https://www.prothomalony.com/

12698

literature

সাহিত্য

উত্তরের সাহিত‍্য

প্রকাশ: ১১ মার্চ ২০২৫ ০৩:২৫

দাঁড়ানোর মুদ্রা 

হরিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়

 

গাছ মনে করলেই গাছ

তুমি মাছও হতে পারো

নাচ হলেও বাঁকা চোখের চাহনিতে  

তোমার কিছু আসবে যাবে না

 

আসলে সবকিছুর মূলে 

তোমার দাঁড়ানোর মুদ্রা 

 

তুমি হাঁটবে

হাওয়ায় হাওয়ায় শুধুই হেঁটে যাবে 

নাকি উত্তরের বরফ বরফ বারান্দায় 

উঁকি মেরে বলবে —

হাঁটাই যায় তবে 

কেউ দাঁড়িয়ে না থাকলে

যেকোনো হাঁটাই অর্থহীন।

 

 

নাগরিকপত্র

সাকিব জামাল

 

হে রাষ্ট্র আমার, তোমার চোখে তাকিয়ে- 

শব্দহীন কত কথা বলে যাই আমি! 

তুমি বুঝে নিও বাতাসের কম্পন। 

বুঝে নিও ডপলার ইফেক্ট। 

যদি তুমি চাও, আমার চুপকথারা 

মুখর হবে স্বাধীনতার গানে 

ভালোবাসার রাজপথে! 

পাশাপাশি হেঁটে যাব আমরা বহুদূর 

সুশাসনের কাঙ্ক্ষিত সড়কে!

 

 

ডিসকোর্সের আগে 

সুবাইতা প্রিয়তি 

 

দান্তের দাহ করা দাঁত থেকে নরকের যে শাখানদী

উধাও করে দিচ্ছে প্রাচীন কবর,

সেখান থেকেও জেগে উঠছে একে একে নাভি।

প্রত্যেকে মুখস্থ শব্দ লিখতে উৎসুক তবে 

শ্বাপদের মুখে গড়িয়ে চলেছে, 

এবং ঘটনাপ্রবাহের অভিলম্বে।

ধীর হয়ে যাচ্ছে আওয়াজের বেগ, শুধু যুদ্ধে বুদ্ধ!

 

কোটি শব্দ গুণোত্তর সম্ভাবনা নিয়ে আমার ভাবনায় 

টেক্সটের সংগ্রাম, যেনবা ডিসকোর্সের আগে।

 

 

রাষ্ট্র তোমাকে বলছি 

এম এ ওয়াজেদ 

 

মাগুরার ধর্ষিতা শিশুটি আমার মেয়ে 

প্রস্ফুটিত গোলাপের কুঁড়ি এক 

হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে শুয়ে কাতরায়

 

রাস্তার কুকুরেরা নির্দিষ্ট মৌসুম ছাড়া সহবাস করেনা

অবশ্যই তার প্রেমিকা যৌবনপ্রাপ্ত

মধুর মিলনে তারা যৌনকাম পূরণ করে 

ভাষাহীন প্রাণীরাও সঙ্গমে তৃপ্ত হয় 

কী অবাক-পৃথিবীর কোনো গবেষণায় প্রাণীরা 

শিশু প্রাণীর সাথে মিলিত হয়নি 

 

হিটু শেখ-মানে নি ধর্মের নীতি, নীতিবিদ্যার 

সরল পাঠ; তার যৌবন ধ্বংস করেছে ক্ষুধার্ত 

নষ্টালজিয়ার বেয়াড়া লাম্পট্য 

রাষ্ট্র তোমাকে বলছি-

আত্নপক্ষ সমর্থনের সুযোগ নেই 

প্রমাণিত ঘটনায় ফাঁসির রশি তার প্রাপ্য 

অতএব হে রাষ্ট্র তুমি কঠোর হও। 

 

 

অসুখের কবিতা 

শম্পা ঘোষ 

 

নিঃসঙ্গ পথে উড়ছে ছায়ার ভাষারা

চাঁদ ভেসে আছে আলিঙ্গনে আর উদ্দীপনে;

দেওয়াল ফাটলে একটা চারা গাছ 

অনেকটা প্রত্যক্ষ জীবনদর্শীর মত,

অজান্তে স্নিগ্ধতা গতিময় হয় 

অকারণ অতিশয‍্য ভেবে হয়তো

পেরিয়ে যেতে পারি বালিয়াড়ি,

ভালোবাসায় পোড়ার দগ্ধতা নিয়ে দগদগে ঘা-

সব ঘায়ে মলম লাগাতে নেই

গুমোট ভেঙ্গে ঝরে পড়তে দাও কান্নাকে,

হাত বাড়ালে অনেকগুলো ছবি 

কিন্তু আমি খুঁজি অসুখের কবিতা।

 

 

মগজে বারুদের গন্ধ 

রফিকুল নাজিম 

 

তোমার মগজে বারুদের গন্ধ! তোমার বোধের সড়কে 

চলছে মৃত্যুর হোলিপাঠ

সযতনে তোমার আঙুল রেখেছ রাইফেলের ট্রিগারে

গোলাগুলির শব্দ শুনে পাখিরা উড়ে যাচ্ছে 

অন্য পৃথিবীতে,  টর্পেডোর উষ্ণ স্পর্শে তছনছ হয়ে যাচ্ছে ফুলের বাগান, কামানের গোলায় ভস্মীভূত হচ্ছে কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির বই-

ধ্বংসস্তূপের নিচে মানুষের মুখ ও মন থেঁতলে যাচ্ছে। 

তুমি গুঁড়িয়ে দিচ্ছো শিক্ষালয়, উপাসনালয়, সিনেমা হল, 

নাটকের মঞ্চ, যাদুঘর, কফিশপ, কবিতা পড়ার নিশুতিরাত।

মিসাইলের দুর্ধর্ষ চুমোতে ভূ-লুন্ঠিত হচ্ছে মানবিক সভ্যতা

প্রিন্টেড গ্লোব থেকেও পৃথিবীকে মুছে দিতে তুমি উদ্যত

তুমি চতুর্দিকে তাক করে রেখেছো পারমাণবিক অস্ত্র; 

হিরোশিমা ও নাগাসাকির যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা; বিকলাঙ্গ প্রজন্ম!

 

বারুদে পোড়ে গেলে পৃথিবী 

মানুষ, তুমি পালাবে কোথায়?

 

 

সময় কেন্দ্রিক এক সেলাই মেশিন 

সাব্বির আহমাদ 

 

এতো এতো বিবর্ণ রঙিন মুর্হুত করতল ঘেঁষে পড়ে আছে; থকিত এক এবং একাধিক জীবন অতিষ্ঠ হওয়ার যথেষ্ট। ভাইসব সময় এক সেলাই-মেশিন! পাথরীয় এ-ই গতর তুলোধুনা হতে হতে এখন এতই নমনীয় ; দূর হতে এক অবসাদগ্রস্ত হাওয়া আসে রোজ —

তার তোড়ে বাতাসে বাতাসে নড়ে ওঠে স্বশরীরী আতঙ্ক। 

দৃশ্যের অন্তরালে এমন সব দৃশ্য আজকাল দ্যাখে ফ্যালি; মনে হয়, মনে হয় এক হুলোবেড়াল ওতপেতে বসে আছে অদূরে। আর মৃত্যু; সময় কেন্দ্রিক এক সেলাই-মেশিন! 

রক্ষিত এই গতর তুলোধোনা করতে এগিয়ে আসছে 

অনিবার্য এক মূহুর্তের দিকে।

 

 

চিঠি 

পলাশ পোড়েল 

 

হৃদয়ে জমানো এতো রঙিন শব্দমালা 

তোমাকে ছুঁতে যায় .....

সযত্নে তুলে রাখি ভালোবাসার টাপুর টুপুর স্মৃতি 

কিশোরী মন গোপনে তুলে রাখে হলুদ চিঠি ।

 

স্তরে স্তরে সাজানো প্রেমের রূপকথা 

স্মৃতির আয়নায় ভেসে ওঠে তোমার মুখ 

এখনও চিঠি আসে অপেক্ষায় অবুঝ মন 

ভালোবাসার গদ্য কথা ; ছুঁয়ে থাকে সারাক্ষণ ।

 

 

 

 

সুশিক্ষার অভাব 

গোলাম সরোয়ার 

 

সকালে বাজারে গেলাম। কিছু কেনাকাটা বাকি ছিল। যে ই কিছু সবজি হাতে নিলাম, হঠাৎ দেখি একটা ছোট বাচ্চা, আমাকে এসে বলল, 'স্যার আমাকে কিছু খেতে দেবেন? আমি সকাল থেকে কিছু খাইনি, খুব খিদে পেয়েছে।' 

তার দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইলাম। বয়স আনুমানিক বছর দশেক হবে। আমাকে তাকিয়ে থাকতে দেখেই সে বলল, 'এমনি খাবো না আপনার বাজারের ব্যাগটা আমি আপনার বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে আসবো।' 

 

আমি তখন ওকে দুটো বিস্কুটের প্যাকেট কিনে দিলাম। খুব খুশি হয়ে সে একটা প্যাকেটের সবটুকু খেয়ে নিল, আর আরেকটা বগলতলে রেখে দিল।

বললাম, 'ওটা খাবে না?' 

'বাড়ি নিয়ে যাব, মায়ের জন্য', বলেই ও আমার বাজারের ব্যাগটা হাতে তুলে নিল। বারণ করার পরেও শুনলো না, আমার সাথে হেঁটে বাজারের ব্যাগটা নিয়ে এলো বাড়ির সামনে। 

'চলি স্যার....।' 

পকেট থেকে একশ টাকার একটা নোট বের করে ছেলেটাকে দিতে চাইলাম। কিন্তু সে নিল না। বলল, 'টাকা কেন দিচ্ছেন স‍্যার? আপনি খাইয়েছেন সেই জন্য আমি বাজারের ব্যাগটা আপনার বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে গেলাম।' 

বললাম, 'এটা নাও কাজে লাগবে।' 

'না স‍্যার! আমার মা বলেছে পরিশ্রম না করে যদি কোন জিনিস কারো কাছ থেকে নেই তাহলে সেটা ভিক্ষা, দয়া, পাপ। আমি এ টাকা নিতে পারব না।' 

বলেই সে বের হয়ে গেল।

আমি ভাবতে থাকলাম, এত ছোট্ট বয়সে ছেলেটা চিন্তার কত গভীরে ঢুকে গিয়েছে! 

 

ঘরে ঢুকলাম। দেখলাম আমার স্ত্রী ছেলের উপর চিৎকার করছে। কারণ জিজ্ঞাসা করতেই বলল, ছেলের এই বয়সে নাকি বাইক চাই, তাই মায়ের সঙ্গে তর্ক করছে।

ছেলের বয়স পনেরো। আমি ছেলেকে বললাম, 'দেখ বাবা তুই যখন কলেজে উঠবি, তখন তোকে বাইক কিনে দেবো কথা দিলাম। এখন নয়।' 

ছেলে বিরক্তি নিয়ে আমার দিকে তাকালো। বলল, 'না আমার এক্ষুনি চাই, আমাদের এত টাকা সম্পত্তি সবই তো আমার। তাহলে আমাকে দেওয়ার বেলা তোমাদের এত কষ্ট কেন? আগামীকালের মধ্যে আমাকে যদি বাইক কিনে না দাও তাহলে আমি বাড়ি ছেড়ে চলে যাব, আর কোনদিন ফিরে আসব না। না হলে আমি .........................!'

ছেলের মুখে এমন কথা শুনে কিছুটা ভয় পেলাম। রাগও হলো। কিন্তু কিছু বলতে পারলাম না যদি উল্টোপাল্টা কিছু করে ফেলে। তাই ছেলের কথা মতো বাইক কিনে দিলাম। 

 

কিছুদিন পর হঠাৎ থানা থেকে আমার কাছে একটা ফোন কল আসলো। 'আপনার ছেলেকে থানায় নিয়ে আসা হয়েছে আপনি তাড়াতাড়ি চলে আসুন।'

আমি দৌড়ে গেলাম থানায়। জানলাম, ছেলে একজন বয়স্ক মানুষকে ধাক্কা মেরেছে, তিনি খুব আহত হয়েছেন। থানায় কর্মরত পুলিশ আমাকে বললেন, 'ছেলেকে এ বসয়েই হাতে 

বাইরে ধরিয়ে নিয়েছেন। বুঝলাম আপনাদের পয়সা খুব,তবে পয়সার গরম সব জায়গায় দেখানো যায় না। ছেলে কি করেছে লোকটাকে দেখুন। ঠিক করে মানুষ করুন ছেলেকে, এই বয়সে এই অবস্থা।' 

সেদিন নিজেকে খুব ছোট মনে হচ্ছিল,কান্না পাচ্ছিল আমার। তারপর সব মিটমাট করে বাড়ি নিয়ে এলাম ছেলেকে। 

 

আসলে আমাদের একটাই সন্তান, বড় আদরের। ও যখন যেটা চেয়েছে তখন সেটা দিয়েছি, কখনো বারণ করিনি। কিন্তু সেদিন বুঝতে পারলাম, চাওয়া মাত্রই সব চাহিদা মেটানো ঠিক না। তাছাড়া, ইমোশোনাল ব্ল‍্যাকমেইলিং-ভবিষ‍্যতের জন‍্যও ভালো কিছু বহন করবে না। 

সেদিন আমি শুধু পথ শিশুটার কথা ভাবছিলাম! তার কাছে হয়তো দামি পোশাক নেই, পর্যাপ্ত ভালো খাবার, ঘরবাড়ি কিছুই নেই। কিন্তু তার কাছে যে দামি জিনিসটা আছে, সেটা হলো-সুশিক্ষা; যেটা আমি আমার ছেলেকে দিতে পারেনি।

সেই অর্থে ওর মা আমার থেকেও বড়ো সম্পদের মালিক। 

 

আসলে আমরা অনেক মা-বাবা মনে করি আমাদের সামর্থ আছে তাই বাচ্চা যা চাইবে তাই দেব। বাচ্চাকে কোন কষ্ট পেতে দেব না। আর এই মনোভাবের ফলে সন্তানদের শৃঙ্খলা ও দায়িত্ববোধ শেখানো কঠিন হয়ে পড়ে। সন্তানদের জীবনের বিভিন্ন পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে নিতে শেখাতে পারলে, তাদের মাঝে শৃঙ্খলা, দায়িত্ববোধ এবং কষ্ট সহ্য করার মতো মানসিকতাও গড়ে উঠে। বাচ্চাদের অভাব শেখাতে হয়, কষ্ট শেখাতে হয়, যাতে সে সব পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে নিতে পারে। 

সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন