https://www.prothomalony.com/
17661
literature
মহাকবি কালিদাসের 'মেঘদূতম্' এবং 'ঋতুসংহারম্' কাব্যে ধরা আছে বর্ষা ঋতুর অপরূপ বর্ণনা! ঈশ্বরগুপ্তের কাব্যেও আছে বর্ষাবন্দনা। আর কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ তো প্রকৃতি পূজারী! বর্ষা ঋতুকে নিয়ে তাঁর ছিল বিশেষ আবেগ! স্বদেশ ও বিদেশে ছড়িয়ে থাকা কবিরা বর্ষাকে নিয়ে আজ কি ভাবেন, তার কিছু নমুনা 'কবিতার এক পাতা' জুলাই সংখ্যায় ধরা থাকলো। আপনাদের ভালো লাগবেই, এ প্রত্যয় আমার আছে!
এক বুক ভালোবাসা আপনাদের জন্যে!
ফারুক ফয়সল
ছায়ালিপি
বিমল গুহ
বাইরে অঝোর ধারা ঝুম বরিষণ
কাঁটাঝোপে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে সকালের রোদ
ঘনমেঘ গিলেছে সময় সূর্যালোক, গিলেছে প্রকৃত বিবরণ ।
জানালার কাচে দূরে মগ্ন ছায়াপথ
এখনো যে-পথে ওড়ে প্রাগৈতিহাসিক রাজহাঁস ঝাঁকে ঝাঁক;
প্রবল বর্ষণে তার শুভ্র পাখা থেকে
ঝরে পড়ে অপসৃত স্মৃতির পালক আমাদের চেনা আঙিনায়?
সতুমি কি এখনো হাঁটো ছায়াঘন পল্লবের নিমগ্ন আড়ালে
একা একা ঝুম বরিষণে?
ধারাজল মুছে দেয় পায়ের নিভৃত কারুকাজ
শোনো কান পেতে দূর মেঘের মল্লার
— আরও বৃষ্টি হবে ;
এ বৃষ্টি মাথায় তুলে কী করে এগোবে ওই পথ?
অঝোর বৃষ্টির ধারা লেখে ছায়ালিপি বিস্তীর্ণ পাতায় ধারাক্রমে ?
দশ বছর আগের এক বরষায়
শামীম আজাদ
সে ছিল এক বেঘোর বর্ষামাস, মাসের শিশিতে বেদনার শেষদাগ
কোমরের কাছে কী ব্যথা টনটনে,কাপের তলায় কুচুটে কফির রাগ।
আনত নয়নে তরকারী করা হাতে, নীল-কেঁচো আর লাল কীট যত ছিল
হোমলেস এক হিয়ার বেদনা হয়ে, উদাম বেরিয়ে রাস্তায় ঘুরছিলো ।
দূরের গীর্জাটি বর্ষার জলে ভিজে, থোকায় থোকায় ছাড়ছিল নিঃশ্বাস
বিরহ-মাপের কবিতার কার্পেটে, ভেজা বালিশটি দেয়নি কোনই ছাড়।
আমার কবিতার মেটামরফিক হাওয়া, বদলে দিয়েছিল পিরানী হবার কাল
নারী ও নাড়ির যে আবেগ নির্মোহ, তাতেই এনেছে বর্ষা ব্যথা যত দূর্বহ।
বৃষ্টি দিনের স্মৃতিলিপি
ফারুক ফয়সল
ঝুম বৃষ্টিতে তুমুল আনন্দে ভিজেছিলাম একবার,
সয়নি কপালে সে সুখ! দিন কতক পড়েছিলাম জ্বরে;
বড় সুখের ক’টা দিন! মায়ের মমতা ও পরিবার নিয়েছিলাম চিনে!
একবার বেহিসাবী সময় দাপিয়েছি পুকুরের জলে,
আকাশ ছুঁড়েছিল তার জলের তীর আমার চোখে মুখে;
প্রজাপতি-সাঁতারে বর্ষাবিদ্ধের সে আনন্দ আজো বয়ে বেড়াই বুকে!
কিছু ইলিশ খিচুড়ি, বেগুন ভাজা মধ্যাহ্ণ ভোজ আছে সঞ্চয়ে
জলের কণাদের চুমুর আদর চোখে-মুখে সয়ে,
আরণ্যকের পাতা উল্টে গেছি, শংকর পড়ে জন অরণ্যে নিজের ভবিষ্যৎ খুঁজেছি!
শ্রাবণের অবিরাম বর্ষণে আঁধার রাতে আকাশ ডাকে, বিদ্যুৎ চমকায়!
হ্যারিকেনের কাঁপা আলোয় গা ছম ছম, হাতে ধরা কালোভ্রমর;
হঠাৎ নাকে তামাকের গন্ধ, দ্রুত সরে যায় হ্যাট পরা কিরীটী রায়!
বছরে নয় মাস শীতের দেশে বর্ষা ঋতু নেই,
কাচের জানালার ওপারে ভাসমান তুষার-তুলার নাচন;
কদম ফুল হাতে অপেক্ষমান প্রেমিক দেখিনা, নেই প্রেমিকার হৃৎকম্পন!
ছত্রিশ বছর, আজো শ্রাবণে জলভরা ধানের ক্ষেতে সমস্বরে ব্যাঙ হাঁকে,
রবিশঙ্করের সেতারে ‘রাগমেঘ’ হাতছানি দিয়ে আমায় ডাকে!
মেঘবীজ
শিহাব শাহরিয়ার
বৃষ্টি নামলেই আমরা কুমড়ো ফুলের ভাজি খাব
ফুলের হলুদ আর মায়াবী বৃষ্টির শাদারা এক হয়ে
অনন্তদের ভিজা উঠোনে কদমের পাপড়ি ছড়াবে
আমরা তাকাবো ঈশ্বরগঞ্জের বালিকা-বৃষ্টির দিকে
তাকাবো টিনের চালে, টানা বৃষ্টির শব্দ-ভ্যালিতে
বর্ষারূপে চোখ রেখে দেখব রবীন্দ্রনাথের নাগর
দেখব টপটপ বৃষ্টিজলে ফুলছে কুমারী ইছামতি
২.
একদিন আমরা মেঘবীজের সংজ্ঞা খুঁজে পাব
বারান্দা চোখে দেখব বেত্রবাগান, নিদ্রা-দুপুর
তপ্ত নগর টাই-শার্ট, বুয়েন্স আয়ার্সের কড়ারোদ
যুবকের পকেটের বৃষ্টিফোঁটা আর রিকশা-জীবন
আচ্ছা বৃষ্টি কি কামুক শরীর? দখল করে শাড়ি!
আমাদের কি একটি সর্দি জীবন থাকা প্রয়োজন?
সমূহস্বপ্নচোখ ভিজবে কি কুইবেক অথবা সাজেকে?
দিওতিমা
মোস্তাক আহমাদ দীন
হিজলতলে দাঁড়িয়েছিলে তুমি
তোমার মুখে পাতার মতো আলো,
যেমন রূপে বৃষ্টি নামে পথে
একটু ওড়ে, একটু বাসে ভালো।
তোমার মুখ আড়াল করে দ্বিধা
যেন জটিল অংকে ফেঁসে আছ,
রেলগুমটি, একটুখানি ছায়া—
আড়ালটুকু নিয়েছ ভালোবেসে।
তবু হঠাৎ ঝড়-ঝাপটা এলে
উড়বে জানি খড়ের রূপে প্রিমা
তোমায় পাব আমার মনোভূমে
আড়ালপ্রিয় আমার দিওতিমা।
তারপর আর বর্ষা আসেনা
আদিত্য শাহীন
তারপর আর বর্ষা আসেনা, শুনি মেঘ আসে
বৃষ্টির মতো কিছু একটা ঝরে ঋতুঘরের তুমুল তাগিদে
কিন্তু বর্ষা আসে না, নতুন পানিতে তীব্র লাফায় না
তিতপুটি মলা ডানকানার ঝাঁক, চারো বসানো
সাদা-কালো দুপুরে নড়ে ওঠে না যৌবনের পাটক্ষেত
বর্ষা ঠিকই আসে এদিকে ওদিকে ছিটিয়ে যায় মেঘের থু থু
মাটির চাপা ঘাম নিয়ে গোপন মাথাব্যথা জমে ওঠে
পৃথিবীর সব অনুর্বর মাঠে, দৌড়ে ঘরে ওঠে দিকহারা ছাগল
বর্ষা মানে আনকো পানিতে হারিয় যাওয়া দুল
বর্ষা এখন মেঘের মতোই কালচে ছাদের জল
বর্ষা মানে ভুল।
আটলান্টায় বৃষ্টি
মনিজা রহমান
আমি লিখতে চেয়েছিলাম
জর্জিয়া সফরের দিনলিপি। প্রতিদিন।
অ্যাকুরিয়ামের নীল জল
সিভিল রাইটস মিউজিয়ামের মুখর দেয়াল,
অলিম্পিক স্টেডিয়ামের রোদ-ছায়া।
চুপ-শহরের কাছে পাতা-বাতাসে বসেছিলাম
বাড়ির পেছনে,
উদ্বাহু গাছের ডালে ডালে মেঘের ছোঁয়া-ছুয়ি।
হঠাৎ বৃষ্টি এল।
আনচান বৃষ্টির ভেতরে দূরে গাড়ি নয়, যেন ছুটে চলেছে হাইওয়ে।
মনে হল, দূরত্ব আসলে মানচিত্রে থাকে, স্মৃতিতে নয়।
বৃষ্টির ফোঁটায় ভেসে উঠল টিনের চাল,
কলংকহীন কচুর পাতা, কাদামাটির উঠোন,
জানালায় নিরবে বসে থাকা একাকী বিকেল।
ভ্রমণের সবচেয়ে গভীর স্মৃতি চোখের ভেতরে থাকে না
কোনো অ্যালবামেও নয়।
কখনো কখনো এক পশলা বৃষ্টিই
হাজার মাইল দূরের দেশকে চুপচাপ
ফিরিয়ে আনে মাগরিবের ওয়াক্তের মত।
অমীমাংসিত বর্ষা
লোপা মমতাজ
এই মধ্যরাতে তোমার বুকের ভাঁজে হাত রাখতে গিয়ে
হঠাৎ বৃষ্টির মতো কার মুখ ভেসে ওঠে মনে!
তখন ভরা বর্ষা। নদী, ভাঙা মেঘ আর পাহাড়ি স্রোতের
ভিতর হয়তো তলিয়ে যাচ্ছিলাম আমি। এক বিস্মৃত
প্রেমিক আমাকে তুলে এনেছিল ডুবে যাওয়া জল থেকে।
ভয়ে কাঁপছিলাম। সে বুকে চেপে ভয়ের কাঁটাগুলো
একে একে খুলে দিচ্ছিল। ভেজা শরীরের সমস্ত কাঁপুনি
আমি তার ঠোঁটে রেখে আসছিলাম।
তার শরীর থেকে ভেসে আসত বৃষ্টি, নদী, পাহাড় আর বুনো ঘাসের গন্ধ!
তারপর একদিন নগরের বৃষ্টির ভিড়ে সে মিলিয়ে গেল।
ঠিকানা নেই। ফোন নম্বরও বন্ধ। কত বর্ষা পেরিয়ে গেছে।
তবু সেই উষ্ণতা এখনও নিভে না।
কিছু বিস্ময়, কিছু প্রশ্ন এখনও অমীমাংসিত...
সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন