https://www.prothomalony.com/
17681
literature
বর্তমানে জাতি-ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সব উৎসব, বিবাহ, জন্মদিন, মঞ্চসজ্জা, নারীদের অঙ্গসজ্জা ইত্যাদি সব কাজে অর্থাৎ আমাদের জন্মের আগে থেকে মৃত্যুর পরও ফুলের বহুল ব্যবহার দেখা যায়। কবি ও সাহিত্যিকেরা বিভিন্ন ফুলের গুণগান করে চলেছেন অনাদিকাল থেকে। রাষ্ট্রীয় প্রতীকরূপেও বিভিন্ন ফুল সমাদৃত। যেমন: ভারতে পদ্ম, বাংলাদেশে শালুক, ইংল্যান্ড ও ইরানে গোলাপ, হল্যান্ডে টিউলিপ, জাপানে চন্দ্রমল্লিকা ইত্যাদি। বর্তমানে মানুষ গ্রামীণ জীবন পরিত্যাগ করে ভোগবিলাসে আকৃষ্ট হয়ে শহরবাসী হয়েছেন। কিন্তু শহরে সামান্য জায়গা পেলে তার মধ্যে অথবা টবে, বারান্দায় ও ছাদে শখ এবং অবসর সময় বিনোদনের জন্য ফুল চাষকে বেছে নিয়েছেন। মোটকথা, প্রাচীনকাল থেকে আজ পর্যন্ত পৃথিবীর মানুষের জীবনে জাতি-ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে ফুল ওতপ্রোতভাবে জড়িত এবং সামাজিক কৃষ্টি, আধ্যাত্মিক ও ব্যবসা-বাণিজ্যে ফুল সবার কাছে সমাদৃত।
বিভিন্ন অনুষ্ঠানে, বিবাহে এবং মালা তৈরির জন্য গাঁদা ফুলের বহুল ব্যবহার পরিলক্ষিত হয়। এই গাছ ওষধি গুণাগুণের জন্যও সমাদৃত এবং এর চাষ পদ্ধতি খুবই সহজ। জমি নির্বাচন: উঁচু, পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থাযুক্ত, প্রচুর সূর্যালোক পায় এমন জমিতে গাঁদা গাছ ভালোভাবে জন্মাতে পারে এবং উত্তম ফুল উৎপাদন করে। মাটির ব্যাপারে তেমন বাছবিচার নেই। সব ধরনের মাটিতে গাঁদা চাষ করা সম্ভব। তবে জৈব পদার্থে ভরপুর বেলে দোআঁশ থেকে দোআঁশ বেলে মাটি উত্তম। জাত: গাঁদা বিদেশি ফুল, আদি স্থান যুক্তরাষ্ট্র। গাঁদা ফুলের বহু প্রজাতি থাকলেও দুটি প্রজাতি (১) আফ্রিকান গাঁদা এবং (২) ফ্রেঞ্চ গাঁদা অর্থনৈতিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়া সুগন্ধি গাঁদা ও সিঙ্গেল গাঁদা প্রজাতির ফুল উদ্যানপ্রেমীরা বাগানে সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য চাষ করে থাকেন। বর্তমানে আফ্রিকান গাঁদা ও ফ্রেঞ্চ গাঁদার সংকরায়ণের মাধ্যমে বহু হাইব্রিড গাঁদার জাতও বাজারে পাওয়া যায়।
আফ্রিকান গাঁদা ফুল গাছের সাইজ বেশ বড়সড়, প্রায় ৪০-১০০ সেমি পর্যন্ত লম্বা হয়। ফুলের আকারও বেশ বড়, ৫-১০ সেমি ব্যাসযুক্ত। বিভিন্ন রঙের জাত পাওয়া যায়; যেমন: কমলা, হলুদ, বাসন্তী ইত্যাদি। ফুল দেখতে অনেকটা গোলাকৃতি, মালা তৈরির জন্য বাণিজ্যিক ভিত্তিতে অধিক সমাদৃত। উল্লেখযোগ্য জাত হলো হনিকম্ব, হ্যাপিনেস, কিউপিড, আফ্রিকান ইয়েলো, আফ্রিকান অরেঞ্জ, আফ্রিকান লেমন, ফিয়েস্তা, মেইলিং, ইয়েলো সুপ্রিম, ইয়েলো স্টোন, গোল্ড স্মিথ, গ্লিটার্স ইত্যাদি। ফ্রেঞ্চ গাঁদাকে ফরাসি গাঁদাও বলা হয়। এই প্রজাতির গাছ আফ্রিকান গাঁদা গাছ অপেক্ষা আকারে ছোট, উচ্চতা প্রায় ২০-৩০ সেমি, শাখা-প্রশাখা বেশি, ফুল অপেক্ষাকৃত ছোট, ব্যাস প্রায় ৪ সেমি। দীর্ঘদিন, অধিক সংখ্যায় ফুল ফোটে। বাগানের সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য বেডে, লনের কিনারায়, রকগার্ডেনে ও টবে বহুল চাষ হয়, উৎপাদন বেশি। বিয়েশাদিতে অধিক চাহিদার জন্য বাণিজ্যিক ভিত্তিতে অধিক চাষ হয়। উল্লেখযোগ্য জাত হলো লেমন কিং, রেড ব্রোকেড, রয়্যাল বেঙ্গল, কুইন সোফিয়া, হারমোনি, স্টার অব ইন্ডিয়া ইত্যাদি। সুগন্ধি গাঁদা ফুলের প্রজাতির মধ্যে সুমিষ্ট সুবাস বিদ্যমান। গাছ প্রায় ৪৫ সেমি লম্বা হয়, পাতা লম্বাটে এবং কিনারায় খাঁজ কাটা থাকে না। ফুল সাধারণত গুচ্ছ অবস্থায় ফোটে, ফুলের আকার খুবই ছোট। কমলা রঙের ফুলের আকার এক সেমি চওড়া।
সিঙ্গেল সিগনেট গাঁদা গাছ ৩০-৪০ সেমি উঁচু হয়। ফুল খুবই ছোট, রঙ কমলা অথবা হলুদ। বৃহৎ অস্ট্রেলিয়ান জাতের গাঁদা গাছ উচ্চতায় প্রায় ২-২.৫ মিটার হয়। ফুল বেশ বড়সড়, ১৫ সেমি চওড়া। খুব কম চাষ হয়। হাইব্রিড গাঁদা প্রধানত আফ্রিকান এবং ফ্রেঞ্চ প্রজাতির সংকরায়ণে উদ্ভূত হয়েছে। গাছে এবং ফুলে উভয় প্রজাতির চারিত্রিক লক্ষণ দেখা যায়। গাছ বেঁটে, ফুলের সাইজ বেশ বড়, ফুলের সংখ্যা অধিক এবং লাল। ব্যবসায়িক ভিত্তিতে হাইব্রিড চাষও আজকাল জনপ্রিয়তা অর্জন করে চলেছে। চারা তৈরি: প্রতিটি গাঁদা ফুল বহু ফুলের সমষ্টি। আমরা যাকে ফুলের পাপড়ি বলি সেগুলোও আলাদা ফুল হিসেবে গণ্য হয়, অর্থাৎ অসংখ্য ফুল সমষ্টিগতভাবে একটি উত্তল ডিক্সের ওপর সুবিন্যস্তভাবে সজ্জিত হয়ে যৌগিক ফুলের চোঙাকৃতি বৃতির মধ্যে অসংখ্য বীজ পাওয়া যায়। পরিপক্ব বীজ বপন করা হলে চারা গজায়, কিন্তু বীজের চারার মধ্যে সব সময় মাতৃগাছের গুণাগুণ বজায় থাকে না। গুণগত মানের ফুলের জন্য মাতৃগাছ থেকে ডাল কলম করা শ্রেয়। গাঁদা ফুলের চাষের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ ডাল কলমের চারা পাওয়া না গেলে ভালো জাতের নীরোগ, সবল মাতৃগাছ থেকে বীজ সংগ্রহ করে বর্ষার আগে বীজতলায় বা বীজপাত্রে চারা তৈরি করা যায়। কানি প্রতি বীজ লাগবে ২৫০ গ্রাম থেকে ৩২০ গ্রাম। বীজ বপনের পর প্রয়োজনীয় পানি সেচন করে মাটির আর্দ্রতা বজায় রাখা আবশ্যক। চারাগুলো ৫ সেমি লম্বা হলে শীর্ষ মুকুল ভেঙে দিলে চারা লিকলিকে লম্বা না হয়ে সবল হয়। এক-দেড় মাস বয়সের চারা শিকড়সহ সাবধানে তুলে নিয়ে মূল জমিতে রোপণ করা যায়। এ প্রসঙ্গে বলা প্রয়োজন, কোনো অবস্থায় হাইব্রিড গাঁদা গাছ থেকে বীজ সংগ্রহ করে চারা তৈরি করা ঠিক হবে না।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট
সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন