https://www.prothomalony.com/

12745

literature

সাহিত্য

উত্তরের সাহিত‍্য

প্রকাশ: ১৬ মার্চ ২০২৫ ০২:২৬


পেন্সিলে আঁকা মুখ

জোবায়ের মিলন 

 

হুট করে একটা রিক্সা এসে পায়ের ওপর প্রায় চড়ে গেল! আমি সরে দাঁড়িয়ে কিছু বলার আগেই অর্পা লাফ দিয়ে নামল রিক্সা থেকে। ভাড়া মিটিয়ে, চিলের মতো ছোঁ মেরে আমার হাতটা তার হাতের তালুতে ভরে নিল। সোজা হাঁটা দিল স্বড়কদ্বীপের দিকে। না-করার অবকাশ পেলাম না।

অর্পা যখন থামল, হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে নিজেকে নিরাপদ করার আগেই তার জেরা শুরু হলো-এতক্ষণ কোথায় ছিলাম, কেন ফোন ধরিনি, ননস্টপ প্রশ্ন। বাপরে! কোনটা রেখে কোনটার উত্তর দিব; তার চেয়ে চুপ করেই রইলাম।  

 

আমার ভীরু চোখ অর্পার চোখের দিকে। রাগে লেদমেশিনের মতো গরগর করে সে পাল্টা রাগ দেখার আশায় হতাশ হয়ে চেঁচিয়ে উঠল 'চেয়ে থাকিস কেন এমন ফ্যালফ্যাল করে! জানিস না তুই এভাবে চেয়ে থাকলে আমার রাগ পড়ে যায়।'

মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ সূচক ইঙ্গিত করলাম। সে দাপিয়ে হাঁটা শুরু করল আমার হাতটা মুক্তি না দিয়েই। বলল, 'আয়।'

'কোথায়?' 

'বললাম না আয়', অর্পা বলল।

আমি সুবোধ বালকের মতো ছুটলাম তার সঙ্গে। পাবলিক লাইব্রেরির ক্যান্টিনে এসে বসলাম মুখোমুখি। একটা টেবিল চরের মতো মাঝখানে সজাগ। দুইটা কিমাপুরি, দুইটা আলুর চপ, দুইটা চিকেন সসেসঅর্ডার করল সে 'দ্রুত চাই কিন্তু', বলে। ক্যান্টিন বালক হারিস কয়েক টেবিল দূর থেকে উত্তর দিল, 'ঠিক আছে আপ্পা, দ্রুতই হবে।'

আমি বসে রইলাম অপেক্ষায়, পরের ধাক্কায় কী আসছে দেখার জন্য। 'থ্যাংকস গড', বাঘিনী আর হুংকার ছাড়লনা। বেলাটা ভালোই কাটল, বলা যায়।

অপরাজেয় বাংলা, ব্যবসায় অনুষদ, পুষ্টিবিজ্ঞান ভবন হয়ে সময় গড়ালে অর্পার মনে হলো তার আজ বাসায় ফিরতে হবে একটু আগে। আমি তাকে বাসে উঠিয়ে দিলাম এই শর্ত মেনে যে, রাত আটটার মধ্যে বাসায় ফিরব, খাওয়া-দাওয়া সারব, তাকে ফোন দিব রাত দশটার পর; কোনোটির ব্যত্যয় ঘটলে কথা বন্ধ তিন দিন।

সন্ধ্যায় টিউশনি শেষ করে যথা নির্দেশ মতো বাসায় পৌঁছে ফোন করি। লাইনটা কেটে দিয়ে অর্পা ব্যাক করে। খুশির ঢেকুর গিলে ধন্যবাদ জানায় আমাকে। আমি স্বাগত বলে তার ছোবল থেকে বাঁচি। ছাত্রের বাসায় কী নাস্তা করলাম, ফিরলাম রিক্সায় না বাসে, গানের ক্লাসের আরকত দিন আছে...কথা চলতে থাকে। রাত ধাবিত হয় রাতের আরও গভীরে।

কার্তিকের পোয়াতি চাঁদ রাতের অন্ধকার ছাপিয়ে কোদালি আকাশটায় ঘুরে বেড়ায় মহাজাগতিক নিয়মে। জানালার পর্দা পেরিয়ে জ্যোাৎস্নার ছাঁট পড়ে বিছানায়। কথা চলে; আমার কথা, অর্পার কথা। আমি ঢুলুঢুলু চোখে তাকিয়ে থাকি। সাত রাজার গল্প বলি, তেরো নদীর কিচ্ছা বলি, মীরাক্কেলের মীরের আর 'হা-শো'র রনির কথা বলি, অর্পা খিলখিল করে হাসে। আমি দেখি একটা সাদা বুনো হাঁস তই-তই করে বিশাল জলাশয়ে সাঁতার কাটছে, পাখা ঝাড়ছে, ছোট ছোট ঢেউ তুলে ভাসছে। আহ কী প্রাণবন্ত সে ভাসান। মনে হয়, অনন্তকাল যদি অর্পা এভাবে আনন্দে ভেসে থাকত। আমিও এ-প্রান্ত থেকে অর্পার হাসি আগলে রাখি অনেকদূর। ও-প্রান্ত থেকে কোনো শব্দ না আসলে বুঝি, সে ঘুমিয়ে পড়েছে। লাইনটা কাটি। আমিও ঘুমিয়ে পড়ি, না হয় রাতটা কেটে যায় সুনীলের নীরার সঙ্গে, জীবনানন্দের বনলতার সঙ্গে, না-হয় শঙ্খ ঘোষ অথবা কবির সুমনের 'প্রথমত আমি তোমাকে চাই, দ্বিতীয়ত আমি তোমাকে চাই, শেষ পর্যন্ত আমি তোমাকে চাই' অশেষ সুরের সঙ্গে।

 

বেলা একটায় ইফতেখার স্যারের ল্যাকচার শেষ করে রাকিবের টং-দোকানে আড্ডায় মশগুল প্রশান্ত, কমল, তারানা, ইভানন, রেইন, আমি। কানে আসে একটা মৃদু স্বর, 'এই মৃদুল...'- বুঝে যাই অর্পার স্বর। রাস্তার ওপার থেকে ডাকছে। তাকাতেই ইশারা করে, 'এখানে আয় জলদি।'

উল্টো ডাক দিই, 'তুই আয়।'

'না, কাজ আছে, আয়।'

অর্পা এমনই। যা করে, করেই। যা বলে, বলেই। আমরা কেউ তাকে টলাতে যাই না। আমি তো সে পথ মারাই-ই না। অর্ধেক চা রেখে রাস্তা পার হই। তার হাতে এক ঝুড়ি ছোট ছোট বক্স। মুখটা রক্তিম। ফর্সা হাতের নীল শিরাগুলো দেখা যায়। 'চল বকুল তলায়', অর্পা বলে। 'কেন?' আমি জানতে চাই। 'আমি বলছি, তাই।'

'যা হুকুম।' বলে তার সঙ্গে পথ ধরি। আমরা পাশাপাশি।সে আমার দিকে তাকায়। আমি তার দিকে। আমরা টুংটাং করে হাঁটি। বকুল তলায় ইটের বেদিতে পা ঝুলিয়ে বসে একে একে সব কয়টা বক্স খুলে মুখের সামনে খাবার ভরা হাত উচিয়ে বলে, 'নে ঝটপট খেয়ে নে।'

'খেয়ে নে মানে!'

'নে মানে নে। ঘুম থেকে উঠে কিছু না খেয়েই ক্লাসে এসেছিস জানি। নে, মুখে নে'-হরহর করে তার পেটের কথা ঝরতে থাকে। আমি চেয়ে থাকি তার মুখটার দিকে।

'হা কর।' হা করি।

কোনো বাধায় রক্ষা হয় না। ডিম-বন, ভুনা গোস্ত, পুডিং সব মুখে পুরতে হয়। 'না' বলা মানেই হলো লঙ্কাকাণ্ড বেঁধে যাওয়া। তারপর বাসার কথা বলে কোনো গলিতে ঘাপটি মেরে থাকা। শত ফোনেও রিসিভ না করা। সাত দিন পর রাগ নামলে গলা চেপে ধরতে তেড়ে আসা, 'তুই রাগ করস ক্যান, না করস ক্যান, আমাকে রাগাস ক্যান, ইত্যাদি ইত্যাদি।'

পেট ভরে গলা পর্যন্ত এলেও ওপরওয়ালার নাম নিতে নিতে গিলতে থাকি। খাওয়ার পরে ব্যাগ থেকে টিস্যু বের করে নিজের হাতটা মুছে আমার হাতটাও মুছে দেয় অর্পা। পাশ থেকে বকুল তলার চেনা পাগলা হারু-মামা পিটপিট করে হেসে বলে, 'মায়া গো মায়া।'

অর্পা আমার দিকে আড়চোখে তাকায়। আমি লজ্জাবোধ করি। প্রকাশ করি না। এরপর ছবির হাট, মলচত্বর, তিন নেতার মাজার, পলাশীর মোড়...সারা দিন টইটই। তার কথার বাক্স খালি হয় না। যেন স্মৃতির সিন্ধুক খুলে বসা। অবশ্য অর্পা ইদানীং আগের কথা, পরের কথা, হঠাৎ হঠাৎ গুলিয়ে ফেলে সব। এক কথার মধ্যে আরেক কথা, আরেক কথার মধ্যে আরেক কথা; সে নিজেও বোঝেনা। অকারণে মন খারাপ করে, জেদ দেখায়, অভিমান কথায় কথায়। মেজাজকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না।

 

আমি নিরুত্তর শুনি। মাঝে মাঝে এটা-ওটা বলি, মাঝেমাঝে বলি না, তাকিয়ে থাকি কেবল। কিছু বলতে পারি না।ভিতরের স্বচ্ছ আকাশটা কালো ধোঁয়ায় ছেয়ে আসে।আড়ালে চোখ মুছি, না হয় কথার বাঁক ঘুরিয়ে অন্য কথা বলি। চেষ্টা করি তার মন খুশি রাখার। কিন্তু নিজেকে তুখোর প্রতারক মনে হয়। মিথ্যুক মনে হয়। অপরাধের চিরুনি আঁচড় কেটে আহত করে অনবরত।

কী অদ্ভুত! একজন মানুষকে মিথ্যা বলে বলে আমরা সত্য থেকে দূরে রাখছি। জানার অধিকার থেকে নীরবে বঞ্চিত করছি। বলতে চেয়েও আমরা বলতে পারছি না।আমি ভাবি, একি আমার, আমাদের ভালোবাসা, আবেগ, নাকি নিজেকেই বাঁচানোর জন্য পালিয়ে বেড়ানো? বাস্তবতার যে রূঢ় রূপ আছে সে রূপ আমরা দেখতে চাই না বলেই কি আমরা লুকিয়ে ফেলি পরম সত্যভাষ্যকে?  আমি কী করব, আমরা কী করব, কী করা উচিত বুঝি না?

শরতের শুভ্র মেঘের মতো গায়ের রং অর্পার। বীণার তারের মতো মুখ। সূচালো নাক, কাজলের লেশমাত্র নেই তবু কাজলটানা ভাসা চোখ, পেঁয়াজ পাতার মতো যুগলঠোঁট, খাড়া কান। কোমল। দীর্ঘ।  জোড়া ভ্রু আর গালের টোল অপ্সরীর মতো আঁকা। কখনো কখনো তারচেয়েওঅধিক বলে ভ্রম করি। আমার ভালো লাগে, এইসব ভ্রম করতে, কল্পনা করতে আর আচ্ছন্ন হয়ে থাকতে।

ছিপছিপে নদীর মতো টলটলে যার বহতা, এমন সুন্দর মানুষটি পৃথিবীতে আর এক বছরও থাকবে না! এ কি ভাবা যায়? কল্পনা করা যায় কি কোনোভাবেই তাকে আর বাঁচিয়ে রাখা যাবে না এই পৃথিবীর আলোতে? 

ঝুপ করে আষাঢ়ীয় বৃষ্টি নামে। আমি শহীদ মিনার থেকে গণিত ভবনের দিকে ছুটতে চাইলে আমার একটা হাত টুপ করে ধরে অর্পার একটা হাত। বলে, 'চল্ আমরা বৃষ্টিতে ভিজি। ভিজবি?'

'না, এই সময়ের বৃষ্টি ভালো না। তোর শরীর খারাপ করবে।'

'কে বলছে শরীর খারাপ করবে? করবে না। করলে তোরও করবে। না-হয় দুজনেই বাসায় পড়ে থাকব দুদিন।'

মাথার ওপর বৃষ্টি ঝরতে থাকে। আমি ভিজি, অর্পা ভেজে। আমরা কেউ কোনো কথা বলি না। চারদিক ঘন কুয়াশার মতো ঝাপসা হয়ে আসে। অর্পা আমাকে জড়িয়ে ধরে রাখে অদ্বিতীয়ের মতে। বৃষ্টির ধারা আরও বাড়ে। ভেতরে কাঁপন ওঠে, টের পাই অর্পাও কাঁপছে। তবু আমি ফিরবার কথা বলি না। বলি না, চল। কী লাভ বলে -এই চরাচরে।

ভেলোর থেকে অর্পাকে নিয়ে শেষবার ফিরে আসার আগে তার বাবা প্রখ্যাত সেতার বাদক অলোক রয়কে বিখ্যাত অনকোলজিস্ট ডা. জয়শ্রী মণ্ডল বলেছিলেন, 'অনেক চেষ্টা করলাম মিস্টার রয়। দুঃখিত, তেমন কিছুই করতে পারলাম না। খুব দেরি করে এসেছেন, এমন সময়ে এসেছেন, যখন কোলন-ক্যান্সারটি সব ধাপ অতিক্রম করে মেয়েটির সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়েছে। তবে অলৌকিক সত্য যে, মেয়েটির যতটা দুর্বল হবার কথা ছিল ততটা সে নয়। তাই বলে নিশ্চিন্ত থাকার কিছু নেই; সময় এক বছরেরও কম। তাকে তার ইচ্ছেমত বাঁচতে দিন।'

কঠিন পেশাদার হয়েও ডা. জয়শ্রী সেদিন কথাগুলো অর্পাকে সরাসরি বলতে পারেননি। অর্পার বাবাও পারেননি; আমিও পারি না অর্পাকে বলতে, 'তুমি আছো আর মাত্র কয়েকটা মাস।'

 

বৃষ্টি কমে আসে। ছোট্ট একটা মেয়ে একজোড়া ফুল হাতে শহীদ মিনারের পাদদেশে কখন আমার আর অর্পার মাঝে এসে দাঁড়ায় বুঝতে পারি না। মেয়েটি মিষ্টি কণ্ঠে বলে, 'মামা, ফুল নিবেন না?' 

আমি তার তুলতুলে গালদুটি ছুঁয়ে জিজ্ঞেস করি, 'কী নামগো তোমার?'

মেয়েটি ফিক করে হসে বলে, 'আমার নাম অর্পা। ক্যান, জানেন না বুঝি! রোজই তো আপনি আমার কাছ থিকা দুইটা জারবেরা ফুল কিনেন আর নাম জিগান। নাম মনে থাকে না আপনের!'
দূর থেকে কে যেন একজন ডাক দেয়, 'মৃদুল...ফিরে আয়, শরীর খারাপ করবে।'

 

 

সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে পথপ্রদর্শক হোক একুশের বইমেলা 

মোঃ আইনাল হক 

 

বইমেলা সম্পর্কে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, "বইয়ের প্রতি ভালোবাসাই সত্যিকারের সভ্যতার পরিচয়। বইমেলা হলো সেই ভালোবাসার মিলনক্ষেত্র।" এ প্রসঙ্গে স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশের প্রখ্যাত বুদ্ধিজীবী আহমেদ ছফার একটি বিখ্যাত উক্তি আছে, "বইমেলা শুধু বই কেনার জায়গা নয় বরং এটি একটি জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষতার প্রতীক।" 

একটি জাতির সমৃদ্ধির জন্য, মেধা ও মননের বিকাশের জন্য সাহিত্য, বিজ্ঞান ও ধর্ম চর্চার বিকল্প কোথায়? জাতি বড় হয় কিসে? জাতি বড় হয় জ্ঞান, নৈতিকতা, ঐক্য, পরিশ্রম এবং আত্মমর্যাদার মাধ্যমে। বইমেলা একটি জাতির ঐতিহ্যকে প্রমোট করে। একবিংশ শতাব্দীর পরিক্রমায় আধুনিকতার নামে ডিভাইস প্রবণতা একটু একটু করে আমাদের এক অজানা জগতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। পরিসংখ্যান থেকে দেখা যাচ্ছে যে, দেশের মোট জনসংখ্যা প্রায় ১৭কোটি। যার ৯৮ শতাংশ পরিবারে কমপক্ষে একটি মোবাইল ফোন আছে। স্মার্টফোন ব্যবহারের হার আরও উল্লেখযোগ্য; দেশের মোট জনসংখ্যার ৫৬ শতাংশ স্মার্টফোন ব্যবহার করেন। ডিভাইসের উপকারী দিক বিবেচনা করে হলেও বলতে চাই এর অপকারী দিকই বেশি। আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশের উঠতি তরুণদের মাঝে এর অপব্যবহার এতোটাই মাথা চাঁড়া দিয়ে উঠেছে যে রাস্তাঘাট,  টেলিভিশন এবং খবরের কাগজে চোখ রাখলে গভীর আতঙ্কে শঙ্কিত হতে হয়। অথচ গত শতাব্দীর দিকে তাকালে দেখা যায় শিক্ষিত সমাজ বিনোদন বলতে গল্প, উপন্যাস, কবিতা, সাইন্স ফিকশান, ধর্মতত্ত্ব, ভ্রমণ কাহিনীর বইকে বুঝতেন। বাস, ট্রেন, লঞ্চ, স্টিমারে বই হাতে অবসর কাটানোর দৃশ্য মনকে প্রশমিত করে; প্রশান্তির বার্তায় ভরিয়ে দেয়। সে সব দিন এখন সোনালী অতীত।  

যে কোনো দেশে বইকে পাঠকের হাতে তুলে দিতে মূল ভূমিকা পালন করে বইমেলা। বইমেলা পাঠক ও লেখকের মাঝে সেতুবন্ধন হিসেবে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। মুক্তচিন্তার খোলা ময়দান হিসেবে বইমেলা যে কত বড় অবদান রাখে তা অনুধাবন করতে হবে।

আর জীবন দর্শনের মূর্ত প্রতীক হিসেবে মানুষের জ্ঞান গরিমাকে সমৃদ্ধ করতে বইয়ের বিকল্প কোথায়? কিন্তু অতি পরিতাপের সাথে বলতে হচ্ছে যে, জ্ঞাত কিংবা অজ্ঞাতসারে জ্ঞানের প্রতীক বইকে আমাদের মেজর প্রায়োরিটি দিতে ব্যর্থ হচ্ছি; তা একাডেমি হোক কিংবা  নন একাডেমিক। ফলশ্রুতিতে জনগণের উপর বেশ কিছু নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে; যা ব্যক্তিগত, মানসিক ও সামাজিক জীবনে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। নিয়মিত বিদ্যাচর্চার অভাবে ব্যক্তির মধ্যে কতিপয় কুফল দেখা দেয়। যেমন- জ্ঞান ও চিন্তা ধারার সীমাবদ্ধতা, মনন ও সৃজনশীলতার অভাব, ভাষাজ্ঞান ও যোগাযোগ দক্ষতার হ্রাস, একাগ্রতা ও মনোযোগ বিঘ্ন, যুক্তি ও বিশ্লেষণ ক্ষমতা হ্রাস ইত্যাদি। সংক্ষেপে বলা যায় যে, বই পড়া না হলে মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক, সামাজিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। 

বই-ই পারে একজন মানুষকে যথার্থ জ্ঞানী হিসাবে তৈরি করতে আর জ্ঞান মানুষকে সবসময় সমৃদ্ধ করে। বইমেলায় নানান ধরনের বই পাঠের মাধ্যমে পাঠকের সৃজনশীল চিন্তা ও কল্পনাশক্তি উন্নত হয়, যা গবেষণা ও নতুন উদ্ভাবনের পথ সুগম করে। এই মিলনক্ষেত্রে লেখক, পাঠক ও গবেষকদের মধ্যে চিন্তার আদান-প্রদান হয় যা বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষে সহায়ক।

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই; শুধু ঢাকা, পাবনা কিংবা চট্রগ্রাম নয়, জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে আলোকিত মানুষ গড়তে প্রতিটি বিভাগীয় শহর এমনকি সম্ভব হলে জেলা শহরে একমাস ব্যাপি বইমেলার আয়োজন করুন। গণবুদ্ধিজীবী আহমেদ ছফার সাথে তাল মিলিয়ে একটি জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষতার প্রতীক বইমেলার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে জাতির প্রকৃত মঙ্গল কামনায় সকলকে এগিয়ে আসতে হবে এই আহবান রেখে শেষ করছি।

 

 

সঞ্জি রাম, দীপক খাজুরিয়া-হিট্টুদের মনে রাখতেই হয়

 

এইচ বি রিতা

 

দিনটা শুরু হয়েছিল খুব সাধারণভাবেই। দুপুরের ঝকঝকা রোদের আলোয় খেলছিল আট বছরের আসিফা বানু। চারণরত ঘোড়াগুলোর দেখাশোনা করছিল। পাহাড়ের পাখিরা ডেকে বলেছিল, 'আজকের দিনটা অন্য রকম হবে!' সত্যিই, দিনটা অন্য রকমই হলো— বনের ধার ঘেঁষে লুকিয়ে ছিল শয়তানের দল, তাদের হাতে ছিল ক্ষমতা আর নিষ্ঠুরতার লাইসেন্স। তারপর সব হারিয়ে গেল। বিকেলে  ঘোড়াগুলো ফিরে এলেও ফিরে আসেনি আসিফা বানু। 

সপ্তাহ ভর মন্দিরে আটকে থাকা শিশুটির সরু যোনিপথে চলল বর্বরতা! অপহরণ, গণধর্ষণ ও হত্যার পরিকল্পনাকারী সঞ্জি রাম, দীপক খাজুরিয়া-সমর্থন ও গণধর্ষণে চার পুলিশ; প্রমাণ নষ্ট করার চেষ্টা; অবশেষে ধর্ষকের মুক্তি দাবিতে কট্টর ডানপন্থী গোষ্ঠীগুলো। 

 

অন্য এক ভোরবেলা, আরেকটি গ্রামে আট বছরের ঘুমন্ত আছিয়া হারিয়ে গেল বর্বরতার শেষ সীমানায়। হিট্টু শেখ-কাঁপিয়ে দিল শিশুটির শরীর, দেশ বিদেশ জুড়ে প্রতিবাদ-কবিদের কলমে ক্ষোভ; ফাঁসি চাই ফাঁসি। অতিপ্রগতিশীলরা যুক্তির দেয়াল ডিঙিয়ে জন্ম দিল মানবতার নতুন সংজ্ঞা; ধর্ষকেরও বাঁচার অধিকার আছে। 

 

একজনের শরীর পড়েছিল হাসপাতালের শীতল বেডে, জীবনসায়াহ্নে মেশিনের দয়া নিয়ে; অন্যজনের ক্ষতবিক্ষত দেহ পাওয়া গিয়েছিল জঙ্গলে। একটিকে মেশিনও বাঁচাতে পারেনি, অন্যজনের আর্তচিৎকার পাহাড়ের বাতাসে হারিয়ে গিয়েছিল।

কেবল আট বছর বয়স, সারা দুনিয়ার প্রতি কৌতূহল আর আনন্দে ভরা তাদের চোখ; দানবদের রাষ্ট্রে শিশুরা তো কেবল শিকার—ধর্ষণ তাদের জন্য বিলাসিতা।

 

বিচার এলো, দানবদের জন্য, শিকারের জন্য নয়। মানুষ আমরা- নাম স্মরণ করি। মোমবাতি জ্বালিয়ে কিছুক্ষণ শোক পালন করি। তারপর সিরিয়ালের পরবর্তী এপিসোড দেখতে বসে থাকি। 

আসিয়া বানু আর আছিফাদের গল্প কেউ ভুলে যায়না। শুধু কিন্তু কেউ মনে রাখেনা, কেন তারা হারিয়ে যায়।

সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন