কিনে নিজেকে রাজা ভাবা। আমাদের দেশে তো অনেকে এই 'কুম্ভিলক-শিল্পে' এতটাই পারদর্শী যে, তারা শুধু শব্দই নয়, অন্যের চিন্তাভাবনাও এমন নিখুঁতভাবে নিজেদের 'মস্তিষ্কপ্রসূত' বলে দাবি করেন যে, স্বয়ং আসল লেখকও ধাঁধায় পড়ে গিয়ে ভাবতে থাকেন, "ইহা কি মোর আবিস্কার?"

সাহিত্য বা বুদ্ধিবৃত্তিক কাজের প্রাণশক্তি হলো স্বাধীন চিন্তা। একজন কবি, প্রাবন্ধিক বা চিন্তাবিদ যা অনুভব করেন, পর্যবেক্ষণ করেন এবং নিজস্ব প্রজ্ঞায় যে ভাবনাকে রূপ দেন, তাই তার সৃষ্টির নৈতিক শক্তি হিসেবে ফুটে ওঠে। এই মৌলিকতাই কোনো কাজকে ক্ষণস্থায়ী জনপ্রিয়তা থেকে মুক্ত করে ইতিহাসের দরবারে স্থায়িত্ব দেয়।

সৃজনশীলতা হলো আত্ম-প্রকাশের গভীরতম মাধ্যম। যখন একজন শিল্পী কোনো কিছু লেখেন, তখন তার ভেতরের স্বতন্ত্র সত্তাটি তার অভিজ্ঞতা, বিশ্বাস এবং বিশ্বকে দেখার নিজস্ব কোণ থেকেই আসে—আর একারণে সেই লেখার প্রতিটি শব্দ, বাক্য, এবং উপমা জীবন্ত হয়ে ওঠে। এই প্রক্রিয়ায় জন্ম নেওয়া কাজই 'আসল' এবং এর ভেতরেই থাকে সেটির সত্যিকারের মূল্য।

অন্যদিকে, অন্যের লেখা চুরি করা বা চুরি করা ভাবনার ওপর ভিত্তি করে খ্যাতি অর্জনের চেষ্টা করলে সেই স্বতন্ত্র সত্তাটিই বিলুপ্ত হয়ে যায়। এ ধরনের কাজ বাহ্যিকভাবে খ্যাতি বা ক্ষণস্থায়ী জনপ্রিয়তা এনে দিতে পারলেও তা মূলত একটি মিথ্যা খ্যাতি। এই 'মিথ্যা' খ্যাতির পেছনে কোনো সততা বা নৈতিক ভিত্তি থাকে না, কারণ এটি লেখকের নিজস্ব শ্রম বা মেধার ফল নয়।

ইতিহাস সাক্ষী, বুদ্ধিবৃত্তিক অসততা বা প্লেজিয়ারিজমের ঘটনা বহুল প্রচলিত। বিশ শতকের অন্যতম খ্যাতনামা কবি ও সাহিত্যিক কণ্ঠস্বর টি. এস. এলিয়ট "দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড" বিখ্যাত কবিতাটি রচনা করেন, যা যুদ্ধ-পরবর্তী মানবজীবনের শূন্যতা ও বিভীষিকাকে তুলে ধরে। কবিতাটি তাকে বিশ্বসাহিত্যের অগ্রভাগে নিয়ে আসে।

তবে অভিযোগ উঠে, এই কবিতাটি পুরোপুরি এলিয়টের নিজস্ব সৃষ্টিকর্ম নয়। বলা হয়, তিনি কম পরিচিত আমেরিকান কবি ম্যাডিসন কাওয়েইনের লেখা "ওয়েস্ট ল্যান্ড" নামের একটি কবিতা থেকে বহু অংশ গ্রহণ বা নকল করেছিলেন।

তবে সাহিত্য সমালোচকেরা সাধারণভাবে মনে করেন, এলিয়টের "দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড" কবিতা সরাসরি "চুরি" নয়, বরং এটি একটি সাহিত্যিক কোলাজ যেখানে তিনি নানা সাহিত্যিক উৎস, পুরাণ, ধর্মীয় প্রতীক, এবং পূর্ববর্তী লেখকদের কবিতার ইঙ্গিত ও উদ্ধৃতি একত্র করে আধুনিক জীবনের ভাঙা বাস্তবতাকে শিল্পরূপ দিয়েছেন। এলিয়টও দাবি করতেন এটি ছিল "ট্র্যাডিশন ও ব্যক্তিগত মেধার" সংমিশ্রণ, যা প্লেজিয়ারিজমের চেয়ে ভিন্ন। তাই তার কাজটি প্রায়ই "ইন্টারটেক্সচুয়াল" বা "উদ্ধৃতিনির্ভর" কবিতা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়, "চৌর্য" হিসেবে নয়।

আবার কিছু সমালোচকরা বিতর্ক করেন যে তিনি কি নতুন কিছু তৈরি করছেন নাকি শুধু ধার নিচ্ছেন। সহজ বাংলায় বলা যায়, চুরি করা খণ্ডাংশের সঙ্গে পাঁচফোঁড়নের মিশেলে এলিয়ট তার কবিতাকে ভিন্ন এক সৌন্দর্য ও অর্থ প্রদান করে সমর্থকদের দ্বারা স্বীকৃতি লাভ করেছিলেন।

উল্লেখ যে, ম্যাডিসন কাওয়েইন ছিলেন সিনসিনাটির এক পুল-হল ক্যাশিয়ার, যিনি তার কবিতা "ওয়েস্ট ল্যান্ড" প্রকাশের মাত্র এক বছর পর মারা যান। কবিতাটি প্রকাশিত হয়েছিল শিকাগোর একটি সাহিত্য পত্রিকায়—যার ইউরোপীয় সম্পাদক ছিলেন এলিয়টের বন্ধু ও পরামর্শদাতা এজরা পাউন্ড।

জার্মান দার্শনিক ফ্রিডরিখ নিটশের কাজ দর্শন, কবিতা, সাংস্কৃতিক সমালোচনা ও কথাসাহিত্য জুড়ে বিস্তৃত। তার লেখায় সংক্ষিপ্ত উক্তি ও ব্যঙ্গের ব্যবহার লক্ষণীয়। নিটশের দর্শনের মূল দিকগুলোর মধ্যে রয়েছে সত্যের প্রতি সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি বা পার্সপেক্টিভিজম, ধর্ম ও খ্রিস্টীয় নৈতিকতার জেনিয়ালজিক্যাল ক্রিটিক, এবং "ঈশ্বরের মৃত্যু"-পরবর্তী নৈরাশ্যের মধ্যে জীবনের নান্দনিক স্বীকৃতি। পরবর্তী সময়ে তিনি ব্যক্তির সৃষ্টিশীল শক্তির ওপর জোর দেন, যা সমাজ ও নৈতিকতার সীমা অতিক্রম করে নতুন মূল্যবোধ গঠনের পথ তৈরি করে। তাঁর চিন্তাধারা শিল্প, ভাষাতত্ত্ব, ইতিহাস, সংগীত, ধর্ম, সংস্কৃতি ও বিজ্ঞানে গভীর প্রভাব ফেলে। তিনি অনুপ্রাণিত হন হিব্রু ও ভারতীয় সাহিত্য, গ্রিক ট্র্যাজেডি, এবং শোপেনহাওয়ার, এমারসন, ওয়াগনার, দস্তয়েভস্কি ও গ্যোথের মতো চিন্তাবিদদের কাছ থেকে (তথ্য- উইকিপিডিয়া)।

ফ্রিডরিখ নিটশের মৃত্যুর পর তার বোন, এলিজাবেথ ফোরস্টার-নিটশে, তার পাণ্ডুলিপির রক্ষক ও সম্পাদক হন। অভিযোগ আসে, এলিজাবেথ ফোরস্টার-নিটশে যিনি ১৮৮০-এর দশকে প্যারাগুয়েতে একটি "আর্য কলোনি" প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং ফ্যাসিবাদপন্থী ছিলেন, তিনি 'দ্য উইল অফ পাওয়ার' এবং নিটশের অন্যান্য অপ্রকাশিত নোট থেকে সংগৃহীত লেখাগুলোকে বিকৃত বা আংশিকভাবে মনগড়া করে প্রকাশ করেছিলেন। বিশেষ করে, নিটশে যেসব বিষয়ে স্পষ্টভাবে ইহুদি-বিরোধিতা ও জাতীয়তাবাদকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, এলিজাবেথের সম্পাদনায় সেগুলো প্রায়শই বিকৃতভাবে উপস্থাপিত হয়। এর ফলে প্রকাশিত সংস্করণগুলোর মাধ্যমে নিটশের দর্শনকে ভুলভাবে ফ্যাসিবাদ ও নাৎসিবাদের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। অনেকের মতে, এলিজাবেথ ফোরস্টার একজন সুযোগসন্ধানী বোন, তার মৃত ভাইয়ের উত্তরাধিকারী হিসেবে ক্ষমতা ব্যবহার করে তার দর্শন বিকৃত করে দিয়েছিলেন।

এলিজাবেথ ফোরস্টারের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ তিনটি মূল বিষয়ে ভিত্তি করে গঠিত: ১. সম্পাদনাগত বিকৃতি: এলিজাবেথ নিটশের অপ্রকাশিত লেখাগুলো সম্পাদনার সময় নানা ধরনের পরিবর্তন করেছেন—যেমন লেখা বিকৃত করা, অংশ বাদ দেওয়া, কিছু জায়গায় মিথ্যা সংযোজন করা, অংশ পুনর্বিন্যাস করা। ফলে তার তৈরি পাণ্ডুলিপিগুলো নিটশের আসল লেখার সঠিক প্রতিফলন ছিল না। ২. রাজনৈতিক উদ্দেশ্য: তিনি এই কাজ করেছেন একটি স্পষ্ট উদ্দেশ্যে—নিজের ফ্যাসিবাদী মতাদর্শের সঙ্গে নিটশের দর্শনকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তুলতে। ৩. ভুল জনপ্রিয়তা: ফ্যাসিবাদীদের কাছে নিটশের জনপ্রিয়তা মূলত তার নিজের লেখা থেকে নয়, বরং এলিজাবেথের সম্পাদিত ও বিকৃত সংস্করণ থেকে এসেছে।

বিখ্যাত ফরাসি ঔপন্যাসিক আলেক্সান্দ্র দ্যুমা "লিটারেচার ফ্যাক্টরি" চালানোর জন্য সুপরিচিত ছিলেন। তিনি একটি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেন, যেখানে লেখকদের একটি দল তার নির্দেশনা, সম্পাদনা ও সংযোজনের অধীনে শত শত গল্প, গবেষণা, প্লট তৈরি এবং লেখার খসড়া তৈরিতে সহায়তা করতেন। ১৮৩৯ থেকে ১৮৪১ সালের মধ্যে, দ্যুমা তাঁর কয়েকজন সহযোগীর সঙ্গে মিলে "Celebrated Crimes" নামে আট খণ্ডের একটি সংকলন প্রকাশ করেন, যেখানে ইউরোপীয় ইতিহাসের কুখ্যাত অপরাধী ও অপরাধের কাহিনি তুলে ধরা হয়। এতে বিয়াত্রিচে চেনচি, মার্টিন গের, সিজার ও লুক্রেজিয়া বোরজিয়া, এবং সাম্প্রতিক সময়ের অপরাধী কার্ল লুডউইগ স্যান্ড ও অঁতোয়ান ফ্রঁসোয়া দ্যরু-এর ঘটনাও অন্তর্ভুক্ত ছিল।

যদিও এটি আধুনিক 'ঘোস্টরাইটিং'-এর মতো, তবে তার সময়ে এটি সাহিত্যিক চুরির সমতুল্য বলে বিবেচিত হত। সমালোচকরা তাকে অভিযুক্ত করতেন যে তিনি অন্যদের কাজ নিজের নামে সামান্য পরিবর্তন করে চালিয়ে দিচ্ছেন, কিংবা তার সম্পাদিত কাজগুলো সম্পূর্ণ তাঁর নিজের নয়।

এই ঐতিহাসিক উদাহরণগুলির সঙ্গে সমসাময়িক লেখকদের পরিস্থিতির তুলনা করলে দেখা যায়, বুদ্ধিবৃত্তিক অসততার ধারণাটি সময়ের সঙ্গে আরও কঠিন ও সুনির্দিষ্ট হয়েছে। চারপাশে এমন বহু লেখক, কবি, প্রাবন্ধিক এবং চিন্তাবিদদের আমরা দেখতে পাই যারা অসততা ও অনুকরণের মাধ্যমে ক্ষণস্থায়ী খ্যাতি লাভের চেষ্টা করেন। তারা সামাজিক মাধ্যমে 'লাইক' বা 'শেয়ার' পাওয়ার জন্য অন্যের ভাবনা, কবিতা বা বক্তব্যের অংশবিশেষ নিজেদের নামে ব্যবহার করেন। নিজেদের সৃষ্টিতে মৌলিক চিন্তাভাবনা বা গভীর পর্যবেক্ষণ না থাকায়, তাঁরা দুর্বলতা ঢাকতে বা লেখার মান উন্নত করতে অন্যের প্রতিষ্ঠিত কাজ থেকে সরাসরি কপি করেন। অনেক সময় বুদ্ধিবৃত্তিক সততা ও নৈতিকতার প্রতি শ্রদ্ধার অভাব থাকায় তাঁরা অ্যাট্রিবিউশন (উৎস উল্লেখ) ছাড়া অন্যের ধারণা, ডেটা বা সাহিত্য ব্যবহার করেন।

তবে, প্রযুক্তিগত অগ্রগতির কারণে এখন খুব সহজেই লেখকদের চুরি করা বা নকল করা ধরে পড়ে। আধুনিক প্রযুক্তিগত টুলস, যেমন টার্নইটিন এবং বিভিন্ন প্লেজিয়ারিজম চেকার সফটওয়্যার, এখন সহজেই একটি লেখার মধ্যে অন্য উৎসের সাথে মিলে যাওয়া অংশগুলোকে সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করতে পারে। সন্দেহজনক লেখার কয়েক লাইন গুগলে সার্চ করলেই উঠে আসে প্রকৃত লেখা ও লেখকের নাম, প্রকাশিত সময়কাল। কিন্তু তারপরও এই লেখকদের "ভাব" বিশেষ অবস্থানে থাকে।

প্রযুক্তিগতভাবে চুরি সহজে ধরা পড়লেও, সামাজিক এবং বাণিজ্যিক বাস্তবতা সেই চোরদের শাস্তি দেওয়ার বা তাদের খ্যাতি বিলুপ্ত করার ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করছে। কারণ তাদের চুরি করা বাক্য-ভাষায় সমর্থকরা নিয়মিত প্রশংসা করে যান। এমনকি পত্রিকার সম্পাদকরাও পাতা ভরাট করতে তাদের লেখা নিয়মিত চালিয়ে চান। অর্থাৎ, বাণিজ্যিক বাস্তবতা (পত্রিকা প্রকাশের তাগিদ, কম খরচে কন্টেন্ট পাওয়া) বুদ্ধিবৃত্তিক সততার নীতির চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। এই বাণিজ্যিক প্রয়োজন অসৎ লেখকদের টিকে থাকতে সাহায্য করছে।

অন্য যে কোনো কিছু বিনা অনুমতিতে দখল করা বা হরণ করাই চুরি। তবে কেন অন্যের লেখা চুরি করাদের সরাসরি চোর বা শিল্পচোর না বলে "চৌর্যবৃত্তি" বা "কুম্ভিলকবৃত্তি"-এর মতো এত উন্নতমানের শব্দে আবদ্ধ করা হয়?

সাধারণত, যারা বড় ধরনের ডাকাতি বা চুরি না করে কেবল সামান্য মূল্যমানের জিনিসপত্র বা সুযোগ বুঝে সামান্য চুরি করে থাকেন, তাদেরকে বলা হয়, "ছেঁচকা চোর"। কারণ এই ধরনের চুরি হলো বস্তুগত সম্পত্তির হরণ। যেমন টাকা, গয়না, বা কোনো ভৌত জিনিস। এই অপরাধে সাধারণত ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির আর্থিক ক্ষতি হয়।

অন্যদিকে, লেখকরা বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পত্তি বা ভাবনার হরণ করেন। এখানে চুরি হওয়া বস্তুটি অদৃশ্য, অবস্তুগত এবং এটি হলো লেখকের মৌলিক চিন্তা ও সৃজনশীলতা। আমরা জানি, সমাজ এবং সংস্কৃতিতে লেখা, শিল্প ও চিন্তার একটি উচ্চ মর্যাদা বা পবিত্রতা রয়েছে। এই কারণে হয়তো এই জগৎ থেকে চুরি করাকে সাধারণ চোর বা শিল্পচোর শব্দের মাধ্যমে নিম্নগামী করতে চাওয়া হয়নি। "চৌর্যবৃত্তি" বা "কুম্ভিলকবৃত্তি" (যা সংস্কৃত থেকে এসেছে) শব্দটি ব্যবহার করা হয়।

সারফুদ্দিন আহমেদের বক্তব‍্যটা সময়ের প্রাসঙ্গিকতায় বেশ উপযুক্ত বলে মনে হলো—"ভাবের ঘরে চুরিতে 'ভাব' নামক তেলেসমাতি মাল কমে না। আরও বাড়ে। হলিউডের সাউন্ড অব মিউজিক সিনেমার কাহিনি ধরে আমাদের উত্তম-অপর্ণার জয়জয়ন্তী হয়েছে, তপন সিংহের গল্প হলেও সত্যি থেকে কপি করে হিন্দি ছবি বাবুর্চি বানানো হয়েছে। তাতে সাউন্ড অব মিউজিক কিংবা গল্প হলেও সত্যির 'ভাব' কমেছে? ব্রিটিশ ব্যান্ড দল 'বাগলস'-এর গাওয়া 'ভিডিও কিল্ড দ্য রেডিও স্টার' গান নিয়ে বলিউডের ডিস্কো ড্যান্সার ছবির 'কোই ইঁয়াহা আহা নাচে নাচে'-গেয়েছিলেন উষা উত্তুপ। তাতে বাগলসের কী হয়েছে?" (প্রথম আলো, টুকলি, চুরি ও কুম্ভিলকবৃত্তি)

লেখকের প্রশ্ন যৌক্তিক। হ্যাঁ! কিছুই হয়নি। কপি বা অভিযোজনের কারণে মূল শিল্পী বা শিল্পের প্রতিভা, মূল্য বা ভাব-গুরুত্বের কোনো ক্ষতি হয়নি। সাউন্ড অব মিউজিক বা বাগলসের মূল কাজগুলি তাদের নিজ নিজ ক্ষেত্রে তাদের স্থান ধরে রেখেছে। অভিযোজিত কাজগুলি মূল শিল্পের প্রতিভাকে ছাপিয়ে যেতে পারে না। মৌলিক কাজটির মধ্যে যে স্বতন্ত্র সত্তা, নৈতিক শক্তি ও প্রজ্ঞা নিহিত থাকে, তা কেবলমাত্র কপি করা মাধ্যমে প্রতিলিপি করা সম্ভব নয়। রবার্ট ফ্রস্টের মতে, "কবিতা যে রূপ নেয়, তা শুরু হয় আনন্দে এবং শেষ হয় প্রজ্ঞায়... যা বিভ্রান্তির বিরুদ্ধে এক মুহূর্তের বিশ্রাম এনে দেয়।" এই মৌলিক সৃষ্টিশীল প্রক্রিয়াটি কখনোই নকল করা সম্ভব নয়।

ভুলে গেলে চলবে না, ইতিহাস কেবলমাত্র সেইসব চিন্তাবিদ বা সৃষ্টিকারীদের স্মরণ করে, যারা তাদের সময়ের প্রচলিত প্রথা ভেঙে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন। একজন কবি, প্রাবন্ধিক বা চিন্তাবিদের অমরত্ব নির্ভর করে তার চিন্তার মৌলিকত্ব, অনুভূতির গভীরতা এবং সততার ওপর।

নামটা মনে পড়ছেনা, কোন এক কবি বলেছিলেন, "একটি কবিতা লেখার সাহস হলো একটি জীবন বাঁচানোর সাহস"। এই জীবন হলো লেখকের নিজস্ব বুদ্ধিবৃত্তিক সত্তা। যখন কোনো সৃষ্টিতে মৌলিকতা থাকে না, তখন তা কেবল অতীতের প্রতিধ্বনি হয়ে থাকে, নতুন কোনো মাত্রা যোগ করতে পারে না। ফলে, অন্যের কাজ চুরি করে যে খ্যাতি অর্জিত হয়, তা সময়ের স্রোতে ভেসে যায় এবং ইতিহাসে তার কোনো দাম থাকে না। বুদ্ধিবৃত্তিক জগতে শেষ পর্যন্ত কেবল সততা এবং স্বাধীন চিন্তার শক্তিই অমরত্ব লাভ করে।

অভিমত থেকে আরো পড়ুন