https://www.prothomalony.com/

14209

opinion

অভিমত

মাইলস্টোন বিমান দুর্ঘটনা: অব্যবস্থাপনা ও দায়িত্বহীনতার মর্মান্তিক চিত্র

প্রকাশ: ২৫ জুলাই ২০২৫ ০৫:৫০

ঢাকার উত্তরায় অবস্থিত মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভবনে বিধ্বস্ত হলো একটি যুদ্ধবিমান। মুহূর্তেই যেন স্কুল প্রাঙ্গণ রূপ নিলো এক অজানা যুদ্ধক্ষেত্রে, যেখানে কেউ কারও শত্রু ছিল না, তবু প্রাণ দিতে হল নিরিহ শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং অভিভাবকদের। নিহত হয়েছেন বিমানের পাইলটও। কেউ মারা গেছে ঘটনাস্থলেই। কেউ কেউ হাসপাতালের বিছানায় মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে পোড়া শরীরে। আমাদের প্রার্থনা তারা যেন বেঁচে যায়। কিন্তু বেঁচে গেলেও তাদের সবার জন্যই কী এই বাঁচা সহজ হবে?

শুরুতে যদিও এটিকে প্রশিক্ষণ বিমান বলা হয়েছিল, তবে এটি যুদ্ধবিমান বলে জানিয়েছে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর।সোমবার বেলা ১টা ৬ মিনিটে রাজধানীর কুর্মিটোলার বিমানবাহিনী ঘাঁটি এ কে খন্দকার থেকে বিমানটি উড্ডয়ন করে। এবং প্রশিক্ষণের কাজে ব্যবহৃত চীনের তৈরি এ যুদ্ধবিমান যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে উত্তরার ওই স্কুল ভবনে আছড়ে পড়ে। এতে এখনো পর্যন্ত মৃত‍্যুর সংখ‍্যা ৩২। 

 

বাংলাদেশে এই মডেলের বিমানের তৃতীয় দুর্ঘটনা এটি। এর আগে ২০১৮ সালের নভেম্বরে টাঙ্গাইলের মধুপুরের রসুলপুরে ফায়ারিং রেঞ্জে মহড়ার সময় বিমানবাহিনীর এফ-৭ বিজি প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হয়। এতে উইং কমান্ডার আরিফ আহমেদ দিপু নিহত হন। এরপর ২০২১ সালের নভেম্বরে চট্টগ্রামের জহুরুল হক ঘাঁটি থেকে উড্ডয়নের পর বঙ্গোপসাগরে বিধ্বস্ত হয় এফ-৭ এমবি। এতে ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহমিদ নিহত হন। এই মডেল ছাড়া আরো বহু বিমান ধ্বসে পড়ার ঘটনা ঘটেছে বিগত কয়েক বছরে। 

এ নিয়ে অবসরপ্রাপ্ত এয়ার কমডোর ইশফাক এলাহী চৌধুরী বলেছেন, "আমাদের যুদ্ধবিমান যেটা আরও ২০ বছর আগে আধুনিক হওয়া উচিত ছিল, সেটা হয়নি। এছাড়া দুর্ঘটনার দুইটা বিষয় আছে। একটা হচ্ছে প্রশিক্ষণ দুর্বল হলে, আর আরেকটা হচ্ছে যথেষ্ট ফ্লাইং না হলে। ধরুন, অনেক পাইলট আছেন, কিন্তু এয়ারক্র্যাফট নেই, তখন আপনি কী করবেন? "

 

বাইরের দেশগুলোতে যুদ্ধবিমান কিংবা প্রশিক্ষণ বিমানের উড্ডয়ন ও মহড়ার জন্য সাধারণত নির্দিষ্টভাবে নির্ধারিত নিরাপদ অঞ্চল নির্বাচন করা হয়। এই স্থানগুলো সাধারণত জনবসতি থেকে অনেক দূরে অবস্থিত—যেমন: জনমানবহীন প্রশিক্ষণঘাঁটি, বিস্তীর্ণ সমুদ্র এলাকা কিংবা সেনাবাহিনীর কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে। এর পেছনে একটাই উদ্দেশ্য—যদি কোনো দুর্ঘটনা ঘটে, সেটি যেন জনজীবনে বিপর্যয় না ডাকে, প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষতি এড়ানো যায়।

এছাড়াও, একটি যুদ্ধবিমান আকাশে উড়ার আগে তার ভিজ্যুয়াল ইন্সপেকশন, জ্বালানি ব্যবস্থা, হাইড্রলিক সিস্টেম, ইঞ্জিন, নেভিগেশন, কমিউনিকেশন যন্ত্র, ল্যান্ডিং গিয়ার, ব্ল‍্যাকবক্স-ডেটারেকর্ডার সমস্ত কিছুর কার্যকারীতা বা ত্রুটিসমূহ চেক করে নিতে হয়। সেগুলি করা হয়নি বলেই আজ রাজধানীর উত্তরায় মাইলস্টোন কলেজে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়ে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৩২ জনে দাঁড়িয়েছে। আরো যারা বার্ন ইউনিটে আছে, তারা কতজন ফিরে আসবে বলা মুশকিল। 

 

কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই ন্যূনতম নিরাপত্তাবোধক নীতি যেন প্রায় উপেক্ষিত। এর মর্মান্তিক উদাহরণ উত্তরার দিয়াবাড়িতে অবস্থিত মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে একটি যুদ্ধবিমানের বিধ্বস্ত হওয়া। কেন এমন জনবহুল  এলাকায় যুদ্ধবিমান ওড়ানো হচ্ছে? দুর্ঘটনার পরপরই তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও, অতীতে এমন বহু তদন্তের রিপোর্ট কোনোদিন জনসমক্ষে আসেনি। যদি কারিগরি ত্রুটি থাকে, তাহলে সেই ত্রুটি দীর্ঘদিন ধরে কীভাবে নজর এড়াল? যদি পাইলটের প্রশিক্ষণে ঘাটতি থাকে, তাহলে তা কে পর্যবেক্ষণ করছিল?

 

বাংলাদেশ সরকার ২০০৫ সালের ২৬ জুন চীনা সরকারের সঙ্গে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে, যার মাধ্যমে ১৬টি এফ-সেভেন/ এফটি-সেভেন বিজি যুদ্ধবিমান কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। মোট চুক্তির মূল্যের ১০ শতাংশ অগ্রিম পরিশোধ করা হয় এবং বাকি অর্থ নয়টি সমান কিস্তিতে পরিশোধের কথা ছিল। যুদ্ধবিমানগুলোর প্রাথমিক মূল্য ধরা হয়েছিল ১২ কোটি ডলার, পরবর্তীতে অন্যান্য সামগ্রী ও পরিবহন খরচ যোগ করে দাম বেড়ে দাঁড়ায় ১৩.৫৪ কোটি ডলার। পরে চীনের সঙ্গে দর কষাকষির মাধ্যমে দাম কমিয়ে আনা হয় ১১.৭৯ কোটি ডলারে যার মধ্যে যুদ্ধবিমানগুলোর মৌলিক মূল্য ছিল ৯.৩৬ কোটি ডলার অর্থাৎ প্রতিটি বিমানের দাম পড়েছে ৫.৮৫ মিলিয়ন ডলার। যদি নিয়ম অনুসারে কিস্তি দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে বাংলাদেশ ২০১৪ সালের মধ্যেই বা সর্বোচ্চ ২০১৫–এর কাছাকাছি সময়ে এই বিমানের সম্পূর্ণ চালানের মূল্য পরিশোধ করে ফেলেছে।

 

কিন্তু এত বড় বিনিয়োগের পরও বাংলাদেশ বিমানবাহিনী যে পর্যাপ্ত আধুনিকায়ন বা দক্ষ জনবল পায়নি, তার মর্মান্তিক প্রমাণ মিলেছে সাম্প্রতিক দুর্ঘটনাটি। বিশেষজ্ঞরা বারবার সতর্ক করে আসছিলেন যে এফ-সেভেন বিমান সিরিজটি পুরনো, ঝুঁকিপূর্ণ এবং প্রশিক্ষণের জন্য আদর্শ নয়। তবুও সেগুলো চালানো হয়েছে, যা একের পর এক দুর্ঘটনার জন্ম দিয়েছে।

এরপর রয়েছে বার্ন ইউনিট সমস‍্যা। বাংলাদেশে বর্তমানে বার্ন ইউনিটের সংখ্যা খুবই সীমিত। সারা দেশে মাত্র ১৪টি সরকারি বার্ন ইউনিট রয়েছে, যার মধ্যে সবচেয়ে বড় এবং পূর্ণাঙ্গ বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটটি অবস্থিত ঢাকার চানখারপুলে-জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট নামে পরিচিত। এটি দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় বার্ন হাসপাতাল, যার শয্যাসংখ্যা ৫০০। অন্য জেলাগুলোর হাসপাতালে বার্ন ইউনিটগুলো ক্ষুদ্র পরিসরে চালু হলেও, অনেক জেলাতে এখনও পর্যন্ত আধুনিক বার্ন চিকিৎসা সুবিধা নেই।

 

এখানে প্রশ্ন ওঠে, সরকারের অগ্রাধিকার আসলে কোথায় ছিল? 

শেখ হাসিনা প্রশাসন সামরিক খাতের আধুনিকায়নের বদলে মুজিববর্ষ উদযাপন, বঙ্গবন্ধুর নামে ভবন-সড়ক-গ্যালারি নির্মাণ, বিদেশে প্রচারণা এবং দলীয় প্রচারযন্ত্র তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণে বিপুল অর্থ ব্যয় করেছে। দুর্নীতির মাধ্যমে দেশের সম্পদ বিদেশে পাচার হয়েছে। অন্যদিকে, পাইলটরা পায়নি পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ, ঝুঁকিপূর্ণ বিমান ব্যবহার করা হয়েছে, এবং দুর্ঘটনা ঘটার পরেও কোনো কাঠামোগত পরিবর্তন দেখা যায়নি। তবে কি আমরা বলতে পারিনা যে, শেখ হাসিনা সরকারের আমলে যুদ্ধবিমান ও সামরিক আধুনিকায়ন ছিল উপেক্ষিত? 

সরকার যদি নিজেদের আর দলীয় নেতাদের জন্য অর্থ আত্মসাৎ না করতো, তাহলে পুরনো ও ঝুঁকিপূর্ণ বিমান বদলে আধুনিক যুদ্ধবিমান কেনা যেত, পাইলটদের আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ দেওয়া যেত এবং বিমান বাহিনী ও সামরিক বাহিনীর অন্যান্য শাখার আধুনিকতা নিশ্চিত করা যেত। পাশাপাশি দেশের সকল জেলায় আধুনিক বার্ন ইউনিট ও জরুরি চিকিৎসা সুবিধা স্থাপন করা যেত, যাতে দুর্ঘটনায় আহতদের দ্রুত ও মানসম্মত চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হত।

 

এই দুর্ঘটনার পর অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন নতুন অন্তর্বর্তীকালীন ইউনূস সরকারকে নিয়ে। তবে এটাও মনে রাখতে হবে, এই সরকার মাত্র এক বছর হলো ক্ষমতায় এসেছে। তারা এখনো স্থায়ী কাঠামো, পরিকল্পনা বা বাজেট প্রণয়নের পর্যায়ে পুরোপুরি প্রবেশ করতে পারেনি।

অতএব, মূল দায় থেকে মুক্তি পায় না গত ১৬ বছরের শাসনব্যবস্থা, যার সময়েই সামরিক খাতে অব্যবস্থা, বিমানের জীর্ণতা ও বার্ন ইউনিটের দুর্দশা জমে জমে আজকের এই ট্র্যাজেডির রূপ নিয়েছে।

তবে, এই ভয়াবহ দুর্ঘটনার পর রাষ্ট্র যদি আবার 'তদন্ত কমিটি' গঠনের চিরাচরিত ঢঙে চুপসে যায়, তবে তা হবে দ্বিতীয় আরেকটি অপরাধ। কারণ যারা মারা গেছেন, যারা এখনো পুড়ে বেঁচে আছেন, তাদের জীবন আর কখনো আগের মতো হবে না। এবং এই দায় কেবল একটি দুর্ঘটনার নয়-একটি উপেক্ষিত ব্যবস্থার, একটি অব্যবস্থাপনার, একটি ভুল অগ্রাধিকারের। 

 

মাইলস্টোন দুর্ঘটনা কেবল একটি বিমান ভেঙে পড়ার ঘটনা নয়। এটি একটি রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার প্রতীক, যেখানে অবহেলা, ভুল সিদ্ধান্ত, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা একত্রে প্রাণ কেড়ে নেয় নিরীহ মানুষের। যারা মারা গেছেন, তারা আর ফিরবেন না। কিন্তু তাদের মৃত্যু যদি আমাদের রাষ্ট্রকে আরও দায়িত্ববান করে তোলে, যদি এই রক্তে ভেজা শিক্ষা রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের চোখ খুলে দেয়, তাহলে এই শোকেরও একটা অর্থ থেকে যাবে।

এই মুহূর্তে, অবিলম্বে এফ-৭ সিরিজসহ সকল পুরনো যুদ্ধবিমান বাতিল ঘোষণা করে বিমানবাহিনীর আধুনিকায়নের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা উপস্থাপন করতে হবে। বিমান চলাচলের নিরাপত্তা নীতিমালা জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে এবং দুর্ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন গণমাধ্যমে উন্মুক্ত করতে হবে।

সেনাবাহিনী ও বিমানবাহিনীর প্রশিক্ষণ কাঠামো আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে হবে। প্রতিটি বিভাগীয় শহরে আধুনিক বার্ন ইউনিট স্থাপন জরুরি, যাতে দুর্ঘটনা ঘটলে দ্রুত চিকিৎসা পাওয়া যায়। দুর্নীতির তদন্ত ও অর্থপাচার ইস্যুতে একটি স্বাধীন কমিশন গঠন করে অতীত প্রশাসনের ব্যর্থতা ও অনিয়ম জনসমক্ষে আনাও দরকার। 

আজ যারা পোড়া শরীরে বাঁচার চেষ্টা করছে, তাদের যেন ভবিষ্যতে উন্নত চিকিৎসা ও পুনর্বাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়। যারা হারিয়েছেন সন্তান, বাবা-মা, শিক্ষক-তাদের ক্ষতিপূরণ যেন হয় মানবিক, যেন তা দায় সেরে ফেলার আনুষ্ঠানিকতা না হয়। 

 

নিহতদের পরিবার যেন এক নিঃশেষে ডুবে থাকা সমুদ্রের মাঝেও এক আলোর দিশা পায়-তাদের প্রতি আমাদের অপরিসীম শোক, গভীর সমবেদনা ও অটুট সাহসার্থক প্রেরণা রইল। 

অভিমত থেকে আরো পড়ুন