https://www.prothomalony.com/

17761

north-america

উত্তর আমেরিকা

ব্রিটেনের নতুন প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম : স্বচক্ষে যা দেখলাম, অভিজ্ঞতায় যা শিখলাম

প্রকাশ: ২৫ জুলাই ২০২৬ ১১:১৪

বর্তমান বিশ্বে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার অভাব অনেক দেশেই আছে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে আধুনিক গণতন্ত্রের সূতিকাগার ব্রিটেন সম্ভবত এক নতুন রেকর্ড গড়েছে। যুক্তরাজ্যে গত ১০ বছরে যেখানে একজন প্রধানমন্ত্রীর সর্বোচ্চ দুই মেয়াদ কিংবা পর পর দুজন প্রধানমন্ত্রীর মাত্র এক মেয়াদ করে ক্ষমতায় থাকার কথা, সেখানে আজ পর্যন্ত ছয়জন প্রধানমন্ত্রী গত হয়ে সপ্তম প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতাসীন হয়েছেন। গত ২০ জুলাই সোমবার নর্থ ইংল্যান্ডের বড় শহর ম্যানচেস্টার সিটির সদ্য সাবেক মেয়র অ্যান্ডি বার্নহ্যামকে ব্রিটেনের রাজা তৃতীয় চার্লস দেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ করেছেন।

যেহেতু যুক্তরাজ্যের শাসনব্যবস্থা একটি সাংবিধানিক রাজতন্ত্রের অধীনে সংসদীয় গণতন্ত্র, তাই রাজার (বা অতীতে রানি) কাছে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের আগে সরকার গঠনের অনুমতি নেওয়া একটা অন্যতম প্রাচীন ও মর্যাদাপূর্ণ সাংবিধানিক প্রথা। এটি কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং এর মাধ্যমে দেওয়া হয় নতুন সরকারের সাংবিধানিক বৈধতা। ব্রিটেনে সাধারণ নির্বাচনের ফলাফলের পর যে নেতা হাউস অব কমন্সে সংখ্যাগরিষ্ঠতার সমর্থন নিশ্চিত করতে পারেন, তিনি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার যোগ্য বিবেচিত হন। এরপর বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী বাকিংহাম প্রাসাদে গিয়ে রাজার কাছে নিজের পদত্যাগপত্র পেশ করেন। রাজা সেই পদত্যাগ গ্রহণ করেন। এরপর নতুন সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতাকে প্রাসাদে আমন্ত্রণ জানানো হয়। রাজা তাকে সরকার গঠনের আহ্বান জানান। তখন সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা রাজার আমন্ত্রণ গ্রহণ করা সাপেক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত হন। এরপর নতুন প্রধানমন্ত্রী তার সরকারি দপ্তর ও বাসভবন ১০ ডাউনিং স্ট্রিটে গিয়ে জাতির উদ্দেশে প্রথম ভাষণ দেন এবং মন্ত্রিসভা গঠন শুরু করেন।

এবার সরকার পরিবর্তনে উপরোক্ত প্রচলিত সব প্রথার ধারাবাহিকতা ঠিক থাকলেও প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের প্রক্রিয়াতে কিছুটা ব্যতিক্রম ঘটেছে। কারণ অ্যান্ডি বার্নহ্যাম কোনো সাধারণ নির্বাচন ছাড়াই প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। মাত্র দুই বছর আগে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে বিপুলসংখ্যক এমপি নির্বাচিত হওয়ার মাধ্যমে বিজয়ী লেবার সরকার গঠন করেছিলেন সদ্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। কিন্তু ইসরায়েল কর্তৃক ফিলিস্তিনের গাজায় নৃশংস গণহত্যা বন্ধে ইসরায়েলের ওপর চাপ সৃষ্টিতে প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের দুর্বল ভূমিকা এবং দেশের ভেতরে অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়নে সরকারের ক্রমশ ব্যর্থতা গত দুই বছরে লেবার পার্টির জনপ্রিয়তাকে বিপুল সংকটের মুখে ফেলে। এর ফলশ্রুতিতে গত মে মাসে অনুষ্ঠিত ব্রিটেনের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির বিপুল পরাজয় ঘটে। এরপর থেকে মূলত নিজ দলের ভিতর থেকেই প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের পদত্যাগের দাবি উঠতে থাকে এবং একপর্যায়ে তা এমন জোরালো আকার ধারণ করে যে, কিয়ার স্টারমারের পক্ষে তা অগ্রাহ্য করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। পার্লামেন্টে দলের প্রায় অর্ধেকেরও বেশি এমপির দাবির মুখে প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার দলীয় প্রধানের পদ থেকে ইস্তফা দেন, যার ফলে অ্যান্ডি বার্নহ্যামকে দলীয় এমপিরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দলীয় প্রধান হিসেবে নির্বাচিত করেন। আর সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হওয়ায় অ্যান্ডি বার্নহ্যামকে রাজা তৃতীয় চার্লস ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত করলেন।

অ্যান্ডি বার্নহ্যাম যুক্তরাজ্যের একজন সুপরিচিত রাজনীতিবিদ, যিনি জনসেবামূলক নেতৃত্ব, আঞ্চলিক উন্নয়ন এবং সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে তার কাজের জন্য ব্যাপকভাবে পরিচিত। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন এবং মানুষের কল্যাণকে অগ্রাধিকার দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। ব্রিটেনের তৃতীয় বৃহত্তম মহানগর গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র হিসেবে অ্যান্ডি বার্নহ্যাম গণপরিবহন উন্নয়ন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, আবাসন এবং জনস্বাস্থ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। তার নেতৃত্বে অঞ্চলটির পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং স্থানীয় অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করেছে।

বার্নহ্যামের নেতৃত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো স্থানীয় জনগণের চাহিদাকে গুরুত্ব দেওয়া। তিনি প্রায়ই সামাজিক বৈষম্য কমানো, সুযোগের সমতা বৃদ্ধি এবং কম আয়ের মানুষের জীবনমান উন্নয়নের পক্ষে কথা বলেছেন। বিভিন্ন সময়ে তিনি স্থানীয় ব্যবসা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং কমিউনিটি সংগঠনের সঙ্গে সমন্বয় করে উন্নয়নমূলক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছেন।

কোভিড-১৯ মহামারির সময়ও তিনি স্থানীয় জনগণ ও ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষার বিষয়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। সে সময় তাঁর অবস্থান জাতীয় পর্যায়ে আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে এবং অনেকেই স্থানীয় জনগণের পক্ষে তার দৃঢ় অবস্থানকে ইতিবাচকভাবে মূল্যায়ন করেন।

সমর্থকদের মতে, অ্যান্ডি বার্নহ্যাম এমন একজন নেতা যিনি স্থানীয় সরকারের ক্ষমতা বৃদ্ধি, উন্নত গণপরিবহন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ধারাবাহিকভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। তাঁরা বিশ্বাস করেন যে তার নীতিমালা আঞ্চলিক উন্নয়নকে আরও গতিশীল করতে সহায়তা করেছে।

যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটের সামনে তার প্রথম ভাষণে তার উপরোক্ত বৈশিষ্ট্য ও প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন ঘটেছে। ভাষণে তিনি রাজনীতিতে নতুন সূচনার অঙ্গীকার করেছেন। তিনি স্বীকার করেছেন, গত এক দশকে বারবার প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তনের কারণে জনগণের আস্থা নষ্ট হয়েছে। তিনি বলেছেন, এই পরিস্থিতিকে বদলানোর জন্য তিনি একটি "circuit breaker" বা বড় পরিবর্তনের সূচনা করতে চান। তিনি আগামী ১০ বছরের জন্য একটি জাতীয় পরিকল্পনা প্রণয়ন করার কথাও বলেছেন, যাতে অর্থনীতি, জনসেবা ও অবকাঠামোকে নতুনভাবে গড়ে তোলা যায়। এছাড়া তিনি সাধারণ মানুষের ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ কমাতে দ্রুত পদক্ষেপ নেবেন এবং অচিরেই এ সংক্রান্ত পরিকল্পনা ঘোষণা করবেন বলে জানিয়েছেন। নতুন প্রধানমন্ত্রী যুক্তরাজ্য থেকে গৃহহীনতা দূর করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন। এছাড়া তিনি লন্ডনের বাইরে বিভিন্ন অঞ্চল ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে আরও ক্ষমতা ও সম্পদ দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন তাঁর প্রথম বক্তব্যে।

পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্যের নতুন প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম তার পূর্বসূরিদের নীতি অব্যাহত রাখবেন বলেই মনে হচ্ছে। দায়িত্ব নেওয়ার পর পরই মার্কিন প্রেসিডেন্ট তার সাথে আলাপ করেছেন। এছাড়া ক্ষমতার প্রথম দিনের শত ব্যস্ততার মাঝেও ইউরোপের এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রেসিডেন্ট-প্রধানমন্ত্রীদের কল রিসিভ করেছেন দেদারসে। তবে আশা করা হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অ্যান্ডি বার্নহ্যাম গাজা ইস্যুতে পদত্যাগী প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের তুলনায় কিছুটা মানবিক হতে পারেন। কারণ তিনি ইতোমধ্যে প্রকাশ্যে বলেছেন, লেবার পার্টি গাজার বিষয়ে অতীতে "সঠিক অবস্থান নিতে পারেনি" এবং তিনি ইসরায়েল সরকারের ওপর আরও চাপ প্রয়োগ করতে চান। তার এমন বক্তব্যে মনে হচ্ছে, তিনি ইসরায়েলে অস্ত্র বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা, অবৈধ ইসরায়েলি বসতি থেকে আসা পণ্যের বাণিজ্য সীমিত করা এবং ফিলিস্তিনের জন্য মানবিক সহায়তা বৃদ্ধির মতো ইতিবাচক পদক্ষেপ নিতে পারেন অদূর ভবিষ্যতে। তবে ইসরায়েল রাষ্ট্রের সৃষ্টিতে ব্রিটেনের ভূমিকা এবং দুই দেশের চলমান সম্পর্কের গভীরতা, এসব কারণে ইসরায়েলের সঙ্গে ব্রিটেনের সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন করা বা নাটকীয় নীতিগত পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।

ব্রিটেনের নতুন প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যামের সাথে সাক্ষাতের সুযোগ আমার হয়েছে। প্রায় বছর তিনেক আগে চ্যানেল এস টেলিভিশনের ইয়র্কশায়ার ব্যুরো চিফ হিসেবে ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির একটি কনফারেন্সে যোগদানের আমন্ত্রণ পেয়েছিলাম পার্টির প্রভাবশালী এমপি রিচার্ড বার্গনের কাছ থেকে। রিচার্ড জানিয়েছিলেন, ম্যানচেস্টার সিটির মেয়র অ্যান্ডি বার্নহ্যামও আসবেন অনুষ্ঠানে। মিস্টার বার্নহ্যাম তখন ম্যানচেস্টারে উন্নয়নমূলক বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। তাছাড়া ইতিপূর্বে লেবার পার্টির লিডার হওয়ার দৌড়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার কারণেও তিনি মিডিয়ার লাইমলাইটে। তাই সিদ্ধান্ত নিলাম, সম্ভব হলে তার একটি সাক্ষাৎকার নিতে হবে। পরিকল্পনা মোতাবেক স্যুট-টাই পরে বেশ ফিটফাট হয়েই হাজির হলাম অনুষ্ঠানে। এমপি রিচার্ড বার্গন উষ্ণ অভ্যর্থনা জানালেন। তারপর অনুষ্ঠানের বক্তব্য-পর্ব শেষে মেয়র অ্যান্ডি বার্নহ্যামের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন আমাকে। তার সামনে গিয়ে আমি কিছুটা বিব্রত বোধ করলাম। কারণ যাকে ইন্টারভিউ করার নিয়তে স্যুট-টাই পরে আসলাম, তিনি সাধারণ একটা শার্টের উপরে নীল ব্লেজার, জিন্স প্যান্ট আর পায়ে কেডস পরে এসেছেন দেখে অবাকই হলাম। যাই হোক, পরিচিত হওয়ার পর অ্যান্ডি বার্নহ্যাম আমার সাথে এমন আন্তরিকভাবে কথাবার্তা বললেন, মনে হলো যেন আমাকে দীর্ঘদিন ধরে চেনেন। কিন্তু আমি জানি, তাঁর মতো একজন সিনিয়র নেতা আমাকে চেনার কথা না। মনে মনে ভাবছিলাম, মানুষকে আপন করে নেওয়ার কি অসাধারণ তাঁর ক্ষমতা! একজন রাজনীতিবিদের জন্য নিশ্চয়ই এটা একটা বড় যোগ্যতা। যাই হোক, তাঁকে ক্যামেরার সামনে ছোট্ট একটি সাক্ষাৎকার দেওয়ার অনুরোধ জানালাম। তিনি সানন্দে রাজিও হলেন। (সাক্ষাৎকারের কিছু অংশ পরে চ্যানেল এস নিউজেও প্রচার করেছিলাম)।

বিদায় নেওয়ার আগে এই লেখার সাথে সংযুক্ত ছবিটিও তুলেছিলাম। সেদিন তাঁর সাধারণ বেশভূষা দেখে যত না অবাক হয়েছিলাম, তার চাইতেও বিস্মিত হয়েছিলাম তাকে গাড়িতে তুলে বিদায় দিতে গিয়ে। তার যাবার প্রাক্কালে এমপি রিচার্ড বললেন, "চলো, অ্যান্ডিকে এগিয়ে দিয়ে আসি।" আমি ভেবেছিলাম, ব্রিটেনের ক্ষমতাসীন দলের এত বড় নেতা! সাথে নিশ্চয়ই কিছু সিকিউরিটি আর গাড়ি থাকবে অন্তত দুই-তিনটা। কিন্তু তার গাড়ির কাছে গিয়ে দেখি, কোথাও কেউ নেই। তিনি একাই এসেছেন তার সাধারণ ব্র্যান্ডের ব্যক্তিগত গাড়িটি নিজে চালিয়ে। তখন স্বপ্নেও ভাবিনি, মাত্র তিন বছরের ব্যবধানে বিশ্বের এক অন্যতম পরাশক্তি ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী হয়ে যাবেন এই মানুষটি! আমার এই ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতা থেকে একটা জিনিস শিখলাম, প্রকৃত নেতারা ক্ষমতার দাপট দেখায় না। তাদের পরিচয় পাওয়া যায় তাদের কাজে। এটারই চর্চা হওয়া উচিত আমাদের দেশে।
 

উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন