https://www.prothomalony.com/
17676
literature
কুমু
দিনা ফেরদৌস
সেই রাতটা ছিল ভয়ানক। বারান্দায় বসে একা বিড়বিড় করছিল কুমু, 'চিন্তা করো না মা, পলাশ বাঁচবে... কিন্তু আমি...'
কথাটা পিছন থেকে শুনতে পেয়ে কুমুর মা তাকে জড়িয়ে ধরে বলেন— কী বলছিস মা, তোর আবার কী হবে!
কুমুর মুখ, চোখ ঠান্ডা। ফিসফিস করে বলছিল, একটা শরীরই তো ওদের চাই...। পলাশ তুই বেঁচে থাকবি ভাই। আমি তোকে কিছুতেই মরতে দেবো না। আমরা সব সময় একসাথে থাকবো, খেলবো, গল্প করবো...
পরদিন সকালে কুমুকে ঘুম থেকে ডাকতে গেলে মৃতদেহটাই পাওয়া গেল। যে মেয়েটি আগের দিনও সুস্থ-স্বাভাবিক ছিল।
পলাশ সুস্থ হয়ে ওঠে ধীরে ধীরে। এদিকে আশেপাশে ছড়িয়ে পড়ে কুমু আসলেই অভিশপ্ত ছিল। কেউ কেউ বলল, যাক এইবার অন্তত আরামে বাঁচা যাবে। কালকেরটা কালকে দেখা যাবে। আগে জেনে কোনো কিছু কী থামানো গিয়েছে এ পর্যন্ত? কেউ কেউ বলল, কুমু ছিল মানসিক রোগী। ওকে বিশ্বাস করতে যাবার দরকারই-বা কী ছিল! তবুও কেউ যেন সত্যটাকে অস্বীকার করতে পারছে না। যেখানে ডাক্তার বলে দিয়েছিলেন পলাশের আর কোনো আশা নেই।
কুমু সেই ছোটবেলা থেকেই একটু অন্য রকম। একা একা কথা বলে নিজের মনে। কাউকে দেখেই বলতে পারে তার সাথে কী হতে চলেছে।
কুমুকে নিয়ে সব সময় অজানা ভয়ে আতঙ্কিত থাকতেন কুমুর মা। আশেপাশের অনেকের মতো কুমুর বাবারও ধারণা ছিল তার মেয়ে মানসিকভাবে অসুস্থ। মেয়েকে মানসিক ডাক্তার দেখাতে হবে বলে কয়েকবার ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্টও নিয়েছিলেন কুমুর বাবা। কুমুর মা রাজি নন। তার এক কথা, যদি বাইরে জানাজানি হয়ে যায় কুমুকে পাগলের ডাক্তার দেখানো হয়েছে, তাহলে ভবিষ্যতে মেয়ের বিয়ে-শাদী দিতে সমস্যা হবে।
তেরো বছরের কুমু সাধারণ জীবনযাপন করলেও অনেকের ধারণা তার ভেতরে অদ্ভুত কোনো শক্তি কাজ করে, যার কারণে সে ভবিষ্যৎ দেখতে পায়। কারো বিয়ের আয়োজন চলছে। সবাই আনন্দ-ফূর্তিতে ব্যস্ত। হঠাৎ কুমু বলে বসল, 'এই বিয়েটা হবে না।' প্রথমে সবাই এ নিয়ে ঠাট্টা-মশকরা করলেও শেষ মুহূর্তে দেখা গেল বিয়েটা ভেঙে গিয়েছে।
পাশের বাড়ির ছেলে মাখন। কুমুর বয়সী। ক্লাস সেভেনে পড়ে। কুমু, পলাশ ও মাখন একই স্কুলে যায়। খেলাধুলাতে বেশ ভালো মাখন। স্কুলের জুনিয়র ফুটবল টিমে খেলার জন্যে সবাই তাকে চেনে। সব সময় প্রথম স্থানে থাকে মাখন। ফাইনাল খেলার দিন স্কুলে যাবার সময় রাস্তায় কুমু মাখনকে বলে, বাড়ি ফিরে যেতে। ফাইনাল খেলা ছেড়ে মাখন কোনোভাবেই যাবে না।
সেদিন স্কুল থেকে বাসায় ফিরে কুমুকে বেশ অস্থির লাগছিল। মা জিজ্ঞেস করতেই কুমু বলেছিল, খেলা শেষে মাখন আর স্কুল থেকে বেঁচে ফিরবে না মা। কথাটি শুনেই মা ধমক দিয়েছেন কুমুকে।
বিকেলে হঠাৎ চারপাশে মানুষের শোরগোল শুনে কুমুর মা ঘরের বাইরে বের হলে জানেন লোকজন বলাবলি করছে, স্কুল থেকে বাসায় ফিরতে রাস্তা পাড়ি দেবার সময় দুর্ঘটনায় মাখন মারা গেছে। কুমুর মা জানতেন ঠিক কিছু একটা ঘটবে মাখনের সাথে। বাইরে থেকে এসেই কষে কুমুর গালে থাপ্পড় লাগান। আর বলেন, যা হবার হবে, তুই আর কখনো মুখ খুলবি না। আর যদি সত্যিই কিছু জেনে থাকিস আগে থেকে, তবে এখন থেকে উল্টোটা বলবি। না হলে চুপ থাকবি। মায়ের কথা শুনে সেদিন কুমু চুপ হয়ে গিয়েছিল।
এর মধ্যে কুমুর দুই বছরের ছোট ভাই পলাশ হঠাৎ করে ভয়ানক অসুস্থ হয়ে পড়ে। কঠিন জ্বরের সাথে মুখ দিয়ে রক্তক্ষরণ শুরু হয়। ডাক্তার দেখিয়ে ওষুধ খেয়ে কয়েকদিন ভালো থাকে তো আবার অসুস্থ হয়ে যায়। হাসপাতালে ভর্তি করে দেওয়া হয় পলাশকে। ডাক্তাররা জানিয়ে দিলেন রোগটা অনেক দূর গিয়েছে, আর আশা নেই।
কুমুর মা কাঁদতে কাঁদতে কুমুকে জড়িয়ে ধরে বললেন, তুই তো সব আগে জানতে পারিস মা। বল তো, তোর ভাই বাঁচবে কি না? কুমুর চোখ তখন স্থির। মাকে জড়িয়ে ধরে কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বলে— কেঁদো না মা, যে করেই হোক আমি কথা দিচ্ছি, পলাশ বাঁচবে। কুমুর মা চিৎকার করে সবাইকে বললেন, আমার মেয়ে বলেছে পলাশ বাঁচবে। আমার পলাশ বেঁচে ফিরবে। কুমুর কথা মতো পলাশকে হাসপাতাল থেকে বাড়িতে নিয়ে আসা হয়।
কুমু ভাইকে না দেখে ঘরের পিছনের বারান্দায় একা একা বসে বিড়বিড় করছিল। সেদিন রাতে কিছু না বলে নিঃশব্দে পিছনে দাঁড়িয়ে কুমুর মা শুনতে চেষ্টা করছিলেন কুমু একা একা কী বলে। 'চিন্তা করো না মা, পলাশ বাঁচবে, কিন্তু তার বিনিময়ে আমি চলে যাবো।'
পলাশ বেঁচে যায়, বড় হয়, কিন্তু হারিয়ে ফেলে কথা বলার ক্ষমতা। অন্ধকার রুমে একা একা কী যেন বিড়বিড় করে নিঃশব্দে।
অনেকের ধারণা পলাশের মধ্যে কুমুর আত্মা ভর করে আছে। কেউ কেউ বলেন, দূর থেকে এই বাড়ির আশেপাশ দিয়ে বারো-তেরো বছরের একটি মেয়েকে হেঁটে যেতে দেখেছেন। আবার কাছে যেতে যেতে দেখেছেন বাতাসে মিলিয়ে যেতে। এই চৌদ্দ বছরের মধ্যে কুমুর মা কিংবা বাবা কেউই এমন কিছু দেখেননি। কিন্তু আজ যখন গোসল থেকে বের হয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল পলাশ, পিছন থেকে পলাশের রুমে ঢুকতেই আয়নার মধ্যে মনে হলো তিনি সেই তেরো বছরের কুমুকেই দেখছেন।
অপূর্ণ বর্ষা
জি বি এম রুবেল আহম্মেদ
বর্ষাকাল। চারিদিকে ঘন কালো মেঘের ঘনীভবন। সকাল থেকেই মুষলধারে বৃষ্টি ঝরছে। আকাশ যেন তার সমস্ত সঞ্চিত জল একদিনেই ঢেলে দিতে বদ্ধপরিকর। এদিকে আকাশ সাহেবের কলেজে যাওয়ার সময় হয়ে এসেছে। সকাল দশটার মধ্যে উপস্থিত হতে হবে। বাসা থেকে কলেজের দূরত্ব প্রায় আধা ঘণ্টার পথ। রেইনকোট গায়ে চাপিয়ে সাড়ে নয়টায় বাইক নিয়ে রওনা হলেন তিনি। রাস্তা ভিজে পিচ্ছিল। মাঝেমধ্যে তীব্র বজ্রপাত— মনে হয় যেন মাথার ওপরই আকাশ ভেঙে পড়ছে। তবুও দায়িত্ব আর অভ্যাসের টানে এগিয়ে চলা থামে না।
আকাশ সাহেব গাড়ি চালাচ্ছেন আর ভাবছেন, প্রতিদিনের মতো আজও হয়তো কলেজ গেটে অপেক্ষা করছে মিস ঊর্মি। আকাশ সাহেব ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক, আর মিস ঊর্মি বাংলা বিভাগের। দুজনেই এ বছর বিসিএস থেকে কলেজে শিক্ষকতা শুরু করেছেন। মাত্র ছয় মাসের পরিচয়— অথচ সেই পরিচয়ের ভেতরেই জন্ম নিয়েছে এক গভীর ভালো লাগা। ধীরে ধীরে তা পরিণত হয়েছে পারস্পরিক বিশ্বাস ও ভালোবাসায়। বিষয়টি দুই পরিবারই জানে এবং সম্মতিও রয়েছে। এখন শুধু একটি সুন্দর দিনক্ষণ ঠিক হওয়ার অপেক্ষা— তারপরই শুরু হবে তাদের নতুন জীবনের পথচলা।
কিন্তু সেদিন সকালে ঊর্মি কলেজে যায়নি। আকাশ ভেবেছিলেন— হয়তো বৃষ্টির জন্য দেরি হচ্ছে। ক্লাসের ফাঁকে কয়েকবার ফোন দিলেন। ফোন বন্ধ। একটু অস্বস্তি হলো। দুপুরে খবর এল, ঊর্মির বাবা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। ক্লাস শেষে ছুটে গেলেন হাসপাতালে।
হাসপাতালের করিডোরে ভেজা শাড়ি পরে বসে আছে ঊর্মি। চোখ দুটো লাল। আকাশকে দেখে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর বলল— 'বাবা খুব অসুস্থ! ডাক্তার বলেছে দীর্ঘ চিকিৎসা লাগবে।'
আকাশ পাশে বসে বললেন—
'চিন্তা করো না। আমি আছি।'
ঊর্মি মৃদু হেসেছিল। কিন্তু সেই হাসিতে কোনো আলো ছিল না। দিন যেতে লাগল। ঊর্মি বদলে যেতে লাগল। ফোন কম, কথা কম।
একদিন দেখা করে বলল— 'আকাশ, আমি বিয়ে করতে পারব না।'
আকাশ অবাক— 'কেন?'
ঊর্মি নিচের দিকে তাকিয়ে বলল—
'আমার সংসার এখন বাবাকে নিয়ে। ছোট দুই বোন। আমি কাউকে বেঁধে রাখতে চাই না। তাছাড়া তুমি জানো আমার ভাই নেই। সংসারের বোঝা আমার ওপর।'
আকাশ অনেক বোঝালেন—'আমরা একসাথে সামলাব।'
ঊর্মির একই কথা—'সব ভালোবাসার পরিণতি সংসার হয় না। কিছু ভালোবাসা দায়িত্বের কাছে হেরে যায়।'
সেদিনই শেষ দেখা।
কয়েক মাস পর ঊর্মি বদলি নিয়ে নিজ জেলা গাজীপুরে চলে যায়।
বহু বছর কেটে গেছে। এখনো বর্ষার দিনে কলেজে যেতে যেতে আকাশ সাহেব মাঝে মাঝে গেটের দিকে তাকান। মনে হয়, ভেজা শাড়ি পরে কেউ হয়তো দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু সেখানে কেউ থাকে না। শুধু বৃষ্টি পড়ে। খোলা জানালায় বসে সবুজ ঘাসে বৃষ্টি পড়া দেখছেন। জানালার পাশে বসে প্রকৃতিতে বৃষ্টির শব্দ শুনছেন তিনি। হাতে এক কাপ দুধ চা। চায়ের কাপে ধীরে চুমুক দিতে দিতে ভাবেন— কিছু গল্পের শেষ অধ্যায় লেখা হয় না। তবু একদিন গল্প শেষ হয়ে যায়।
সব ভালো লেখা কালজয়ী নয়
আরজাত হোসেন
ভালো লেখা আর কালজয়ী লেখা এই দুটো এক জিনিস নয়। তাহলে ভালো লেখা কী, কালজয়ী লেখা কী?
অনেক ছড়াকার খুব ভালো লেখেন, ভালো প্যাটার্ন দেন। ছন্দ, মাত্রা, তাল, লয়, রূপক, অন্ত্যমিল এমনকি খুব ভালো অনুপ্রাসও প্রয়োগ করেন। কিন্তু অবাক বিষয় হচ্ছে, এই লেখা অত্যন্ত সুপাঠ্য হলেও তা একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ভালো লাগে।
কেন এমন হয়? কারণ লেখার আগে স্থায়িত্ব নির্ধারণ করে না। এটি অনেকটা ছয় কিলোমিটার পথের স্লিপার বাসের মতো!
তাহলে কালজয়ী লেখা কীভাবে সৃষ্টি করব? প্রতিষ্ঠিত কবিরা কীভাবে কালজয়ী ছড়া, কবিতা লিখেছিলেন?
ধরুন আপনি কোনো একটি ঘটনা লিখলেন— কিন্তু কবি সেখানে ঘটনার রহস্য, সমাধান, অপকার ও উপকার লিখেছেন। ফলস্বরূপ আপনার লেখাটি শক্তিশালী, কিন্তু কবির লেখাটি কালজয়ী। অর্থাৎ, যদি একজন লেখক শুধু ঘটনা লেখেন, লেখাটি সময়ের সঙ্গে পুরোনো হতে পারে। কিন্তু যদি সেই ঘটনার ভেতর থেকে মানুষের চিরন্তন সত্য, ন্যায়, স্বাধীনতা, ভালোবাসা, ভয়, আশা বা মর্যাদার কথা তুলে আনেন, তাহলে সেই লেখা বহু প্রজন্ম বেঁচে থাকতে পারে। সমসাময়িক রাজনীতি বা কোনো নির্দিষ্ট ঘটনার ওপর লেখা ছড়া, কবিতা বা গান খুব শক্তিশালী হতে পারে। তা মানুষকে আন্দোলিতও করতে পারে। কিন্তু সেগুলোর অনেকগুলোই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রাসঙ্গিকতা হারায়।
আধুনিক কবিগণ অনেকটা ধৈর্যহীন। লেখার প্যাটার্ন নিয়ে ব্যস্ত থাকলে লেখা শুধুমাত্র সুপাঠ্য হবে, কিন্তু কখনো কালজয়ী হতে পারবে না। কালজয়ী হওয়ার জন্য একটি লেখাতেই ব্যয় করতে হয় অনেক সময়। তাই নিজের লেখা অনন্ত সময় ধরে টিকিয়ে রাখতে প্রতিটি লেখায় দিতে হবে যথেষ্ট পরিমাণ সময়, ভবিষ্যতের প্রাসঙ্গিকতা এবং মানুষের সাথে সম্পর্ক।
কেন বর্তমান কবিগণ কালজয়ী লেখা সৃষ্টি করতে ব্যর্থ?
•সমসাময়িকের উপর নির্ভরতা: কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ঘটনা বা বিতর্ককে কেন্দ্র করে লেখা শক্তিশালী হতে পারে, কিন্তু যদি তা বৃহত্তর মানবিক অভিজ্ঞতায় পৌঁছাতে না পারে, তবে সময়ের সঙ্গে তার আবেদন কমে যায়।
•কবিতায় চমক পঙক্তি অনুপস্থিত: কখনও কখনও চমক, স্লোগান, উক্তি, প্রবাদ ইত্যাদি কবিতায় অনুপস্থিত থাকায় কবিতা কম টিকে থাকে।
•দ্রুত প্রকাশের চেষ্টা: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত প্রকাশের সুযোগ থাকায় অনেক লেখা দীর্ঘ সময় ধরে ঘষেমেজে তৈরি হয় না। বরং লেখার মান যাচাই না করতেই তা প্রকাশে ব্যস্ত হয়।
•ধৈর্যের অভাব: অনেক ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যকর্ম বহুবার সংশোধিত হয়েছে। আজকের দ্রুতগতির প্রকাশসংস্কৃতিতে সেই প্রক্রিয়া কম দেখা যায়।
সাধারণ ভালো লেখা এবং কালজয়ী লেখার মধ্যে পার্থক্যগুলো দেখলেই বোঝা যায়।
একটি সাধারণ ভালো লেখা একটি নির্দিষ্ট সময়কে ভালোভাবে প্রকাশ করে, সমসাময়িক পাঠকের কাছে জনপ্রিয় হতে পারে , একটি ঘটনা বা ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে হতে পারে, পড়ে ভালো লাগে, জনপ্রিয়তা দ্রুত আসতে পারে এবং সময়ের সঙ্গে গুরুত্ব কমে যেতে পারে।
অন্যদিকে, কালজয়ী লেখা সময়কে অতিক্রম করে, বহু প্রজন্মের পাঠকের কাছে প্রাসঙ্গিক থাকে, घटनाর ভেতর থেকে মানুষের চিরন্তন সত্য তুলে আনে, বারবার পড়লে নতুন অর্থ আবিষ্কার হয়, স্বীকৃতি পেতে অনেক সময়ও লাগতে পারে এবং সময়ের সঙ্গে গুরুত্ব আরও বাড়তে পারে।
আমরা যখন কোনো লেখা লিখতে যাব, তার আগে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জানতে হবে। কী করলে একটি লেখা সময়কে অতিক্রম করবে? কীভাবে আগামী প্রজন্মেও লেখাটি প্রাসঙ্গিক হতে পারে? এই লেখাটির অর্থ কি শুধু একটি মাত্র ঘটনাকে উল্লেখ করে, নাকি এর ভিতরে রাখতে হবে ঘটনার উত্তর এবং এর ভবিষ্যৎ প্রতিক্রিয়া?
এসব বিষয় মাথায় রেখে যখন একটি ছড়া বা কবিতা লেখা হবে, তখন সেই লেখাটিই হতে পারে কালজয়ী। তা ছাড়া লেখার ক্যাটাগরির ওপর নির্ধারণ করে কোন লেখাতে কী কী প্রয়োগ করতে হবে।
একটি ছড়ার উদাহরণ দেওয়া যাক।
একটি ছড়ায় কেবলমাত্র ছন্দ, মাত্রা, অন্ত্যমিল, রূপক— এগুলো থাকলে হবে না। ছন্দের পাশাপাশি রাখতে হবে পাঠকের চাহিদা, কোন শ্রেণীর পাঠকের জন্য লিখছি, ভবিষ্যতের সাথে প্রাসঙ্গিক হবে কিনা। ছড়ার ক্ষেত্রে কোন বয়সীদের জন্য লিখব তা মাথায় রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শিশুর বয়স অনুযায়ী সহজ শব্দ ব্যবহার করতে হবে। জটিল বাক্য ও দুর্বোধ্য শব্দ এড়িয়ে চলতে হবে। পড়লে যেন মুখে লেগে থাকে। শুনলেই শিশুর মুখে মুখে ফিরতে পারে এমন লয় থাকা দরকার। সবচেয়ে বেশি খেয়াল রাখতে হবে ছড়াটি থেকে শিশুর কী উপকার হবে। শুধু ছন্দ বা তালের মাধ্যমে শিশুকে আন্দোলিত করাই কি প্রধান উদ্দেশ্য? নাকি একই সাথে শিশুর জন্য শিক্ষণীয় বিষয় উপস্থিত রাখতে হবে? ছড়ায় অবশ্যই শিশুর আনন্দ ও শিক্ষার বিষয় উপস্থিত থাকা অত্যাবश्यक।
তাই আমাদের কালজয়ী লেখা সৃষ্টির লক্ষ্যে এগোতে হবে। লেখাকে সংশোধন, পরিমার্জন ও আত্মসমালোচনার জন্য যথেষ্ট সময় দিতে হবে। তাৎক্ষণিকতার সংস্কৃতি হচ্ছে সবচেয়ে বড় বাধা, তাই এটি পরিহার করতে হবে। সমসাময়িক ঘটনায় অতিরিক্ত নির্ভর করা যাবে না। ভাইরাল হওয়ার আকাঙ্ক্ষা ছেড়ে দিতে হবে। ভাষার প্রতি যথেষ্ট সাধনা করতে হবে। লেখার চেয়ে বেশি পড়তে হবে। দ্রুত স্বীকৃতি পাওয়ার আশা ছাড়তে হবে। গভীর জীবন-উপলব্ধি করতে হবে।
সবসময় মাথায় রাখতে হবে— আমি কি সময়ের খবর লিখছি, নাকি মানুষের চিরন্তন সত্য লিখছি? আমার ভাষা কি শুধু তথ্য বহন করছে, নাকি শিল্পও সৃষ্টি করছে? লেখাটি কি আজকের জন্য, নাকি আগামী প্রজন্মও এতে নিজেদের খুঁজে পাবে? আমি কি দ্রুত প্রকাশের জন্য লিখছি, নাকি দীর্ঘস্থায়ী মানের জন্য লিখছি?
এসব বিবেচনা করেই আমাদের প্রত্যাশা রাখা উচিত, আজকের সাহিত্য হবে আগামী দিনের সোনার মুকুট।
সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন