https://www.prothomalony.com/

12432

literature

সাহিত্য

শিল্পঘর

সৃজনশীলতায় সৌন্দর্য প্রকাশের শিল্পে-মেকআপ আর্টিস্টরা

প্রকাশ: ১২ ফেব্রুয়ারী ২০২৫ ১৩:৪৯

মেকআপ আর্টিস্ট বা রূপসজ্জাশিল্পী হলেন এমন এক সৃজনশীল পেশাদার, যিনি মানুষের চেহারায় শৈল্পিক দক্ষতার মাধ্যমে সৌন্দর্য এবং নান্দনিকতার ছোঁয়া এনে দেন। এই শিল্প কেবল বাহ্যিক রূপচর্চা নয়, বরং এটি একটি সৃজনশীল অভিব্যক্তি, যা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে, বিশেষ করে বিয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ দিনে, একজন ব্যক্তিকে তার স্বপ্নের সাজে রূপ দিতে সাহায্য করে। মেকআপ শিল্পীদের কাজের পরিধি বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিস্তৃত। থিয়েটার, চলচ্চিত্র, ফ্যাশন, বিজ্ঞাপন, সাংস্কৃতিক এবং সামাজিক অনুষ্ঠানে তাদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। তারা কেবল মেকআপ প্রয়োগ করেই থেমে যান না; বরং মুখের গঠন, ত্বকের ধরন, আলোর প্রকৃতি, অনুষ্ঠানের প্রয়োজন, ক্যামেরার লেন্স এবং চরিত্রের চাহিদা অনুযায়ী সঠিক মেকআপ নির্বাচন করেন। 

মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, মেকআপ শুধুমাত্র রূপচর্চার জন্য নয়, এটি আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। অনেক মানুষ কর্মক্ষেত্রে বা বিশেষ অনুষ্ঠানে আত্মপ্রকাশের জন্য মেকআপের সাহায্য নেন। 

এটি একজন ব্যক্তির নিজেকে উপস্থাপনের ক্ষমতাকে শক্তিশালী করে, যা তাদের সামাজিক ও পেশাগত জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। মনস্তাত্ত্বিকভাবে, মেকআপ একটি প্রতীকী আবরণ হিসেবে কাজ করতে পারে, যা মানুষকে তাদের ভিতরের শক্তি প্রকাশ করতে সাহায্য করে। কিছু মানুষের জন্য এটি সৃজনশীলতার একটি মাধ্যম, যেখানে তারা রঙ ও শৈলীর মাধ্যমে নিজেদের অভিব্যক্তি ফুটিয়ে তুলতে পারেন। অন্যদিকে, কিছু মানুষের জন্য এটি সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার সাথে সংযোগ স্থাপনের উপায় হতে পারে। এছাড়াও, মেকআপ রুটিন অনেকের জন্য স্ব-যত্নের একটি অংশ, যা মানসিক প্রশান্তি এনে দেয়। এটি শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য নয়, বরং মানসিক শক্তি এবং ব্যক্তিগত পরিচর্যার মাধ্যমে নিজের প্রতি ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশও বটে। 

একজন মেকআপ আর্টিস্টের কাজ শুধুমাত্র প্রসাধনী সামগ্রী ব্যবহার করা বা ব‍্যবসায়িক উদ্দেশ‍্য নয়, বরং একজন শিল্পীর দায়বোধ থেকে তিনি মুখের ওপর রঙ, ছায়া এবং আকারের মাধ্যমে এক অনন্য রূপ ফুটিয়ে তোলেন। তাই এই শিল্পের জন্য সৃজনশীলতা, ধৈর্য এবং নান্দনিক বোধ থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। 

বর্তমানে মেকআপ শিল্পে ব্রাইডাল মেকআপ (বিয়ের সাজ) সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ মেকআপ শিল্পগুলোর মধ্যে একটি। এটি সাধারণত ঐতিহ্যবাহী এবং আধুনিক উভয় স্টাইলে করা হয়।

ফ্যাশন শো এবং ফটোশুটের জন্য বিশেষ ধরণের মেকআপ করা হয়, যা পোশাক ও থিমের সাথে মানানসই হতে হয়।

ফিল্ম ও থিয়েটার মেকআপ যা চরিত্রের চাহিদা অনুযায়ী বাস্তবসম্মত কিংবা কাল্পনিক রূপ তৈরি করা হয়।

স্পেশাল ইফেক্টস মেকআপ রয়েছে যা সিনেমা, থিয়েটার বা বিজ্ঞাপনে বিভিন্ন ধরনের বিশেষ চরিত্র তৈরি করতে ব্যবহার করা হয়, যেমন—আঘাতের দাগ, দানবীয় মুখাবয়ব বা কৃত্রিম চামড়া প্রয়োগ। এয়ারব্রাশ মেকআপ যা টেলিভিশন এবং হাই-ডেফিনিশন ভিডিওর জন্য বিশেষ ধরনের মেকআপ, যা স্কিনকে নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলে।

ক্যারিয়ার হিসেবে মেকআপ শিল্প বর্তমান যুগে একটি সম্ভাবনাময় ক্যারিয়ার হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। অনেকে পেশাদার মেকআপ আর্টিস্ট হিসেবে কাজ করছেন এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও সুনাম কুড়িয়েছেন। যারা এই শিল্পে নিজের দক্ষতা এবং ভালোবাসা বিনিয়োগ করতে প্রস্তুত, তাদের জন্য মেকআপ শিল্প হতে পারে এক অনন্য পেশা।

 

শিল্পঘর পাতায় আজ থাকছে এমনই দুজন মেকআপ আর্টিস্ট কানিজ হুসনা আকবরী এবং সাদিয়া। আশাকরি, শিল্পঘর এর আজকের পাতাটি পাঠকদের মনে ভালো লাগা এনে দিবে, সেইসাথে মেকআপ শিল্প নিয়ে অনেক অজানা গল্প জানা হবে।

ধন‍্যবাদান্তে-রোকেয়া দীপা

 

মেকাপ আর্টিস্ট কানিজ হুসনা আকবরী: 

কানিজ হুসনা আকবরী একজন মেকআপ আর্টিস্ট যার  অনুপ্রেরণামূলক গল্প 'আমি মেকআপ আর্টিস্ট হওয়ার আগে একজন ভিজুয়‍্যাল আর্টিস্ট।' 

এই বাক্যটি একাধারে শিল্পের প্রতি ভালোবাসা, জীবন সংগ্রাম এবং সাফল্যের প্রতিচ্ছবি। কানিজ হুসনা আকবরীর এই যাত্রা শুধু একটি পেশার গল্প নয়; এটি একজন নারীর আত্মপ্রতিষ্ঠার গল্প। চারুকলা ইনস্টিটিউটে মাস্টার্স শেষ করার পর তিনি জীবনকে নতুন করে চিনতে শুরু করেন। তবে কাঙ্ক্ষিত পেশায় পৌঁছানো তাঁর জন্য সহজ ছিল না। কঠোর পরিশ্রম আর শিল্পের প্রতি অগাধ ভালোবাসাই তাকে আজকের জায়গায় এনে দিয়েছে।

ছোটবেলা থেকেই কানিজের মধ্যে শিল্পচর্চার প্রবল আগ্রহ ছিল। বিভিন্ন পোর্ট্রেট আঁকতে ভালোবাসতেন তিনি। নিজের কাজিনদের কাছে প্রাথমিকভাবে মেকআপের হাতেখড়ি নিলেও, তাঁর চোখে মেকআপ ছিল আরেকটি শিল্পমাধ্যম। এই আগ্রহ তাকে ধীরে ধীরে পেশাদার মেকআপ শিল্পী হয়ে ওঠার পথে নিয়ে যায়।

 

কানিজ বলেন, 'শিল্প মানে শুধু ক্যানভাস নয়। মানুষের মুখও আমার কাছে এক একটি জীবন্ত ক্যানভাস। মুখের বিভিন্ন অংশে আলোর ছোঁয়া এনে, রঙের সঠিক ব্যবহার করে সৌন্দর্য ফুটিয়ে তোলার মধ্যে এক ধরনের শিল্পকর্ম লুকিয়ে আছে।' 

কানিজ হুসনা আকবরী বর্তমানে নিউ ইয়র্কে একজন সফল মেকআপ আর্টিস্ট হিসেবে পরিচিত। সেখানে তাঁর ক্লায়েন্টরা বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর। আফ্রিকান, আমেরিকান, মেক্সিকান কিংবা গায়েনিজ—প্রত্যেকের চেহারার গঠন ও ত্বকের ধরন ভিন্ন। তাই প্রতিটি মানুষের জন্য আলাদা পরিকল্পনায় মেকআপ করেন তিনি।

মনোবিজ্ঞানিদের সাথে একমত হয়ে তিনি বলেন, 'মেকআপ শুধু সুন্দর দেখানোর জন্য নয়, আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর একটি মাধ্যম।' নিউ ইয়র্কে সৌন্দর্যচর্চা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। শহরের প্রায় প্রতিটি ব্লকে বিউটি সেলুন রয়েছে। সেখানকার নারীরা নিয়মিত আইব্রোজ, নেইল এক্সটেনশন এবং চুলের যত্ন নেন। তবে বিশেষ অনুষ্ঠান ছাড়া তাঁরা সাধারণত ভারী মেকআপ পছন্দ করেন না।' 

কানিজের মতে, আমেরিকান মেকআপে ন্যাচারাল লুক বেশি প্রাধান্য পায়। তবে বাংলাদেশি বা ভারতীয় বিয়েতে কনের সাজের ক্ষেত্রে আলাদা গুরুত্ব থাকে। তাই এই দুই ধরনের মেকআপ স্টাইল বোঝা একজন মেকআপ আর্টিস্টের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

প্রতিটি নতুন ক্লায়েন্টের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে কানিজ নতুন কিছু শিখেছেন। বিভিন্ন ত্বকের ধরন এবং সংস্কৃতিগত রুচির পার্থক্যের জন্য তাকে প্রতিনিয়ত নিজেকে আপডেট রাখতে হয়েছে।

তিনি বলেন, 'একজন মেকআপ আর্টিস্টের কাজ কেবল মুখ সাজানো নয়, বরং প্রতিটি ক্লায়েন্টের ব্যক্তিত্বের সঙ্গে সাজটি মানিয়ে দেওয়া জরুরি।'

কানিজের মতে, বিয়ের কনের সাজ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কনের সাজ এমন হতে হবে, যাতে তিনি অন্যদের চেয়ে আলাদা দেখান।

তিনি বলেন, 'বিয়ের দিন কনে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাওয়ার যোগ্য। তাই কনের সাজ এমনভাবে করা উচিত, যাতে তাঁর ব্যক্তিত্বও ফুটে ওঠে।' 

কানিজ মনে করেন, সফল মেকআপ আর্টিস্ট হতে হলে স্কিন কেয়ারের সঠিক ধারণা থাকা জরুরি। ত্বকের ক্ষতি যাতে না হয়, সে জন্য ভালো প্রোডাক্ট ব্যবহার এবং ত্বকের যত্ন নেওয়ার পদ্ধতি জানা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, 'কোনো প্রোডাক্ট ব্যবহারের আগে তার উপাদান ও প্রভাব সম্পর্কে জানতে হবে। প্রোডাক্টের ভুল ব্যবহার ত্বকের ক্ষতি করতে পারে।' 

তিনি নতুন প্রজন্মের মেকআপ আর্টিস্টদের উদ্দেশ্যে বলেন, 'মেকআপ শিল্পে টিকে থাকতে হলে প্রতিনিয়ত শেখার মানসিকতা থাকতে হবে। ত্বকের যত্ন সম্পর্কে জানতে হবে এবং কসমেটোলজির লাইসেন্স নিতে হবে।' 

কানিজের দর্শন, ভেতরের সৌন্দর্যের গুরুত্ব। কানিজ মনে করেন, ভেতরের সৌন্দর্যই একজন মানুষকে সত্যিকারের সুন্দর করে তোলে। মন ভালো থাকলে মুখের সৌন্দর্যও বাড়ে।

তিনি বলেন, 'আমাদের কাজ কেবল মানুষকে সাজানো নয়। বরং তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়ানো। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ক্লায়েন্ট যখন নিজেকে সুন্দর মনে করেন তখন তার আত্মবিশ্বাসও বাড়ে, আর তখন আমি বুঝি, আমার কাজ সফল হয়েছে।'

কানিজের বিশ্বাস করেন, একজন মেকআপ আর্টিস্টের কাজ শুধু মুখ সাজানো নয়। বরং ক্লায়েন্টের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলাও গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেন, 'ক্লায়েন্টের মনের কথা বুঝতে পারলে, তার পছন্দমতো সাজ দেওয়া সহজ হয়। তাদের সন্তুষ্টি আমার কাজের সবচেয়ে বড় পুরস্কার।' 

 

কানিজ হুসনা আকবরী ভবিষ্যতে বাংলাদেশি মেকআপ শিল্পীদের জন্য একটি প্রশিক্ষণ কর্মশালা শুরু করার পরিকল্পনা করছেন। তিনি চান, দেশীয় শিল্পীরা আন্তর্জাতিক মেকআপ ট্রেন্ড সম্পর্কে ধারণা লাভ করুক এবং বিশ্ববাজারে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করুক।

কানিজের জীবনগল্প প্রমাণ করে, কঠোর পরিশ্রম এবং আত্মবিশ্বাস দিয়ে যে কোনো লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব। তাঁর কাজ শুধু পেশাদারিত্বের পরিচয় নয়, বরং একধরনের শিল্পকর্ম। যেখানে প্রতিটি মুখই এক একটি ক্যানভাস এবং মেকআপের মাধ্যমে সেই ক্যানভাসে ফুটিয়ে তোলা হয় অনন্য সৌন্দর্য।
 

মেকআপ আর্টিস্ট সাদিয়ার পেশাগত যাত্রা ও অভিজ্ঞতা:

আরো এক মেকআপ আর্টিস্ট সাদিয়া, যিনি মনে করেন, মেকআপ প্রথমত, তাঁর নিজের জন্য। তিনি বলেন, 'আমি আমাকে ভালোবাসি। নিজেকে সুন্দর রাখতে, গুছিয়ে নিতে এবং নিজের সাজসজ্জার দক্ষতাকে আরও সমৃদ্ধ করতে মেকআপ শেখার আগ্রহ জন্মায়। যেকোনো কাজেই গ্রামার জানা থাকলে কাজটি যেমন সহজ হয়, তেমনি সুন্দরও হয়।'

সাদিয়া প্রায় ৮-৯ বছর আগে মেকআপ শেখা শুরু করেন। সেই সময় সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে ঘরে বসেই পৃথিবীর বিভিন্ন মেকআপ ট্রেন্ড সম্পর্কে জানার সুযোগ পান। এরপর যুক্তরাষ্ট্রে চলে আসার কারণে শেখার সুযোগ আরও বাড়ে। তিনি মনে করেন, একজন মেকআপ আর্টিস্ট হওয়ার জন্য সৃজনশীলতা ও দক্ষতার পাশাপাশি পেশাগত প্রশিক্ষণও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মেকআপ শেখার জন্য এখন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বেসিক থেকে অ্যাডভান্স লেভেলের কোর্স প্রদান করে। এসব কোর্সে স্কিন কেয়ার, মেকআপ অ্যাপ্লিকেশন, হেয়ার স্টাইলিং, রঙের তত্ত্ব, বিশেষ ইফেক্টস (Special FX) এবং ক্যামোফ্লাজিং শেখানো হয়। বিভিন্ন দেশে মেকআপ আর্টিস্ট হওয়ার জন্য বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। সাদিয়া নিজেও অনেক প্রশিক্ষণ নিয়েছেন মেকআপের প্রয়েজনে। 

কাজের সুযোগ ও সম্ভাবনা নিয়ে সাদিয়া বলেন, 'মেকআপ শিল্পী হিসেবে একজন পেশাদার ব্যক্তির কাজের সুযোগ সীমাহীন। সেলুন বা বিউটি ক্লিনিকে কাজ করতে পারেন।

ফ্রিল্যান্সার হিসেবে বিভিন্ন বিয়ের অনুষ্ঠান, পার্টি বা কর্পোরেট ইভেন্টে মেকআপ সার্ভিস দিতে পারেন। ফ্যাশন শো, টেলিভিশন শো, চলচ্চিত্র ও বিজ্ঞাপন সংস্থায় তাদের দক্ষতার প্রয়োগ করতে পারেন।সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে নিজের কাজ প্রচার করে ব্যক্তিগত ক্লায়েন্ট বেস তৈরি করার সুযোগও করে নিতে পারেন।'

 

সাদিয়া,  নিজেও আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে কাজ করার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। তবে মেকআপের পাশাপাশি তিনি সবসময় অন্যান্য সৃজনশীল কাজের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। বাংলাদেশে থাকাকালীন যেসব কাজ করতেন, সেগুলোরও আন্তর্জাতিক পরিসরে সুযোগ পান। তাই এককভাবে মেকআপকে পেশা হিসেবে না নিয়ে, নিজেকে বিভিন্ন সৃজনশীল কাজে ভার্সেটাইল হিসেবে গড়ে তুলেছেন।

 

এই শিল্পে আসবার শুরুর দিকে তার তেমন কোনো বড় সমস্যা হয়নি। সাদিয়া বলেন, 'সৃজনশীল যেকোনো কিছু শিখতে আমার ভালো লাগে। তবে মেকআপ পুরোপুরি হাতের কাজ। প্রথমদিকে সেই হাতের ফ্লেক্সিবিলিটি ছিল না। চর্চার মাধ্যমে সেটি সময়ের সঙ্গে এসেছে। হাতের কাজ যত সুন্দর হয়, কনফিডেন্স তত বাড়ে। এখন আমি কনফিডেন্ট ও ফ্লেক্সিবল।' 

ভিন্ন দেশের মানুষদের সাথে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। সাদিয়া দু'বার নিউ ইয়র্ক ফ্যাশন উইকে মেকআপ আর্টিস্ট এবং ফ্যাশন ডিজাইনার সহযোগী হিসেবে কাজ করেছেন। সেখানে বাংলাদেশের টপ মডেল থেকে শুরু করে বিভিন্ন দেশের প্রসিদ্ধ মডেলদের মেকআপ করার সুযোগ পেয়েছেন।

সাদিয়া বলেন, 'ভিনদেশীদের সঙ্গে কাজ করা তুলনামূলক সহজ। কারণ, তারা আমাদের এশিয়ান মেকআপের মতো ভারী মেকআপ পছন্দ করেন না। তারা খুব ন্যাচারাল লুক পছন্দ করেন। তাদের নির্দিষ্ট কোনো চাহিদা থাকে না। তারা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মেকআপ আর্টিস্টের ওপর নির্ভর করেন। কাজ শুরুর আগেই তাদের প্রয়োজনীয় তথ্য জেনে নেওয়া একজন পেশাদার মেকআপ আর্টিস্টের দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে।'

সাদিয়ার মতে, মেকআপ আর্টিস্ট হতে হলে প্রথমেই একজন সৃজনশীল মানুষ হতে হবে। তিনি বলেন, 'যেমন একজন ডায়েটিশিয়ানকে আমরা স্বাস্থ্যবান দেখতে চাই, ঠিক তেমনি একজন মেকআপ আর্টিস্টের উপর ভরসা করতে হলে তার নিজেকে সাজানো গুছানো থাকতে হবে। ক্লায়েন্ট যেন তাকে দেখে মেকআপ করতে আগ্রহী হয়। বিশ্বাস, ভালোবাসা, শিক্ষা—সবকিছুই একজন মেকআপ আর্টিস্টের ব্যক্তিত্বে প্রকাশ থাকা জরুরি। এতে ক্লায়েন্টের সঙ্গে সহজে সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং কাজও সুন্দরভাবে সম্পন্ন হয়।' 

সাদিয়া মনে করেন, যে কোনো প্রফেশনে ভালোবাসা, নিষ্ঠা, বিশ্বস্ততা এবং সততার প্রয়োজন। তিনি বলেন, 'আপনি যে পেশাতেই থাকুন না কেন, যদি এসব গুণ আপনার মধ্যে থাকে, তবে বাড়তি সতর্কতার প্রয়োজন নেই।' 

 

বর্তমানে সাদিয়া মেকআপ, ফ্যাশন, প্রোমোশন, ফটোগ্রাফি, ভিডিওগ্রাফি, কনটেন্ট রাইটিং, প্রোগ্রাম প্রডিউসিং, পাবলিক রিলেশন, হোস্টিং, ডিজিটাল মার্কেটিং, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট, জার্নালিজম এবং ইন্টেরিয়র ডিজাইন নিয়ে কাজ করছেন।

তার মতে, এই কাজগুলো একে অপরের পরিপূরক। 

ভবিষ্যতে এই সবকিছুকে একত্রিত করে নিজেকে আরও সমৃদ্ধ করার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর। সাদিয়া বলেন, 'সব কাজ মিলিয়ে আমি এক 'আমি' হিসেবে বাঁচতে চাই।' 

আজকে শিল্পঘরের পাতায় কানিজ হুসনা আকবরী ও সাদিয়ার গল্প আমাদের শেখায় যে, প্রতিভা, পরিশ্রম, এবং পরিবার-পরিজনের সমর্থন থাকলে জীবনের যেকোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব। সৃজনশীলতা ও দক্ষতার সমন্বয়ে মেকআপ শিল্পীরা সৌন্দর্যের সংজ্ঞাকে নতুন রূপ দেন। আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর এই যাত্রায় বাহ্যিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি অন্তর্নিহিত সৃজনশীলতাকেও গুরুত্ব দেওয়া উচিত। বর্তমানে মেকআপ শিল্পে সফল হতে হলে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, নতুন ট্রেন্ড সম্পর্কে আপডেট থাকা এবং ক্লায়েন্টের প্রয়োজন অনুযায়ী কাজ করার দক্ষতা অর্জন করতে হবে। কানিজ ও সাদিয়ার অভিজ্ঞতা থেকে এটি পরিষ্কার যে, মেকআপ শুধুমাত্র একটি পেশা নয়—এটি শিল্প, ভালোবাসা, এবং আত্মপ্রকাশের এক শক্তিশালী মাধ্যম।

 

 

সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন