https://www.prothomalony.com/
12674
opinion
প্রকাশ: ০৬ মার্চ ২০২৫ ০৫:৩৯
'পুরুষ প্রকাশ্যে সিগারেট টানে। নারীরা কেন টানতে পারবে না? পুরুষ সিগারেট টানলে গ্রেফতার হয় না, নারী কেন গ্রেফতার হবে? '-এমন সব প্রশ্নের প্রতিবাদে মুখর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। এই পর্যবেক্ষণগুলো অবশ্যই সমাজে লিঙ্গভিত্তিক দ্বৈতমানদণ্ডের দিকে ইঙ্গিত করে, যেখানে পুরুষদের কিছু আচরণ স্বাভাবিক বা গ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হয়, কিন্তু একই আচরণ নারীদের ক্ষেত্রে নেতিবাচকভাবে দেখা হয়।
ঘটনাটি মার্চের ১ তারিখের। পুলিশ সূত্রমতে, শনিবার সন্ধ্যায় লালমাটিয়া আড়ং এর পাশের গলিতে মাঠের কোনায় একটি চায়ের দোকানে বসে দুই তরুণী চা ও ধূমপান করছিলেন। তখন সেখান দিয়ে যাওয়ার সময় একজন ব্যক্তি তাদের ধূমপান নিয়ে আপত্তি করেন ও দোকান বন্ধ করতে বলেন।
এ নিয়ে ওই ব্যক্তির সঙ্গে দুই তরুণীর কথা কাটাকাটি হয়। এক পর্যায়ে তাদের একজন ওই ব্যক্তির গায়ে চা ছুঁড়েন। যদিও ওই তরুণীরা পুলিশকে জানিয়েছেন যে, ওই ব্যক্তি তাদের অশ্রাব্য ভাষায় গালি দেওয়ার কারণে তারা ক্ষুব্ধ হয়ে চা ছুঁড়েছেন। এরপর ওই ব্যক্তি আরো লোকজন নিয়ে এসে সেখানে জড়ো হতে শুরু করলে দুই তরুণী চলে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু লোকজন তাদের ঘিরে ফেললে ওই ব্যক্তি ও তাঁর সাথে জড়ো হওয়া ব্যক্তিরা দুই তরুণীকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে। পরে খবর পেয়ে পুলিশ সেখানে গিয়ে তাদের উদ্ধার করে মোহাম্মদপুর থানায় নিয়ে যায়। এরপর কয়েক ঘণ্টা ধরে আলোচনা তর্ক বিতর্কের পর দুপক্ষের মধ্যে সমঝোতা হয় বলে দাবি করে পুলিশ। অবশেষে দুই তরুণীকে পরিবারের জিম্মায় ছেড়ে দেয়া হয়।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, বিভিন্ন ভিডিও বার্তায় বলা হচ্ছে, ধুমপান করায় দুই তরুণীকে মারধর করা হয়েছে মব জাস্টিসে। যদিও অনেক খুঁজেও মারধরের এমন কোনো দৃশ্য পাইনি। যদি সত্যিই মারধর করে থাকে, তবে সেটা নিন্দনীয়।
প্রসঙ্গটা ছিল একজন নারী হিসাবে প্রকাশ্যে সিগারেট টানা নিয়ে। আমরা একটা বহু মতবিশ্বাসের সমাজে বাস করি। আমরা সংখ্যাগরিষ্ট একটা মুসলিম দেশে বাস করি, ইউরোপ আমেরিকা নয়। এই সমাজে বহু পুরুষদের বহু অপরাধ আছে। হত্যা, ধর্ষণ, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, পরকীয়া, একাধিক বিবাহ-পুরুষরাই করেন বেশি। তারা রাস্তায় প্রশ্রাব করার মতো নোংরা কাজটাও করেন। তাদের সাথে যদি সবকিছুতে পাল্লা দিতে যাই তবে নারী হিসাবে আমাদেরকেও একাধীক স্বামী রাখতে হবে, ধর্ষক হতে হবে, পরকিয়া তো করছিই, তারপর রাস্তায় প্রশ্রাবও করতে হবে। তা না হলে লিঙ্গ বৈষম্য দূর হবে না, এমনটাই বর্তমান অবস্থা মনে করিয়ে দিচ্ছে।
লিঙ্গভিত্তিক দ্বৈতমানদণ্ডকে আমাদের সমাজে অস্বীকার করার উপায় নেই। পুরুষরা নির্দ্বিধায় খোলা গায়ে থাকতে পারেন, কিন্তু নারীদের ক্ষেত্রে এটি 'অশোভন' বলে বিবেচিত হয়। আচরণের ক্ষেত্রে, পুরুষ রাগ দেখালে তাকে শক্তিশালী মনে করা হয়, কিন্তু নারীদের ক্ষেত্রে সেটি খারাপ মেজাজ হিসেবে ধরা হয়। পেশার ক্ষেত্রে, পুরুষের কর্মজীবন স্বাভাবিক, কিন্তু নারীর ক্ষেত্রে পরিবার ও ক্যারিয়ারের মধ্যে কোনো একটা বেছে নেওয়া নিয়ে চাপ সৃষ্টি হয়। এখন, এই লিঙ্গভিত্তিক মানদণ্ড খণ্ডানো মানেই পুরুষ যা করে, নারীকে হুবহু তাই হবে, এমনটা নয়। নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার অর্থ এই নয় যে, তাকে পুরুষের প্রতিটি অভ্যাস অনুসরণ করতে হবে।
পুরুষ, খালি গায়ে পথে বের হয়, একাধিক স্ত্রী রাখেন, রাস্তায় প্রশ্রাব করেন। এই কাজগুলি আমরা নারী হয়ে করতে পারি না। কেন পারি না?
কারণ প্রতিটি কাজের সামাজিক, শারীরিক ও নৈতিক প্রভাব আছে, যা লিঙ্গ নির্বিশেষে সবাইকে বিবেচনা করতে হয়। কোনো আচরণ ন্যায়সঙ্গত, মানবিক ও সভ্যতার উপযোগী তা বিবেচনা করতে হয়। পুরুষ খালি গায়ে রাস্তায় বের হলে ঝুঁকি নেই, কিন্তু নারীদের ক্ষেত্রে এটি যৌন হয়রানি ও সামাজিক নিরাপত্তার ঝুঁকি। পুরুষদের দেহ কাঠামো ও শারীরিক গঠন আলাদা, যা কিছু নির্দিষ্ট আচরণে তাদের সুবিধা দেয়, কিন্তু নারীদের জন্য তা প্রযোজ্য নয়। রাস্তার পাশে প্রস্রাব করা পরিচ্ছন্নতার অভাব এবং অনৈতিকতার পরিচায়ক। এটি পুরুষদের ক্ষেত্রেও অশোভন এবং নারীদের জন্য আরও অস্বাস্থ্যকর ও অসম্মানজনক। একাধিক বিবাহ বা সম্পর্ক রাখা সমাজে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক স্থিতিশীলতাকে বিঘ্নিত করে এবং এটি কোনো লিঙ্গের জন্যই গ্রহণযোগ্য হওয়া উচিত নয়।
যদি ধর্মীয় বিধান বা সামাজিক-আইনি ব্যবস্থা বাদও দিই, তারপরও একজন নারীর পক্ষে একাধিক স্বামী রাখা সম্ভব নয়। একাধিক স্বামী থাকার ক্ষেত্রে একজন নারীর জন্য গর্ভধারণের বিষয়টি জটিল হবে, সন্তানদের পিতৃত্ব নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়বে। এটি নারীর শারীরিক ও স্বাস্থ্যগত চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে। নারী রাস্তায় পুরুষের মতো প্রকাশ্যে প্রস্রাব করতে পারে না, এর পেছনে শরীরবৃত্তীয় এবং শারীরিক সীমাবদ্ধতা কাজ করে। পুরুষের পেশি এবং মূত্রনালির গঠন এমনভাবে তৈরি হয়েছে, যে তারা সহজেই দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করতে পারে। নারী এবং পুরুষের শরীরের গঠন এবং ফিজিওলজি ভিন্ন হওয়ার কারণে, নারীদের জন্য প্রকাশ্যে দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করা কঠিন এবং শারীরিকভাবে অস্বস্তিকর। নারীদের শারীরিক গঠন, মূত্রনালির প্রস্থ এবং অবস্থান, পোশাকের ধরন এবং সামাজিক সংকোচনার কারণে এটি তাদের জন্য বাস্তবসম্মত নয়।
কাজেই বুঝতে হবে যে, নারীর জন্ম ও তার জীবনধারা এক ধরনের সামাজিক ও শারীরিক বাস্তবতার সাথে সম্পৃক্ত, যা তার শারীরিক ক্ষমতা এবং সামাজিক শর্ত অনুযায়ী নির্ধারিত হয়।
যারা আজ আগুন জ্বালিয়ে প্রকাশ্যে কোনো এক মেয়েকে সিগারেট ধরাতে দেখলেন এবং সমর্থন করলেন, তারাও তাদের কন্যা সন্তানের ক্ষেত্রে এমন দৃশ্য মেনে নিতে পারবেন না, তসলিমা নাসরিনের মতো অতিপ্রগতিশীল ছাড়া। এতটা প্রগতিশীল এখনো আমরা সবাই হইনি। আর যারা এতে সমর্থন করছেন, লক্ষ্য করলেই দেখা যায় তারা সবাই কোনো না কোনো ভাবে জুলাই আন্দোলনের বিপক্ষের লোকজন। কিংবা আ. লীগের দলবল। তাদেরও এখানে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য আছে। এটি নিছক নারীর স্বাধীনতা বা সমতার পক্ষে অবস্থান নয়, বরং এর পেছনে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বা বিভ্রান্তি তৈরির উদ্দেশ্য আছে। যারা এই ঘটনাকে অতিরঞ্জিতভাবে সমর্থন দিচ্ছেন, তাদের একটি বড় অংশ নারী স্বাধীনতার আসল সংগ্রামের প্রতি অভিজ্ঞ বা আন্তরিক নন; বরং তারা রাজনৈতিক বিভক্তিকে বাড়িয়ে তুলতে এবং বর্তমান সরকার ব্যবস্থাকে ব্যর্থ প্রমাণ করতে চান। তাদের স্ত্রী বা কন্যা সন্তান যদি প্রকাশ্যে ধূমপান করেন, তারা কখনোই সেটাকে স্বীকৃতি দিবেন না। ছেলে সন্তানের বেলায় স্বীকৃতি না দিলেও ছাড় দিবেন। কারণ হতে পারে, ধর্মীয় বা সামাজিক ভীতি বা পারিবারিক মূল্যবোধ। কিন্তু এখন তারা অন্যের তরুণ সন্তানদের প্রকাশ্যে ধূমপানকের পক্ষে কথা বলছেন নিজ স্বার্থে। বিগত বছরগুলোতে যখন নারীরা ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন, মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, তখন তাদের অনেককেই প্রতিবাদমুখর হতে দেখা যায়নি।
সমস্যাটা হল আমাদের প্রতিবাদের ধরন। আগুন জ্বালিয়ে সে আগুন থেকে প্রকাশ্যে সিগারেট ধরিয়ে কোনো তরুণীকে ঠোঁট চেপে টানতে দেখার বিষয়টা কারো কাছে প্রতিবাদের ভাষা হলেও সমাজের অনেকের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।
অভিভাবক হিসাবে আমরা চাইবো আমাদের কিশোর তরুণ সন্তানরা একটা সুস্থ, সুন্দর, নিরাপদ পরিবেশে বাস করুক এবং পড়াশোনা সম্পন্ন করে ক্যারিয়ার গঠন করুক। তাদেরকে এ বয়সে প্রকাশ্যে ধূমপান করতে দেখলে আমরা আতঙ্কিত হই, না জানি কবে হেরোইন, গাঁজা, ইয়াবায় আসক্ত হয়ে জীবনটাকে শেষ করে দেয়। তাছাড়া, আরো একটা বিষয় হল, একজন পুরুষকে আমরা প্রকাশ্যে সিগারেট টানতে দেখতে পারি, যা আমাদের অনেকের বাবা-ভাই, স্বামীও করেছেন। আমরা অনেকেই শিশুকাল থেকে পিতাকে ধূমপান করতে দেখে অভ্যস্ত। কিন্তু আমরা অনেকেই আমাদের মাকে এমনটা করতে দেখিনি। তাই নারীর বেলায় বিষয়টা আমাদের কাছে অপ্রতিকর। আবার অতীতেও দেখা গেছে, বহু গ্রাম্য এলাকায় নারীরা সিগারেট বা হুক্কা টানতেন। এখন যুগ বদলেছে। নারীরা অনেক স্বাধীনচেতা হয়েছে। যদি প্রকাশ্যে তারা সিগারেট টানেন, সেটা সমাজ কীভাবে নেবে তা নির্ভর করে সমাজের সংস্কৃতি, মূল্যবোধ এবং দৃষ্টিভঙ্গির ওপর। যদিও ধূমপান স্বাস্থ্যসম্মত নয় এবং পুরুষ ও নারী উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর, তবুও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার ক্ষেত্রে লিঙ্গভেদে ভিন্নতা রয়েছে।
ব্যক্তিগতভাবে যদি বলি, এই লিঙ্গভেদে ভিন্নতা খণ্ডাতে গিয়ে একজন নারী হিসাবে আমিও ধূমপান করবো-বিষয়টা আমার কাছে বিভ্রতকর। ভাইরাল হওয়া ভিডিওটি যেখানে আগুন জ্বালিয়ে এক তরুণী সিগারেট ধরিয়ে প্রতিবাদ করছেন, সেটাও বিভ্রতকর। সেটা অনেক অভিভাবকের জন্য আতঙ্কের। যদি আমি নিজেকে এই প্রেক্ষাপটে দাঁড় করাই, তবে সমাজের এই লিঙ্গভেদ বৈষম্যের প্রতিবাদে যা করতাম, তা হল, নারী-পুরুষ উভয়ের স্বাস্থ্যের জন্যই যে ধূমপান ক্ষতিকর, তা নিয়ে সচেতনতা বাড়াতাম। কিংবা প্রকাশ্যে ধূমপান করা অবস্থায় কারো বাধার সম্মুখীন হলে বাধা দেওয়া ব্যক্তির মুখে গরম চা ছুঁড়ে না ফেলে বিশৃঙ্খলা এড়িয়ে চুপচাপ সরে আসতাম।
এখন আমি ধূমপান করি না বলে অন্য কেউ করলে সেটাকে 'অপরাধ' বলার অধিকারও আমার নেই। আমি বড়োজোর সেটাকে অপছন্দ করতে পারি। সমাজের জন্য ক্ষতিকর বলে মনে করতে পারি, সচেতনতা বাড়াতে কাজ করতে পারি-এতটুকুই।
তবে হ্যাঁ! পুরুষ যদি প্রকাশ্যে সিগারেট গাঁজা টেনে আইনের আওতায় না যান, তবে নারীর বেলা কেন এই আইন-এই প্রশ্নটাও যৌক্তিক। কিন্তু সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ঘটনায় মূলত দুই তরুণীকে থানায় যেতে হয়েছে অপরপক্ষের সাথে হাতাহাতি দ্বন্দের কারণে, শুধু ধুমপান করার জন্য নয়। অপরিচিত ব্যক্তি যদি তাদের বাধা না দিতেন এবং দুই তরুণীর পক্ষ থেকে গরম চা তার উপর ছুঁড়ে না ফেলতো, তবে এমন কিছুই হয়তো ঘটতো না।
আসলে গড়মিলটা কোথায়?
গড়মিলটা সমাজের দ্বৈত নৈতিকতা ও নারীর অতিপ্রগতিশীল হয়ে উঠার চেষ্টার মধ্যে। সমাজ অনেক কিছুতেই পুরুষদের জন্য শিথিলতা দেখায়, কিন্তু নারীদের ক্ষেত্রে কঠোর অবস্থান নেয়। এমনটাই করেছেন সেই অপরিচিত ব্যক্তি দুই তরুণীকে ধুমপান করা থেকে বাধা দিয়ে। অন্যদিকে, অধিকার ও সমতা চাইতে গিয়ে নারীরা 'অধিকার ও সমতা'র সংজ্ঞায় ভুল করছেন। পুরুষের মতো আচরণ করা বা পুরুষের আচরণকে লক্ষ্য হিসেবে নেওয়া যে আসলে নারীর প্রকৃত স্বাধীনতার উদ্দেশ্যের বিপরীত, তা অনেকেই বুঝতে পারছেন না। সমতা মানে এই নয় যে সমাজে মন্দ বা অপ্রিতিকর যা কিছু পুরুষেরা করছে, নারীদেরও তা করতে হবে। বরং এখানে প্রশ্ন হওয়া উচিত—কোন আচরণগুলো সত্যিকার অর্থে ক্ষতিকর, এবং কোন আচরণগুলো সামাজিকভাবে আরোপিত ভণ্ডামির শিকার?
এখানেও দুটো আলাদা বিষয় আছে-আইন ও নৈতিকতার বৈষম্য এবং সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা বা ব্যক্তিস্বাধীনতা। যদি প্রকাশ্যে ধূমপান করা অপরাধ হয়, তবে তা নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবার জন্যই সমানভাবে প্রযোজ্য হওয়া উচিত। কিন্তু যদি শুধু নারীকেই এর জন্য হেনস্ত হতে হয়, আর পুরুষরা সহজেই রেহাই পায়, তাহলে সেটাই লিঙ্গ বৈষম্য।
সমাজ অনেক কিছুই গ্রহণ করেনি বা করতে চায় না, যেমন নারী নেতৃত্ব, নারীদের উচ্চশিক্ষা বা কর্মক্ষেত্রে সমান অংশগ্রহণ—যা একসময় বিরোধিতার শিকার ছিল, কিন্তু ধীরে ধীরে পরিবর্তন এসেছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, ধূমপানের মতো কিছু বিষয় কি কেবল 'সমতার' জন্য গ্রহণযোগ্য হওয়া উচিত, নাকি এটি ব্যক্তিগত পছন্দ ও সামাজিক মূল্যবোধের বিষয়?
এই প্রশ্নের উত্তর দুটি দিক থেকে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। ব্যক্তিগত স্বাধীনতার দৃষ্টিকোণ থেকে, ধূমপান করা একজন মানুষের নিজস্ব সিদ্ধান্ত। যেহেতু এটি আইনসিদ্ধ, তাই নারী বা পুরুষ নির্বিশেষে কেউ চাইলে ধূমপান করতেই পারে। সমতার প্রশ্নে বলতে গেলে, যদি পুরুষরা প্রকাশ্যে ধূমপান করতে পারে, তবে নারীদের ক্ষেত্রেও এটি একইভাবে দেখা উচিত।
কিন্তু সামাজিক মূল্যবোধের দৃষ্টিকোণ থেকে, যেহেতু আমরা একটা সমাজে বাস করি, তাই একটি সমাজে কিছু বিষয় কেবল আইনসিদ্ধ হলেই তা গ্রহণযোগ্য হয় না, বরং সামাজিকভাবে কী এটা স্বাভাবিক হিসেবে ধরা হয় কিনা-সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সমাজে ধূমপান করাকে নেতিবাচকভাবে দেখা হয়, কারণ এটি স্বাস্থ্যকর নয় এবং তরুণ প্রজন্মের জন্য ক্ষতিকর। এই জায়গায় প্রশ্ন ওঠে, আমরা কি শুধু সমতার জন্য ক্ষতিকর কোনো অভ্যাসকে স্বীকৃতি দিতে চাই, নাকি সেটি ভালো-মন্দ বিবেচনা করেই গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারণ করব?
এখানেই আমরা অতিপ্রগতিশীল নারীরা আটকে যাই। ভালো মন্দের গ্রহণযোগ্যতার হিসাব ভুলে আমরা সমতার জন্য ক্ষতিকর অভ্যাসকে স্বীকৃতি দিতে চাচ্ছি। ধূমপানের বিষয়টি স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর জেনেও আমরা সেটা নিয়েই লড়ছি। যেখানে আমাদের লড়াই হওয়া উচিত নারীর স্বাস্থ্য ও সুস্থতার পক্ষে, সেখানে আমরা ধূমপানের মতো ক্ষতিকর অভ্যাসকে সমতার প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছি—এটাই মূল সমস্যা।
সমতা মানে কখনোই ক্ষতিকর কিছুতে অংশগ্রহণের অধিকার পাওয়া নয়, বরং সুস্থ ও সচেতন সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা। পুরুষরা দীর্ঘদিন ধরে ধূমপানের ক্ষতিকর অভ্যাস বহন করে চলেছেন, যা তাদের স্বাস্থ্যের জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনছে। নারীরা যদি সমতার নামে সেই একই ভুল পথ অনুসরণ করেন, তবে তা আদতে কারো জন্যই কল্যাণকর হবে না। সত্যিকারের প্রগতিশীলতা হলো—সমাজের প্রচলিত ক্ষতিকর অভ্যাসগুলোকে চ্যালেঞ্জ করা, শুধু পুরুষ নয়, নারীর ক্ষেত্রেও সচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং সুস্থ জীবনের পক্ষে দাঁড়ানো। সমতা মানে পুরুষের সবকিছু অনুকরণ করা নয়, বরং সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতাকে প্রতিষ্ঠিত করা।
একজন নারী হিসাবে ব্যাক্তিগতভাবে যদি বলি, লিঙ্গ বৈষম্যের প্রতিবাদে পুরুষের মতো প্রকাশ্যে ধূমপান বা আগুন জ্বালিয়ে তা থেকে সিগারেটে ধোঁয়া উঠানো-আমার কাছে প্রতিবাদ নয়, বরং সমাজের দ্বৈত নীতিকে কঠোরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করা এবং সচেতনতা বৃদ্ধি করাই প্রকৃত প্রতিবাদ। প্রতিবাদের ভাষা এমন হওয়া উচিত, যা শুধু উত্তেজনা তৈরি করবে না, বরং সমাজের চিন্তাধারায় পরিবর্তন আনবে। প্রতিবাদ হওয়া উচিত সেই সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে, যা পুরুষদের অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয় এবং নারীদের পায়ে শিকল পরায়। প্রতিবাদের ভাষা হওয়া উচিত এমন, যা সমাজের মূল সমস্যাগুলোকে সামনে নিয়ে আসে এবং সত্যিকার সমতার পথকে প্রশস্ত করবে।
নারীদের প্রতি নেতিবাচক মানসিকতা এবং বৈষম্যমূলক আচরণ দূর করতে হলে, স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর অভ্যাসের সমতা চাওয়ার বদলে শিক্ষা, অধিকার এবং মর্যাদার সমতায় সমতা প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে জোর দেওয়া উচিত। সামাজিক পরিবর্তন আসে বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন ও ইতিবাচক সংলাপের মাধ্যমে, পুরুষ যা করছে তা নারীদেরও করতে হবে—এই যুক্তিতে নয়।
অভিমত থেকে আরো পড়ুন