https://www.prothomalony.com/
12496
literature
ঘড়ি
দর্পণ কবীর
পরীর মত ফুটফুটে শিশু মেয়েটি এসে আমার হাতে একটা ঘড়ি দিয়ে বলল, 'ঘড়িটা তোমার। ফেলে এসেছিলে। হারিয়ে ফেলো না, রেখে দাও!'
দুবাই বিমানবন্দরে এমন একটা ঘটনায় হচকিয়ে গেলাম আমি। কিছু বলতে যাচ্ছিলাম, মেয়েটি মুখে স্বর্গীয় হাসি ধরে রেখে দৌড়ে চলে গেল। কিছুক্ষণ আগে আমি ওয়াশরুমে গিয়েছিলাম, তবে হাতঘড়ি ফেলে আসিনি। এখনও রাডো ঘড়িটা ডান হাতের কব্জিতে ঝুলে আছে। কিন্তু যে ঘড়িটা মেয়েটি দিয়ে গেল, এটাও আমার। একসময় এই সিকো ফাইভ ঘড়িটাই ছিল আমার অহংকার। বা বলা যায়, আমার প্রেম। আমার জন্মদিনে ঘড়িটা উপহার দিয়েছিল অপ্সরা। তিরিশ বছর আগের কথা! ঘড়িটা একদিন অপন্সরাকে ফিরিয়ে দিয়েছিলাম। ওর বিয়ের দিন ঘড়িটা ফিরিয়ে দিয়েছি। ঐ সময় ওকে বলেছিলাম, 'আমার জীবন থেকে তোমার নাম ও স্মৃতি মুছে ফেলতে না পারলে কীসের পুরুষমানুষ আমি! প্রবঞ্চকদের আমি ঘৃণা করি!'
অপ্সরার ঘড়ি তিরিশ বছর পর বিমানবন্দরে ফিরে এলো কেন? প্রশ্নটা আমাকে কাঁপিয়ে দিল। ভেতরে সেকি তোলপাড়! আমি দ্রুত পা বাড়ালাম। শিশুটিকে পেলাম। ও একটি ওয়েটিং এরিয়ার চেয়ারে বসে আছে। ওর পাশে মধ্যবয়স্ক এক নারী। এগিয়ে গেলাম। শিশুটি আমাকে দেখেই ফিক করে হাসলো। আমি দেখলাম মধ্যবয়স্ক রমণীটাও ফিক করে হাসছে। আমার দৃষ্টি আটকে গেল অপন্সার চোখে, হাসিতে উদ্ভাসিত ওর মুখে। আমি হতভম্ব! তিরিশ বছর পর অপ্সরার সঙ্গে দেখা। অপ্সরা আমাকে দেখে স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল,
'তিতলি হচ্ছে আমার নাতনী। তোমাকে দেখে ভাবলাম, আমি সামনে দাঁড়ালে ফের অভিশাপ দেবে। তাই নাতনীকে কথা শিখিয়ে ঘড়িটা পাঠিয়েছি। জানি, চমকে যাবে। চমকে গিয়েছো তো?'
আমি কিছু বলতে পারি না। বুকের ভেতরে ঝড় বইছে। এই ঝড় সৃষ্টির, নাকি প্রলয়ের তা জানি না। ঝড়টা জয়ের নাকি পরাজয়ের, তাও জানি না। কান্নার নাকি আনন্দের, এটাও বুঝতে পারছি না। বড় অদ্ভূত জীবন! যাকে ঘৃণা করে যাব আজীবন-এমনটাই ভেবে বসে আছি। এখন তার মুখের মুচকি হাসিটা কীযে ভাল লাগছে! অস্ফূট কণ্ঠে বললাম,
'তুমি!'
'হ্যাঁ, আমি। ঘড়িটা ফিরিয়ে দিয়েছিলে। সেই থেকে আমি ঘড়িটা নিজের সঙ্গে রাখতাম। হাতছাড়া করিনি কোনদিন। সবসময় মনে হতো ঘড়ি নয়, তুমি আমার সঙ্গে আছো। আজ ফিরিয়ে দিতে পেরে খুব ভালো লাগছে। এই ঘড়িটা পড়ে থেকো। তাহলে আমার কথা মনে পড়বে '
বলেই অপ্সরা মিষ্টি করে হাসলো, সেই আগের মতো! আমি নিজের ভেতরে তুমুল বৃষ্টিপাতের মত ঝরতে থাকি। নিজেকে সামলে নিতে চেষ্টা করি। চোখে কঠিন দৃষ্টি ফুটিয়ে বলি,
'তোমার কথা আমি মনে করতে যাব কেন? জানোই তো আমি তোমাকে ঘৃণা করি!'
'তা জানি। ঘৃণা করতে গেলেও তো আমার মুখটা স্মরণে আনতে হবে, তাইনা ?'
'তোমাকে আমি স্মরণ করতেও চাই না!'
কথাটা বলেই আমি রাগে মুখ ফিরিয়ে যে ই হাঁটতে যাব, পেছন থেকে অপ্সরা বলল,
'তুমি উল্টোদিকে যাচ্ছো। নিউইয়র্কের ফ্লাইট ঐদিকে!'
রাগলে আমার মাথা ঠিক থাকে না। আমি দেখলাম উল্টোদিকে যাচ্ছিলাম। আমি ঘুরে বললাম,
'আমি কোনদিকে যাব, এটা আমার ব্যাপার। আগেও তুমি বলতে আমি নাকি উল্টোদিকে হাঁটি। ওসব কথা আর বলবে না !'
'ঠিক আছে আর বলব না। তবে চোখের সামনে ভুল করলে তো না বলেও থাকতে পারি না।'
'আচ্ছা। যাচ্ছি। তোমার সঙ্গে আর কথা বলতে চাই না।'
কথাটা বলে অকারণে দাঁড়িয়ে থাকি। অপ্সরা বলল,
'যাও। তবে যাবার বেলায় একটা কথা বলতে পারি?'
'কী কথা? তিরিশ বছর পর কী কথা বলার আছে?'
'তুমি তো অনেকবছর হল নিউইয়র্ক শহরে থাকো। আমি যাচ্ছি এই প্রথমবার। আমার মেয়ে ও মেয়ের জামাই আর তিতলি থাকে তোমাদের শহরে।'
'তোমার মেয়ে আর ওর স্বামী এখন কোথায়?'
'ওরা গিয়েছে কফিশপে। আমি আর তিতলি এখানে বসে আছি।'
'আর কিছু কি বলবে?' জানতে চাইলাম।
অপ্সরা বলল, 'আমার খুব ইচ্ছে নিউইয়র্ক শহরের সেন্ট্রাল পার্কটা ঘুরে ঘুরে দেখার। কাল ভ্যালাইন্টাইন ডে। তোমার কী সময় হবে? আমাকে নিয়ে যদি সেন্ট্রাল পার্কে একটু ঘুরতে।'
আমার রাগটা ফের বেড়ে যায়। এতোবছর পর কী ধরনের প্রস্তাব দিল অপ্সরা? বিয়ে করবে একজনকে, আর সেন্ট্রাল পার্কে ঘুরবে আমার সঙ্গে। কী আবদার! আমি বলি,
'তা তোমার স্বামী কই? আমার সঙ্গে পার্কে ঘুরতে চাচ্ছো কেন? আমি কিন্তু তোমাকে ঘৃণা করি, কথাটা ভুলে যেও না!'
আমার কথা যেন গ্রাহ্য করলা না অপ্সরা। ম্লান হেসে বলল, 'আমার মেয়ের জন্মের দু'বছর পর এক সড়ক দূর্ঘটনায় তিনি মারা যান। অভিশাপ হয়তো লেগেছে। কার অভিশাপ লাগতে পারে, আমি জানি।'
এ কথায় আমি একটু বিব্রতবোধ করি। বলি,
'আমি এমন অভিশাপ দেইনি মানে এমনটা ক্ষতি কামনা করিনি।'
'ঘৃণা যখন করতে পেরেছো, ক্ষতি কামনা করাটা অস্বাভাবিক কিছু নয়।'
'না না, সত্যি বলছি। দুঃখিত, তোমার সঙ্গে আমার দুর্ব্যবহার করা ঠিক হয়নি। আচ্ছা, আমি এখন যাই।'
এ কথা বলে আমি অপ্সরার সামনে থেকে সরে আসি। পেছনে ফিরে তাকাই না। অপ্সরা কি আমার চলে যাওয়া পথের দিকে চেয়ে আছে? ভাবতে থাকি। ফ্লাইটে কি ওদের সঙ্গে ফের দেখা হবে? আমার সিটটা কি ওদের সিটৈর কাছাকাছি পড়বে? যাকে ঘৃণা করে আসছি, তাকে নিয়ে একরাশ ভাবনা মনে পেখম ছড়িয়ে যাচ্ছে। মানুষের মন বড় অদ্ভূত! আমার চোখের সামনে সেন্টাল পার্কটা ভেসে উঠে। চোখ ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চায় জলরাশি!
এক সন্ধ্যায়
জাকিয়া শিমু
শীতকালটা এমনই, দুপুর না পড়তে শেষবিকেলের আমেজে মজে যায়। তবে আজ প্রকৃতি জুড়ে ফাগুনের গুণগুণ হাওয়ার কমতি নেই। এমন আদৃত প্রকৃতিস্পর্শ গায়ে জড়িয়ে আমরা ব্যাসিলিকা অফ সেন্ট ভ্যালেন্টাইন'এ অর্থাৎ বিশ্বজুড়ে ভালোবাসা দিবসের উপলক্ষ যাকে ঘিরে সেই সেন্ট ভ্যালেন্টাইন'র সমাধিস্থলে পৌঁছে যাই। প্রবেশদ্বারে এসে হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ি! গায়ের লোমগুলো সকলে একত্রে যেন কচিধানের চারার মতো জেগে উঠল! জায়গাটির সর্বত্র কেমন জানি এক রোমাঞ্চকর অথচ কবর-নিস্তব্ধতার আবহে ঢেকে আছে! দূর থেকে শাদা ধবধবে গির্জাটি চোখে পড়ল। সমাধিস্থলকে গির্জা করা হয়েছে' সে ইতিহাস অনেকের মতো আমিও জেনেছি। তারপরও কেমন যেন এক অব্যাখ্যায় অনুভূতি আমাকে যেন একটু বেশিই কাবু করে ফেলল!
গির্জার চারপাশে প্রচুর গাছগাছড়া, সেসবও নৈঃশব্দ্যের ভারি চাদরে ঢাকা! জনশূন্য! তবে একটু আগে গির্জার ঘণ্টাধ্বনি শুনেছি,হয়তো প্রার্থনার-সময় হয়েছে। প্রবেশদ্বারে, অতি প্রাচীন কারুকাজের নকশা আমাকে দলছুট হয়ে আরও কিছুক্ষণ দাঁড়াতে উৎসাহ যোগাল। আমার যা অভ্যাস; প্রাচীন ঐতিহাসিক স্থানের ভাঙ্গা দালানকোঠা, ইটসুরকি হাত বুলিয়ে স্পর্শ না করলেই নয়! খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে আদ্যপ্রান্ত পরখ করতে,নিজেকে সেইসময়ের একজন আবিষ্কার করি, অবর্ণনীয় সেই জগতের কল্পবিলাস!
আমরা ক'জন দল বেঁধে এসেছি। বাকিরা অভ্যাস মতো আমাকে ফেলে হুড়মুড়িয়ে ভেতরে ঢুকে গেছে! অবশ্য আমার স্বভাবচরিতে তারা বহুকাল ধরে অভ্যস্ত। আমাকে নড়াবার সাধ্য কার, যতক্ষণে তৃপ্ত না হই! এরপর প্রবেশদ্বার ঠেলে ভেতর-পথে পা বাড়াই। পথের দু'পাশে সারি সারি ওক গাছ, যারা পথ চিনিয়ে নিয়ে যাবে গির্জার সন্মূখপ্রান্তে। শান্ত কোমল হাওয়ার তালে তালে পথের দু'পাশের গাছের পাতা ঝিরঝিরিয়ে দুলছে। সবে সূর্য ডুবেছে এখনো তার কমলারঙের আবেশ জংলীশাড়ির আঁচলের মতো ছোপ ছোপ পশ্চিম আকাশজুড়ে রয়ে গেছে। এমন পথ-প্রকৃতির মাঝে অবলীলায় হেঁটে যাওয়া যায় হাজার বছর ধরে। এমনটা ভাবতে,আবার পা থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে! পথের একপাশে সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের মূর্তি! যা অতি স্বাভাবিক কিন্তু দাঁড়ানো ভাস্কর্য দেখে অভ্যস্ত আমি, কফিনে শুয়ে থাকার ভঙ্গিতে ভাস্কর্যে বিস্মিত হই!
এমন সময় জাভেদ মুচকি হেসে, ধীর পায়ে খানিকটা ডানদিকে হেলে এমন ঢংগে সে সবসময় হাঁটে, উল্টো পথ ধরে আমার দিকে এগিয়ে আসে! আমি এমনতর চমকে, কেঁপে উঠি! কিন্তু জাভেদ খুব স্বাভাবিক, যেন সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের সমাধিপাশে আমাদের হাত ধরে দাঁড়াবার যে প্রতিজ্ঞা ছিল,তা সে কোনো অজুহাতে ভুলে যায় নাই! আমি মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে,তার পাশাপাশি হেঁটে এগিয়ে যাই। পথের ডানপাশে বিস্তর আমন্ড বাগান। গাছ ভর্তি গোলাপিরঙের অজস্র ফুলেরঝার, হেলেদুলে বাদুরঝুলা ঝুলে আছে। মৃদু গন্ধে চারপাশটা ম ম করছে। আমি বাগানের দিকে এগিয়ে গেলে জাভেদ একটি ফুলেরঝার আমার খোলাচুলের ক্লিপে গোঁজে আর আমাদের আমন্ড গাছটির কথা জানতে চায়।
ভ্যালেন্টাইনের সমাধি পাশে তার বন্ধু কিংবা প্রেমিকা জুলিয়া, একটি গোলাপিফুলে ভরা আমন্ড গাছ লাগিয়েছিল। এবং সেই থেকে আমন্ডগাছ স্থায়ী প্রেম ও বন্ধুত্বের প্রতীক হয়ে বেঁচে আছে। অনেক বছর আগে জাভেদ আমাকে একটি আমন্ড গাছ উপহার দেয়। গাছটি আমার বাড়ির উঠোনের দক্ষিণকোণায় যত্ন করে লাগাই। প্রতিদিন সকাল-বিকাল গাছটির পরিচর্যার কমতি করিনি কিন্তু একদিন সকালে দেখি গাছটি মরে মাটির সাথে নুয়ে আছে! পরিষ্কার মনে আছে, আমি স্বজন হারানো শোকের মতো মর্মাহত হয়েছিলাম। এরপর বহুবার ভালোবাসার প্রত্যাশায় আমন্ড পুঁতেছি বাড়ির উঠোনে, অপেক্ষায় থেকেছি কিন্তু এজীবনে আমন্ডগাছ আমার বাড়ির উঠোনে বেড়ে উঠেনি। আমি জাভেদের কথার উত্তর না করে, চোখেরকোণে জমে থাকা পানি লুকাতে, চুপচাপ সম্মুখে ফুলভরা আম্নড গাছের দিকে তাকিয়ে থাকি।
এমন সময় অনেকটা গায়েবী আওয়াজের আদলে গির্জার ভেতর থেকে সমস্বরে প্রার্থনার আওয়াজ ভেসে আসে। সূর্য ডুবেছে অনেকক্ষণ হয়, সে-ফাঁকে যুতমতো আঁধার জমেছে গির্জার আশেপাশে ঝুপঝারে। আমরা হেঁটে গির্জার সামনের দিকে এসে দাড়াই। ধবধবে শাদা রঙের গির্জার গায়ে খোঁদাই করা সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের অবয়ব-মূর্তি। উঠোনের চারপাশে নানান রঙের গোলাপঝার এসব গাছের ফাঁকফোঁকরে আমন্ড গাছগুলোও বেশ সরব হয়ে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। আম্নড গাছের শাখাপ্রশাখায় ঝুলে আছে- ভালোবাসার হৃদয়চিহ্ন আঁকা অসংখ্য ধাতব কাগজ। ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে অনেকে গুঁজে রেখে যায় এসব স্মৃতিচিহ্ন। কুয়াশার সূক্ষ্ম চাদর নিংড়ে অস্পষ্ট আলো সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের মূর্তিটিকে বিমূর্ত করে তুলেছে। আমরা দু'জন অনেকক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে ভাবনায় জগতে ডুবে যাই,- প্রকৃত বিশ্বাস বোধহয় এমনই হয়। খ্রিষ্টধর্মের প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস ছিল বলেই মৃত্যুর মতো ভয়ঙ্কর শাস্তিকে বরণ করে নিতে এতটুকু দ্বিধা করেননি সেন্ট ভ্যালেন্টাইন। অথচ চাইলেই প্রিয় জুলিয়াকে নিয়ে নির্ভারে জীবন কাটিয়ে দিতে পারতেন! সম্রাট ক্লাডিয়াস সেন্ট ভ্যালেন্টাইনকে খ্রিষ্টধর্ম ছেড়ে তার ধর্ম মেনে নিতে আহ্বান জানান এবং বিনিময়ে মৃত্যুদন্ডের মতো শাস্তি উহ্য করার প্রতিজ্ঞা করেন। কিন্তু সেন্ট ভ্যালেন্টাইন শেষ পর্যন্ত তার বিশ্বাসে অটল ছিলেন!
আমরা গির্জার ভেতর শব্দহীন পায়ে ঢুকে পড়ি! আজ বোধহয় বিশেষ কোন প্রার্থনা আছে মানুষজনে ভরা। জাভেদ ভেতরে বিছিয়ে থাকা বেঞ্চের এককোণে বসে পড়ে এবং প্রাইমারি স্কুলে বন্ধুর জন্যে জায়গা রাখতে পাশের জনকে কনুইয়ের গুঁতায় সরিয়ে দেওয়ার আদলে তার পাশের জায়গাটি আমার জন্যে খালি করে, আমি তার পাশে বসি। গির্জাটি আহামরি বড় নয়, ভেতরে গোটাপঞ্চাশ লোকের বসার ব্যবস্থা হয়তো; তাদের মধ্যে বেশিরভাগ চুপচাপ হবার ভঙ্গিতে বসে আছে,এরা পর্যটক। বাকিরা প্রার্থনারত। গির্জার ভেতর কৃত্রিম আলোর স্বল্পতায় দেয়ালগাঁথা চিত্রকল্পগুলো ঠিকঠাক দেখা যাচ্ছে না। আমি আলগোছে আসন ছেড়ে দেয়ালের কাছে এগিয়ে যাই এবং দেয়ালে ভেসে থাকা চিত্রকল্প,দেয়াললিখনে মনোযোগ দিই। দেয়ালের গায়ে হাত রাখি, কতোকাল আগে এসব লেখা হয়েছে কে জানে! দেয়াল চিপড়ে বেরিয়ে আসে সেসব দিনের অজস্র দীর্ঘশ্বাসময় ইতিহাস! ভ্যালেন্টাইনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয় ২৭০ খ্রিষ্টাব্দে, ১৪ ফেব্রুয়ারি। এরপর তাকে এইস্থানে সমাহিত করা হলে তাকে ঘিরে গির্জাটির পত্তন ঘটে। ইতিহাসে ঋদ্ধ সমৃদ্ধ হয়ে আছে এই ভূমি। আমি স্বভাবমতো বর্তমান ভুলে সেসময়ে চলে যাই! এভাবে কতোক্ষণ কেটে গেছে, খেয়াল নেই! চেতন ফিরতে তাকিয়ে দেখি-মানুষশূন্য গির্জার ভেতর আমি একা! আবছায়া আঁধার এবং আগরবাতির ধোঁয়ায় কক্ষটিতে অন্যজগতের আবহ তৈরি হয়েছে। আমি ভয়ে জমে ওঠি! দু' হাত বাড়িয়ে জাভেদকে খুঁজি কিন্তু কেউ কাছেধারে নেই! চোখ কচলে আঁধার ঠেলে দরজার পাশটাতে ফিরতে জাভেদের সাথে দেখা হয়! সে চুপিসারে আমার হাত ধরে সিঁড়ির কাছে নিয়ে আসে। লম্বা আলখেল্লা পরা পাদ্রী উদাস হয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে! আমরা নীরবে তাকে পাশ কাটিয়ে উঠোনে এসে দাঁড়াই।
বাইরে রূপালী আলোর বন্যা বইছে! এত আলোময় চারপাশ! একটু আগেও যা আঁধারে ঢেকে ছিল,এখন দিনের আলোর মতো পরিষ্কার! আজ কি পূর্ণিমা! জাভেদ আমার কথায় মাথা তুলে আকাশের দিকে তাকায়। এতক্ষণে আমি ওকে স্পষ্ট দেখতে পাই। ঘোরলাগা এক অপার্থিব-সৌন্দর্যে ডুবে আছে জাভেদ! চোখে নীলআলোর উজ্জ্বল এক আভা। আমি মুগ্ধ হয়ে ওকে দেখি! ও হেসে ওঠে আমার প্রশ্ন শুনে, মুখে বলে-পূর্ণচন্দ্র। এবং অভ্যস্ত স্বভাবে বুকপকেট হাতড়ে মুঠো ভর্তি করে বের করে আনে আমার প্রিয় ফুলের, উজ্জ্বল বেগুনি রঙের পাপড়িগুলো! আমি অভ্যাসমতো দু'হাত বাড়িয়ে দিতে আমার হাতের মুঠো ভরিয়ে দেয়।
সেসময়ে আমার দলের ওদের উপস্থিতি টের পেয়ে ঘুরে তাকাই। এবং জাভেদ সে সুযোগে উধাও হয়ে যায়। এমন করে সে হারিয়ে গিয়েছিল বিশ বছর আগের এইদিনে। সেদিন আমি এবং জাভেদ বেশ রাত করে রিকশা করে ফিরছি। একটি ট্রাক কোথা থেকে এসে রাস্তার সাথে মিলিয়ে দিয়ে গেল জাভেদকে! প্রত্যক্ষদর্শীদের জবান মতে, আমি ট্রাকের দুচাকার ফাঁকে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলাম!
মনে পড়ে
এইচ বি রিতা
রাত তখন ১১টা। ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছি। হঠাৎ একটি অপরিচিত নম্বর থেকে কল এলো। কিছুটা দ্বিধা নিয়ে রিসিভ করলাম।
'কেমন আছো?'
'আপনি কে?'
উত্তর শুনে আমি চমকে উঠলাম। অপর প্রান্ত থেকে ভেসে এলো পরিচিত এক কণ্ঠস্বর—ইফতিখার।
শৈশবে স্কুল ছুটি হলেই গ্রামের নানাবাড়িতে চলে যেতাম। সেখানকার মাটির তৈরি বাড়িঘর, সবুজ শ্যামল ক্ষেত-খামার এবং সহজ-সরল জীবনযাপন ছিল আমার ভীষণ প্রিয়। মাটির ঘরগুলো গ্রীষ্মে শীতল ও শীতে উষ্ণ থাকত। মাটি, বাঁশ, খড়কুটো, কাঠ, গোলপাতা, হোগলার পাতা কত কি দিয়ে তৈরি হতো এসব ঘরবাড়ি। গ্রামের পথে কাঁঠাল-আমের বাগান, খড়ের ছাউনি আর মাটির চার দেয়ালের ভেতর আমি আর মামাতো ভাই ইফতিখার-খুনসুটিতে কাটিয়েছি শৈশব-কৈশোর।
সে ছিল খুব শান্ত ও চুপচাপ স্বভাবের, আর আমি চঞ্চল। আমি নানাবাড়ি গেলে তার যেন ঈদের আনন্দ লাগতো। তবে বড় হওয়ার সাথে সাথে শহরের ব্যস্ত জীবনে তার সাথে যোগাযোগ কমে যায়, তবে নানাবাড়িতে গেলে দেখা হতো। লক্ষ্য করতাম, সে কখনো আমার চোখে সরাসরি তাকাতো না। এ নিয়ে মাঝেমাঝে মজা করতাম। বলতাম, 'আয় তোকে বিয়ে করি।' সে লজ্জা পেত।
আমার বিয়ের দিন সে এসেছিল। হাতে একটি ছোট কৌটার মতো কিছু নিয়ে। আমাকে ডেকে বলল, 'নীলা, তোমার জন্য এনেছি।' খুলে দেখলাম, একটি সুন্দর সোনার আংটি। সাথে একটা ছোট চিঠি।
আমি অবাক হয়ে তাকালাম। ইফতিখার কখনো আমার চোখে চোখ রাখতে সাহস করেনি। সেদিনও করেনি। শুধু বলেছিল, 'সাহস পাইনি। আজ তোমার জীবনের বিশেষ দিনে না বলে থাকতে পারলাম না।'
ভীষণ মন খারাপ হলো। সেদিন মনে হলো, হয়তো খুনসুটিতে আমার মনেও তার জন্য একটা অন্যরকম ভালো লাগা তৈরি হয়েছিল, যা সময় ও সুযোগের অভাবে বুঝতে পারিনি। তা না হলে কেন কবুল বলতে গিয়ে আঙুলের ডগায় তার আংটিটি শক্ত করে চেপে ধরছিলাম? কেন আটকে যাচ্ছিল শব্দ!
ইফতিখার কল করেছিল গত রাতে। ২৫ বছর পরও সে একই স্বভাব ধরে রেখেছে, চুপচাপ ও শান্ত। জানতে চাইলাম, 'বিয়ে করোনি কেন?'
ওপাশ থেকে কোনো উত্তর আসেনি। শুধু বলল, 'তোমাকে মনে পড়ে।'
সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন