https://www.prothomalony.com/

12884

literature

সাহিত্য

উত্তরের সাহিত‍্য-ঈদসংখ‍্যা

(নোট- দুই পাতা ঈদসংখ‍্যার লেখা পাঠালাম।)

প্রকাশ: ২৬ মার্চ ২০২৫ ০২:৫১

বাঙ্গালির ঈদ যাপন

শাহজালাল সরকার 

নতুন জামা, নতুন জুতো-টুপি সারিসারি

কসমেটিকস ও গয়নাগাটি; সবার বাড়ি বাড়ি।

হাটবাজারে দোকানপাটে-বেঁচাকেনার ভীড়ে

প্রতি বছর এমন করেই; ঈদের আমেজ ফিরে।

 

ধনী-গরিব সবার ঘরেই-ঈদের বার্তা বয়

শত্রু-মিত্র হাসি মুখে; সুখের কথা কয়।

মেহেদী পাতায় হাত রাঙিয়ে-উল্লসিত হয়

ঈদ যেনো তাই সবার কাছে; রঙিন স্বপ্নময়।

 

ঈদগাহেতে ঈদের নামাজ-পড়ে জনে জনে

কোলাকুলি করে সবাই; হিংসা নেয় না মনে।

ঘরে ঘরে ফিরনি পায়েশ-সেমাই রাঁধা হয়

পোলাও, কোর্মা, গোস্ত, রুটি; তা-ও খাওয়া হয়।

 

ছোট ছোট ছেলে মেয়ে-ছুটে ঈদের মেলায়

সারাটা দিন কাটে তাদের; হাসিখুশি খেলায়।

মানুষজনে দলে দলে-স্বজন গৃহে যায়

রাস্তাঘাটে যানবাহনে; দারুণ শোভা পায়।

 

 

 

ঈদের খুশি 

গোলাম আযম 

বাঁধ ভেঙেছে খুশির আমেজ

চারদিকে রব,

ছড়িয়ে পড়ুক দিগ্বিদিক্

আনন্দ উৎসব।

 

উৎসবের উন্মাদনায় 

নাচে সবার মন,

কলকাকলিতে মুখরিত 

ঘন সবুজ বন! 

 

ফিঙে নাচে গাছের ঢালে

খুকি নাচে কোলে,

গন্ধ মেখে ফুলকলিরা

গাছের শাখে দোলে।

 

ঈদ আনন্দে আত্মহারা

সৃষ্টিকূলের সব,

জান্নাতি ঘ্রাণ সবাই মিলে

করি অনুভব।

 

 

ঈদের শপিং 

মেশকাতুন নাহার 

ঈদ এলো রে ঈদ এলো রে

খুশির নেই তো শেষ, 

বাজার ঘিরে শপিং করা 

জমে উঠছে বেশ। 

 

রোজার দিনে কেনাকাটা 

ভারি কষ্টের কাজ, 

তাই বলে কি থেমে থাকে

খুকুমণির সাজ?

 

হরেক রকম জামা কাপড়

হরেক রকম সাজ

ঈদ সালামির নেই যে ছাড়

পকেট ভরবে আজ। 

 

আশেপাশের মার্কেট জুড়ে 

মানুষজনের ভীড়,

মনের মতো পোশাক কিনে

ফিরছে সুখের নীড়। 

 

তিরিশ রোজা পেরিয়ে ফের

আসবে খুশির ঈদ, 

চাঁদের আলো কাটবে কালো 

এই সবার উমিদ।

 

 

আজ বসন্ত ডেকেছে 

সৈয়দ নূরুল আলম 

নদীর ওপাড় থেকে বসন্ত ডেকেছে চোখ-ইশারায়, 

মধ্যরাতের হিম বাতাস কাঁপুনি দিয়ে যায় 

বুকের বন্ধ দরজায়। 

কে আসে কে যায় খেয়াঘাটে, 

রেখে যায় নগ্ন পায়ের ছাপ। 

পাড়ানি ছাড়া কেউ কি যাবে ওপাড়ে? 

খেয়ামাঝি পারে না হিসাব মেলাতে। 

অসমাপ্ত গল্পটার শিরোনাম লেখা হয় না জলপাতায়।

 

 

ইদ বানের মতো ছোট ঈদ

নাহিদ সরদার

দেবদারু পাতার পিছনে যে লকুনো ঈদ-

সেই ঈদে,

কলাগাছের গেট পেরুলে চোখে পড়ে

রঙিন কাগজে উড়ুক্কু সময়;

আর সেটা বয়ে নিয়ে চলেছে মৃচ্ছকটিক।

এখন এখানে

ফিরনির প্লেটে ঘরবন্দী চলে ভোজ

ইদ বানানের মতো ছোট হয়ে গেছে

আমাগো পাড়ার  ঈদ।

 

 

 

তাদের ঈদ

সেলিনা আক্তার

ঈদের চাঁদ ওঠে আকাশে ধীরে,
আনন্দে ভাসে শহর-গ্রামে
হাসির ঢেউ বয়ে যায় ঘরে ঘরে,
তবু কিছু মন পড়ে থাকে খামে। 

 

ওরা বসে চুপটি করে,
নাঙা পায়ে পথের ধারে
ঈদের নতুন পোশাক কোথায়?
ওদের চোখও প্রশ্নে ভরে।

 

সেমাইয়ের গন্ধ বাতাসে ভাসে,
ওদের প্লেটে শূন্যতা হাসে
কেউ কি ওদের কথা ভাবে?
ঈদ তবে কার জন্য আসে?

 

 

 

 

সময়ের পরিবর্তনে ঈদ

দিনা ফেরদৌস

দীর্ঘ একমাস সিয়াম সাধনার পর ঈদ আসে। ঈদ মানেই আনন্দ। সেই আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে কাছের লোকজনদের ঈদ কার্ড দিয়ে বাসায় দাওয়াত দেয়াই ছিল রেওয়াজ। সময়ের সাথে সাথে আনন্দের ধরন পাল্টায়। একটা সময়ে গিয়ে আমরা আনন্দের স্মৃতি নিয়েই বাঁচি। ঈদের চাঁদ দেখার সাথে সাথেই চারপাশ কেমন সরগরম হয়ে উঠত। টিভির সংবাদ পাঠিকাদের মাথা থেকে ঘুমটা চলে যেত। প্রফুল্ল একটা হাসি মুখে টেনে বলতেন, শাওয়ালের চাঁদ দেখা গিয়েছে। সাথে সাথেই টিভিতে কাজী নজরুল ইসলামের সেই জনপ্রিয় গান, "ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ"। পাশাপাশি সৈয়দ আব্দুল হাদীর গান, "চাঁদের পালকি চড়ে আসলো সবার ঘরে, আসলো খুশির ঈদ"। 

এইতো সেদিনই মনে হয়, ঈদের জামা আমরা ছোটরা লুকিয়ে রাখতাম। কেউ দেখলেই ঈদ চলে যাবে। ভোরে উঠে গোসল করে ঈদের জামা পরে সেমাই, পরোটা, লুচি, নারিকেলের পিঠা, তেলের পিঠা, নুনগড়া পিঠা, এইসব দিয়েই সকাল শুরু। আব্বা ঈদগাহ থেকে ঈদের নামাজ শেষ করে ঘরে ফিরলেই সালাম করলে সাথে সাথে দশ টাকা সালামি অবধারিত। ঈদের সময় যেই বেড়াতে আসতেন, বাচ্চাদের সালামি দিতেন।

চাঁদা তুলে সব চাচাতো ভাই-বোনেরা মিলে রিক্সা করে আত্নীয়-স্বজনদের বাসায় ঘুরতে যাওয়া। দুপুরের আগে ঘরে ফিরতে হবে। ঈদের দিন নিজের ঘরে খেতে হয়। কোরমা-পোলাও, মিষ্টি পোলাও, সাথে আমাদের সিলেটের বন্দর বাজারের মশরাফিয়ার দই। টিভিতে বাচ্চাদের অনুষ্ঠান চলছে। এরমধ্যে বাসায় মেহমনদের আসা- যাওয়াও চলছে। 

 

স্কুল ছেড়ে কলেজে যেতেই ঈদ একটু পাল্টে গেলো। এইবার মার্কেটে ঈদের বাজারে কি আসছে, আনার কলি নাকি পাখি ড্রেস। বিশেষ করে ইন্ডিয়ান টিভি সিরিয়ালের নায়িকারা যেইসব জামা পরেন, সেইসব সিরিয়ালের নায়িকাদের নাম দিয়ে ঈদ জামা বের হয়। তখন আর কেউই জামা লুকিয়ে রাখে না। বরং অতি উৎসাহে কার, কি জামা কেনা হলো খুশি মনে সবাইকে দেখানো যেত। লাচ্চা- সেমাইয়ের জায়গায় সকালের নাস্তায় জায়গা করে নিল, চটপটি, নুডুলস, কাস্টার্ড, চিকেন রুল। কোরমা-পোলাও এর জায়গায় রোস্ট- পোলাও সাথে ডিমের পুডিং। কাজিনদের বাদ দিয়ে বান্ধবীদের নিয়ে ঘুরাঘুরি। কখনো অন্য বান্ধবীদের বাসায় দাওয়াতে, তো কখনো দূরে অন্য কোথাও দলবেঁধে যাওয়া। চাঁদা তুলে সবাই মিলে ছবি তোলা। আমরা সবাই তখন ইন্ডিয়ান চ্যানেলে অভ্যস্ত।

 

সময় আরও পাল্টে গিয়েছে সময়ের নিয়মে। চাহিদা বেড়েছে, চিন্তায় পরিবর্তন এসেছে। এখন ঈদ কার্ড দিয়ে কেউ কাউকে তেমন দাওয়াত করেন না। ফেইসবুক, মেসেঞ্জারে ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়েই শেষ। আগে যেখানে একশো টাকা পেলে বাচ্চারা খুশিতে গদ গদ হয়ে যাওয়া যেত, সেখানে এখন হাজার টাকা পেলেও তাদের হয় না। সবার হাতে হাতে মোবাইল ক্যামেরা। ঈদের জামা পরে সাজগুজ দেখলে মনে হয় বর / ব্রাইডাল সাজ। এখন জামাকাপড় মানুষ কিনে ব্রান্ড দেখে, বিশ্বের নামীদামী ফ্যাশন ডিজাইনারদের করা জামা পরাই ফ্যাশন। খাবারেও পরিবর্তন এসেছে। শুধু ফ্যাশনে নয়, রান্নাবান্নায়ও মোটামুটি সবাই এক্সপার্ট। নানাজাতের মিষ্টান্ন বেশিরভাগই বানাতে পারেন। শুধু দেশিও নয়, বিদেশি নাস্তাও কমন এখন। সেই লাচ্চা-সেমাই দিয়েই এখন করা হয় আরাবিয়ান সুইট কুনাফা, তুর্কি ডেজার্ট রেসিপিও রাখেন কেউ কেউ। ডিম ছাড়াও নানা জাতের পুডিং, সমুচা, রোলস, ফ্রুটস দিয়ে ফালুদা, দই দিয়ে বানানো হয় লাচ্ছি। রোস্ট - পোলাও এর জায়গায় এখন অনেকেই করেন আস্ত চিকেন ফ্রাই, ফ্রাইড রাইছ অথবা কাচ্ছি, মাটন, চায়নিজ ভেজিটেবল, চিংড়ি মালাইকারি আরও কত কি। ইউটিউব দেখে দেখে সকলেই আজকাল রান্নায় দক্ষ। তারপরও দেখা যায় ঘরের বাচ্চাদের কাছে, বাইরের রেস্টুরেন্টের পিজ্জা, বার্গারই বেশি পছন্দের। 

 

এখনকার ডিজিটাল বাচ্চারা স্মার্ট ওয়াচ ব্যবহার করে। কম্পিউটার- ট্যাব সব চালাতে জানে তারা। বাচ্চারা এখন আর কার্টুন দেখে হাসে না, তারা রোবলক্স খেলে, বিভিন্ন ধরনের গেইম খেলে, চরিত্র নিজেরাই বানায়। গেইমের জন্যে কার্ড পেলে খুশি হয়।

 

অন্যদিকে বড়রাও মেকাপ -গেটাপে অনেক সচেতন হয়েছেন। রাত্রের সাজ, দিনের সাজের সাথে সামঞ্জস্য রেখে জামা- জুতা- ব্যাগ- জুয়েলারি তো আছেই। মানুষের হাতে টাকা হয়েছে। এখনকার ঈদের বাজেট কারো কারো ৩/৪ লাখ টাকা পযর্ন্ত যায় বা তারও বেশি। মধ্যবিত্তদের অনেকেই দেশের বাইরে থেকে ঈদের শপিং করেন। কেউ কেউ সারা বছর এতো শপিং করেন, যে ঈদের শপিং বলে তাদের কাছে আলাদা কিছু নেই। ঈদে দল বেঁধে এর তার বাড়িতে এখন খুব কমই যাওয়া হয়। উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্তরা পরিবার নিয়ে দেশের বাইরে ঘুরতে যান। নিম্নমধ্যবিত্তরা কাছের মানুষজন নিয়ে দেশের মধ্যেই বিভিন্ন রিসোর্টে ঘুরতে যান। কোলাহল থেকে একটু দূরে গিয়ে শান্তিতে ঈদের ছুটি নিরিবিলি কাটিয়ে আসেন।অথবা কোথাও একদিন প্ল্যান করে কোন আত্নীয় বা বন্ধুর বাসায় জড়ো হন সবাই। মানুষের ব্যস্ততার কারণে হুটহাট কেউ আর কারো বাসায় তেমন যায় না এখন। 

 

সবই এতো বেশি বেশি আছে। তারপরও কি যেন কি নেই। বিশেষ করে আগের সেই আন্তরিকতা আর নেই, যাওয়া আসা নেই। আছে শুধু ব্যস্ততা আর নাই নাই রব। কিছুতেই যেন মনে শান্তি নেই। কি আছে, তার থেকে বেশি যন্ত্রণা কি নেই। কি দেখাতে পারলাম না, কি দেখাতে পারলে মানুষ আরও বেশি কিছু ভাবত। এই যে দেখানোর একটি প্রবণতা এটাই রাতের ঘুম কেড়ে নিয়ে যায়। কি দেখালে আরেকটু বেশি দাম পাওয়া যেত সেই চিন্তা সারাক্ষণ অস্থির করে রাখে। যা নেই তা কি করে লুকিয়ে রাখা যায়, তার জন্যে সব সময় সত্য-মিথ্যা মিলিয়ে নিজের কাছেই নিজেকে চোর হতে হয়। অথচ না থাকাটা দোষের কিছু না। না থাকলে যারা কাছে থাকে না, তাদের ধরে রাখার কোন মানে হয় না। 

 

সময় পাল্টায়। আমরাও পাল্টাই সময়ের সাথে সাথে। পাল্টানো দোষের কিছু নয়, কিন্তু পাল্টাতে গিয়ে যদি নিজেই নিজের অস্থিত্ব হারিয়ে ফেলি, তখন সেটা নিজের জন্যেই হজম করা কঠিন হয়ে যায় একসময়। ঈদ আসে ঈদ যায়, কারো কারো সারা বছরই ঈদ। কারো কারো জীবনে সারা বছরই রোজার মতো করে কাটাতে হয়। একবেলা খেয়ে, অন্যবেলা অনাহারে। ঈদ মানে আনন্দ, আর সেই আনন্দ তখনই পূর্ণতা পায়, যখন আশেপাশের সকলের সাথে ভাগাভাগি করে নেয়া হয়। তাই যারা কষ্টে আছেন, অনাহারে আছেন তাদেরকেও যেন আমরা সেই আনন্দে শরীক করতে পারি, তাদেরকে যেন সহযোগিতা করতে পারি নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী সেদিকেও খেয়াল রাখা আমাদের কর্তব্য। 

                                        

"ঘুরে ফিরে বারে বারে ঈদ এসে ঈদ চলে যায়।

ঈদ হাসতে শেখায়, ভালোবাসতে শেখায়

ত্যাগের মহিমা শেখায়"।

 

 

 

বাঁকা চাঁদের জ্যোৎস্নায়  

সোহানা নাজনীন

 

সিজদায় থাকা অবস্থাতেই তাহেরা খরগোসের মতো কান খাড়া করলো। সিঁড়িতে হুড়োহুড়ির ধুপ-ধাপ শব্দ শোনা যাচ্ছে। তার মানে ভাশুরের ছেলে-মেয়েরা ইতোমধ্যে ছাদে চলে গিয়েছে, উপর থেকে ওদের চেঁচামেচির জারালো আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। তাহলে চাঁদ কি উঠে গেছে? আগামীকাল ঈদ হবে? 

নামাজে মন বসাতে পারলো না তাহেরা, মনোযোগ হালকা হয়ে গেল। ডানে-বায়ে দ্রুত সালাম ফিরিয়ে অন্যদিনের মতো আর লম্বা মোনাজাত করলো না। ঝটপট উঠে দাঁড়াতে গেল তাহেরা। আর ঠিক সেই সময় পাশের জায়নামাজে বসা শাশুড়ি খপ করে তাহেরার ডান হাতটা ধরে ফেললেন। 

"কোথায় দৌড়াচ্ছ? আরো একটু বসো, নামাজটা আগে শেষ করে নেই। কথা আছে তোমার সাথে। বেশি সময় লাগবে না, মাত্র দুই মিনিট নেব।" 

তাহেরার আর তর সইছে না, কি কথা বলতে চায় তার শাশুড়ি- এই টানটান উচাটনের সময়? দিনশেষে সব আনন্দ এখন জড় হয়েছে বাড়ির ছাদে, না জানি কতো আনন্দ ঘটে যাচ্ছে সেখানে! আজ যদি চাঁদ উঠেই যায় তাহলে উনত্রিশ রোজা হবে এবার। খুব ভালো হবে তাহলে, একটুপরেই সেমাই বানাতে বসবে সবাই। বেচারা বয়স্ক শাশুড়ি, দোয়া শেষ করে দাঁড়াতে গিয়ে হাঁপিয়েই উঠলেন। মাথার ঘোমটা টেনে দিয়ে তাহেরার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তার মুখে হাত ছোঁয়ালেন। শাশুড়ি ছোট খাট মানুষ, ইশারায় নিচু হতে বললেন তাহেরাকে। তাহেরার তখন বয়স আর কত হবে, এই কুড়ি-একুশের বেশি নয়। ছিপছিপে লম্বা শরীরটা সামনে ঝুকে ধরলো যেন তার শাশুড়ি মাথা স্পর্শ করতে পারেন। মাত্র সতের বছর বয়সে এই বাড়ীর বৌ হয়ে এসেছে তাহেরা, কিন্তু চার বছরেও কিশোরীর খোলস ছেড়ে বের হতে পারেনি। এখনো ভাশুরের ছেলে-মেয়েদের সাথে ছাদে লুটোপুটি করতে মন চায়। ফোলা শাড়ির ভিতরের শরীরটা বাড়ন্ত হলেও মন এখনও সেই কচুর লতির মতো কোমল। তাহেরার শাশুড়ি সেই কোমল শরীর ছুঁয়ে বিড়বিড় করে কিছু বলতে লাগলেন, 

"সারা রোজার মাস তুমি আমাদের সেবা করলে, কতো যত্ন করে ইফতারি করালে, আমার প্রাণটা জুড়ায়ে গেছে। দোয়া করি আল্লাহও যেন তোমার প্রাণটা এভাবেই শান্তিতে জুড়ায়। স্বামী-সন্তান নিয়ে চিরসুখী হও তুমি। আর আটকাবো না, যাও এবারে ছাদে যাও, দেখে আস চাঁদ উঠলো কিনা" 

 

ছাড়া পেতেই তাহেরা ছুট লাগালো সিঁড়ি ঘরের দিকে। তার মনে পড়ছে, গত এক মাস সারা বিকাল ধরে সে ইফতারির জোগাড় করেছে। শাশুড়ির দাঁত নেই, তাই দুধ গরম করে খেজুর কুঁচি ভিজিয়ে রাখতো, শসার ভুজি কাটতো, নরম করে দুটো পিঁয়াজু ভাজতো। এসব কথা ভাবতে ভাবতেই বিড়ালের মতো টপকে সিঁড়ি ভাঙতে লাগলো তাহেরা। তখনো পুরোপুরি আঁধার নামেনি, হালকা আলো চারিদিকে। 

ছাদে উঠে দেখে রাস্তার ওপারে মসজিদের বা'কোণ আলো করে চিকণ বাঁকা চাঁদ উঠেছে। তারই নিচে গাব গাছের কচি লাল পাতাগুলো চকচক করে দুলছে। বাড়ির ছেলেমেয়ে সবাই একসাথে, বাড়ির বৌয়েরা মাথার ঘোমটা ফেলে চিবুক উঁচিয়ে চাঁদ দেখছে। সবার কলরবে তখন "ঈদ মোবারক"।

 

 

 

ছোটবেলার ঈদ 

শামছুন ফৌজিয়া 

ঈদ মানেই আনন্দ আর ছোটবেলার ঈদের স্মৃতি ও আনন্দ যেন একটু বেশিই স্পেশাল। যদিও বর্তমানের আধুনিকতার জৌলুস ছোটবেলার ঈদে ছিল কম। একমাস সিয়াম সাধনার পর আসে ঈদ আর রোজার ঈদে 'ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ ' কাজী নজরুল ইসলামের গানটি রেডিও টেলিভিশনে প্রচারিত হওয়ার সাথে ঈদের আনন্দ যেন বেড়ে যেত। 

ছোটবেলার ঈদে প্রধান আকর্ষণ ছিল ঈদের জামা, মেহেদী পরা,নাস্তা খাওয়া আর বেড়ানো। ঈদের দিনে পরার জন্য নতুন জামার ব্যবস্থা না হওয়া পর্যন্ত ছোটদের স্বস্তি ছিলো না।অনেকেই কাপড় কিনে সেলাই করতেন, কেউ তৈরি জামা পরতেন আর কেউ নিজের হাতে সেলাই করতেন।

নিজের কথা বললে বলব, আমার জামা বড় বোন সিলাই করে দিতেন, আমাদের একটা সিঙ্গার সেলাই মেশিন ছিল। কোন সময়ে হাফ সেলাই শেষে মাপ ঠিক হয়েছে কিনা সেটা দেখার সময় কাজিন বা বাল‍্যসাথী কেউ যাতে না দেখে সেদিকে খুব খেয়াল রাখতাম। দরজা বন্ধ করে সেলাই করতেন এবং একবার পরার পর লুকিয়ে রাখতেন আর সেই জামা ঈদের দিন সকালে বের করতেন। জামার সাথে মিলিয়ে চুলের বেনিবল, ফিতা বা বড় জোর চুড়ি থাকত। তবে জামা পরার পরে বোনের সংগ্রহে থাকা জিনিসগুলো দিয়ে মেকাপ করে, চুল বেঁধে দিতেন। আহা আমরা ছোটরা সাজুগুজুর আনন্দে মাতোয়ারা ছিলাম। 

গ্রামের ঈদ আরো সাদামাটা। ঈদের চাঁদ দেখার হিড়িক ছিল অনেক সময় চাঁদ দেখা না গেলে শেষ ভরসা রেডিও/ টেলিভিশনের খবর থেকে নিশ্চিত হবার পর ছেলে মেয়েদের আনন্দের চিৎকার শোনা যেত,"আগামীকাল ঈদ"। তাছাড়া মসজিদের মাইকে পুরো মাস সেহরির সময় হুজুর ডেকে দিতেন এবং ঈদের চাঁদ দেখার ঘোষণা ও দিতেন।

গ্রামে ঈদের সময় ভোর রাতে পুকুরের পানিতে গোসল করার প্রচলন ছিল। কে বলেছিল জানিনা ঐ সময়ে নাকি আব জমজমের পানি মেশানো থাকে বলে সবাই ঐ সময়েই গোসল করার চেষ্টা করতো। ঊনত্রিশ রোজার সকালে গাছের মেহেদী পাতা সংগ্রহ করে পিষে রাখা হতো এবং চাঁদ রাতে আমরা হাতে পরতাম, কেউ কেউ ঐ অবস্থায় ঘুমিয়ে যেতাম।

সকালে নতুন জামা পরে মা বাবাকে সালাম দিয়ে একসাথে বসে ঈদের স্পেশাল সেমাই পরোটা, পিঠা, হালুয়া খেয়ে দলবেঁধে এঘর ওঘর, এবাড়ি ওবাড়ি বেড়ানো হত। সালাম দিয়ে চলে আসতাম কিন্তু সবাই বলতেন নাস্তা খেয়ে যেতে। দুপুরের সময় বাল‍্যসাথীদের সাথে দেখা হতো,আমরা তিনজন ছিলাম একসাথে বেড়াতাম। 

এখন ঈদের আনন্দ ও থিম বদলে গেছে। গেট টুগেদার হয় সেই সাথে রকমারি খাবার ও বিনোদন সবই থাকে, এক জামাতেই ঈদ নয় একের অধিক লাগে। এতসব জৌলুসের মাঝে তবুও ছোটবেলার ঈদের স্মৃতি জড়িয়ে থাকে মনে, মা বাবা ভাই বোন, আত্মীয়স্বজন সবাই স্মৃতিতে জড়িয়ে আছেন। এখন সবই আছে কিন্তু নেই সেই বাবা, মা ভাই বোনের সাথে একসাথে থাকার আনন্দ।

 

 

 

ঈদের খুশিতে অবহেলিত হৃদয়

ফরিদা ইয়াসমীন

 

ঈদের চাঁদ উঠলেই শহরজুড়ে আনন্দের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে। রঙিন পোশাক, সুগন্ধি আতর, নতুন জুতার শব্দে মুখরিত হয় চারপাশ। শিশুরা খিলখিলিয়ে হাসে, বড়রা ব্যস্ত থাকেন উৎসবের আয়োজন নিয়ে।কিন্তু এই আনন্দের মাঝেও কোথাও কেউ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে—চোখে এক অপূর্ণতার ছায়া নিয়ে।

দীর্ঘদিন যাবত দেশ ছাড়া। জীবিকার প্রয়োজনে হোক বা উন্নত জীবনযাপনের আশায়, ঈদের আয়োজন করতে গেলেই দেশের অসহায় মানুষগুলো চোখে ভাসে; যাদের জন‍্য ঈদ বলে বিশেষ কোনো দিন নেই। দেশ থেকে দূরে থাকলেও ঈদের চাঁদ উঠলে হৃদয় ছুটে যায় শৈশবের সেই চেনা আকাশের নিচে। স্মৃতির পাতায় ভেসে ওঠে ঈদের আগের রাতের ব্যস্ততা, নতুন জামাকাপড়ের গন্ধ। কিন্তু এ সবকিছুর মাঝেও এক অদৃশ্য বেদনা মনের কোণে জমে থাকে—ঈদ যাদের কাছে আসে না কোনো আনন্দের বার্তা নিয়ে, বরং প্রতিদিনের বঞ্চনার চেহারা হয়ে।

 

যারা পথের ধারে বসে থাকে, হয়তো কারও দয়া দান পাওয়ার আশায়, তাদের ঈদ কেমন কাটে? হয়তো কারও ফেলে দেওয়া সেমাইয়ের আধপোড়া টুকরোই তাদের উৎসবের স্বাদ, হয়তো পুরোনো একজোড়া ছেঁড়া স্যান্ডেলই তাদের জন্য নতুন উপহার। শহরের উজ্জ্বল আলো, বিলাসী খাবারের আয়োজন, দামি পোশাকের মাঝে যখন আমরা নিজেদের ডুবিয়ে রাখি, তখন কি একবারও মনে পড়ে, এই ঈদের দিনেও কেউ না খেয়ে ঘুমোচ্ছে? 

রাস্তার ধারে রুক্ষ হাতে পুরোনো শার্টের বোতাম জুড়ে দেওয়া সেই ছেলেটি, ময়লার স্তুপ থেকে পড়ে থাকা টুকরো কুড়িয়ে নেওয়া মেয়েটি—তারা কি ঈদ বোঝে? নতুন কাপড়ের উচ্ছ্বাস, সুস্বাদু খাবারের স্বাদ, ঈদের সালামি পাওয়ার আনন্দ—এসব যেন তাদের জন্য কেবলই গল্প।

 

খুব ছোটবেলায়, একটা ঘটনা আমার মনে গভীর দাগ কেটে গিয়েছিল। ঈদের দিন যে ই বের হলাম, দেখলাম কোণের দোকানের সামনে একটি ছেলে বসে আছে, কাঁধে ছেঁড়া গামছা। তার চোখে ঈদের আনন্দ নেই, বরং একধরনের শূন্যতা। বাবা এগিয়ে গিয়ে তার হাতে কিছু টাকা দিলেন। ছেলেটি মাথা নিচু করে নিয়ে চলে গেল, কিন্তু তার চোখের ভাষা যেন কোনো এক হারিয়ে যাওয়া ঈদের গল্প বলছিল।

সেদিন বাড়ি ফিরে খাবারের থালার সামনে বসেও আমার আর খেতে ইচ্ছে করছিল না। মাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, "ঈদ কি সবার জন্য একইরকম?"  মা একটু চুপ থেকে বলেছিলেন, "যদি আমরা চাই, ঈদ সবার জন্য আনন্দময় হতে পারে।" 

আজ প্রবাসে বসে যখন ঈদের আয়োজন করি, তখন সেই ছেলেটির মুখ মনে পড়ে যায়। মায়ের কথা মনে পড়ে যায়। 

 

একবার ভাবুন, যদি প্রতিটি পরিবারের ছোট্ট আনন্দের ভাগ থেকে তাদের জন্য কিছু রাখা যেত? যদি একজোড়া নতুন স্যান্ডেল, এক প্লেট সেমাই, এক টুকরো মাংস তাদের মুখে হাসি ফোটাতে পারত?

ঈদ শুধু নতুন পোশাক পরার নাম নয়, ঈদ মানে ভালোবাসা ভাগ করে নেওয়া। ঈদ মানে একে অপরের কষ্ট বুঝতে শেখা। তাই আসুন, এই ঈদে আমরা শুধু নিজেদের আনন্দ নিয়েই ব্যস্ত না থেকে, তাদের মুখে একটু হাসি ফোটানোর চেষ্টা করি, যাদের ঈদ এখনো শুধু আকাশের চাঁদ দেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ।

ঈদের আনন্দ হোক সবার জন্য, ঈদের খুশি ছড়িয়ে পড়ুক প্রতিটি হৃদয়ে।

 

 

পঞ্চাশ মিনিটের বন্ধু

সুমন শামসুদ্দিন

 

 

টিকিট কাউন্টারে হঠাৎ কথা!  "ওহ্ দুঃখিত! আমি খেয়াল করিনি যে তোমরা লাইনে! আমি দাঁড়াচ্ছি তোমাদের পেছনে, তোমরা সামনে যেতে পারো।"

হেসে দিয়ে স্বর্ণকেশি শ্বেতবর্ণ রন্ডা বললো, "না না ঠিক আছে তুমি দাঁড়াতে পারো, অসুবিধা নেই।" 

আমি বলি, "না, তা হয় না, তোমরা তো আমার আগেই এসেছিলে, দয়া করে চলে এসো সামনে।"

আমি ওদের পেছনে গিয়ে লাইনে দাঁড়ালাম। ওরা চারজন, স্বামী স্ত্রী এবং এক ছেলে ও এক মেয়ে। ব্যস, এইটুকুই!

তারপর বোর্ডিং এর সময় হলে ম্যানহাটনের পিয়ের ১৬ থেকে ছোট্ট ক্রুজটিতে উঠলাম। ওপরের ডেকে উঠে বসেছি, দেখি আমার সামনের সারিতে রন্ডা, ওর হাজবেন্ড এ্যান্থনি এবং ওর বাচ্চারা বসেছে।

চোখে চোখ পড়তেই রন্ডা হেসে দিয়ে বললো, "হাই, খুব ভালো হলো, আমরা আবার একসাথে।" 

আমিও হেসে সায় দিলাম।

 

ক্রুজ দুলতে দুলতে ছুটে চললো সাইট সিয়িং এর উদ্দেশ্যে। প্রথমে ব্রুকলিন ব্রিজ ক্রস করে ম্যানহাটন ব্রিজের নিচ দিয়ে ঘুরিয়ে লিবার্টি আইল্যান্ডের দিকে ছুটে চললো। সবাই যার যার মতো করে ম্যানহাটনের ছবি, আর বিভিন্ন রকম ফটোশুটে ব্যাস্ত হয়ে পড়লো। আমিও কিছু ছবি তুললাম। তারপর কিছু সেলফি তুললাম।

আমাকে দেখে হঠাৎ রন্ডা এগিয়ে এসে বললো, "আমি তুলে দেবো?"

আমি বললাম, "ঠিক আছে দাও।" 

ছবি তোলা হলে রন্ডা বললো, "তুমি কোত্থেকে এসেছো?" 

"আমি নিউইয়র্কেই থাকি, তুমি?" 

"আমরা ফ্লোরিডা থেকে এসেছি; আমি, আমার হাজবেন্ড- এ্যান্থনি, আর আমাদের দুই বাচ্চা", ওর ছেলে আর মেয়ের দিকে দেখিয়ে বললো।

পরে জেনেছি ওদের তিন মেয়ে এক ছেলে।

 

তারপর এ্যান্থনির সাথে পরিচয় করিয়ে দিলো। এ্যান্থনি একটু লাজুক টাইপের, খুবই কম কথা বললো; তবে মুখে সবসময় হাসি লেগেই ছিল।

রন্ডা বললো, "আমরা ফার্স্ট টাইম নিউইয়র্কে।" 

"ওহ তাই! ওয়েলকাম টু নিউইয়র্ক।" 

তারপর গল্প জমে গেল, গল্পে গল্পে কেটে গেল পুরো পঞ্চাশ মিনিট!

এর মধ্যেই লিবার্টি আইল্যান্ড, স্ট্যাচু অব লিবার্টি আর সাইট সিয়িং করার সাথে সাথে সবাই ছবিও তুলছিলাম।

একসময় রন্ডা বললো, "আমরা একসাথে একটা ছবিও তুলতে পারি? কি বলো?"

"ডেফিনিটলি"

"তোমার ক্যাপটা একটু আমাকে দিবে? আমার চুলগুলো বাতাসের ঝাপটায় মুখে এসে পড়ছে, তোমার ক্যাপ পড়েই ছবিটা তুলি।" 

আমি আমার ক্যাপটা ওকে এগিয়ে দিলাম। ও আমার ক্যাপ পড়ে ওর অসাধারণ সুশ্রী স্বর্ণালী চুলের অর্ধেকটাই ঢেকে ফেললো। তারপর আমি ওদের সাথে আমাদের পঞ্চাশ মিনিটের বন্ধুত্বের একটা স্মৃতি ডিজিটাল ছবির ফ্রেমবন্দি করে রাখলাম।

 

 

ঈদ এলেই বাবা জেগে ওঠে

রোকেয়া দীপা

 

রাত পোহালেই ঈদ। পুরো বাসায় সাজসাজ রব। মা নতুন শাড়ি গুছিয়ে রাখছেন, ছোট ভাই তাওসিফ বারবার আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে তার নতুন পাঞ্জাবির কলার ঠিক করছে। আমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে ঈদের চাঁদ দেখছি, চাঁদটা আজ যেন একটু বেশি উজ্জ্বল, নরম রুপালি আলোয় চারপাশ ভাসছে। গাছের পাতাগুলো নিঃশব্দে দুলছে ঈষৎ বাতাসে, যেন তারাও ঈদের আনন্দে মেতে উঠেছে। দূরের মসজিদ থেকে ভেসে আসছে তাকবিরের সুর, এক অদ্ভুত শান্তি ছড়িয়ে পড়ছে রাতের আকাশজুড়ে। রাস্তার ধারে শিশুরা দৌড়ঝাঁপ করছে ঈদের আনন্দে, পাশের বাড়ির ছাদ থেকে ভেসে আসছে আতরের মিষ্টি গন্ধ, কোথাও কেউ সেমাই রান্না করছে—হালকা দারুচিনি আর দুধের গন্ধ মিশে গেছে বাতাসে। 

আগামীকাল ভোরের সূর্য উঠলেই শুরু হবে খুশির দিন। কিন্তু আমার ভেতর এক অদৃশ্য শূন্যতা জেগে উঠছে; কারণ ঈদ এলেও বাবা আর ফিরে আসবেন না।

ঈদ মানেই তো বাবার হাতে হাত রেখে বের হওয়া, নামাজ শেষে বাবা বাড়ি ফিরলে গরম গরম সেমাই খাওয়া, বাবার দেওয়া সালামি পকেটে ভরা। অথচ কতগুলো বছর ধরে ঈদ এলে বাবাকে ছুঁয়ে দেখতে পাই না, শুধু অনুভব করি। বাবা নেই—এই সত্যিটা অনেক আগেই মেনে নিয়েছি, কিন্তু ঈদ এলেই মনে হয়, বাবা আবার আমাদের মাঝে ফিরে আসেন, তার স্মৃতির ভেতর দিয়ে।

আমার বয়স তখন দশ বছর। ঈদের আগের রাত, বাসায় ঈদের আয়োজন চলছে পুরোদমে। বাবা সেদিন খুব ব্যস্ত ছিলেন, আমার জন্য নতুন জামা কিনে এনেছিলেন, মাকে বলছিলেন, "দেখো তো, মেয়েটাকে জামাটা কেমন মানাবে?"

আমি খুশিতে বাবার গলায় ঝাঁপিয়ে পড়তাম।

কিন্তু এমনই এক রমজান মাসেই সব বদলে গেল। বাবাকে ছাড়া সেই প্রথম রমজান মাস কেমন ছিল, বোঝাতে পারব না। ঈদের সকালে মা আমাকে বুকে টেনে নিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদেছিলেন, আমি তখনো বুঝে উঠতে পারছিলাম না, ঈদ মানে কেন কষ্টের আরেক নাম হয়ে গেল।

আজ এতগুলো বছর পরও ঈদ এলে বাবা জেগে ওঠেন—তার স্মৃতি হয়ে, তার গলায় শোনা তাকবির হয়ে, তার হাতে নতুন জামা দেওয়ার উচ্ছ্বাস হয়ে। ঈদের ভোরবেলা যখন ঘুম ভাঙে, মনে হয়, বাবা এখনই দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকবেন, মাথায় স্নেহভরা হাত রাখবেন, বলবেন, "উঠ মা, আজ ঈদের দিন!"

আমি জানি, বাবা নেই, কিন্তু প্রতিটা ঈদের সকালে মনে হয়, বাবা ঠিক পাশেই আছেন। নামাজের জন্য প্রস্তুত হওয়ার সময় তার সেই পরিচিত আতরের গন্ধ যেন বাতাসে ভেসে আসে। মা যখন সেমাই পরিবেশন করেন, তখন বাবার সেই হাসি চোখের সামনে ভেসে ওঠে—যে হাসিতে ঈদের খুশি ছিল, ছিল আমাদের জন্য অফুরন্ত ভালোবাসা। ছোটবেলায় বাবার হাত থেকে পাওয়া সালামির সেই পুরনো টাকার গন্ধ আজও যেন নাকে লেগে থাকে।

ঈদ এলেই মনটা ভারী হয়ে যায়, কারণ বাবাকে ছুঁয়ে দেখা যায় না, তার কণ্ঠ শোনা যায় না। তবু মনে হয়, তিনি আছেন—আমাদের স্মৃতিতে, আমাদের অনুভূতিতে, আমাদের ঈদের প্রতিটি মুহূর্তে। বাবা চলে গেছেন, কিন্তু ঈদ এলেই তিনি নতুন করে ফিরে আসেন, ঠিক আমাদের হৃদয়ের গোপন কোণায়, যেখানে স্মৃতিগুলো চিরজাগরুক হয়ে থাকে।

সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন