https://www.prothomalony.com/
17721
literature
স্মৃতির কলতান
মৃদুল রহমান
পাখিরা খোঁজে আকাশের নীলিমায় মুক্তির ঠিকানা,
নদী খোঁজে স্রোতের বুকে জলের অনন্ত প্রার্থনা।
ফুলেরা খোঁজে ঋতুর কাছে রঙের গোপন উৎসব,
আমি খুঁজি এক অভয়ারণ্য—
যেখানে প্রকৃতির সাথে নতুন কলরব ।
যেখানে নীরবতারও থাকবে আপন ভাষার সংজ্ঞার্থ,
যেখানে হারিয়ে যাওয়াও হবে ফিরে পাওয়ার এক অর্থ।
তোমরা সেখানে খুঁজে নিও কিছু অব্যক্ত বিরহের গান,
আমি রেখে যাবো—
হৃদয়ের গভীরে তোমাদের স্মৃতির কলতান।
স্বাধীনতা কেনো উপহার নয়
মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির
সে দেশে শিশুরাও কুঁজো হয়ে হাঁটতো,
যেন জন্মই হয়েছিল ঝুঁকে থাকার অভিশাপ নিয়ে।
সেখানে পথিক, পুলিশ, ইমাম,
শিক্ষক, কুলি, দিনমজুর, আমলা-
সবাই একই ছন্দে হাঁটে মেরুদণ্ডহীন।
তাদের মুক্তির উচ্চারণও ছিল ফাঁকা আওয়াজ-
বয়ানহীন স্লোগানের মতো-
মগজে গ্রথিত মিথ্যা বুলি আওড়ে
ওদের বিজয় মিছিলে গাওয়া হতো ভ্রান্ত সুরের গান।
তারপর এল এক সময়—
চোখে ঘুম ছিল না কারও, হৃদয়ে ছিল অগ্নি।
মায়েদের বুকফাটা আর্তনাদ,
পিতার নীরব কান্না রূপ নিল বজ্রের হুঙ্কারে।
মুক্তির সন্তানেরা চেপে ধরে স্বৈরাচারীর টুঁটি -
জ্বালাল স্বাধীনতার মশাল,
এভাবেই জন্ম নিল এক অদ্ভুত আলোর-
তারপর নিঃশব্দে ঘুমিয়ে গেল ওরা, ভোরে-
সহস্র বুলেট বিদ্ধ রক্তগোলাপের মতো।
যারা ছিল সাধারণ মানুষ- রিকশাওয়ালা, ভিক্ষুক
কিংবা দিনমজুর, যাদের জীবনের অভিধানে
'সোজা হয়ে দাঁড়ানো' মানেই ছিল দুঃস্বপ্ন
তারাই শিখিয়েছিল এক অমোঘ সত্য—
স্বাধীনতা কোনো উপঢৌকন নয়-
স্বাধীনতা কেবল ছিনিয়ে নিতে হয়।
প্রিয় মাছ
সাইয়্যিদ মঞ্জু
তারপর থেকে ইলিশের প্রতি খুব টান অনুভব
কাঁটার যে ভয় মনের ভেতর— ক্রমাগত ঠেলি দূরে
রূপালী শরীর ডাকি লেজ মাথা নয়, ঠিক মাঝখণ্ড
এসো ধীরলয়ে পাতে,
ডেকের উপর জোড়া নামাতায় গণনার ধ্যানে মাঝি
তখন কেন যে—
মনে পড়ে যায়, অচ্ছুৎ মায়ায় শৈশবের এক মুখ
ছুঁয়ে দেখি বারবার, ঘাটে ফেরে যতবার
পাঁচমিশেলির কোণে রূপচাঁদা হাসে, ইলিশের
প্রীতি দেখে
দৃঢ় এক সীমারেখা, তবুও কেন যে রয়ে যায় আবদার
কোন একবেলা খেতে ডাকিও তোমার হাতের পাক
তারপর থেকে ইলিশের প্রতি খুব টান অনুভব
যখনই জানি এ তোমার প্রিয় মাছ ...
বৃক্ষবাগান
এস ডি সুব্রত
ব্যথাবিষে নীল সমস্ত দেহপ্রান্তর
কোথায় বুলাবে হাত
কোথায় লাগাবে বলো মলম
ভেতরে যে বিষাদের কালো ছায়া
কীভাবে দেবে বলো সান্ত্বনা?
উষর ভূমিতে হয় না বৃক্ষ-বাগান
খরতাপে দগ্ধ যে মাটি
সেখানে তুমি দেবে কতটা আর জল?
একটি প্যারাডক্স
আরজাত হোসেন
তোমায় দেখতে গিয়ে দেখেছি সমস্ত পথ
ইট, মাটি, কাঁচারাস্তা, পাকারাস্তা সব।
রেলপথ পেরিয়ে ধবল মেঘের বাড়ি!
তোমায় দেখতে গিয়েই দেখেছি তোমার
ষোড়শী কানের দুল - ঝুলন্ত ফুলের কুঁড়ি।
সম্মুখে অপলক দৃষ্টির উপরে কোনো প্রেম নেই
যে দৃষ্টি ছুঁয়ে যায় স্নায়ুকোষ, কুসুমরাঙা হতে
শ্বেত রক্তকণিকা।
দেখেছি বর্ণহীন, শব্দহীন অথচ
সমস্ত মুখাবয়ব একটি প্যারাডক্স-সাহিত্য।
তোমায় দেখতে গিয়েই দেখেছি সমস্ত দহন
অগ্নিগিরি, জ্বলন্ত স্ফুলিঙ্গ!
তারপর হাস্যোজ্জ্বল ঠোঁট বৈরাগী হয়।
অন্তরের স্থান জানি, আকার জানি না
তাই মনে মনেই দেখেছিলাম মনের স্থানান্তর -
সে ধবল মেঘের রূপান্তর !
তোমায় দেখতে গিয়েই দেখেছি ফসিল, ধারা—
শোকাশ্রু হতে আনন্দাশ্রু।
তড়িৎ-আনন্দে
মারুফ আহমেদ নয়ন
সূর্যশিশিরের বনে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। কীটজন্মে
রূপবতী ফুলের লোভে পিচ্ছিল আঠায় দিয়েছি প্রাণ।
আমাকে নিষেধ করেছিল পিপীলিকারা—
"ঐ কামুকী ফুলের কাছে যেও না, বালক।"
তুরীয় আহ্লাদে মেতে ভুলে গিয়েছি সবকিছু।
হরিণের মতো চোরাকাদায় নাচছি—তাধিন-ধিন।
শিকার দেখে ছুটে আসছে চিতাবাঘ। এমন
দুঃস্বপ্নে প্রেমে পড়েছিলাম। যেন চাঁদ বাওরির
কুয়ায় পড়েছিলাম, অগ্নিচুল্লিতে পুড়েছিলাম।
তোমার কাছে জেনেছি, তুমি পতঙ্গশিকারি ফুল।
তোমার শরীর জীবন্ত সমাধি। আমাকে ভক্ষণ করো।
তোমার বিচ্ছেদে শরীরে ফুটছে লাভার নদী-নালা।
তোমাকে জড়িয়ে ধরি। জানি, বিপরীতধর্মী দুটি
চুম্বক একবার কাছে এসেছিল—তড়িৎ-আনন্দে।
বিমূর্ত ময়ূরের দাগ
সাব্বির আহমাদ
একদল নৃবিজ্ঞানীর গবেষণা বলছে: আমার ঘুমের
ভিতর একটা মৃত নদী কাতরাতে কাতরাতে শুকিয়ে গিয়েছিল হঠাৎ।
সেই থেকে পৃথিবীতে পানির আকাল।
মৎস্যকন্যাদের এইসব দুঃখ আমি কিভাবে ভুলাই?
আমার ফণা-ফণা বুক, ভেজা উদ্যান,
চুলগুলো উষ্কখুষ্ক। দ্যাখো— অচেনা এক নদী
চোখের ভিতর।
ডুব দাও, হে রুপোলী কন্যাদের দল। তোমাদের ক্যামোফ্লেজ স্তনে আঁকা জানালার শিক, সশব্দে বৃষ্টি
পড়ছে বাহিরে।
আমার সঞ্চারিত রক্তের শিরায় বয়ে যায় কালো কালো বিন্দুর আকাশ। অদ্ভুত এই বৃষ্টি; রঙিন সন্ধ্যার তলে তুলে ধরে তার উদ্যত ফণা। বিছানার উপকথা শুনে নেয় স্বপ্নের নিরবচ্ছিন্ন কান। সেই থেকে একটা বিমূর্ত ময়ূর—
চুমুর আবেশে দাগ কেটে যায় গলার মাদুলিতে।
ভাসতে চেয়ে ডুবে যাই
শাখাওয়াত তানভীর
অতঃপর জানলাম—
স্বজনহীন সন্ন্যাসের বিষাদ বিলাসে
সূর্যভীত জলেরও মন আছে; সর্বগ্রাসী সে মন
সম্ভবত চাঁদকেই ভালোবাসে!
দূরত্বে যদিও জ্বলে বিরহ অনল
জানি না কেন, কোন অভিলাষে চাঁদের টানে
উদ্ভ্রান্ত জল জোয়ার-ভাটায় তবুও হাসে!
ও জল, কত বিমল!
তবুও এতো রূপ তোমার!
দীঘির জল, নদীর জল, সমুদ্র জল
অশ্রুজল— পাথর চোখে ব্যথার উপহার!
হায় জল! উতলা জল!
চন্দ্র বিরহে ডুবিয়ে দাও তারে— রুদ্র দহে
ভালোবেসে তোমার বুকে ভাসে যে কমল!
এইসব জলীয় অনুভবে
মানুষও কি জল নয় তবে?
ভালোবাসার মায়াছলে
ভাসতে চেয়ে ডুবে যাই যার অতলে!
প্রথম আলো'র আলো
আশরাফুল ইসলাম মিলন
নিউ ইয়র্কের বুকে জ্বলে এক আলোর প্রদীপ,
শব্দের সেতু গড়ে, হৃদয়ের কলতানে নিত্যদীপ।
উত্তরের প্রথম আলো -প্রবাসের এক গর্বের নাম,
বাংলা ভাষার সুবাস ছড়ায় সকাল-সাঁঝ অবিরাম।
হাডসনের হাওয়ায় ভেসে আসে বাংলার গান,
প্রতিটি পাতায় জাগে স্বপ্ন, আশা আর প্রাণ।
প্রবাসীর হৃদয়ে শত কথা-তুলে ধরে যতনে,
সত্য আর সৌন্দর্য মিশে থাকে প্রতিটি বর্ণে।
সংস্কৃতির রঙে রাঙায় পাতা, প্রজন্মের মন,
বাংলার ইতিহাসে জাগায় নতুন স্পন্দন।
কবিতা, গল্প, সংবাদ আর জীবনের কথা,
পাঠকের হৃদয়ে গেঁথে যায় মমতার ব্যথা।
দূর পরবাসেও রাখে শেকড়ের পরিচয়,
প্রথম আলো এগিয়ে চলে; অটুট প্রত্যয়।
কলমের শক্তিতে গড়ে ঐক্যের সেতুবন্ধন,
মানুষে মানুষে ছড়ায় ভালোবাসার স্পন্দন।
আগামীর পথে থাকুক তার সাফল্যের দীপ,
সত্য-নৈতিকতায় হোক আরও সুদীপ্ত রূপ।
নিউ ইয়র্কের আকাশ জুড়ে উঠুক তার জয়গান,
উত্তরের প্রথম আলো; থাকুক সম্মানে চিরঅম্লান।
আব্বার দিনলিপি'
মুরাদ ক্বালবি
বিকেল নামলে
সূর্যটা ঘুমঘুম চোখে
ধানক্ষেতের ভেতর ডুবে যেত।
সবুজের বুক চিরে
একটি সরু পথ—
সেখানে আব্বা ফিরতেন
ঘামে ভেজা খয়েরি সন্ধ্যা হয়ে।
ফিরতেন কাদামাখা গোধূলি হয়ে।
কাঁধে তাঁর সন্ধ্যা ঝুলত।
স্কুলের ঘণ্টা থেমে গেলে
পাখিরাও নিচু স্বরে উড়ত।
হ্যারিকেনের আলোয়
আমরা শব্দ কমিয়ে ফেলতাম।
আব্বা খুব কম কথা বলতেন—
তবু তাঁর নীরবতায়
একটা সংসার
নোঙর খুঁজে পেত।
ঘর ভর্তি থাকত অদৃশ্য শব্দভান্ডার।
সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন