https://www.prothomalony.com/

13268

opinion

অভিমত

প্রতিবাদের মানে দলবদল নয়: এটা বিবেকের ডাকে সাড়া

প্রকাশ: ০২ মে ২০২৫ ০৫:০৪

বাংলাদেশে রাজনৈতিক বিভাজন নতুন কিছু নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে প্রতিবাদ মানেই কোনো এক নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সমর্থক বলে চিহ্নিত করা হয়। অর্থাৎ, বর্তমান ‘প্রতিবাদ’ শব্দটি এক দুঃসাহসিক সিদ্ধান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। আপনি যদি অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলেন, তা যত যৌক্তিক ও মানবিক হোক না কেন, তখনই আপনাকে কোনও না কোনও দলের বিরোধী বা ‘দুশমন’ বানিয়ে ফেলা হবে, কিংবা সহজেই কোন এক দলের মদদপুষ্ট বলে বিবেচিত হবেন। আরো মজার ব‍্যাপার হল, কোনো পক্ষের নির্লজ্জ অপরাধ কিংবা স্বৈরতান্ত্রিক মনোভাব নিয়ে প্রশ্ন তুললেই আপনি ‘রাজাকার’ বা ‘পেইড এজেন্ট’ হয়ে যাবেন। এই মনোভাব আমাদের রাষ্ট্র এবং সমাজ- উভয়েরই জন্য ভয়াবহ সংকেত।

আমি নিজে কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় ছাত্র-জনতার পাশে ছিলাম, প্রবাসে থেকেও দিনরাত কলম ধরেছি। যারা শিক্ষার্থীদের উপর গুলি চালিয়েছে, হত্যা করেছে, তাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছি। আজ সেই আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে যখন দেশে নতুন অন্তরবর্তী সরকার এসেছে, যার নেতৃত্বে রয়েছেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস- একজন নোবেলজয়ী এবং আন্তর্জাতিকভাবে সম্মানিত ব্যক্তিত্ব, তখনও আমরা দেখতে পাচ্ছি, নানা ঘরোয়া-বিদেশি চক্রান্তে সরকারের সংস্কার প্রক্রিয়া বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি, ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান এবং দীর্ঘকালের লুটেরা সংস্কৃতির পরিপ্রেক্ষিতে নতুন সরকারকে সময় দেওয়া দরকার, যা আমরা দিচ্ছি না। তারপরও, যখন ভারতের গণমাধ্যমে বাংলাদেশের উন্নয়ন, গণতন্ত্র কিংবা মানবাধিকার বিষয়ে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যা প্রচার চলছে, তখন চীন, কাতার, ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বর্তমান সরকার নতুন নতুন অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করছে।

কিন্তু তার মানে এই নয় যে, নাগরিকরা চোখ বন্ধ করে সবকিছু মেনে নেবে। এই পরিবর্তনের মাঝেও কিছু অপরাধ, কিছু পুরনো দৃষ্টিভঙ্গি এখনো চলমান। সিস্টেম বদলানো সহজ নয়, সময় লাগে। তবু আমরা যদি নাগরিক হিসেবে নিরব থাকি, তবে অন্যায় আরও গভীর শিকড় গাঁথবে।

সম্প্রতি একটি ঘটনা আমাকে প্রশ্ন করতে বাধ্য করছে- আমরা কোন দিকে যাচ্ছি? একজন শিল্পী, যিনি রাজনৈতিকভাবে আওয়ামী ঘরানার, বিএনপির নেতা তারেক রহমান সম্পর্কে কটূক্তি করায় জনতা তাকে মারধর করে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। অনেকে এই ঘটনাকে সমর্থনও করেছেন সামাজিক মাধ্যমে। আমি এর প্রতিবাদ করেছি। তখন আমাকে দুই একজন ‘লীগপন্থী’ বলে আক্রমণ করলেন। মজার ব‍্যাপার হল, যখন জুলাই আন্দোলন থেকে শুরু করে আজকের দিনটা পর্যন্ত স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার বিরোধীতা করছি, তখন আওয়ামী লীগের কাছে হয়ে উঠছি ‘ইউনূস সরকারের পেইড এজেন্ট’ বা ‘রাজাকার।’

প্রশ্ন হল- প্রতিবাদ কি শুধুই রাজনৈতিক অবস্থানের ভিত্তিতে হওয়া উচিত? কোনো একজন মানুষ অন্যায় করলে, সে যেই দলেরই হোক না কেন, আমরা কি তার বিরোধিতা করতে পারি না? এ কেমন নাগরিকতা?

আমরা ভুলে গেছি, সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো মানেই দলীয় রাজনীতির অংশ হওয়া নয়। একজন সচেতন নাগরিকের দায়িত্ব হলো অন্যায়কে চিহ্নিত করা, সেটা যে পক্ষ থেকেই হোক। দলকে সমর্থন করা মানে এই নয় যে, তার সব অপরাধ চোখ বুজে মেনে নিতে হবে। আবার অন্য দলকে সমালোচনা করা মানেই সে দলের দুশমন হয়ে যাওয়া উচিত নয়।

এটাই আমাদের সমাজের মূল সংকট- মানুষ এখন দলীয় পরিচয় ছাড়া চিন্তা করতে পারছে না। প্রতিবাদ যেন দলীয় লাইসেন্সে অনুমোদিত। একচেটিয়া সমর্থন যেন নাগরিকত্বের মানদণ্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে। দলান্ধতা আমাদের ভাবনার স্বাধীনতাকে হরণ করছে। প্রতিবাদ করা এখন রাজনৈতিক পরিচয়ের পুতুল হয়ে গেছে।

যে গলা আজ আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে চিৎকার করে, কাল বিএনপির অপরাধে চুপ থাকে। আবার যারা বিএনপির অন্যায়ে সরব, তারা আওয়ামী নিপীড়নে নিশ্চুপ। জামায়াত আর জুলাই বিপ্লবের ছাত্ররা তো আছেই। তাদেরকে একসঙ্গে দেখা বা উপস্থাপন করা একটি বিভ্রান্তিকর প্রবণতা, যা ইচ্ছাকৃতভাবে রাজনৈতিক সুবিধার জন্য তৈরি করা হচ্ছে। এটা শুধু রাজনৈতিক চাতুর্যের অংশ নয়, বরং একটি গভীর ষড়যন্ত্র- যার মাধ্যমে ন্যায়ভিত্তিক ছাত্র-আন্দোলনকে অপরাধীকরণ করা হচ্ছে এবং জনমতের বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হচ্ছে।

জুলাই বিপ্লবের ছাত্ররা ছিল একটি নিরপেক্ষ, অরাজনৈতিক এবং স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনের অংশ। তাদের দাবি ছিল সংবিধানসম্মত অধিকার, সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার এবং একটি সুষ্ঠু, যোগ্যতাভিত্তিক নিয়োগব্যবস্থা। তারা কোনো দলের হয়ে রাজনীতি করেনি, বরং দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুবিচার প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল। এদের অনেকে শেখ হাসিনা ও পুলিশি নির্যাতনের শিকার হয়েছে, নিহত হয়েছে, গুম, হামলা, রিমান্ড, মামলা- তাদের জীবন হয়ে উঠেছিল আতঙ্কের নাম। অবশেষে তারা জনমত গড়ে স্বৈরাচারের পতন ঘটাতে সক্ষম হয়েছে।

অন্যদিকে, জামায়াত একটি রাজনৈতিক দল, যার নিজস্ব মতাদর্শ, ইতিহাস ও উদ্দেশ্য রয়েছে। তারা অতীতে যুদ্ধাপরাধে জড়িত ছিল, বর্তমানে শেখ হাসিনা সরকার পতনের পর রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার চেষ্টা করছে। তাদের ধর্মীয় বিধি-নিষেদ অনেকের মনে আতঙ্ক তৈরি করছে। তবে, বর্তমানে যে কেউ ইসলামের কথা বললেও তাকে জামায়াত ট্যাগ দিয়ে চুপ করিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এটাও ভয়ংকর। তাছাড়া, জুলাই আন্দোলনের তরুণদের মধ্যেও যারা ইসলামী পোশাক পরে, যারা নামাজ পড়ে, যাদের চেহারায় দ্বীনি ছাপ- তাদের উপর একরকম শিকারি দৃষ্টি পড়ে গেছে। তাদের সকলকে জামাত বানিয়ে ‘উগ্রবাদী’ প্রমাণ করতে তৎপর হচ্ছে আওয়ামী সমর্থকরা। এটাও এক বুদ্ধিবৃত্তিক নিপীড়নের চিত্র- তা বুঝতে পারলে আমরা আতঙ্কিত হবো।

জামায়াত আর জুলাই বিপ্লবের ছাত্রদের একপঙক্তিতে বসিয়ে যারা রাজনৈতিক সুবিধা নিতে চায়, তারা না ছাত্রদের ত‍্যাগকে সম্মান করছে, না দেশের গণতন্ত্র। বরং তারা চরম দলান্ধতার বিষে সমাজকে আরও বিভক্ত করছে। এই বর্ণচোরা প্রচার থেকে বেরিয়ে এসে সত্যকে সত্য বলার সাহসই আজকের আসল প্রতিবাদ।

আমাদের জানতে হবে- দেশে গত ১৫ বছরে কি কি ঘটেছিল। মনে রাখতে হবে শেখ হাসিনা সরকারের পতন কেন হল!

বিগত সাড়ে ১৫ বছরের আওয়ামী দুঃশাসনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাধ্যমে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে কোনো প্রকার প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই হত্যার যে নজির সৃষ্টি হয়েছিল, তার ভয়াবহ স্মৃতি মানুষ এখনও বয়ে বেড়াচ্ছে। গুম কমিশনের তথ্যমতে, বিগত সাড়ে ১৫ বছরে সাড়ে তিন হাজার মানুষ র‍্যাবের হাতেই বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের রিপোর্ট অনুযায়ী ২০০৯-২০২৩ পর্যন্ত ২ হাজার ৬৯৯ জন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে, এই সময়ে ৬৭৭ জনকে গুম করা হয়েছে, যাদের অনেকেই এখনো নিখোঁজ এবং ১ হাজার ৪৮ জন ব্যক্তি পুলিশি হেফাজতে মারা গেছেন।

ইংরেজি দৈনিক ‘দ্য ডেইলি স্টার’-এর সম্পাদক মাহ্ফুজ আনামের বিরুদ্ধে দেশের ৫৩ জেলায় ৮৩টি মামলা হয়। এর মধ্যে ১৭টি মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ আনা হয়। সাংবাদিক রোজিনা ইসলামের বিরুদ্ধে যে মামলা দায়ের করা হয় এবং তাঁকে পাঁচ ঘণ্টা আটক রেখে শারীরিক ও মানসিকভাবে নিপীড়ন করা হয়- এই ঘটনা গণতন্ত্রের চরম অবক্ষয়ের প্রতিচ্ছবি হয়ে দাঁড়ায়।

২০১৮ সালে প্রণীত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের আওতায় ২০২১ সালের ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৬৬৮ টি মামলা হয়। এই মামলাগুলোয় অভিযুক্তের সংখ্যা ১ হাজার ৫১৬ জন, যার মধ্যে ১৪২ জন সাংবাদিক, ৩৫ জন শিক্ষক, ১৯৪ জন রাজনীতিবিদ, ৬৭ জন শিক্ষার্থী। এই আইনের অধীনে এই সময়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মানহানির অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়েছে ৭৪টি।

জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে সরকারবিরোধী আন্দোলনে প্রায় ১ হাজার ৪০০ জন নিহত হয়েছেন, যাদের ৭৮ শতাংশ গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন। ২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনা ও তার সরকারের ৪৫ জন সদস্যের বিরুদ্ধে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে।’

জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতা ধরে রাখতে গণহত্যা, নির্যাতন ও নির্বিচারে গ্রেপ্তারের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে।’

এসব তথ্য যদি আমাদের হৃদয় না কাঁপায়, বিবেক না জাগায়- তবে আমরা কেবল একটি দলের অন্ধ অনুসারী, স্বাধীন চিন্তার নাগরিক নই। যারা এসব রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম, নিপীড়নের ইতিহাসকে পাশ কাটিয়ে এক বছরেরও কম সময়ের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের খুঁত ধরে বসে থাকে, তাদের আত্মা নিঃসাড়, তাদের বিবেক স্তব্ধ।

হ্যাঁ, আমরা ভালো কিছু পাবার আশায়, পরিবর্তনের স্বপ্নে স্বৈরাচারী সরকারকে প্রতিরোধ করেছি। ছাত্র-জনতার সেই সংগ্রাম সহজ ছিল না। তাই এই নতুন সরকারকে সময় দিতে হবে, দায়িত্বশীলভাবে প্রশ্ন করতে হবে, প্রয়োজনে গঠনমূলক সমালোচনা করতে হবে। কারণ গণতন্ত্র মানে কেবল ভোট নয়- গণতন্ত্র মানে জবাবদিহিতা, মানবাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রক্ষমতার ন্যায্য ব্যবহারে বিশ্বাস।

আমরা যদি আবারও পক্ষপাতদুষ্ট হই, যদি চোখ বুঁজে দলীয় আনুগত্যে আবদ্ধ থাকি, তাহলে ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না।

যেকোনো পক্ষের গর্হিত কাজের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা মানেই বিরোধী দলে যোগ দেওয়া নয়। বরং সত্যিকার দেশপ্রেমিক হতে হলে আমাদের দলীয় পরিচয়ের বাইরে এসে মানবিকতা, ন্যায়বোধ এবং সাংবিধানিক মূল্যবোধ দিয়ে জনগণের স্বার্থে প্রতিক্রিয়া জানাতে হবে।
 

অভিমত থেকে আরো পড়ুন