https://www.prothomalony.com/

12652

literature

সাহিত্য

উত্তরের সাহিত‍্য

প্রকাশ: ০৫ মার্চ ২০২৫ ০৩:৪৯

তোমার বাড়ি যাবো ভাবি, যাওয়া হয় না

দীপংকর গৌতম

তোমার বাড়ি যাবো ভাবি, যাওয়া হয় না

কি এক অবস্থা জানো!  

বসন্ত কাল এসে বাড়ির ইজিচেয়ার দখল করেছে

চেনারোদগুলো ভিটে ছাড়ার জন্য ফোন কল দেয়।

তোমার বাড়ি চলে যাবো ভেবে রিক্সা থেকে মুকুন্দরামের 

হাটে নামতেই আমার চক্ষু চড়কগাছ! 

এক ডজন মেহনতী বিকেল তোমার পথের বাঁকে বসে গল্প করছে। তারা জোছনার চাঁদের অপেক্ষায়।

পূর্নচাঁদে সিগ্রেট ধরিয়ে তারা ইউক্রেন-রাশিয়া বিষয়ে আলোচনায় বসবে।

আমিতো একদম নিরাপত্তাহীন তা বললে নিরাপত্তা পরিষদ শুনবে না সে জানি

আমার পকেটে ঝোলায় তখন একডজন জোছনা- তোমাকে দেব ভেবেছিলাম

কিন্তু কতগুলি ভাঙাচোড়া ক্লান্ত বিকেল আমাকে নিরাপত্তাহীন করে তুলেছে।

আমি এখনও ফিলিস্তিন-বিশ্বাস করো ,

এখনও আমি উঠে আসতে পাছি না।

তোমার বাড়ি যাবো ভাবি, যাওয়া হয় না! 

 

 

 

বৃষ্টি তুমি

ইন্দ্রজিৎ মণ্ডল

হঠাৎ করে বৃষ্টি এলো বিনা কোনো পূর্বাভাসে। 

ভিজলো মাটি, ভিজলো গ্রাম, ভিজছে ফুল পাতাগুলো।

ধুয়ে মুছে যাচ্ছে জমে থাকা ধুলোবালি দূষিত কণা

নতুন ভাবে খুঁজে পাচ্ছে ঠেকে যাওয়া সৌন্দর্যতা। 

জল নামছে ফুল থেকে পাতা, পাতা থেকে মাটি 

চারিদিকে মুখরিত হয় শব্দ ধ্বনি, কি অপূর্ব সৃষ্টি।

ভেজা মাটির গন্ধ আসছে মাতাল হাওয়ায় 

মন কেমন করে মাটির কাছে যাওয়ার! 

জমেছে জল দুর্বার আগায় আলতো পায়ে সে ছুঁয়ে যায়

মনে হয় কোনো মেয়ে নূপুর পায়ে ঘাসের ওপর হেঁটে যায়।

পুকুরে জলে বৃষ্টির জল খেলা করে, হাওয়ায় ঢেউ খেলে

কতকালের অপেক্ষা, তাইতো তারা আনন্দে মেতে ওঠে।

বৃষ্টি তুমি এসো পূর্বাভাসে কিংবা বিনা কোনো সংকেতে

অপেক্ষায় থাকবো তোমারই; তুমি থাকবে মনের গহীনে।

 

 

তুঘলক 

মিশকাত উজ্জ্বল 

মনে করি, শিকার একটি পাখির নাম

জাল মানে নদীতটে মাছের অভয়াশ্রম

নদী তবে আকাশের পাটাতনে মেঘের তালুক;

আনন্দ হতে পারে—ক্রুশবিদ্ধ যীশুর অনুভূতি।

 

কী শোভন পুলিশের সেবাধর্মী হাতকড়া!

রাষ্ট্র অর্থ সরকারদলীয় নর্তনকুর্দকদের রক্ষাকবচ।

গুম, খুন সকাল-সন্ধ্যা নাস্তার টেবিলে 

সহজপাচ্য খাবারের মেন্যু।

 

ঘুষের মন্ত্রে দীক্ষিত কী বিচিত্র স্বদেশ!

'উন্নয়নশীল'তার তকমা সুচতুর এক প্রোপাগান্ডা;

যার কুশীলবগণ প্রায়ান্ধ, হাভাতে সুশীল।

 

 

 

বেহাত বিপ্লবে হাতছাড়া ভালোবাসা 

আ ই না ল  হ ক 

নাক উঁচিয়ে যে মেয়েটি বলেছিল, 

কোন দিন বিয়েই করবো না; সিঁথিতে লম্বা সিঁদুর মেখে 

সামনে দাঁড়িয়ে যখন জিজ্ঞেস করে কেমন আছেন? 

তখন কবির নিরব হওয়া ছাড়া আর কি'বা করার থাকে? 

 

ফ্লাসব্যাকে গিয়ে স্মৃতির খাতা খুললে 

হড়বড় করে বেরিয়ে আসে কোটি বছরের হলফনামা। 

কোনোটা পাঠযোগ্য, কোনটা অশ্লীলতার চাদরে ঢাকা

অসহযোগ আন্দোলনে গড়া ভালোবাসার মহাপ্রাচীর 

বেহাত বিপ্লবে হাতছাড়া হয়ে গেলে প্রকৃতি আর 

ভাগ্যের দোষারোপ ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না।

 

 

 

মায়াজালের নদী

মুহাম্মদ রফিক ইসলাম 

তার চোখে দীর্ঘ মায়াজাল।

যাদুর কাঠি ছুঁয়ে দিলে বশ মেনে যায়, যে কেউ

মগ্ন থাকে সন্ন্যাসী ধ্যানে।

চোখের পাতায় ফুটায় ফুল, ঘ্রাণের ভেতর 

তৃষ্ণা লুকায় নদী;

জলের সৌন্দর্য মাখিয়ে গায়

শাদা কাশবন আড়াল করে না দখিনা হাওয়া।

পলক যতদূর যায় ততদূর সে, 

মায়া নিয়ে হেঁটে যায় কেউ!   

 

 

 

আর্তনাদে মুজিত চোখ

রিপন বর্মন

শহরের মাথায় গামছা বেঁধে,

বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছে অভিমানি রোদ্দুর...

বৃষ্টির বুকে দুর্বিষহ খরা!

তামাম আকাশে অভ্র মেঘের প্রতিবাদী শোক;

মিছিলে ব্যানার, ফেস্টুন আর পোস্টার।

 

কিসের এত দাবী, কিসের এত চিৎকার-চেঁচামেচি?

বর্ষার আগমন কি অনেক দেরি?

 

একদল কাদাজল মাখা লোকের—

দেহ পুড়ে অঙ্গার,

চোখে-মুখে ভাঙনের চিহ্ন!

 

এরা কারা! এসব কিসের কানাঘুষা—

এসব কি কৃষকের কান্না...?

তবে কি মাটিতে মিলিয়েছে নুনের স্থিতি?

 

 

বিরহী ফাগুন 

আসাদুজ্জামান খান মুকুল

গগনে গগনে ফাগুনের বাণী বাগানে ফুলের ডালি.

সাথীহারা মনে শূন্যতা তবু রয়ে যায় এক ফালি।

 

ফুলে ফুলে কতো সেজেছে ফাগুন সুর ঝংকার বাজি,

বিরহীর প্রাণ করে আনচান সখা যে এলোনা আজি!

 

পলাশ ফুলের রাঙ্গা আগুনে পুড়ে দুখিনীর বুক,

মৌ'বনে অলি ফুলের বিহারে বেড়ে যায় আরো দুখ!

 

রাখালের বাঁশি দূর মাঠে বাজে কত সুমধুর সুরে,

বিরহীর মনে বিষাদ লহরী সখা আছে বহু দূরে!

 

যার তরে কাঁদে সেই মথুরায় শুনেনি যে তার কথা,

বসন্ত প্রেম ঝাপটিয়ে মরে বুঝাবে সে কারে ব্যথা!

 

 

 

 

পরিবর্তনের পালক

মধুমিতা দত্ত

 

'এই বর্ণা, পায়ের স্টেপগুলো ঠিক কর, কাল কিন্তু আমি আসতে পারবো না।' 

অদিতির কথা শুনে মেয়েগুলো হেসে উঠলো। বলল, 'অদিতিদি, কাল তো তোমাকে দেখতে আসবে। পছন্দ হলে তো তোমার বিয়ে হয়ে যাবে। কত দূরে তুমি চলে যাবে।' অদিতি বললো, 'দেখতে আসলে কি বিয়ে হয়ে যায়? নে নে তাড়াতাড়ি শেষ কর।' 

 ২৬ বছরের অদিতি সেন চিত্রানগর শহরের একজন সফল ব্যবসায়ীর মেয়ে। মাস্টার্স কমপ্লিট করেছে নাচ নিয়ে। এই শিল্পকলা ওকে যথেষ্টই প্রতিষ্ঠা এনে দিয়েছে। বর্তমানে এই শহরে একটি নাচের স্কুল খুলেছে। বেশ ভালোই চলছে। এদিকে ওর মা কমলিকাদেবী মেয়ের বিয়ের জন্য অস্থির হয়ে উঠেছেন।তাই আগামীকাল এই পাত্র দেখার প্রস্তুতি। পাত্র অয়ন রায় সুদূর মরুশিখা শহরের একজন প্রাচীন রত্ন গবেষক। সেন পরিবারের উঠোনে চলছে নানান আয়োজন।এলোমেলো গল্প, হাসি, আর পাত্রপক্ষের মিষ্টি খাওয়ার মাঝে অদিতি রান্নাঘরের দরজার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে।তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে অজস্র প্রশ্ন—এই ছেলেটি কেমন? আমাকে কি সে বোঝার চেষ্টা করবে? আমার স্বপ্নগুলো কি তার কাছে মূল্য পাবে?

 

অবশেষে অদিতি এলো পাত্রপক্ষের সামনে।পাত্রপক্ষের মৃদু প্রশ্ন-'অদিতি, তোমার  ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কিছু বলো।' 

অদিতি মুখ তুলে জবাব দেয়, 'আমি নাচ নিয়েই থাকতে চাই।' তারপর ধীরে ধীরে বলে, 'আমি জানি না এই বিয়েতে কী হবে। কিন্তু আমি চাই এমন একজন জীবনসঙ্গী যে আমাকে আমার মতো করে বাঁচতে দেবে।' 

অয়ন মুগ্ধ হয় তার স্পষ্টবাদিতায়। বলে, 'আমারও একই চিন্তা। আমি চাই একজন সঙ্গী, যার স্বপ্নের জন্য আমি সেতু হতে পারি, বাঁধা নয়।'

কিছুদিন পর, এক শুভলগ্নে অয়ন ও অদিতির চার হাত এক হয়ে গেলো। তারপর নববিবাহিতা স্ত্রীকে নিয়ে অয়ন ফিরে গেলো সুদূর মরুশিখা শহরে -মরুভূমি অঞ্চলে।

এখানে আসার পর প্রথম কিছুদিন অয়ন-অদিতির জীবন খুব সুন্দরভাবেই কাটছিলো।মরুভূমি অঞ্চলের এই শহরটিতে সোনালি বালির ঢেউ সূর্যের আলোয় উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। দিনভর অগণিত বালি কণিকা বাতাসের সাথে নেচে বেড়ায়, যেন এক অনন্ত নৃত্যের মঞ্চ। শহরের চারপাশ জুড়ে ছড়িয়ে থাকা বালির সাগর, যার প্রতিটি দিকেই শুধু শূন্যতা আর নীরবতার সুর। কিন্তু এই নিঃশব্দতার মাঝেই লুকিয়ে আছে প্রকৃতির নিজস্ব এক গতিময়তা। যখন বাতাসের হালকা ঝাপটা এসে মুখে লাগে, অদিতির মনে হয় এই শূন্যতার মধ্যেই প্রকৃতি তার নিঃশ্বাসের স্পর্শ  দিয়ে তাকে শান্ত করছে। কোনো দিক নেই, কোনো গন্তব্য নেই, শুধু এক অন্তহীন পথ।   

 

কিন্তু সময়ের সাথে সাথে অদিতি এই ধূসর মরুভূমি,তার আদিবাসী-সব কিছুতেই হাঁপিয়ে উঠলো। যে নাচ ছিল তার প্রাণের একান্ত আপন , সেটাও তার অসহ্য হতে লাগলো। তার মনে হলো, এই নির্জন প্রান্তরে দাঁড়িয়ে থাকা একটি শুকনো কাঁটা গাছ, যার শিকড় মাটির গভীরে প্রবেশ করতে চেয়েও বারবার ব্যর্থ হয়েছে। এর প্রতিটি শাখা, প্রতিটি কাঁটা যেন কোনো ব্যর্থ আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। বাতাসের ঝাপটায় যখন সেই শুষ্ক ডালপালা দুলে ওঠে, তখন মনে হয় মরুভূমি তার নিজের বুকে সঞ্চিত কান্না প্রকাশ  রাতের আকাশে অগণিত নক্ষত্রের মেলা সত্ত্বেও, এই শহর এক গভীর শূন্যতায় আচ্ছন্ন। মাঝে মাঝে উটের ঘণ্টা বা বাতাসের একঘেয়ে হু হু শব্দ নিস্তব্ধতা ভাঙে, তবে তা যেন আরো গভীর করে এই একাকিত্ব। রাতে চাঁদের আলো বালির ঢেউয়ের ওপর সরে সরে যায়, কিন্তু সেই আলোর নিচে শহরটি যেন এক মৃতপ্রায় নিস্তব্ধতা ধারণ করে।তাছাড়া যেহেতু সে শহরে বেড়ে উঠেছিল, তাই মরুভূমি তার কাছে প্রত্যন্ত, গেয়ো এবং নিরানন্দ লাগছিল।  

অয়ন যতক্ষণ ঘরে থাকতো স্ত্রীকে নানাভাবে উৎসাহিত করার চেষ্টা করতো। বলতো, 'তুমি আবার সব শুরু করো, তারপর ধীরে ধীরে এখানে তোমার নাচের স্কুল খুলে দেব। ছোট হলেও এটা তো একটা শহর,দেখবে সময়ের সাথে সাথে তুমি নিজেকে ঠিক সবকিছুর সাথে যুক্ত করে নিতে পারবে।' 

মা বাবার সাথে যখনি কথা হতো, অদিতি বলতো, 'আমি হাঁপিয়ে গেছি, আর ভালো লাগছে না।'

তাঁরা নানাভাবে তাকে বোঝানোর চেষ্টা করতেন। এর মধ্যে একদিন অয়ন কাজের প্রয়োজনে কিছু দিনের জন্য বাইরে চলে গেল। তখন সে তার মাকে একটা মেসেজ পাঠালো; 

'আর কথা বলবো না তোমাদের সাথে, এখানে এই অদ্ভুত প্রকৃতি, মানুষ আর তাদের সংস্কৃতির সাথে  চলতে পারছি না। তাই আমি বাড়ি ফিরে আসছি।' 

 

মেসেজ পাঠিয়ে অদিতি যাবার প্রস্তুতি শুরু করলো। কিছুক্ষন পর দেখলো ওর মায়ের একটা মেসেজ এসেছে। তাতে লেখা  আছে -

'দুই জন লোক কারাগারের ফটক দিয়ে বাহিরে তাকাল

একজন দেখতে পেল কাদা আর অন্যজন আকাশের তারা।' 

 

এই কয়েকটা শব্দেই তার অন্তরদৃষ্টি খুলে গেল। এবার সে আর পরিবেশকে নয় বরং নিজেকে বদলিয়ে ফেললো। আদিবাসী প্রতিবেশীদের সাথে বন্ধুসুলভ আচরণ শুরু করলো। অল্প সময়েই তার কাছে ঐ জায়গা মনে হল এক নতুন জগৎ- এক নতুন আনন্দলোক। অদিতির মনে হলো, মরুভূমির নীরবতায় কান্নার ধ্বনি, প্রকৃতির শূন্যতায় মানব মনের গভীর অনুভূতির এক প্রতীকী চিত্র। এটি নিঃসঙ্গতা, অন্তর্দ্বন্দ্ব ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষার এক অবিস্মরণীয় প্রকাশ।  মরুভূমির এই শহরে জীবনের সঙ্গী কেবল বালির ঝড়, খেজুর গাছের হেলানো ছায়া, দূর থেকে ভেসে আসা কাব্যিক এক নির্জনতা নয় ; প্রতিটি দিনের মতোই এখানে রাতও যেন বলে, 'তুমি একা হলেও, এই একাকিত্বেই তোমার অস্তিত্বের সৌন্দর্য।' 

সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন